২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেল পেলেন ভেনেজুয়েলার রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো!

শৈলেন কুমার দাশ

২০২৫ সালের নোবেল আসরের বর্ণালী মঞ্চে রাজনীতির এক ধ্রুবতারার জ্যোতির্ময় আগমন বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে! নোবেলের শান্তির আসর জুড়ে তাঁর আগমন যেন শিশির স্নাত শিউলী জড়ানো শারদ ভোরের স্নিগ্ধ পরশ! বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে নতুন এক বারতা, নতুন এক স্বপ্নের যাত্রা! নারী শক্তির  স্বপ্নের সোনালী বুননের পথের রেখায় নতুন আলপনা! বিশ্বরাজনীতি হাসবে নক্ষত্র খচিত পুবর্বাশার প্রান্তদেশে নবীণ অরুণের মত! নারীর মমতার সোনালী পিরাণে সেজে উঠবে সসাগরা বসুমতি। দেশে দেশে জেগে উঠবে দেবী নারী শক্তির বিদগ্ধ কল্যাণী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনার দেখানো পথ ধরে।

ভেনেজুয়েলারয়া রাজনৈতিক কর্মী মারিয়া করিনা মাচাদোকে বিশ্ব জানে, ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে ও প্রচারে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য। স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তর অর্জনের সংগ্রামের এক বিশাল কঠিন পদযাত্রার জন্য। আর সেজন্য নোবেল আসরের বিজ্ঞ বিচারক মন্ডলী বেছে নিয়েছেন তাঁকে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরষ্কার প্রদানের জন্য। ধন্য কন্যা; ধন্য বিশ্বময় নতুন নারী নেতৃত্বের রুপকার। পৃথিবীর অগণিত মানুষের আশিস, ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা আজ তোমার এ অর্জনের পথে; তোমার নতুন মহান যাত্রাপথে!

এ বছর শান্তিতে নোবেল পেলেন রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো! ছবি : রয়টার্স

মারিয়া করিনা মাচাদো পারিস্কার জন্ম ৭ অক্টোবর ১৯৬৭। তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার এবং তাঁর মানব দরদী কর্মের জন্য ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছেন। মারিয়া ভেনেজুয়েলার হুগো শ্যাভেজ এবং নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে একজন সাড়া জাগানো বলিষ্ঠ বিরোধী নেতা। তিনি ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাদুরো শাসনের দমন-পীড়নে কঠোর রাজনৈতিক পথ পাড়ি এবং অনেক অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তিনি গণমানুষের নেতা, নারী নেতৃত্বের উজ্জল প্রতীক। তাঁকে একজন উদারপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফাইন্যান্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী একজন শিল্প প্রকৌশলী মাচাদো তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের এক পযর্যায়ে ভোট-পর্যবেক্ষণ সংস্থা সুমাতে-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তিনি ভেন্তে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক দলের জাতীয় সমন্বয়কারী এবং ২০১২ সালের বিরোধী দলের রাষ্ট্রপতি প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই নির্বাচনে তিনি হেনরিক ক্যাপ্রিলেসের কাছে হেরে যান। ২০১৪ সালের ভেনেজুয়েলার বিক্ষোভের সময়, তিনি মাদুরোর অত্যাচারী সরকারের বিরুদ্ধে জণবিক্ষোভ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

২০২৩ সালে, মাচাদো ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ঐক্য প্রার্থী হওয়ার জন্য বিরোধী দলের প্রাইমারিতে জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে ভেনেজুয়েলা স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নিষেধ করে। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। তিনি স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে রাজনীতির বিকল্প অনুসরণ করে তিনি করিনা ইয়োরিসকে তাঁর বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেন। যার স্থলাভিষিক্ত হন এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়া। বিরোধীরা ভোটের হিসাব উপস্থাপন করে দাবি করে যে গঞ্জালেজ উরুতিয়া বিপুল ভোটে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে মাদুরো স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন প্রমাণ উপস্থাপন না করেই জয় দাবি করে। ২৮শে জুলাইয়ের নির্বাচনের কিছুক্ষণ পরেই, মাচাদো ঘোষণা করেন যে তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন। কর্তৃত্ববাদী মাদুরো শাসনামলে তিনি বার বার তাঁর জীবন এবং দেশের জনগণের গনতান্ত্রিক স্বাধীনতার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন।

মাচাদো তাঁর জনমুখী সক্রিয় রাজনীতির জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাই বিশ্বের অনন্য এই নোবেল আসরের বিজ্ঞ বিচারকেরা ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের পথে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তর অর্জনের সংগ্রামের জন্য তাঁকে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করেছেন।

মাচাদোকে ২০১৮ সালে বিবিসির জরীপে বিশ্বের ১০০ জন নারী নেতৃত্বের মধ্যে তাঁকে একজন বিশ্ব নারী নেতৃত্বের অংশ হিসাবে মনোনীত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে তাঁকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে, মাচাদো ভ্যাক্লাভ হ্যাভেল মানবাধিকার পুরষ্কার এবং এডমুন্ডো গঞ্জালেজের সাথে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য শাখারভ পুরষ্কার লাভ করেন।

‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা!’ গণমানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের দশদিকে বিচরণ করেছেন এই মহান নারী রাজনীতিক। নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫ সালের এই মহান অর্জনের পথ ভেনেজুয়েলার এই রাজনীতিক ও মানবাধিকার নারীকর্মী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। প্রকৌশলী পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা ৫৭ বছর বয়সী নারী মাচাদো নিজের দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এবার তাঁকে চিনবে গোটা পৃথিবী। পুরুষ জাতি অনেক ভোগ করেছেন এসব পুরস্কার! কিন্তু শান্তির ধারায় পৃথিবীকে তেমন একটা এগিয়ে নিতে পারেননি! এখন নারীদের সব জায়গায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন। যদি তাঁদের মমতাপূর্ণ সৎ নেতৃত্ব শান্তির পথ দেখায় বিশ্বমঞ্চে? তাই আজ মাচাদোর দেখানো পথ ধরে নতুন নারী প্রচেষ্টা ও শক্তির জাগরণ ঘটুক সব জায়গায়। তাঁদের মমতার হাত ধরে, সততা, সৃজনশীল ও সুন্দর নেতৃত্ব বিকশিত হোক। বিশ্ব রাজনীতির আসর সেজে উঠুক নারীর সততায়, সৌন্দর্য্য ও মমতায়! অনেক দেখা হয়েছে, পুরুষরা পারেননি বিশ্বকে শান্তি ও সুন্দরে সাজাতে। নারীরা পারবেন বিশ্বশান্তি ফিরিয়ে আনতে। ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা!’ জাগো আজ পৃথিবীর দিকে দিকে!

পরিশেষে ভেনেজুয়েলার বঞ্চিত গণমানুষের নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো তোমাকে সুস্বাগতম এই বিশ্বমঞ্চে। তোমার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবন কামনা করি। কামনা করি মানুষের সঠিক গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে তোমার অগ্ৰযাত্রা চিরভাস্বর ও চিরস্মরণীয় হোক মানুষের অন্তরে অন্তরে।

শৈলেন কুমার দাশ

লেখক, কলামিস্ট

কানাডা, ১০ অক্টোবর, ২০২৫