বোঝার ভার

সাইদুল হোসেন

এপ্রিল ০৫, ২০২৬

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Uneasy lies the head that wears the crown.

  • English Proverb

যে করে শিরে তার রাজমুকুট ধারণ;

রাতের সুখনিদ্রা সে করে যে হরণ।

*                *                      *

“মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে,

আমি আর বাইতে পারি না”

বোঝার ভারটা বইতে কেউই পছন্দ করে না। আমিও করি না। কিন্তু বেঁচে থাকলে বোঝার ভার বহন করার হাত থেকে কারো মুক্তি নেই যদি না সেই ব্যক্তি হয় একজন নির্বোধ অথবা পাগল। শিশুরা এই ভার থেকে মুক্ত।

বোঝা সাধারণতঃ দু’ ধরণের- দৃশ্যমান ও অদৃশ্য। দৃশ্যমান বোঝাটার ওজনটা অনুমান বা নিরুপণ করাটা সহজ- এতো পাউন্ড অথবা এতো কেজি।

অন্যদিকে অদৃশ্য বোঝাটার ওজনটা মাপা যায় না, এমনকি তা অনুমান করাটাও সম্ভব নয় কখনো কারণ সেটা তো লোকচক্ষুর অন্তরালে স্মৃতির বোঝা যার কোন ওজন নেই, এমনকি সেটার কোন আকৃতিও নেই। তবে হ্যাঁ, সেটার একটা প্রকৃতি আছে বটে। তার প্রকৃতিটা হলো দুঃখময়, বেদনাময়। সুখময় স্মৃতির অবশ্য কোন বোঝা নেই, সে হয় হালকা-পাতলা এবং আনন্দময়, গায়ে লাগা ফুরফুরে হাওয়ার মতো। গায়ে লাগে, তারপর হারিয়ে যায়।

বেঁচে থাকলে বোঝার ভার বহন করার হাত থেকে কারো মুক্তি নেই। ছবি: সংগৃহীত

দুঃখময় স্মৃতির অপর বৈশিষ্ট্য হলো এই যে বয়সটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটারও ওজন (তীব্রতা) ক্রমে ক্রমে বাড়তে থাকে। কখনোবা সেই বোঝার ভারটা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অতীতের কোন গুরুতর অপরাধের অথবা পাপের স্মৃতির ক্ষেত্রে সচরাচর এমনটা ঘটে থাকে। বিবেকের অনবরত দংশন এমতাবস্থায় একজন মানুষকে দৈহিকভাবে অসুস্থ করে তুলতে পারে, এমনকি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলতে পারে কেউ কেউ। হয়ে যেতে পারে পাগলও।

দৃশ্যমান বোঝাটার একটা রূপ হলো একজন মানুষের উপর আরোপিত দায়িত্ব-কর্তব্যের গুরুত্ব ও তার ব্যাপ্তি। যদি সেই ব্যক্তিটি mature, intelligent and competent হয়, তাহলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তা না হলে সেই ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি বোঝাটা বহন করতে পারবে না, সৃষ্টি হবে নানা সমস্যার।  অযোগ্য ব্যক্তির উপর ভারী কোন দায়িত্বের বোঝা চাপালে সে তা সন্তোষজনকভাবে পালন করতে পারবে না তার প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও কর্ম-অভিজ্ঞতার অভাবে। পদে পদে ভুল করবে, হোঁচট খাবে সেই বোঝার ভারে। কাজটা রয়ে যাবে অসমাপ্ত অথবা হবে সেটা ক্রটিযুক্ত। নিজের অযোগ্যতাটাকে ঢাকতে গিয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিটি কখনো দোষ দেয় তার সহকর্মীদের অথবা কখনো তার কাজের যন্ত্রপাতির উপর। ইংরেজী প্রবাদ : A bad worker blames his tools.

সুদূর অতীতে বাল্যকালে যখন গ্রামে বাস করতাম তখন কৃষকদের মুখে শুনতাম, তারা বলতো, “ছাগল দিয়ে কখনো হালের জোয়াল টানা যায় না, তাতে দরকার গরুর।” কথাটা খাঁটি সত্য, প্রতিবাদের কোন অবকাশ নেই এখানে।

বোঝার ভারটা লাঘব করার একটা উপায় হলো সম্ভব হলে সেটা ভাগাভাগি করে নেয়া। বাংলা প্রবাদ : “দশের লাঠি একের বোঝা।”

বোঝার ভারটা লাঘব করার আর একটা উপায় হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিটির তার কর্তব্যের প্রতি সহনশীল মনোভাব, অপ্রতিবাদী মনোভাব। দায়িত্বটা পালনের প্রতি আগ্রহ, প্রতিবাদ নয়। কাজকে, দায়িত্ব পালনকে ভালোবাসতে হবে আর তাহলেই বোঝাটা অসহনীয় বলে বোধ হবে না।

কাজ-পাগলা লোকেরা সুখী কারণ তাদের “অলস কাল” বলে কিছু নেই, তারা কর্তব্যসম্পাদনে সদা ব্যস্ত। ব্যস্ততাই তাদের জীবনীশক্তি (fuel). ইংরেজীতে একটা কথা আছে :  If you want to get something done, go to a busy person, not to a lazy guy. কাজ-পাগলা ব্যস্ত ব্যক্তিটি তার শত কাজের মাঝেও তোমার কাজটা করে দেয়ার মত সময় বের করে নেবে, কিন্তু অলস লোকটা তার অখণ্ড অবসরেও তোমার কাজটা করে দেয়ার মত উদ্যোগ নেবে না। কথাটা সত্য। অলসেরা কর্মবিমুখ এবং দায়িত্বগ্রহণে অনাগ্রহী।

              *                                        *                                        *

প্রাচীন বাংলা কবিতা।

“সতীর পূণ্যে পতির পূণ্য সর্বলোকে জানে,

সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে ॥”

বহু যুগ আগের কথা। মনে পড়ে যে আমাদের গ্রামের বাড়ির বৈঠকখানায় (আমরা বলতাম “বাংলা ঘর”।) দেয়ালে আয়নাতে বাঁধানো দু’টি সুদৃশ্য ফ্রেইম (frame)  ছিল যার একটাতে লেখা ছিল “ভুলো না আমায়”, আর অন্যটাতে লেখা ছিল “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।”

এই বাক্যটি নিয়ে গুরুজনদের মাঝে আলোচনাও শুনতাম। বয়স ও বিদ্যা দুই-ই ছিল কম, সব কথা ঠিক মত বুঝতাম না। পরে পরিণত বয়সে সেসব আলোচনার রেশ মনে পড়তো। বুঝতে পারতাম যে বাক্যটির দু’টি অর্থ করা হতো। একটা মত ছিল এই যে ঘরের রমণীরা (স্ত্রীরা) বাস্তবিকই তাদের নানা গুণাবলীর কারণে প্রশংসনীয়া।

আর দ্বিতীয় মতটি ছিল এই যে, সব রমণীই সমান গুণবতী নয়। উপরে বর্ণিত প্রশংসাটা আসলে পুরুষদের একটা মিথ্যা স্তোকবাক্য মাত্র যাতে নারীরা মোহিত হয়ে নিজেদের কষ্ট ভুলে সংসারের সর্বরকম কাজের বোঝা ঘাড়ে তুলে নিয়ে পুরুষদের অব্যাহতি দেয় এবং তারা পরম সুখে নারীদের সেই সর্বক্ষণিক সেবাটুকু উপভোগ করতে পারে।

সাইদুল হোসেন

মিসিসাগা

অন্টারিও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *