নিভৃতে
রীনা গুলশান
১২
বার্গার-এ মাত্র ২/৩টা কামড় দিয়েছে। ভালো করে খেতেও পারছে না ফাবিয়ান। বুকের কোন গহীন কোণে একটা সুক্ষ্ম কাঁটা ওকে বার বার বেদনাহত করেই চলেছে। ও নিজেই ভেবে পাচ্ছে না, এত বড় একটা ভুল সে কিভাবে করলো? ওকি তবে আসলেই খুব স্বার্থপর ধরনের একটা ছেলে? সারাটি জীবন শুধু নিজের যন্ত্রণার পেছনেই ছুটেছে? একটি বারও অন্য কারও কথা ভাবেনি! সেই মেয়েটি তাকে রাস্তা থেকে তুলে কোথায় বসিয়েছে? আজ প্রায় ৫টি বছরের প্রতিটি সুখে-দুঃখে যে মেয়েটি তাকে ছায়ার মত ঘিরে রেখেছে। সেই তাকেই সে কিভাবে এরকম ওভারলুক করেছে? একটি বারও কি ও কখনো নাওমীর কথা ভেবেছে! কেন মেয়েটি দিনের পর দিন ওর জন্য এত করছে, কেন? কেন? কেন? আসলে আজ কেন যেন মনে হচ্ছে ও কখনোই কারো কথা আসলেই কি ভেবেছে? এই যে বুড়ো নানীটা যে সারাটি জীবন ওকে আঁচলের ছায়া দিয়ে এতটি বড় করেছে, সেকি একবারও নানীর কথা ভেবেছে? বুড়ো মানুষটা কিভাবে আছে? তারপর ডোরিন? শুধুমাত্র একটি মানুষের জন্য সে ক্রমাগতভাবে তার আশপাশের আরও কতগুলি মানুষকে দুঃখী করে চলেছে?
: ওহ্, ওহ্- আমি এটা কি করেছি। হায় ঈশ্বর। এটা আমি কি করেছি? আমি কি তবে সারা জীবন শুধু মরীচিকার পেছনে ছুটেছি? শুধু সুন্দরের পেছনে? সিসিলিয়ার অসম্ভব সৌন্দর্যটাই দেখলাম, আর নাওমীর ভালোবাসাটা আমার চোখেও পড়লো না?
হঠাৎ তার সেল ফোনটা বেজে উঠলো-
: হ্যালো, কিরে শালা- তুই কৈ? আমি দেখি সেই কখন থেকে তোর ফ্লাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেল বাজাচ্ছি!
: ওহ্! রায়ান তুই এসে গেছিস?
: এসে গেছি মানে, ঘণ্টা খানেক ধরে। তুই ব্যাটা আজকের দিনে আবার বেরিয়েছিস কেন?
: ওহ্! সরি, এক্ষুনি আসছি। একটু কাজে বেরিয়ে ছিলাম দোস্ত। আসছিরে…
ট্যাক্সি ধরেই বাসা চলে এলো যাতে করে দেরি না হয়। এসেই দেখে রায়ান আবার এক তলাতে নেমে নিচের দর্শনার্থীদের বেঞ্চে বসে আছে। ফাবিয়ানকে দেখে, ওর আবার মুন্ডু চটকে দুজন উপরে উঠলো। একটা ব্যাগ হাতে এসেছে।
: দোস্ত তুই খেয়েছিস? ফাবিয়ান খুব কুণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলো। কারণ ও জানে ফ্রিজে তেমন কিছু নাই। চলে যাবে বলে ফ্রিজ প্রায় খালি করে রেখেছে। এখন রায়ান যদি বলে, তার ক্ষিধে পেয়েছে তাহলে বেশ বিব্রতকর অবস্থা হবে। ও যখন বেশ বিব্রতভাবে এসব ভাবছে এমন সময় ওর সেল ফোন বেজে উঠলো। নাওমী-
: ফাবি, আমি তোমার ঘরের সামনেই, তোমাদের জন্য লাঞ্চ বানিয়ে আনছি।
: সত্যি? ফাবিয়ান প্রায় চিৎকার করে উঠলো।
: কি ব্যাপার এরকম বিকট চিৎকার। খুউব ক্ষিধে পেয়েছে?
: তাতো পেয়েছেই- ফাবিয়ান নাওমীকে খুশি করতে চাইলো। উপরন্তু গলা পর্যন্ত ক্ষিধে নিয়ে রায়ানও দাঁড়িয়ে আছে!
: ওহ্, হো… হো… আমি খুবই দুঃখিত দেরী হবার জন্য।
: আচ্ছা আমি দরজা খুলছি, আর তোমার ‘বাজ’ টিপার জন্য অপেক্ষা করছি।
একটু পর নাওমী বিশাল পিকনিকে যাবার খাবার ঝুড়ি নিয়ে হাজির। হাতে আবার কিসব লটবহর। রায়ান মোটামুটি ঝাঁপিয়ে পড়লো সব খোলাখুলি করার জন্য।
: ওহ্, মাই গড ‘রিসোটো’? ওহ্, কত দিন পর এ রকম ‘রিসোটো’ গন্ধ পেলাম! রায়ান নাক জোরে টানলো।
: আচ্ছা, আচ্ছা হয়েছে- সরো আমি খাবার লাগিয়ে দিচ্ছি।
নাওমী সুন্দরভাবে তিনটে প্লেটে বাড়লো ‘রিসোটো’ আর চিকেন বেকিং রোস্ট। আর একটা পাত্রে রয়েছে চিজ কেক। ফাবিয়ানের ক্ষিধে পায়নি। কিন্তু সেও মোটামুটি রায়ান-এর মতই ভাব করছে। কারণ, তা নাহলে নাওমী খুব দুঃখ পাবে। ওকে আর কত দুঃখ দেবে। বুকে পাহাড় পরিমাণ দুঃখ নিয়েও সে ফাবিয়ানের জন্য লাঞ্চ বানিয়েছে। এমনকি ওর বন্ধুর জন্যও। রায়ান আসবে এটা নাওমী জানে। নাওমীর সাথে আগে ও অনেক বার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। রায়ানও সিসিলিয়াকে একদম পছন্দ করতো না। বলতো, ‘ওটা মাকাল ফল’। নাওমীকে বরাবর রায়ান খুব পছন্দ করতো। সে নিজেও এখনও না খেয়ে আছে অথচ ফাবিয়ান তো রীতিমত ংঁনধিু-এর বার্গার খেয়েছে।
খাওয়া শেষে নাওমী স্যুটকেস গোছাতে বসলো। নিপুণ করে গোছাতে শুরু করলো। রায়ান আবার তার বাবা-মায়ের জন্য গিফট এনেছে। সেগুলো গুছালো।
নাওমী এনেছে ওর নানীর জন্য একটা খুব দামী আর্থপেডিক জুতো। আর হালকা গোলাপী রঙের একটা সোয়েটার। বেশ কিছু দিন ধরে এই সোয়েটারটা সে নিজেই বানাচ্ছিল। অনেক আগে, সিসিলিয়া তার জীবনে আসবার আগে। নাওমী তাকে একটা ধুসর রঙের সোয়েটার বুনে দিয়েছিল। আর একটা কালো রঙের ভেলভেটের ছোট্ট চৌকাণা বাক্সে কি যেন।
: ওটা আবার কি? ফাবিয়ান বাক্সটা দেখিয়ে বললো।
: এই তো দ্যাখো, বলে নিজেই খুললো।
একটা রিয়েল শ্যাপায়ার আর রিয়েল ডায়মন্ডের আংটি হোয়াইট গোল্ডের মধ্যে।
: এটা আবার কি করেছো? ফাবিয়ান খুব বিস্মিতভাবে বললো।
: না, মানে- এটা একটা আংটি। এটা তুমি তোমার তরফ থেকে ডোরিনকে পরিয়ে দিও। আমিতো জানি, তুমি ডোরিনকে দেবার মত কোন রিঙ কেনোনি। তাই আমিই কিনে এনেছি।
ফাবিয়ানের হঠাৎ খুব কান্না পেল। এমনিতেই সেই সকাল থেকেই তার হৃদয়ে ঝড় বইছিলো। এখন আবার নাওমীর এইসব আচরণ। ফাবিয়ান তার কান্না চাপতে দৌড়ে ওয়াশরুমে ছুটলো। বেসিনের সামনে জোরে কল ছেড়ে, ফাবিয়ান খুব কাঁদলো।
নাওমী আজ আসবার পর থেকেই ফাবিয়ানের আচরণ দেখে বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল। কেন যেন মনে হচ্ছিল ফাবির মধ্যে কি একটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন তার কৌতুহল আর চাপতে পারলো না, রায়ানকে জিজ্ঞাসা করলো-
: রায়ান, ফাবির কি হয়েছে?
