ফেলে আসা দিনগুলি মোর
[অতীত জীবনের কিছু স্মৃতি]
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সাইদুল হোসেন
ঢাকার জীবনে প্রত্যাবর্তন
১৯৫৮ সনে মহিমাগঞ্জ মিল অফিসে বদলী হলাম। ১৯৬১ সনে প্রমোশন পেয়ে চলে গেলাম জয়পুরহাট শুগার মিলে। (বগুড়া) সেখান থেকে ঢাকায় ই-পি-আই-ডি-সি হেড অফিসে বদলী হয়ে অডিট ডিপার্টমেন্টে যোগদান করলাম ১৯৬৩ সনের মার্চ মাসে। দীর্ঘ প্রায় ৭টি বছর পর ফিরে এলাম রাজধানী ঢাকাতে। ইতিমধ্যে বিয়ে করেছি, দু’টি ছেলেও জন্মেছে। শুরু হলো নূতন করে নগরজীবন।
ঢাকার জীবন
১৯৫৩ সনে ঢাকা যাই, উদ্দেশ্য বি.কম. পড়া এবং একই সঙ্গে একটা চাকরি খোঁজা। তাই ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে ভর্তি হলাম বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সদরঘাটে অবস্থিত জগন্নাথ কলেজে নাইট ক্লাসে। বিরাট কলেজ, হাজার হাজার ছাত্রের আনাগোনা দিনেরাতে। তাছাড়াও অতিব্যস্ত সদরঘাট-ইসলামপুর বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত সেই কলেজ, তাই প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই জনসমাগমে চঞ্চল ছিল সেই এলাকা। কলেজের সামনেই ভিক্টোরিয়া পার্ক। পাকিস্তান আমলে নাম বদলিয়ে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

ঢাকার জীবনের শুরুতে ঘটেছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ১৯৫৩ সন, সবে মাত্র ঢাকায় এসেছি, স্থায়ী ঠিকানা তখনো হয়নি। থাকি জিন্দাবাহার লেনে এক মেসে। আমার এক চাচা ছিলেন তখন ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার ভাইস-প্রিন্সিপাল। তিনি এবং ঐ মাদ্রাসার আরো অনেক শিক্ষকও সেই মেসে থাকতেন। মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্যে রিকুইজিশন করা বিরাট বাড়ি ছিল সেটা। চাচার অনুরোধে আমারও থাকার ব্যবস্থা হয় ওখানে সাময়িকভাবে। অন্যান্যদের মাঝে ছিল এক যুবক, নামটা এখন মনে পড়ছে না তবে এটুকু মনে আছে যে সে রেডিও পাকিস্তানে চাকরি করতো।
একদিন গভীর রাতে খুব তর্ক-বিতর্ক-ধমক ইত্যাদির কারণে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে দেখি মহা হৈ চৈ ব্যাপার, সব রুমে আলো জ্বলছে। উত্তপ্ত আলোচনা চলছে মাদ্রাসা শিক্ষকদের মাঝে হারাম/অবৈধ যৌনসম্পর্ক নিয়ে। যাহোক অন্যান্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে যা প্রকাশ পেল তা হলো, রেডিও পাকিস্তানের সেই যুবক কর্মীকে আমাদের মেসের বাবুর্চি মহিলার যুবতী মেয়ের সঙ্গে যৌনকর্মরত অবস্থায় একজন মাদ্রাসা শিক্ষক আকস্মিকভাবে দেখে ফেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মহা হৈ চৈ জুড়ে দিয়ে মেসের অন্য সবাইকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে জাগিয়ে তোলেন। তিনি তখনো ঐ যুবকটির রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছেন যাতে অপরাধী দু’জনের কেউই সরে যেতে না পারে। উৎসাহীরা উঠে দরজা খুলে দেখলেন যে অপরাধী দু’জন মাথা নীচু করে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তখন সকলে মিলে পরামর্শ করে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে এই জ্বেনাকারীদের এখনি বিয়ে পড়িয়ে দিতে হবে, না হলে ইসলাম ধর্মের চরম অবমাননা হবে; অন্য শাস্তি হলো উভয়কে পাথর মারা বা শতাধিক চাবুকাঘাত। তবে বিয়ে পড়িয়ে দেয়াটাই সহজতর। সিদ্ধান্ত দুই অপরাধীকেই জানানো হলো এবং অবস্থা বেগতিক দেখে দু’জনেই বিয়েতে রাজী হলো। তখন লোক পাঠানো হলো ঐ মেয়ের মাকে ধোয়া পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন শাড়ি ব্লাউজসহ মেসে ডেকে আনার উদ্দেশ্যে। যুবককে বলা হলো বাথরুমে গিয়ে গোসল করে অজু করে পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে ডাইনিং হলে ফিরে আসতে। তাকে পাহারা দেয়ার লোকেরও ব্যবস্থা করা গেল।
ইতিমধ্যে হন্তদন্ত হয়ে মেয়ের মা’ও এসে উপস্থিত শাড়ি-ব্লাউজসহ। মাওলানা সাহেবরা পরিস্থিতি ও তাঁদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে মেয়ের মা সহজেই রাজী হয়ে গেল। তখন মেয়েকে পাঠানো হলো বাথরুমে গোসল ও অজু করে আসার জন্যে। দুই আসামীকেই ডাইনিং রুমে উপস্থিত করা হলো, তাদের হারাম কাজের জঘন্য অপরাধের স্বীকৃতি আদায় করা হলো, বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি আদায় করা হলো এবং তাৎক্ষণিকভাবেই বিধিবদ্ধভাবে তাদের বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হলো। কাজীর অফিসে বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এক মাওলানা। নববিবাহিত দু’জনের স্বাক্ষর সাক্ষীসাবুদসহ বিয়ের দলিল সাদা কাগজের উপর লিখে সেসব করা হয়ে গেল অতি দ্রুততার সঙ্গে। তারপর সবাই মোনাজাত করে ওদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক, শান্তির হোক, ইসলামী শরিয়ত মতো চলুক ইত্যাদি দোয়া করা হলো। ইতিমধ্যে কোথা থেকে কিছু জিলাপিও জোগাড় করা হয়ে গেছে। তাই সবার মাঝে বিতরণ করা হলো।
আনুষ্ঠানিকতার শেষে নববিবাহিতদের নিয়ে যাওয়া হলো সেই যুবকের বেডরুমে। এবং আরো একবার তাদের জন্যে দোয়া করে মাওলানা সাহেবরা আস্তে সেই রুমের দরজা টেনে বন্ধ করে নিজ নিজ রুমে ফিরে গেলেন। নীরবতা নেমে এলো মেস প্রাঙ্গনে। ঘটনার দ্রুততার সময় জ্ঞান কারো ছিল না বললেই চলে। আবার যখন শুতে গেলাম তখন শুনি ফজরের আজান হচ্ছে চারদিকের সব মসজিদ থেকে। এই ঘটনার দু’চার দিন পরই সেই ভদ্রলোক মেস ছেড়ে চলে যান।
