নানা রঙের দিনগুলি

শুভ্রা শিউলী সাহা

অফিসে মিটিং আছে  MNP এর অডিটদের সাথে।  পৌঁছাতে হবে তাড়াতাড়ি। 401 এর ট্র্যাফিক জ্যাম যেন নিত্যদিনের সাথী। Bumper to Bumper , Spotify তে বাজছে রবীন্দ্র সংগীত – সেই যে আমার নানা রঙের দিন গুলি…. । গাড়ী  চালাতে চালাতে এ আলো আধারীর জীবনের কত পুরোনো কথা মনে হয় আজকাল। । পাখির ছানা গুলো উড়তে শিখলেই নিজের ডানায় ভর করে উড়ে যায় দিগন্তে। আমরাও তেমন করেই মা বাবার ঘর ছেড়ে এসেছিলাম । দেখতে দেখতে  ছোট ছেলেটা অভিক যাচ্ছে ইউনিভারসিটিতে আর আমাদের একা থাকার দিন শুরু হবে। মনে পরে পেছনের নানা রঙের দিনগুলোর কথা।

 আমি একরকমের কর্মযোগী মানুষ গত ২৮ বছর যাবত বিরামহীন কাজ করে চলেছি ঈশ্বরের ব্রত হিসেবে। কখনো প্রত্যাশা নিয়ে কোন কাজ করিনি।  যখন যা করেছি খুব মন প্রাণ ঢেলে দিয়ে দৃঢ়তার সাথে করেছি। এদেশের Mainstream Economy তে সম্পৃক্ত হতে গেলে লেখা পড়ার কোন বিকল্প নেই। Guelph University তে পিএইচডি করার জন্য যোগাযোগ করেছিলাম। Agricultural Cooperative এর উপর কাজ করার জন্য admission এর কাগজ পত্রও process করেছিলাম । আমার husband তার সিভিল ইন্জিনিয়ারিং প্রফেশনাল লাইসেন্সের জন্য এগোচ্ছে তাই ছেলেদের কথা ভেবে নিজের প্রফেশনাল  Agricultural Economics লাইনে পড়াটা স্থগিত করলাম। কলেজে Accounting পড়তে শুরু করলাম।

