গত বছর কানাডা থেকে রেকর্ড সংখ্যক অধিবাসী দেশ ত্যাগ করছেন
এই সংখ্যা গত প্রায় ছয় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, জুন ৮, ২০২৫ : ২০২৪ সালে কানাডায় দেশ ত্যাগীদের হার অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে যে কোনও বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি অধিবাসী কানাডা ছেড়েছেন। ২০২৪ সালে কানাডা ত্যাগ করেছেন ১০৬,১৩৪ জন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩% বৃদ্ধি এবং এই দেশ ত্যাগীদের সংখ্যা গত প্রায় ছয় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। নতুন এই তথ্য জানায় স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা। খবর দি ডেইলি ভয়েস এর।
দেশ ত্যাগের এই প্রবণতার কেন্দ্রস্থল হিসেবে অন্টারিও প্রভিন্সের নাম উঠে আসে গবেষণায়। যারা কানাডা ত্যাগ করেছেন তাদের শতকরা ৪৮ জনই ছিলেন অন্টারিও’র অধিবাসী। এর অর্থ হল ২০২৪ সালে ৫১,০০০ এরও বেশি অন্টারিওবাসী অন্য দেশে চলে গেছেন, যা কানাডার ক্যুবেক, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এবং আলবার্টা প্রভিন্স থেকে চলে যাওয়া মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
দেশ ত্যাগীদের সংখ্যা অন্টারিও’র পর ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় বেশি। ঐ প্রভিন্স থেকে একই সময়ে প্রায় ২০,০০০ বাসিন্দা দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার তুলনায় অনেক বেশি জনসংখ্যার প্রভিন্স হওয়া সত্ত্বেও কুইবেক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম সংখ্যক বাসিন্দা দেশ ছেড়েছেন। সংখ্যায় আনুমানিক ১৩,৫০০। এই সংখ্যা ইঙ্গিত দেয় যে কুইবেকের বাসিন্দারা নিজ প্রদেশে থাকার প্রতি বেশি আগ্রহী।
অন্যদিকে এক প্রভিন্স থেকে অন্য প্রভিন্সে চলে যাওয়ার দিক থেকেও অন্টারিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে ২০২৪ সালে ২৩,৫৮৫ জন অন্টারিও’র বাসিন্দা অন্য প্রভিন্সে চলে গেছেন। তবে আলবার্টা এদিক থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। এই প্রভিন্স ২০২৪ সালে ৯১,০০০ জন নতুন বাসিন্দাকে স্বাগত জানিয়েছে। অবশ্য এই সময়কালের মধ্যে প্রায় ৫৫,০০০ জন বাসিন্দা চলেও গেছেন অন্য প্রভিন্সে। তারপরও যোগবিয়োগের পর আলবার্টায় যেটি দেখা গেছে তা হলো এখানে নতুন বাসিন্দার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৬,০০০ জন। কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রভিন্সটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় কম হওয়াতে এবং চাকরির সুযোগ ও একই সাথে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের সুযোগ থাকাতে কানাডিয়ানদের কাছে দিন দিন আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠছে আলবার্টা।
তবে ২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক অধিবাসী কানাডা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও দেখা গেছে এই একই বছরে রেকর্ড সংখ্যক নতুন ইমিগ্রেন্টকে স্বাগত জানিয়েছে কানাডা। এদের সংখ্যা ছিল ৪৮৩,৫৯১ জন।
রেকর্ড সংখ্যক কানাডিয়ান অধিবাসী বিদেশে চলে যাওয়া বা দেশের অভ্যন্তরে এক প্রভিন্স থেকে অন্য প্রভিন্সে স্থানান্তরিত হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে মূলত অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার মান এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের ভূমিকা রয়েছে। স্ট্যাটিসটিকস কানাডার সমীক্ষা এই জটিল চিত্রটি তুলে ধরেছে।
আরেকটু বিস্তারিত ভাবে বলতে গেলে যে বিষয়গুলো সামনে আসে তা হলো, প্রধানত উচ্চ আবাসন খরচ, কম বেতন এবং আর্থিক সুযোগের অভাবের মতো অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণগুলো লোকজনের স্থানান্তরের পিছনে বড় ভূমিকা রাখছে। অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে উন্নত চাকরির বাজার খোঁজ করা এবং সেই সাথে উচ্চ কর ও দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ।
উল্লেখ্য যে, কয়েক বছর আগে ফ্রেসার ইন্সটিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, কানাডার পরিবারগুলো গড়ে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান খাতে মোট যা ব্যয় করে তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে টক্স দেয়ার জন্য। দ্য কানাডিয়ান প্রেস এই তথ্য জানায়।
ভ্যাঙ্কুভারে অবস্থিত ওই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালে কানাডীয় পরিবারগুলোর গড় আয় ছিল ৭৭,৩৮১ ডলার এবং তারা ট্যাক্স দিয়েছে ৩২,৩৬৯ ডলার-অর্থাৎ তাদের ট্যাক্সের পরিমাণ ছিল মোট আয়ের ৪১.৮ শতাংশ। অন্যদিকে তারা খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের জন্য ব্যয় করেছে মোট আয়ের ৩৬.১ শতাংশ।