চাচা আমার থাকার স্থায়ী ব্যবস্থা করলেন তাঁর এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে, কলেজ থেকে বহুদূরে বেচারাম দেউড়ীতে, চকবাজার-মৌলভীবাজার-আরমানীটোলা এলাকায়। কলেজে যাই কখনো হেঁটে, কখনো বাসে চড়ে। প্রচন্ড ভীড় সেই আদ্যিকালের ‘মুড়ির টিন’ মার্কা বাসে। বাসে ভাড়া যদিওবা বেশ সস্তা কিন্তু তাতেও তো কিছু পয়সা খরচ হয়। তাই শুরু করলাম আই-কম ক্লাসের ছাত্রদের প্রাইভেট টিউশনী। সঙ্গে রইলো চাকরি খোঁজা, খবরের কাগজ দেখেদেখে দরখাস্ত পাঠানো বিভিন্ন ঠিকানায়। ছাত্র ভাল ছিলাম, আই-কম ফাইনালে বেশ ভাল রেজাল্টসও করেছিলাম। তদুপরি ছাত্রদের বুঝিয়ে বলার কৌশলটাও ভাল জানতাম। তাই ধীরেধীরে ছাত্রের সংখ্যা বাড়তে লাগল। এবং এক পর্যায়ে এমন অবস্থায় পৌঁছল যে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জ-শুভাইড্যা পর্যন্ত আমার প্রাইভেট টুইশনীর পরিধি বিস্তৃত হয়ে গেল।
ভোরে গোসল-নাস্তা সেরে বাদামতলী ঘাট থেকে খেয়াতে চড়ে ওপারে চলে যেতাম, ৪-৫ জন একই সঙ্গে পড়তে বসত, ঘন্টা দুই-আড়াই ক্লাস চালিয়ে ফিরতি খেয়াতে ঢাকায় ফিরে আসা। দুপুরে আহার-বিশ্রাম সেরে বিকেলে আরো ৩-৪ জন ছাত্রকে পড়িয়ে বইপত্র গুছিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে যাত্রা। ক্লাস সেরে রাত ১০টা/সাড়ে ১০টায় বাসায় ফেরা। এই ছিল দৈনিক রুটিন।
ছাত্রদের মাঝে মূল ঢাকাইয়া কুট্টি এবং অন্যান্য জেলাবাসীও ছিল। আর ছিল পশ্চিম বঙ্গের দু’জন। কুট্টি ছেলেরা আমাকে খুব ভালবাসত এবং ওরাই ছাত্র জোগাড় করে আনত। আরো অনেকের মত আমারও ধারণা ছিল যে কুট্টিরা সবাই এক শ্রেণীভুক্ত, কিন্তু একদিন আমার দুই ছাত্রের মাঝে কিছু একটা নিয়ে প্রচন্ড ঝগড়া ও তর্কাতর্কির মাঝে ব্যবধানতা প্রকাশ পেয়ে গেল যখন একজন আরেকজনকে উদ্দেশ করে খুব রেগে গিয়ে বলল, “তুই হালায় ত কুট্টি, গাড়োয়ান; আর আমি হালায় ’শুকবাস’, শরীফ আদমি। আমার লগে তক্রার (তর্ক) করবার লাগ্চস্ হালায়?”
যাহোক আমার আর্থিক সঙ্গতি বেড়ে যাওয়াতে আমি আমার সেই আত্মীয়দের ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে নওয়াবপুর (আলাউদ্দীন) রোড়ে জগন্নাথ কলেজের এক হোস্টেলে এসে ঠাঁই নিলাম। কেরানীগঞ্জের টুইশনী ছেড়ে দিয়ে নওয়াবপুর অঞ্চলেই এবং আমাদের হোস্টেলেই নতুন ছাত্র জোগাড় করে নিলাম। দুলাল নামে আমার এক বন্ধু ছিল, সে আমার জন্য খুব ভাল একটা টুইশনী জোগাড় করে দিল ওর এক আত্মীয়ের বাসায় আমাদের হোস্টেলের বেশ কাছেই। ছাত্র জীবনের শেষে দুলালের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যদিও ওর গ্রামের বাড়ি আমার গ্রামের বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে ছিল না। ১৯৭১ সনে আমার ছোটভাই একদিন আমাকে জানাল যে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিল বলে রাজাকাররা দুলালকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে।