কানাডা খুব সুন্দর দেশ। অনেক ধরনের Opportunity, যে যার ইচ্ছে মত কাজে লাগাতে পারে। এরই সাথে চলছে অজয় বণিক দাদার কাছে ড্রইভিং শেখা। দাদার বকাগুলো এখনো মনে হয়। এদেশে আসার ৫ মাস পরেই অভিকের জন্ম ডিসেম্বরের এক বরফঢাকা  সকালে। হাল ছাড়িনি।  আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি অসম্ভব বলে কিছু নেই। কানাডাকে ভালোবাসলে, কানাডা আমাকে ভালোবাসবে। ছেলেরা এদেশে লেখাপড়া করবে, বড় হবে সেই স্বপ্ন ও প্রত্যয় ছিল। সকালের বরফ ঠেলে অভিক ডে care এ যেতো । ওর ভাইয়েরা বিকেলে স্কুল থেকে এসে নিয়ে আসতো।  আমার কলেজের পড়া শেষ হতেই শুরু হলো placement. Cyner Drinks নামে ইটালিয়ান একটা বেভারেজ কম্পানী-  সেই দুরে মিসিসাগাতে।  এখানে কাজ করেই কানাডার একটা business কিভাবে চলে a to z শেখা। ক মাস পরেই business টা বিক্রি হল তারপর তারা করলো Bankruptcy । Cyner থেকে পাওয়া  শেষ pay cheque টা NSF হল – পুরো ১ মাসের কষ্টের রোজগার। শুনেছি কোথায় যেন ৬ মাসের মধ্যে complain করা যায় কিন্তু করিনি।  ভাবলাম ওরা হয়তো অসুবিধায় আছে পরে হয়তো দিয়ে দেবে কিন্তু আজও পাইনি। শুরু হলো এজেন্সিতে পরীক্ষা দেয়া আর কাজ খোজা। কাজ পেলাম একটা Government এর program এ । তিন ছেলের একজন teen, আর এক জন middle School আর ছোটোটি Kindergarten এ। এই নিয়ে আমার অন্তহীন ব্যস্ত জীবন। বেশ Struggle তো বটেই। নতুন একটা দেশে সব মিলে গুছিয়ে উঠতে একটু সময় তো লাগবেই । হতাশ যে হয়নি তা নয় । একসময় সত্যি বাঁচতেও ইচ্ছে করতো না। তারপর নিজেই সোশ্যাল ওয়ারকারের সাথে কাজ করেছি। নিজেকে counselling করেছি। আবার উঠে দাড়িয়েছি । আপন মনে ব্যাটিং করেছি, ৬ কিংবা ৪ এর আশা করিনি তেমন একটা । আমার Husband চলে গেল মন্ট্রিল এর Concordia university তে Master’s করতে। কিন্তু বাবাকে ছাড়া teen age boy সামলানো বেশ কঠিন। তাই সে ফিরে এলো আবার Ryerson University টরেন্টোতে। ছোট্টা একখানা ঘর কেনা হল। টানা ৩ বছর কাজ করলাম Finance & Procurement এ। তারপর আমার IT Skills দেখে আমাকে CMDB Configuration Specialist হিসেবে Asset Management এ কাজ দিল। job এর requirement হিসেবে PMP certification পাশ করতো হলো। চার ঘণ্টা লম্বা professional exam গুলো বেশ challenging. কাজ, পড়া, সংসার, ছোট বাচ্চা বেশ কঠিন জীবন। তবে কখনোই হতাশ হয় নি, সাহস হারাইনি। আমার সাথে সকলের আশীর্বাদ আছে, ঈশ্বর আছে, আছে রবীন্দ্রনাথ। চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির-জগতে তখন কিসের ভয়? সব কাজ সেরে রাত ১১ টা থেকে ২ টা এই ছিল আমার study plan. দেখতে দেখতে দুই ছেলের একজন Waterloo University তে অন্যজন McMaster University তে পড়তে গেল। weekend এ ওদের দেখতে যেতাম। ছেলেদের শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করলো আমার বোনের ছেলে, MS এবং PhD করলো আমাদের সাথে থেকে। আমার husband তার ইন্জিনিয়ারিং লাইসেন্সিং শেষ করে তার নিজের Field এ কাজ শুরু করলো। ছেলেরা university পড়া শেষ করে job এ join করলো। সবমিলে এক যুগ পার করলাম । এর মাঝে অবসরেও থেমে নেই , Christmas এর ছুটিতে বাবা মাকে দেখতে দেশে যেতাম। কিছুটা সংস্কৃতি চর্চা, Community তে কাজ করা ,বন্ধু বান্ধব, গান বাজনা, হৈ চৈ ,বই পড়া, ঘুরে বেড়ানো, সামান্য লেখা লেখি সবমিলে আনন্দে থাকতে চেষ্টা করেছি সবসময়ই। কারো জন্য কিছু করতে পারলে নিজের কাছেই ভীষণ ভালো লাগে । সবচেয়ে important হল নিজের wellness, সুস্বাস্থ্য আর পরিবারারের সবাইকে ভালো রাখা। জীবনের সর্বাধিক আনন্দ হল ভালবাসা। যারা ভালোবাসতে জানে তাদের জীবনে ভালোবাসার অভাব হয় না। বাবা, মা , ভাই, বোন, আত্মীয় পরিজন পরিবারের সকলের সহযোগিতায় আমার পথ চলা।

এটা সত্যি  দুঃখ সুখের সাদা কালো দিন গুলো, চিরদিন সমান নাহি যায় । যখন যা আসে সবই গ্রহণ আমরা করি খুশী মনে। জীবনে সব যে সঠিক ভাবে করতে পেরিছি তা নয় । কিছু সীমাবদ্ধতা তো আমাদের রয়েছেই।  অন্য সকলের মত কথায় কথায় Thank you বা কাউকে দেখে Good morning বলার অভ্যাসটা আমাদের কম। কেন যেন আমাদের মাঝে positivity এর অভাব। Negative টাই চোখে পরে বেশী। অন্যকে কৃতজ্ঞতা জানানো বা Appreciate করার অভ্যাস করতে অনেকটাই সময় লেগেছে  যা একটা মানুষের সাফল্যের জন্য বিশাল ভূমিকা রাখে। এ জীবনের  পাতায় পাতায় কিছু তো ভুল ত্রুটি থাকবেই। তবে  নিজের প্রতি আমার অনেক বিশ্বাস। মস্তিষ্ক আমাদের পরিচালনা করে, যদি ভাবতে পারি “yes I can “ তখন ঠেকায় কে। কোন বাঁধাই যে আর থাকে না।

