কানাডার টরন্টোতে বাঙালি-অবাঙালি লেখক-পাঠকের অভূতপূর্ব সম্মিলন

গত ১লা মে  কানাডার টরন্টো শহরের সেন্ট পল ইউনাইটেড চার্চে অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য প্লাটফর্ম কানাডা জার্নাল (c-j.ca) আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ  প্রকাশনা উৎসব। এই আয়োজনে সম্প্রতি প্রকাশিত যে তিনটি গ্রন্থের উন্মোচন করা হয় সেগুলো হলো বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাস সম্পাদিত ‘কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা’, কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি শ্যামশ্রী রায় কর্মকার সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী ‘সাহিত্য এখন’ এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত কবি উদয় শংকর দুর্জয় সম্পাদিত ‘পোয়েট্রি আউট লাউড’ সাহিত্য সাময়িকীর কানাডার সাহিত্য বিষয়ক সংখ্যা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সংখ্যা দুটির অতিথি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন টরন্টোর লেখক সুব্রত কুমার দাস। তিনটি বইতেই কানাডার বিপুল সংখ্যক  বাঙালি-অবাঙালি লেখকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টরন্টোর অগ্রগণ্য বাঙালি সংস্কৃতিজন ড. ইখতিয়ার ওমর। টরন্টোর যে চার পোয়েট লরিয়েট এই আয়জনকে আলোকিত করেন তাঁরা হলে  গভর্নর জেনারেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, গিলার পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক   অ্যান মাইকেলস, গ্রিফিন পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি এ এফ মরিৎজ, এবং ডাব পোয়েট লিলিয়ান অ্যালেন।  ছাড়াও বিপুল সংখ্যক বাঙালি অবাঙালি লেখক এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।

সুব্রত তাঁর উদ্বোধনী বক্তৃতায় এই প্রকাশনা উৎসবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি আরও জানান, বাংলামেইল এ বছর চারজন পোয়েট লরিয়েটকে নিয়ে তাদের জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করেছে। সেগুলো প্রকাশের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন কানাডা জার্নালের উদ্যোক্তা সুব্রত কুমার দাস। এরপর বাংলামেইলের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু সেই সাপ্লিমেন্টগুলোর রেপ্লিকা কবিদের হাতে তুলে দেন। অনুষ্ঠানের শুরু হয় আরিয়ানা ইসলামের ল্যান্ড একনলেজমেন্ট পাঠের মধ্য দিয়ে। এরপর মঞ্চে আহবান করা হয় উপস্থিত মূলধারার কবিদের; যাঁদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিয়াত্রিজ হাউসনার, আন্না ইয়িন এবং প্যাট্রিক কনোরসকে। প্রধান অতিথির সাথে তাদেরকে  ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান ড. দিলীপ চক্রবর্তী।   
সামগ্রিক এই আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী, ইমিগ্রেশন কন্সালট্যান্ট মনীষ পাল, মোর্শেদ নিজাম সিপিএ এবং মর্টগেজ এজেন্ট বজলুর মারুফ। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বাংলামেইল এবং এনআরবি টেলিভিশন।   

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঢাকা থেকে গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে সুব্রত কুমার দাস সম্পাদিত ‘কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা’। রয়েল পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থে কানাডার বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী একাত্তর জন বাঙালির লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। টরন্টো ছাড়াও ভ্যাঙ্কুভার, ক্যালগেরি, এডমন্টন, সাস্কাটুন, মন্ট্রিয়ল, অটোয়া, হ্যালিফ্যাক্স প্রভৃতি শহরের লেখকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।    

এই গ্রন্থে কানাডার যে বাঙালিদের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁরা হলেন, অশোক চক্রবর্তী, ড. দিলীপ চক্রবর্তী, তাজুল মোহাম্মাদ, সৈয়দ ইকবাল, শাহানা আকতার মহুয়া, আকবর হোসেন, বায়াজিদ গালিব, মেজর (অব.) সুধীর সাহা, সুজিত কুসুম পাল, স্বপন বিশ্বাস, রূমানা আহমদ চৌধুরী, ফুয়াদ চৌধুরী, হাসান মাহমুদ, সুলতানা শিরীন সাজি, সেলিনা শেলী, তসলিমা হাসান, ডক্টর ঝর্ণা চ্যাটার্জী, শহিদুল ইসলাম মিন্টু, নিরঞ্জন রায়, সুব্রত কুমার দাস, সুপর্ণা মজুমদার, ড. বাদল ঘোষ, রোকসানা পারভীন শিমুল, জয়ন্তী রায়, লতিফুল কবির, রোকসানা লেইস, রঞ্জনা ব্যানার্জী, তাসমিনা খান, কাজী হেলাল, আবদুল হাসিব, রথীন ঘোষ, আহমেদ হোসেন, ডক্টর শান্তনু বণিক, সুশীল কুমার পোদ্দার, শেখর ই গোমেজ, শুভ্রা শিউলী সাহা, ফাহমিদা নীপা, ঋতু মীর, অমলেন্দু ধর, স্বপন কুমার দেব, রেশমা মজুমদার শম্পা, অসীম ভৌমিক, আশীষ রায়, সৈয়দা রোখসানা বেগম, ঋতুশ্রী ঘোষ, আসমা অন্বেষা, রতন সাহা, অতনু দাশ গুপ্ত, দেবাঞ্জনা মুখার্জী ভৌমিক,  ফারহানা আইরিন, ডা. সৈয়দ আযম মোহাম্মদ,  শাহজাহান কামাল, জাকারিয়া মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন, হোসনে আরা জেমী, ড. জান্নাতুল ফেরদৌস,  প্রতিমা সরকার, পূর্বাশা চৌধুরী, মাহবুব ওসমানী, মনীষ পাল, মম কাজী, নারগিস দোজা,  মিত্রা চট্টোপাধ্যায়, রওশন আরা বেগম, ড. জান্নাতুল নাইম, রুমা বসু, সামিনা চৌধুরী, শ্রেয়সী বোস দত্ত, তাহমিনা সুলতানা, হাবিবুল্লাহ দুলাল, মানসী সাহা এবং জেবুন নাহার।  