সেই যুগে ঢাকা ছিল সস্তার শহর। কাপড়-জুতা, খাদ্যপানীয়, বাড়ি ভাড়া, রিক্সা ভাড়া, ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া সবই ছিল বড় সস্তা। ঢাকার কাবাব-রুটি, হালিম-পায়া-পরোটা-গোশ্ত ছিল অপূর্ব সুস্বাদু ও সস্তা। গরমের দিনে বিশেষ আকর্ষণ ছিল লাস্সি, প্রতিটি হোটেল-রেস্টুরেন্টেই সুস্বাদু কল্জে-ঠান্ডাকরা লাস্সি বিক্রি হতো। নতুন ঢাকা শহর তখন সবেমাত্র গড়ে উঠছে। সব কর্মকান্ড তখনো পুরনো ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ।
বিকাল হলেই শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসে যেতো লোকেরা বড় কড়াইতে জ্বাল দেয়া ঘন দুধ এবং ছোটছোট পাউরুটি, এক বালতি ভর্তি পানি আর গোটা ছয়েক কাঁচের গ্লাস নিয়ে। ক্রমশঃ দুধ জ্বাল হয়ে ঘন হচ্ছে, লম্বা হাতা দিয়ে নেড়ে নেড়ে দুধের ফেনা সামলাচ্ছে দুধওয়ালারা। প্রচুর খরিদ্দার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা ছোট পাউরুটিসহ একগ্লাস দুধ খাচ্ছে, মূল্য মাত্র চার আনা।
বিখ্যাত হোটেল ছিল সলিমাবাদ হোটেল। সেক্রেটারিয়েটের পাশেই, দশ আনা থেকে বারো আনায় মাছ অথবা মাংস দিয়ে ভরপেট লাঞ্চ। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগবে আজকাল। প্রোভিন্সিয়াল রেস্টুরেন্ট ছিল নতুন গড়া স্টেডিয়াম এলাকায় বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট, যেমনি উত্তম রান্না, তেমনি সস্তা- মাত্র চৌদ্দ আনায় খাসির চাপ ও আটার রুটি অথবা ভাত দিয়ে তৃপ্তি করে লাঞ্চ অথবা রাতের খাবার। বিরাট বিরাট কই মাছ ও চিতল মাছের পেটির রসনা তৃপ্তিকর রান্না খেতে হলে সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার পাড়ের হোটেলে গেলেই তাদের দেখা পাওয়া যেতো।
রেক্স রেস্টুরেন্ট-এর পাউরুটি খুব বিখ্যাত ছিল, অনুরোধ করলে রুটিটাকে বড় ছুরি দিয়ে কেটে স্লাইস করেও দিত ওরা। কিন্তু ১৯৫২ সনে নাবিস্কো ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর ওরা মেশিন স্লাইস্ড সুস্বাদু ব্রেড বাজারে ছাড়লে ঢাকায় হৈ চৈ পড়ে গেল। ঘরে ঘরে নাবিস্কোর স্লাইস্ড ব্রেড, দাম মাত্র সাড়ে তিন আনা। কালাচাঁদ মরণচাঁদ-এর দোকানের দই-মিষ্টি তো ছিল ঐতিহ্যগতভাবে বিখ্যাত। পরবর্তীতে সেই স্থান দখল করে নিয়েছিল আলাউদ্দিনের দই-মিষ্টি।
আমাদের কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল ছিলেন রেবতী কুমার চক্রবর্তী। ছাত্রদের খুবই ভালবাসতেন। কোনকিছু সমস্যা দাঁড়ালে, কিছু চাইতে হলে নির্ভয়ে তাঁর কাছে গিয়ে আবেদন-নিবেদন করা যেত। রাতের ক্লাসে লাইট চলে যাওয়াটা ছিল অতি সাধারণ ঘটনা। অন্ধকার হলে আমরা হৈ চৈ করে উঠতাম বটে কিন্তু ক্লাস ছাড়তাম না কারণ জানতাম যে অনেকগুলো মোমবাতিসহ তিনি এসে ক্লাসে ঢুকবেন। হাতে থাকবে একটি জ্বালানো মোমবাতি, বাকীগুলো সব তাঁর বগলে।