একসময়ে আমি যেখানে কাজ করতাম সে  কাজ গুলো out source করা হল। একসাথে অনেকেই layoff পেলাম । জীবন চলার পথে বাঁধা আসতেই পারে তাই বলে থেমে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। যেখানে বাঁধা আসবে সেখান থেকেই আবার শুরু করতে হয় । আবার পড়তে গেলাম Computer Networking. আর সেই সাথে join করলাম Hellenic Home এ । Accountant হিসেবে কাজ করলেও IT Lead ও আমি। আমার বস , আমাদের CFO চিত্রা তারই অনুপ্রেরণায়  শুরু করেছি CPA Designation এর জন্য পরীক্ষা দেয়া, অনেকটাই এগিয়েছি। সামনে আর একটা পরীক্ষা রয়েছে। সবাই মজা করে বলে বড় ছেলের বৌ এসেছে, শাশুড়ী হয়েছো আর কত পড়া? কিন্তু আমার পড়তে ভালো লাগে, ভালো লাগে নিজেকে নানান কাজে ব্যস্ত রাখতে । কাজের মধ্যে আত্মতৃপ্তি কাজের মধ্যেই মানুষের পরিপূর্ণতা ।

মনে পরে আমিও এদেশে প্রথম শুরু করেছিলাম McDonald আর Timhortons এর job দিয়েই। মনে পরে  কানাডাতে প্রথম আসার পরপরই health card ছিল না, check up করাতে গিয়েছিলাম Esat End Community Center এ। ফেরার পথে ঢুকলাম McDonald এ, Store  ম্যানেজার কে বললাম – কাজ করতে চাই। বলল কাল সকাল ৮টায় সাদা শার্ট আর কালো ড্রেস প্যান্ট পরে আসতে। ১ ঘণ্টা job shadowing পর, বলল কাল তোমার orientation. Front cash counter এ দাঁড়ালাম কিন্তু তখনও আমি টুনি, লুনি কিংবা সব খাবারের আইটেম গুলোর নামও সঠিক ভাবে জানিনা। নতুন একটা দেশে আসার পর প্রতিদিনই নতুন নতুন জিনিস শেখা। এদের সংস্কৃতি, ভাষা, পোষাক চালচলন আরও কত-কী। McDonald এ দু তিন সপ্তাহ কাজের পর মনে হলো এভাবে বরফ ভঙ্গা কিংবা মেশিনে কোক ঢাললে আমার বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। সেদিনই Mainstreet এ নেমে Tim Hortons এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, একজন লেডী দরজার কাঁচ পরিষ্কার করছে – নেইম প্লেট দেখলাম Karen. বললাম Karen তোমাদের এখানে কাজ করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। আমি খুব কাছেই থাকি। বলল চল ভেতরে, দেখি তোমার সাইজের Uniform আছে কিনা। শুরু হলো বিকেলের শিফটে কাজ করা আর সকলে কলেজ করা। একদিন গার্বেজ করতে গিয়ে চাবি হারিয়ে  আটকা পরে ছিলাম কয়েক ঘণ্টা। শুরুতে এই কাস্টমার সার্ভিস job করেই নিজেকে সব সবসময় কিভাবে smiling রাখা যায় তা শিখে ছিলাম।

কি পেয়েছি আর পাবো তা কখনোই ভাবিনি। তেমন কোন বর্ণাঢ্য জীবন আমার নয়।  নিতান্ত সাধারণ মেয়ের গল্প, এ জীবনের ক্ষুদ্র কোলাজ –  আমার এ অভিজ্ঞতা যদি এদেশে নতুন আসা কোন মেয়ের মনে সাহস এ শক্তি যোগায় তবে আমার ভালো লাগবে।  জীবনটা সাইকেল চালানোর মত। নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিজেকে অবশ্যই গতিশীল রাখতে হয় । কখনোই মরার আগেই মরতে চাইনা। গতিই জীবন, দেহে আছে যতক্ষণ প্রাণ তবেই আনন্দের প্রাণ সাগরে ভেসে থাকা যায়।

শুভ্রা শিউলী সাহা

টরন্টো