কানাডার সাহিত্য নিয়ে ‘সাহিত্য এখন’ নামের সাময়িকীটির বর্তমান সংখ্যার উন্মোচন হয় গত ২৭ ডিসেম্বর কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন মিলনায়তনে। পত্রিকার এই সংখ্যাটিতে কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড, অ্যালিস মানরো, মাইকেল ওনডাটজে  লেখা প্রসঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, লিলিয়ান অ্যালেন, অ্যান মাইকেল, এ এফ মরিৎজে প্রমুখ কানাডীয় সাহিত্যের নক্ষত্রপ্রতিম কবিদের কবিতার অনুবাদ। প্রায় এক বছরের অধিক সময় ধরে সুব্রত কুমার দাস ও শ্যামশ্রী রায় কর্মকার এই সংখ্যার পরিকল্পনা করেছেন। তাঁরা নিরলস পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে বৃহত্তর পাঠকের সামনে কানাডীয় সাহিত্যকে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন।

এই সংখ্যায় মার্গারেট অ্যাটউডের সাহিত্য নিয়ে লিখেছেন বিশিষ্ট কবি যশোধরা রায়চৌধুরী, লন্ডন প্রবাসী লেখক উদয় শংকর দুর্জয় এবং কানাডার ব্রাম্পটন প্রবাসী পণ্ডিতজন দিলীপ চক্রবর্তী। কানাডায় আদিবাসী সাহিত্য নিয়ে একটি তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন শ্রেয়সী বোস দত্ত। অ্যালিস মানরোর ছোটগল্প নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য পাল। অ্যান মাইকেলসের উপন্যাসে নিউরন মিউজিক সম্বন্ধে লিখেছেন সুজিত কুসুম পাল। লিলিয়ান অ্যালেনের বিপ্লবী লেখা নিয়ে লিখেছেন মম কাজী। তাসমিনা খান লিখেছেন সাহিত্যিক জর্জ এলিয়ট ক্লার্কের লেখা নিয়ে। মাইকেল ওন্দাটজের পোয়েটিক্স দর্শন নিয়ে লিখেছেন অমিত সরকার। জান্নাতুল নাইম কানাডিয়ান কবি রুপি করের কবিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। বঙ্গদেশে ক্যানলিটের চর্চা নিয়ে লিখেছেন ড. রাশিদ আসকারী।

কানাডীয় কবিদের এক গুচ্ছ কবিতার ভূমিকাসহ অনুবাদ করেছেন সুরেশ রঞ্জন বসাক। এ. এফ. মরিৎজের কবিতার উপর চর্চা করেছেন সামিনা চৌধুরী। বিশ্ব সাহিত্যে অ্যালিস মানরোর অসীম ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন হাসান জাহিদ। পত্রিকাটিতে কানাডার গল্পকার ম্যাভিস গ্যালান্টের গল্প অনুবাদ করেছেন শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়, হিমানী ব্যানার্জির গল্প অনুবাদ করেছেন বিতস্তা ঘোষাল ও সত্যব্রত ঘোষ, অভিজিৎ পালচৌধুরী অনুবাদ করেছেন মাদেলেইন থিয়েনের গল্প, পত্রিকার সম্পাদক শ্যামশ্রী রায় কর্মকারের লেখনীতে অনূদিত হয়েছে মাইকেল ক্রামির গল্প। মাইকেল ওনডাটজে গল্প অনুবাদ করেছেন অমিত সরকার।

