কানাডায় শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতার হার গত ছয় বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক , নভেম্বর ১৬ ২০২৫ : কানাডায় যারা শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন তাদের গ্রহণযোগ্যতার হার গত ছয় বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সিবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানে এই তথ্য প্রকাশ পায়।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে ২০২৩ সালে কানাডায় আশ্রয়প্রাপ্ত শরণার্থী দাবিদারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭,০০০, যা ২০১৮ সালে ছিল ১৪,০০০ এরও বেশি।
আশ্রয়প্রার্থীদের ঘিরে বেশিরভাগ মিডিয়া কভারেজ হয়েছে ভারত, হাইতি এবং মেক্সিকোর মতো দেশ থেকে কানাডায় আসা ব্যক্তিদের নিয়ে। আর ২০১৮ সালের জানুয়ারী থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ সালের মধ্যে এই দেশগুলি থেকে আসা প্রায় অর্ধেক শরণার্থীর আবেদনেই গৃহীত হয়েছে।

তবে কানাডায় থাকার অনুমতি পাওয়া সবচেয়ে বেশি শরণার্থী এসেছেন যে দুটি দেশ থেকে তা হলো, ইরান এবং তুরস্ক। এই দুটি দেশ থেকে আসা ৯৫ শতাংশেরও বেশি শরণার্থীর বেলায় কেস একসেপ্টেন্সির হার ছিল ইতিবাচক। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এর তথ্যের বিশ্লেষণে সিবিসি এই চিত্র দেখতে পায়।
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, একজন আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থী কানাডায় থাকার অনুমতি পাবেন কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য অনেকগুলি বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঐ ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা, তার পরিচয় প্রমাণ করার ক্ষমতা, হুমকির তীব্রতা এবং তার নিজ দেশের পরিস্থিতি।
কানাডায় বেশিরভাগ শরণার্থী দাবিদার তাদের মামলা শুনানিতে উপস্থাপন করে থাকেন। শুনানির সময় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এর একজন সদস্য সিদ্ধান্ত নেন যে আবেদনকারী কানাডায় আশ্রয়ের জন্য যোগ্য কিনা।
কিন্তু ‘ইমিগ্রেশন এবং রিফিউজি প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ কিছু মামলার ক্ষেত্রে শুনানি ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেয়, যা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘পেপার রিভিউ’ নামে পরিচিত। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড অনুসারে, এই প্রক্রিয়াটি ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ গ্রহণযোগ্যতার হারযুক্ত দেশগুলির লোকেদের জন্য প্রযোজ্য যারা তাদের পরিচয় প্রমাণ করতে পারেন, তাদের কোনও গুরুতর বিশ্বাসযোগ্যতা সমস্যা নেই এবং যারা নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
উল্লেখ্য যে, শুনানি ছাড়া কানাডায় শরণার্থীর দাবি প্রত্যাখ্যান করা যায় না। তাই ‘পেপার রিভিউ’র মাত্র দুটি সম্ভাব্য ফলাফল রয়েছে: একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, অথবা একটি মামলার শুনানিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত।
ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসকারী শরণার্থী ও অভিবাসন আইনজীবী মোজদেহ শাহরিয়ারি, (যিনি একসময় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এর সদস্য ছিলেন) বলেন, ‘শুনানি ছাড়া শরণার্থীদের মামলা অনুমোদন করা একসময় বিরল ঘটনা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকার শুনানির অপেক্ষায় থাকা মামলার বিশাল জটের (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ২৫০,০০০) কারণে তা দ্রুত এবং শুনানির সময় ও ব্যয় ছাড়াই সমাধানের উপায় খুঁজছে।’
তবে শাহরিয়ারি বলেন, ‘এভাবে শরণার্থীদের মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আর আমি মনে করি এটা এখন সকলেরই জানা যে কানাডায় শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থার অপব্যবহার করা হচ্ছে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে হচ্ছে।’
ইরান থেকে আসা অনেক শরণার্থীর কেস পরিচালনাকারী শাহরিয়ারি বলেন, এগুলোর বেশিরভাগই বৈধ এবং ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থায় সেখানকার অনেকের জীবন ‘আতঙ্ককর’।
রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা, অথবা যারা ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, তারা কঠোর নির্যাতনের সম্মুখীন হন। যেহেতু রাষ্ট্রই এই ধরনের লোকদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তাই সেখান থেকে আসা শরনার্থীদের আশ্রয় প্রার্থনার দাবি এক অর্থে আরও স্পষ্ট।
সিবিসি’র বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে ইরান থেকে আসা শরণার্থীদের বেশিরভাগ দাবি ধর্মীয় নিপীড়নের সাথে সম্পর্কিত। যারা কানাডায় সুরক্ষা চাওয়ার কারণ হিসেবে ধর্মীয় নিপীড়নের কথা বলেছিলেন তাদের বেশিরভাগই ধর্মত্যাগী বা ইসলাম ত্যাগকারী বলে বিবেচিত হয়েছিল।
তবে শাহরিয়ারি বলেন যে, ইরান থেকে আসা অনেকের মামলা বৈধ নয়। কারণ তিনি তার মক্কেলদের প্রতিনিধিত্ব করতে রাজি হওয়ার আগে তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই করেন। তিনি বলেন, এইসব মানুষ হতে পারে যারা ভিজিটর বা স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডায় এসেছেন এবং উন্নত জীবনের আশায় আছেন। তিনি বলেন, এটি বন্ধ করার জন্য, বিদেশে ভিজিটর বা স্টুডেন্ট ভিসা দেওয়ার আগে স্ক্রিনিং বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যদিকে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড –কে আরও শুনানি আয়োজন করতে হবে।
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড অবশ্য এক বিবৃতিতে বলেছে যে শুনানি ছাড়া শরণার্থীদের মামলাগুলি প্রক্রিয়া করা হবে না। এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে যে, আবেদনকারী ব্যক্তিটি নিরাপত্তা ছাড়পত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং তার পরিচয় বা বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনও উদ্বেগ নেই।
কিন্তু শাহরিয়ারি বলেন, ‘শুনানিই হলো এটি প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়। যদি শুনানি না হয়, তাহলে ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতার কোনও যাচাই-বাছাই করা যায় না। তাছাড়া সিস্টেমের অপব্যবহারের সম্ভাবনা সর্বদা থেকেই যায়। ’
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত পাঁচ বছরে কানাডায় শরণার্থী দাবির গ্রহণযোগ্যতার হার বৃদ্ধি পাওয়ায়, ইরান এবং তুরস্কের মানুষের গ্রহণযোগ্যতার হার সর্বোচ্চ, ৯৫ শতাংশেরও বেশি। তবে কিছু কিছু দেশ থেকে আসা শরণার্থীদেরকে ব্যাপক তদন্তের সম্মুখীন হতে হয়।
যেমন, সিবিস ‘র বিশ্লেষণ অনুসারে দেখা গেছে আফ্রিকার নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের দাবী গৃহীত হয়েছে ৪৬ শতাংশ। এই হিসাব ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যকার।
টরন্টোতে বাস করেন এবং নাইজেরিয়ার শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করেন এমন একজন অভিবাসন আইনজীবী ভাক্কাস বিলসিন সিবিসিকে বলেন, এ সকল শরণার্থীদের মামলাগুলি সর্বদা শুনানিতে পাঠানো হয়। আর এই শরণার্থী দাবিদারদেরকে একজন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এর সদস্যের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে তাদের দেশের পুলিশ তাদেরকে সুরক্ষা দিতে পারবে না এবং তাদের দেশের অন্য কোথাও তারা নিরাপদে থাকতে পারবে না।