এদিকে সিবিসি নিউজ জানায়, কানাডা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া কানাডিয়ানদের জন্য নতুন কোন খবর নয়। চাকুরি বা ব্যবসার কারণে, আবহাওয়ার কারণে অনেক কানাডিয়ানই যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে। ‘আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে’র এক জরিপ থেকে তথ্য জানা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে হারে কানাডিয়ানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছেন তা ঐতিহাসিক গড় থেকে অনেক বেশী। ‘আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে’র জরীপ থেকে আরো জানা যায় যে, ২০২২ সালে কানাডা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া লোকের সংখ্যা ছিল ১২৬,৩৪০ জন। ২০১২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৫,৭২৫ জন। গত কয়েক বছরে বৃদ্ধির এই হার ৭০%।
২০২২ সালে যারা কানাডা ছেড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন তাঁদের মধ্য ৫৩,৩১১ জনের জন্ম কানাডায়। আর ৩০,৪৩৪ জনের জন্ম কানাডার বাইরে, অর্থাৎ অন্যদেশ থেকে যাঁরা কানাডায় এসেছিলেন ইমিগ্রেন্ট হয়ে।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় জনসংখ্যা বিপুল ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক চাপ পড়েছে। অন্টারিওর হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশন ইতিপূর্বে এই বলে সতর্ক করেছে যে, জনসংখ্যার “বিপুল বৃদ্ধি” প্রদেশের জরুরি বিভাগগুলির ওপর “স্থায়ী চাপ” আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্লোবাল নিউজের এক খবরে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ইতিপূর্বে স্ট্যাটক্যান এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, পারমানেন্ট রেসিডেন্ট হিসাবে কানাডায় আসার ২০ বছরের মধ্যে দেশটি ছেড়ে যাচ্ছেন ১৫ শতাংশেরও বেশি অভিবাসী। তারা হয় স্বদেশে ফিরছেন অথবা অন্য কোনও দেশে অভিবাসী হয়ে যাচ্ছেন। নতুন এক সমীক্ষায় এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। স্ট্যাটক্যান এর সূত্র উল্লেখ করে সিটিভি নিউজ ইতিপূর্বে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, “কিছু অভিবাসী হয়ত কোনও এক পর্যায়ে কানাডা ছেড়ে যাবার পরিকল্পনা করে থাকতে পারে, তবে এই অভিবাসনের সঙ্গে কানাডার শ্রমবাজার অথবা সমাজে একাত্ম হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অভিবাসী যে সঙ্কটে পড়েন তারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।”
কানাডা ছেড়ে রেকর্ড সংখ্যক বাসিন্দার অন্য দেশে চলে যাওয়ার পিছনে আবাসন সংকটেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ব্যাংক অব কানাডাও একই রকমের বিশ্লেষণ করেছে। ডেপুটি গভর্নর টনি গ্রাভেল ইতিপূর্বে এক বক্তৃতায় সতর্ক করেছিলেন যে, জনসংখ্যার জোরালো বৃদ্ধি বাড়ির দাম ও বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, অভিবাসনের কারণে পরিষেবা, আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর যে চাপ পড়ছে তাতে কানাডীয়রা ক্রমবর্ধমান হারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে এবং তাতে উচ্চহারে অভিবাসনের প্রতি জনসমর্থন কমে যাচ্ছে।
Rentals.ca’র সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে দেখা যায়, সারাদেশে গড় বাড়ি ভাড়া ছিল মাসে ২,০০০ ডলারের বেশি।
দেশের বৃহত্তম শহরগুলিতে এক শয়নকক্ষের একটি আবাসনের ভাড়া হ্যালিফ্যাক্সের মত শহরে প্রায় ১,৮৬০ ডলার থেকে শুরু করে যে কোনও অঙ্কের, যেমন টরন্টোতে ২,৫০০ ডলার এবং ভ্যাঙ্কুভারে এমনকি ২,৮০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কোনও শহরে এই অঙ্কটা প্রায় ১,০০০ ডলার বেড়ে যায় দুই শয়নকক্ষের ইউনিটের ক্ষেত্রে, আর ভ্যাঙ্কুভারে কোনও ইউনিটের ভাড়া দাঁড়ায় মাসে গড়ে ৩,৭৪০ ডলার।
অন্য এক সমীক্ষার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জীবনযাত্রায় ব্যয় অভিবাসীদের দেশত্যাগের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অভিবাসীরা অবশ্য ঐতিহাসিকভাবেই চাকরিবাকরি নিয়ে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিলেন। বিদেশের শিক্ষাসনদ ইত্যাদি থাকার পরও অনেকে স্বল্প বেতনের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্যমতে, কানাডায় আসার এক বছরের মাথায় একজন অভিবাসীর মাঝারি পর্যায়ের আয় ছিল ২০১৮ সালে ৩১,৯০০ ডলার। যদিও ১৯৮১ সাল থেকে শুরু করে ওই সময় পর্যন্ত এটাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ আয়সীমা, তবুও এটাই কিন্তু জনগণের অন্য সব অংশের মাঝারি আয়ের চেয়ে ছিল ১৮ শতাংশ কম।
আর কানাডায় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের অর্থ হলো, অভিবাসীদের কানাডায় অবস্থানের সম্ভাবনা কমে যাওয়া। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য বলছে, সাম্প্রতিককালে আসা অভিবাসীদের ৩১ শতাংশ তাদের আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি ব্যয় করছেন আবাসন খাতে, যেখানে অন্য সবাই এই খাতে ব্যয় করেন মাত্র ১৮ শতাংশ।
সম্প্রতি কানাডায় জীবনযাত্রার ব্যয় এমনই বৃদ্ধি পেয়েছে যা গত ৩০ বছরের মধ্যে দেখা যায়নি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
এরকম পরিস্থিতিতে কানাডার রেকর্ড সংখ্যক অধিবাসী দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবেন এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