: কি জানি বুঝতে পারছি না। আসবার পর থেকেই দেখছি বেশ গম্ভীর হয়ে আছে। হয়তো বা অনেক দিন পর নানীর কাছে যাচ্ছে, সেই জন্যই বেশ ইমোশনাল হয়ে আছে।
: হু! হয়তো বা- কিন্তু আমার অবশ্য তা মনে হচ্ছে না।
: হতেও পারে হয়তোবা সারা আন্টির কথা মনে পড়েছে। ওরতো সারাক্ষণ ব্রেনের মধ্যে দুটি চিন্তা ঘোরে। এক সাইডে তার মার জন্য অন্য সাইডে তার অন্য জগৎ। যদিও মুখে ঠিক তার উল্টোটা বলে। ভাব দেখায় মাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে। অথচ মনে মনে এখন সারা আন্টির সেই ‘পিচ্চি’ ফাবি হয়েই আছে। অথচ মায়ের ফোন ধরবে না। কথা বলবে না।
: এ ব্যাপারে আমি তোমার সাথে একমত। আর মায়ের ব্যাপারে কোন রকম আলোচনাও কারো সাথে করতেও চায় না।
এর মধ্যে ফাবিয়ান চলে এলো।
: দ্যাখো আমি একেবারে গোসলটাও করে ফেললাম। এখন ড্রেসটাও পরি ফেলছি। সাড়ে চারটে বেজে গেছে।
: নে রায়ান আর কি কি খাবি খেয়ে ফেল-
: শালা আমি কি খালি খেতেই আসি নাকি?
ফাবিয়ান অনেক দিন পর হো… হো… করে হেসেই ফেললো। ঘরের পরিবেশটা বেশ হালকা হয়ে গেল।
: ফাবিয়ান তোমার শেভিং কিডটা নীল রঙের এই স্যুটকেসটার ডানদিকে আছে, বুঝেছো?
: কেন, ওটা হ্যান্ডব্যাগে দিলে হতো না?
: ওহ্! তুমি তাও জানো না। হ্যান্ডব্যাগে এখন এসব নেওয়া যায় না?
: তাইতো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।
: সেই জন্য তোমার হ্যান্ডব্যাগে আমি এই ক’দিন যে সমস্ত কাপড় পরবে সেগুলো দিয়ে দিলাম। আর সমস্ত গিফট আইটেম স্যুটকেসে দিলাম।
: ওহ্, হো. হো- ‘এই না হলে হুসনা বানু’- রায়ান হঠাৎ করে মজা করে চেঁচিয়ে উঠলো।
: শালা, তুই খুব লাকি- এক একটা দোস্ত বন্ধুও পাস বটে…
: তাতো বটেই। তাতো বটেই। দ্যাখ এই তোর মত বন্ধুও কিরম পেয়েছি? এ কথায় তিনজনেই হেসে উঠলো।
একটু পরই ওরা রওনা দিল। নাওমীর গাড়িতেই রওনা হলো। পথে বিশেষ কেউ কথা বললো না। কেমন যেন যার যার নিজের ভাবের মধ্যে ওরা ডুবে রইলো।
এয়ারপোর্টে লাগেজ চেকিং হয়ে গেল। একটা স্যুটকেস এক্সটা ছিল বলে অনেকগুলো ডলার দেওয়া লাগলো। এবারে ফাবিয়ান ইমিগ্রেশনের ভেতরে চলে যাবে। অতএব ওদের সাথে আর কথা বলতে পারবে না। তাই একটু দাঁড়িয়ে গেল। আজ কেন জানি ও ভালো করে নাওমীর সাথে কথা বলতে পারছে না। কেন কে জানে? রায়ানের সাথে টুকটাক কথা বলছে। কিন্তু নাওমীকে যথেষ্ঠ এড়িয়ে যাচ্ছে। নাওমী মনে মনে খুব অবাক হচ্ছে। নাওমী ভাবছিল ও কি কোন কষ্ট দিয়েছে অজান্তে ফাবিয়ানকে? নাওমী তখন থেকে মনে করবার চেষ্টা করছিল। এখন আর খুব বেশি সময় নাই। ফাবিকে ভেতরে চলে যেতে হবে।
: রায়ান আমি যাইরে, তোরা ভালো থাকিস।
: হ্যাঁ থাকবো। তুই কিন্তু পৌঁছেই একটা ফোন করতে ভুলিস না। বেশ চিন্তায় থাকবো। আর মাকে বলিস, আমি ভালো আছি। নেক্সট ইয়ারে একেবারে বৌ নিয়ে ভ্যালেলংগায় যাবো, বুঝলি?
