অভিবাসনের প্রতি কানাডিয়ানদের জনসমর্থন কমে গেছে
জরিপ বলছে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কানাডিয়ান নতুন অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর পক্ষে
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৫: কানাডার বিশাল অভিবাসী জনসংখ্যাকে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সুফলদানের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে — কিন্তু নতুন এক জরিপ তথ্য বলছে, বছরের পর বছর ধরে নুতন অভিবাসীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে জনমতে এক বিরাট পরিবর্তন এসেছে। খবর সিবিসি নিউজের।
গত ২৫ বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে, অভিবাসন কানাডার রাজনীতিতে তৃতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এই সময়ের মধ্যে খুব কম নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতাই প্রকাশ্যে এর সুফলদানের শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
এই সপ্তাহে এডমন্টনে লিবারেলদের ককাস মিটিং এ প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “অভিবাসনের সংখ্যা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলি ‘টেকসই’ হয়নি। এ ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ বা পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর এটা স্পষ্ট যে আমাদের সামগ্রিক অভিবাসন নীতিগুলি উন্নত করতে হবে।”
প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোইলিভ অতীতের চেয়ে আরও কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করে বলেছেন, অভিবাসনের উপর “খুব কঠোর বাধা” আরোপ করতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন লিবারেল সরকার “অনেক বেশি অভিবাসী গ্রহণ করেছে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে। তিনি ‘অস্থায়ী বিদেশী কর্মী কর্মসূচি’ সম্পূর্ণরূপে বাতিলেরও দাবি জানিয়েছেন।

ব্রিটিশ কলম্বিয়া-র প্রিমিয়ার (নিউ ডেমোক্র্যাট পার্টি’র) ডেভিড এবি, ফেডারেল সরকারের ত্রুটিপূর্ণ অভিবাসন নীতিকে দায়ী করছেন তার প্রদেশে গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলি এবং ফুড ব্যাংকে ভীড় তৈরী করার জন্য।
রাজনীতিবিদরা সম্প্রতি অভিবাসনের বিষয়ে কেন এত কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন তার একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে ইদানিংকার কিছু জনমতের তথ্য থেকে।
এই সপ্তাহে প্রকাশিত ন্যানোস রিসার্চের একটি জরিপে দেখা গেছে যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কানাডিয়ান উত্তরদাতা এখন নতুন অভিবাসীদের সংখ্যা হ্রাস করার পক্ষে।
অন্য আরেকটি জরিপ প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাবাকাস ডেটা’ও অভিবাসন বিষয়ে ক্রমহ্রাসমান জনসমর্থনের উপর নজর রাখছে। একসময় তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচিত এই অভিবাসন ইস্যুটি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় উঠে এসেছে। এই মাসে জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন যে অভিবাসন এখন তাদের শীর্ষ তিনটি ইস্যুর মধ্যে একটি।
এনভায়রনিক্স ইনস্টিটিউট (Environics Institute) এর জরিপেও দেখা গেছে প্রায় ১০ জন কানাডিয়ার মধ্যে ছয়জন বলেছেন যে অনেক বেশি অভিবাসী আসছে দেশটিতে।
জরিপ প্রতিষ্ঠান অ্যাবাকাস ডেট ‘র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডেভিড কোলেটো এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “গত ১০ বছরের কথা ভাবুন, কানাডায় আমরা সিরিয়ান শরণার্থীদেরকে উষ্ণহৃদয়ে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।
কোলেটো বলেন, “বিশেষ করে তরুণরা, যারা উচ্চ বেকারত্বের হার এবং আবাসন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তারা অস্থায়ী বিদেশী কর্মী কর্মসূচি বাতিল করার পক্ষে অন্যদের তুলনায় বেশি সোচ্চার।”
অভিবাসীদের প্রতি কানাডিয়ানদের মনোভাবে পরিবর্তন আসে কোভিড-১৯ সংকটের পর এবং শ্রমিক ঘাটতির মধ্যে গত লিবারেল সরকার যখন “অস্থায়ী” বাসিন্দাদের উপর বিধিনিষেধ শিথিল করে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। হিসাবে দেখা গেছে ২০২৩ সালে সক্রিয় স্টাডি পারমিটের সংখ্যা দশ লক্ষে পৌঁছে গিয়েছিল।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুসারে, টানা তিন বছর ধরে জনসংখ্যা প্রতি বছর প্রায় দশ লক্ষ লোক বৃদ্ধি পেয়েছে – যা একটি উন্নত দেশের জন্য অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ হার।
জনসংখ্যার এই উত্থান আবাসন বাজার, স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতা এবং কানাডিয়ানদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে।
ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ মিকাল স্কুটেরুড বলেন, অভিবাসন বিষয়ে অতীতের উদারনীতি কানাডিয়ান ঐকমত্যকে ভেঙে দিয়েছে যে আরও বেশি লোক যোগ করা সাধারণত একটি ভালো জিনিস।
সিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক স্কুটেরুড আরো বলেন।”কানাডীয়দের বিশাল অংশ স্পষ্টতই অভিবাসনের বিরুদ্ধে ঝুঁকছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা অভিবাসী-বিরোধী বা বিদেশী-বিদ্বেষী। তারা কেবল যা দেখেছে তার বিরোধিতা করছে। তারা মনে করে যে সরকার এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনা করেনি। এই সরকার ছিল ট্রুডো সরকার। দোষ শেষ পর্যন্ত তাদের উপরই বর্তায়। এ নিয়ে আমার মনে কোনও প্রশ্ন নেই। অভিবাসনের ক্ষেত্রে কানাডার অসাধারণ রেকর্ড ছিল এবং এখন এটি একটি বিষাক্ত বিষয়ে পরিনত হয়েছে।”
কিন্তু স্কুটারড এ কথাও বলেন যে, শুধু ট্রুডোর লিবারেলরাই দোষ করেছে তা নয়। বিরোধী রক্ষণশীল দলের সদস্যরাও এই কিছুদিন আগপর্যন্তও অভিবাসনের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে মূলত নীরব ছিল। তারা আরো আগেই এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিতে পারতো। কিন্তু তখন না করে রক্ষণশীলরা এ বিষয়ে কথা বলছে “সমস্ত ক্ষতি যখন হয়ে গেছে তখন এবং অভিবাসন বিষয়ে জনমত জরিপ পরিবর্তনের পরেই রক্ষণশীলরা অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।
উল্লেখ্য যে, কনজার্ভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোইলিয়েভ গত জুলাই মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন কানাডায় যে সংখ্যক লোক আসছেন তার চেয়ে বেশী সংখ্যক লোকের চলে যাওয়া দরকার এখান থেকে। অন্তত আগামী কয়েক বছরের জন্য। গ্লোবাল নিউজের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
পোইলিয়েভ তখন আরো বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের অভিবাসন স্তরের উপর খুব কঠোর সীমা আরোপ করতে হবে। হাউস অফ কমন্সের প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তার মতে কানাডার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং তিনি লিবারেল সরকারের প্রতি অভিবাসন সংখ্যা আরও কমানোর আহ্বান জানান।
পোইলিয়েভ আরো বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের অভিবাসন স্তরের উপর খুব কঠোর সীমা আরোপ করতে হবে। হাউস অফ কমন্সের প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তার মতে কানাডার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং তিনি লিবারেল সরকারের প্রতি অভিবাসন সংখ্যা আরও কমানোর আহ্বান জানান।
পোইলিয়েভের মতে, অভিবাসনের সংখ্যার উপর খুব কঠোর সীমা আরোপের পদক্ষেপ নেওয়া হলে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং চাকরি “বৃদ্ধি পেতে” পারে। তবে কি ভাবে আরো বেশি সংখ্যক লোক দেশ ছেড়ে চলে যাবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
সিবিসি নিউজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে কনজারভেটিভ পার্টির অভিবাসন বিষয়ক সমালোচক, এমপি মিশেল রেম্পেল গার্নার বলেন, “কানাডায় অভিবাসনের মাত্রা ‘অত্যধিক’ এবং সেই কারণেই অনেক কানাডিয়ান দুঃখজনকভাবে হলেও এখন আরো নতুন অভিবাসী গ্রহণের ব্যাপারে বিমুখতা প্রকাশ করছেন।
তিনি আরো বলেন, “লিবারেলরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বেশি লোককে কানাডায় অভিবাসী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এই কারণেই আমরা ‘অস্থায়ী বিদেশী কর্মী কর্মসূচি’ বাতিল করার কথা বলছি।”
এমনকি ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির নেতা কার্নির ককাসেও, প্রোগ্রামটি সংস্কারের চাপ রয়েছে।
লিবারেল এমপি মার্ক মিলার, যিনি প্রাক্তন অভিবাসন মন্ত্রী ছিলেন, তিনিও বলেছেন যে ‘অস্থায়ী বিদেশী কর্মী কর্মসূচি’ প্রোগ্রামটি “অবশ্যই ঠিক করা দরকার। এতে সমস্যা আছে, LMIA (Labour Market Impact Assessment) -তে জালিয়াতি আছে।”
মিলার বলেন, “কানাডায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো “অস্থায়ী কর্মীদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে।”
এই শরতে কী ধরণের পরিবর্তন আসতে পারে জানতে চাইলে, বর্তমান ইমিগ্রেশন মন্ত্রীর মুখপাত্র লেনা দিয়াব বলেন, “ভবিষ্যতের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি অনুমান করতে পারবেন না” তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে “টেকসই অভিবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি শীর্ষ প্রতিভাবানদের আকর্ষণ করা আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলির মধ্যে একটি।”
তবে মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স ফর চেঞ্জের সহ-নির্বাহী পরিচালক কারেন কোক বলেন, দেশের কিছু সমস্যার জন্য অভিবাসীদের অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কর্পোরেট ল্যানলর্ড, বৃহৎ গ্রোসারীর মালিক, নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তা এবং অন্যান্যরা আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং স্থবির অর্থনীতির জন্য দায়ী – অভিবাসীরা নয়।
তিনি বলেন, অভিবাসনের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়া নতুনদের জন্য নিরাপত্তার উদ্বেগও বাড়িয়ে তুলছে, যারা সম্ভাব্য সহিংসতা এবং শত্রুতার মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এর ফলে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।