ক্লাসে পাঠ্যবিষয় নিয়েও দু’টি মজাদার ঘটনা এখানে মনে পড়ছে। স্ট্যাটিস্টিক্স ছিল অবশ্যপাঠ্য বি.কমে। অনেক বইয়ের নাম ছিল লিষ্টিতে, যার যেটা খুশী পড়ত ছাত্ররা। প্রফেসর ছিলেন উর্দুভাষী, সম্ভবতঃ লক্ষ্ণৌ-এর বাসিন্দা ছিলেন। আমি একদিন ইন্ডিয়ান দুই লেখকের লেখা একটা স্ট্যাটিস্টিক্স-এর বই উনাকে দেখিয়ে বললাম যে আমি এই বইটাই ফলো করছি, স্যার। বইটির পাতা কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে আমার হাতে ফেরত দিতে দিতে তিনি পরিস্কার ইংরেজীতে আমাকে বললেন, You will fail in the final examination if you follow this book. তাঁর কথা শুনে চমকে উঠলাম, কিন্তু জেদ চেপে গেল এই বই-ই ফলো করবো, দেখি শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়ায়। তবে পড়াশোনায় আগের চেয়ে অধিক মনোযোগী হলাম। ফাইনালের পর ইউনিভার্সিটি থেকে মার্ক শীট এনে দেখলাম স্ট্যাটিস্টিক্স-এ ১০০ নম্বরের মাঝে ৬৪ নম্বর পেয়েছি। গেলাম প্রফেসার সাহেবের কাছে। পাশ করেছি শুনে খুব খুশী কারণ সে বছর পাসের হার ছিল ২০% অথবা ২২%। থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার, বলে মার্কশীটটা উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। সেটা হাতে নিয়ে স্ট্যাটিস্টিক্স-এর নম্বরটার উপর চোখ পড়তেই অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, You have scored very well indeed, but whose book did you follow? The same one you showed me in the class? বললাম, Yes, only that book, sir. No other book. আমার জবাব শুনে একটি মাত্র শব্দ বের হল তাঁর মুখ থেকে, Strange! তারপর মার্কশীটটা আমাকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, “গুডলাক, ইয়াংম্যান।” এখন ভাবলে মনে হয় যেহেতু বইটির লেখক দু’জনেই ছিলেন হিন্দু এবং ইন্ডিয়ান, তাই রাজনৈতিকভাবে হিন্দু ও ভারত বিরোধী মনোভাবটা সেই বিরূপ মন্তব্যের পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল।
অ্যাপ্লাইড ইকোনমিক্স ছিল আনকোরা নতুন সাবজেক্ট, বাজারে তখনো সহজবোধ্য কোন বই-ই বের হয়নি ছাত্রদের জন্যে, সবই বিদেশী লেখকদের ইংরেজী, এবং দাঁতভাঙ্গা সব কথাবার্তা ও থিওরী সেসব বইতে। কম্পালসারি পেপার, বদলে অন্য কোন সাবজেক্ট নেয়ারও কোন উপায় নেই। এমনি সংকটকালে শ’দেড়েক পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হলো ঢাকা থেকেই। অ্যাপ্লাইড ইকোনমিক্স, লেখক প্রফেসর আবুল হোসেন। ছুটে গিয়ে কিনে আনলাম এক কপি বুকস্টোর থেকে। পড়লাম, কিন্তু খুব একটা বোধগম্য হলো না। তবে মজার ঘটনা ঘটলো অল্পদিন পরেই। অ্যাপ্লাইড ইকোনমিক্স-এর নতুন যে প্রফেসর যোগ দিলেন কলেজে তিনি আর কেউ নন, আবুল হোসেন স্বয়ং। তখন আমাদের আর পায় কে? লোকও অমায়িক, সবেমাত্র পাশ করে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে এসেছেন, ইতিপূর্বে ছিলেন ঢাকার বাইরে কোন এক প্রাইভেট কলেজে। আমাদের সমস্যার সমাধান ঘটে গেল অচিরেই। (চলবে)