: হু! বলবো- ফাবিয়ান কথা বলতে পারে না। তার ভেতর থেকে একটা গভীর অপরাধবোধ এবং আরো অনেক কিছু মিলিয়ে একটা কষ্টের কান্না চোখের ভেতরে এসে জমছিল। তাই মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। সে রায়ানকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিল। তারপর হঠাৎ করে নাওমীর কাছে যেয়ে সে খুব দ্রুত ওর মুখটা দুহাতের করতলে তুলে ধরলো, তারপর তার ললাটে চুম্বন করলো; আর খুব ফিসফিস করে বললো-
: ক্ষমা করো আমাকে প্লিজ, ক্ষমা করো। ভালো থেকো আমি খুব শিঘ্রি ফিরে আসবো- বলেই এক রকম ছুটে চলে গেল। আর পেছনে ফিরে চাইলো না।
পেছনে ওরা বেশ হতভম্ভ হয়ে রইলো। ফাবিয়ান চলে যাবারও অনেকটা সময় পর্যন্ত ওরা দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ কোন কথা বললো না। মনে হলো ওদের চারপাশ নৈঃশব্দে ভরে আছে। অনেকক্ষণ পর রায়ান বললো-
: নাওমী, লেটস গো।
: হ্যাঁ, চলো।
১৩
কাটিনজারোতে অনেকক্ষণ আগে পৌঁছে গেছে। ফাবিয়ান তার নানীকে সারপ্রাইজ দেবে বলে তাকে বলেনি যে, সে আসছে। শুধু জেসনকেই বলেছে। জেসন ওকে কালাব্রিয়া থেকে পিকআপ করবে। এখন আর একটা ডমিস্টিক প্লেনে ওকে কালাব্রিয়াতে যেতে হবে। ওর ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা কেমন যেন থিতিয়ে আসছে।
কালাব্রীয়াতে নেমে চেকিং আউট হয়েই দেখতে পেল তার প্রাণের বন্ধু জেসন একদম সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। সাথে আর একটা খুব সুন্দর মেয়ে। দুজন দুজনাকে অনেকক্ষণ ধরে জড়িয়ে ধরে থাকলো।
: ওহ্! জেসন, কদ্দিন পর তোকে দেখলামরে।
: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস। ওহ্ ফাবি দ্যাখ, এটা তোর ভাবী।
: ওহ্! মাই গড। কবে, কখন? আমাকে বলিসনি কেন?
: আরে এই এক মাস হলো। এর মধ্যে তুই বললি আসবি, তখনই বুদ্ধিটা এলো তোকে একটা গ্রেট সারপ্রাইজ দেবার। নামটা তো তোকে আগেই বলেছি। মারিয়ানা গ্যারিসটো। আর মারি, এ হলো…
: জানি বাবা, তোমার প্রাণের বন্ধু ফাবিয়ান ফ্রাঞ্জিপেনে।
ফাবিয়ান সত্যিই খুবই সারপ্রাইস হয়েছে। তবু সে স্মিত হেসে মারিয়ানার সাথ সেকহ্যান্ড করলো।
: মাই গড, তুমিই তাহলে সেই ফাবিয়ান। তোমার কথা শুনতে শুনতে আমারতো কান ঝালাপালা।
: আচ্ছা, তোমার মত সুন্দরীকে পেয়েও আমার কথা তাহলে বলে জেসন?
: কি যে বলো, সারাক্ষণ- অবিরাম।
: তা এত শিঘ্রি শিঘ্রি বিয়েটা করে ফেললে যে… এ কথায় জেসন আর মারিয়ানা দুজন দুজনার দিকে তাকালো। তারপর জেসনই জবাবটা দিল-
: আসলে হয়েছেটা কি, তুইতো জানিস আমার বাবা-মা একেবারে যাকে বলে সত্য যুগের মানুষ। ইয়ে মানে, মারিয়ানা কনসিভ করলো, তাই যাতে ওরা বুঝতে না পারে আমরা তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেললাম।
: ওহ্! হো। ফাবিয়ান হো… হো… করে হাসলো।
: তুই আর শুধরালী না, ভালোই করেছিস! আমাদের মধ্যে তুই-ই বিয়ের কাজটা আগে করলি। অবশ্য রায়ান আর মিরান্ডারও এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। আমার যাবার পরই ওদের বিয়ে।
: বলিস কি, ঐ শালা আমাকেতো বলেনি।
: ওকে তো জানিসই, ফাবিয়ান তাড়াতাড়ি রায়ানের পক্ষ নিলো- একটা কথা শুরু করে, অন্য কথা বলে। আবার একটা কথা বলতে গেলে আর একটা যায় ভুলে!
: হু, তা মিরান্ডা দেখতে কেমন রে?
: দা..রু..ন, একেবারে ঝাকাস!
: আচ্ছা, ঐ যে ওর সেই মটু মামার মেয়ে না?
: হ্যাঁ তাই-ই, শুধু কি তাই একেবারে রাজকন্যার সাথে অর্ধেক রাজত্ব।
: বলিস কি? কি রকম বলত?
: আসলে হয়েছে কি মটু মামার বাড়িটা একেবারে ম্যানসন। এবং অলরেডি পেইড অফ! তো, এনগেজমেন্টের পর উনারাই বলেছে যে, তোমরা যদি এ বাড়িতেই থাকো তো আমরা খুব খুশী হবো। এছাড়া চালু বিজনেস।
রায়ান-ই এখন সেখানকার ম্যানেজার। মামা এখন ক্বচিত বসে।
: হু! রায়ান বেশ দান মেরেছে একখানা।
: তা যা বলেছিস।
: তোমাদের মনে হচ্ছে খুব জ্বলুনি হচ্ছে, মারিয়ানা টিপ্পনি কাটলো।
: জ্বলুনি বলে, দুই বন্ধুই হো… হো… করে হেসে উঠলো।
: তারপর জেসন, ডোরিন কেমন আছেরে?
: ভালোই তো মনে হলো।
: মনে হলো বলছিস কেন, কথা হয় না?
এবারে জেসন আর মারিয়ানা দুজন দুজনার দিকে তাকালো। কেমন যেন পাশ কাটাতে চাইলো এই বিষয়টার। হটাৎ করে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল জেসন।
: তুই খুব ড্যাসিং হয়ে গেছিস রে।
: বলছিস? ফাবিয়ান স্মিত হাসে।
: কদ্দিন থাকবি বলে ভাবছিস?
: ৪ সপ্তাহের মত ছুটি নিয়েছি, এর মধ্যে নন্নার স্পন্সরের কিছু ফরমালিটি বাকি আছে, ওটা এসে গেলে নানীকেও নিয়ে যাবো।
: কিন্তু ফাবি, নন্নাকি যেতে চাইবে? এই বয়সে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে…
: একেবারেই যাবে নাকি? বাড়িঘর রইলো। মাঝে মাঝে নানীকে আমরা আনবো না? তাছাড়া টনি চাচার সাথে কথা বলেছি। সে চাচীকে নিয়ে আমাদের বাড়ির এক পাশে থাকতে রাজি হয়েছে।
: টনি চাচা, মানে তোদের জমিজমা যে দেখতো?
: হ্যাঁ রে, সেই একোদ্বিতম টনি চাচা!
: কিন্তু, সারা আন্টি কি এই ব্যবস্থায় রাজি হবে?
: তার রাজিতে কি এসে যায়?
হঠাৎ ফাবিয়ান দারুন একটা ফুর্তিতে চেঁচিয়ে উঠলো-
: আরে ঐ যে আমাদের চার্চের মাথা দেখা যাচ্ছে। উহ্! কি যে ভালো লাগছে না? জেসন তুই বুঝবি না। বিদেশে না গেলে দেশের মর্ম কেউ বোঝে না। নিজের দেশ, নিজের মাটির গন্ধ- ওহ আমার যে কি অসাধারণ উত্তেজনা আসছে, তুই বুঝবি না।
: তারপরও তো তুই পুরোপুরি পাততাড়ি গোটাতে চাইচিস?
: আরে বাবা, সে তো কত লোকেই করে- তাই বলে নিজের দেশের সাথে কিসের তুলনা?
ইতিমধ্যে ফাবিয়ানের শহর ভ্যালেলংগা একটু একটু করে তার চোখের উপর উদ্ভাসিত হতে শুরু করেছে। তার পরিচিত সব বৃক্ষেরা তাদের সমস্ত সতেজ সবুজ নিয়ে যেন ফাবিয়ানকে স্বাগতম জানাচ্ছে। জলপাই গাছের পরিবেষ্টিত ঘর, বাড়ি উঁকি মারছে যেন অনেক পরিচিত হাসি নিয়ে। ঘরগুলো এই পাঁচ বছরে অনেক বদলেছে। কোন কোন পরিচিত বাড়ি ভেঙে নতুন করে দ্বিতল বাড়ি হয়েছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটা বেশ বড় সড় হাইরাইজ বিল্ডিং হয়েছে। আগে ছিল না তাদের এই ছোট শহরে। ফাবিয়ান বেশ উৎসুক হলো-
: এটা কার বাড়িরে জেসন? আগে তো ওটা হেরল্ড আঙ্কেলের বাড়ি ছিল, তাই নারে?
: হ্যাঁ, ওহ্! তুই শুনিসনি, হেরল্ড আঙ্কেলতো মারা গেছে। আর তার দুই ছেলে ঐ বাড়ি এবং সব জায়গাজমি বেঁচে দিয়ে কোথায় জানি তারা চলে গেছে, কেউ জানে না?
: আচ্ছা, তা কিনলো কে?
: বিশাল মালদার পার্টি। অন্য কোন শহরে ছিল। এগুলো সব কিনেছে। তারপর এই দশ তলা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং করেছে। আবার একতলাটা বিউটি পার্লার এবং বিউটি সাপ্লাই-এর দোকান করেছে। দোতলাটা আবার জিম এন্ড ইয়োগা সেন্টার করেছে। বাকি এপার্টমেন্ট ভাড়া দিয়েছে। ৪ তলাতে বাড়িওয়ালা নিজে থাকে, ওয়ান ইউনিট ওটা।
: তাই নাকি? কে এরা? আমরা চিনি?
: না, আমরা চিনি না। লোকটার নাম ডোনাল্ড গ্যারিসটো। লোকটা ইটালিয়ান কিন্তু বৌ ফরাসি। একটি ছেলে, ম্যাথিউ গ্যারিসটো আর একটি মেয়ে। মেয়ে থাকে প্যারিসে। বাবা-মাও বেশির ভাগ সময় প্যারিসে থাকে। ছেলেকে এই সম্পত্তি কিনে, বিজনেস দিয়ে ওরা চলে গেছে। মাঝে মাঝে আসে।
: ঐ ডোরিন মেয়েটাও তো, হঠাৎ মারিয়ানা বললো-
: কি হয়েছে ডোরিনের? ফাবিয়ান চকিত প্রশ্ন করলো।
: না, না- ওসব কিছু নয়। জেসন আবার কথা ঘুরালো।
: জেসন তুই কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছিস?
: নাহ্! কি লুকাবো?
: দ্যাখ দোস্ত, কিছু বলার থাকলে আমাকে বলে দে…
: আচ্ছা পাগল তো, তুই- তুই নিজেই যখন এসেছিস আমার আর কি বলার আছে?
ফাবিয়ানের হঠাৎ আসা আনন্দ এবং অপ্রশমিত উত্তেজনা যেন বা কিছুটা থিতিয়ে আসে। ও গাড়িতে হেলান দিয়ে একটু চোখ বন্ধ করলো। (চলবে)

লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।