পত্রিকায় কানাডার কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, এ. এফ. মরিৎজ, লিলিয়ান অ্যালেন, অ্যান মাইকেলস, কে গান্ধার চক্রবর্তী, দয়ালি ইসলাম ও অ্যান কার্সনের কবিতার নির্ভরযোগ্য অনুবাদ করেছেন জেনিথ রায়, বেবী সাউ, অর্পিতা কুণ্ডু, শ্যামশ্রী রায় কর্মকার, সুব্রত কুমার দাস, সোমা দত্ত, সায়ন রায়, জয়িতা ভট্টাচার্য এবং গৌরাঙ্গ মোহান্ত।

কানাডার সাহিত্য নিয়ে রচিত দুটি বই নিয়ে আলোচনা করেছেন বরুণ কুমার বিশ্বাস এবং অরিত্র দ্বিবেদী। বইদুটি হলো সুব্রত কুমার দাস রচিত ‘কানাডার সাহিত্য’ এবং সুরজিৎ রায় মজুমদার অনূদিত ‘কানাডার কবিতা’।

পত্রিকাটির ইংরাজি বিভাগে সুব্রত কুমার দাস ও জেনিথ রয় লিখেছেন যথাক্রমে কানাডার সাহিত্য কী এবং অ্যান মাইকেলসের উপন্যাস হেল্ড নিয়ে। কানাডার কবি গিয়োভানা রিচিও, প্যাট্রিক কোনরস, বিয়াট্রিজ হাউসনার, আনা ইন, পিজে ইউকন, গ্রেগরি বেটস, জিম জনস্টন, এলিস মেজর, দেবাশীস মণ্ডল, দুর্গাপ্রসাদ পাণ্ডা, মোহাম্মদ জাহিদ, নিশি পুলুগুরথা, পৌলমী চ্যাটার্জি, এবং অবন্তিকা কর্মকারের কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে। প্রবালকুমার বসু, সৈয়দ কওসর জামাল, ঋজুরেখ চক্রবর্তী, সেবন্তী ঘোষ, পৌলমী সেনগুপ্ত ও গৌরব চক্রবর্তীর কবিতা ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে ঔষ্ণীক ঘোষ, বাপ্পাদিত্য রায় বিশ্বাস, জেনিথ রয় এবং তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়। বাপ্পাদিত্য রায় বিশ্বাসকৃত কবি সুবোধ সরকারের কবিতার দ্বিভাষিক অনুবাদগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রীতি সান্যাল। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই সংখ্যার অতিথি সম্পাদক ছিলেন সুব্রত কুমার দাস।

যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে সাহিত্য সাময়িকী পোয়েট্রি আউট লাউড তাদের সপ্তম সংখ্যাটিতে প্রকাশ করেছে কানাডার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পোয়েট্রি আউট লাউডের প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন লন্ডন প্রবাসী লেখক উদয় শংকর দুর্জয়। সম্পাদনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন বিশিষ্ট কবি ও অনুবাদক ড. গৌরাঙ্গ মোহান্ত। পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক হলেন কবি ডেভিড লী মরগান ও কবি অশোক কর। সম্পাদনা সহযোগী হিসেবে দায়িত্বরত আছেন লুইস হুয়াইবার্ড।

কানাডার সাহিত্য নিয়ে বাঙালি লেখক ও গবেষকদের পরিধিকে সবার সামনে তুলে ধরতে এবং বাঙালি পাঠককে কানাডার সাহিত্য বিষয়ে আগ্রহী করতে পোয়েট্রি আউট লাউড এ বছর উদ্যোগ গ্রহণ করে কানাডার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের। এই  সংখ্যায় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত কানাডার অগ্রগণ্য কবি ও সাহিত্য উদ্যোক্তা মার্গারেট অ্যাটউডের সারভাইভাল নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন পণ্ডিতজন ড. দিলীপ চক্রবর্তী। বাংলাদেশে কানাডীয় সাহিত্যের পাঠ ও চর্চা নিয়ে লিখেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক প্রফেসর ড. রাশিদ আসকারী। কানাডীয় সাহিত্যে বিশ্বসাহিত্যের উপস্থিতি নিয়ে লিখেছেন সুব্রত কুমার দাস। এছাড়া কানাডার আদিবাসী লেখকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে লিখেছেন শ্রেয়সী বোস দত্ত।

কানাডার প্রধান যে কবিদের কবিতা দিয়ে এই সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে তাঁরা হলেন অ্যান মাইকেলস, জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, এ এফ মরিৎজ এবং লিলিয়ান অ্যালেন। টরন্টোর প্রাক্তন তিন পোয়েট লরিয়েট এবং বর্তমান পোয়েট লরিটের কাব্যজগৎ ও কাব্য চর্চা নিয়ে লিখেছেন কানাডার চার বাঙালি লেখক সুজিত কুসুম পাল, সামিনা চৌধুরী, তাসমিনা খান এবং মম কাজী।

ক্রোড়পত্রের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন সুব্রত কুমার দাস।

অনুষ্ঠানে উল্লিখিত তিন প্রকাশনায় যাদের লেখা প্রকাশিত হয়েছে তাদের হাতে লেখক-কপি তুলে দেওয়া হয়। – সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ছবি : দীপক সূত্রধর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *