বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো’র উদ্যোগে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালিত
প্রবাসী কণ্ঠ, ১৬ জুন, ২০২৫: বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো’র উদ্যোগে গত ১৫ জুন রবিবার পালিত হয় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী।

১৬৮৪ ভিক্টোরিয়া পার্কে অবস্থিত Emmanuel Lutheran Charch এর মিলনায়তনে প্রবাসী বাংলাদেশী কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল বেশ প্রাণবন্ত।
বক্তরা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা সাহিত্যের এই দুই দিকপাল জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কবি হিসেবে আবির্ভাব হয়েছিলেন। তাঁদের লেখনী, কবিতা ও গানের সঙ্গে মিশে আছে গোটা বাঙ্গালী জাতির সংস্কৃতি ও কালের বিবর্তনের নানা ইতিহাস। এই দুই মহীয়সীর প্রধান পরিচয় কবি হলেও সাহিত্যের সব শাখাতেই ছিল তাঁদের অবাধ বিচরণ। সমাজের অগ্রগতি, মানবতা ও মানুষের মুক্তি নিয়ে তাঁদের চিন্তা ছিল সার্বক্ষণিক। তাঁদের অবদান ছিল অসামান্য।
আলোচনায় যারা অংশ নেন তাঁরা হলেন, লেখক ও অধ্যাপিকা ফরিদা রহমান, গবেষক সোনা কান্তি বড়ুয়া, বাংলা একাডেমীর পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক সালমা বাণী, বাংলা একাডেমীর সৈয়দ ওয়ালিউল্লা পুরস্কারে ভুষিত লেখক ও সাংবাদিক জসিম মল্লিক, কবি দেলওয়ার এলাহী, কবি মোয়াজ্জেম খান মনসুর, অধ্যাপিকা ও লেখক মাহমুদা নাসরিন, ঋতুশ্রী ঘোষ ও প্রবাসী কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক খুরশিদ আলম।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বক্তারা আলোচ্যসূচিতে একেবারেই ছিল না এমন এক বিষয়ে প্রাণবন্ত আলোচনায় মেতে উঠেছিলেন যা উপস্থিত দর্শকদের মনকেও ছুঁয়ে যায়। বিষয়টি ছিল কানাডায় আমাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা টিকে থাকবে কি থাকবে না এবং এ বিষয়ে আমাদের করণীয় কি। আলোচকগণ এ বিষয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন দর্শকদের সামনে। প্রবাসে কে কিভাবে তাঁদের সন্তানদের মধ্যে বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটিয়েছেন বা ঘটানোর চেষ্টা করেছেন সেইসব অভিজ্ঞতার কথাও তাঁরা শেয়ার করেন আলোচনা সভায় এবং প্রবাসে এর প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব কতটা তা তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য যে, এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে টরন্টোতে সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক ড. মহাদেব চক্রবর্তীকে স্মরণ করতে গিয়ে। রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয়েছিল তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর জন্য। তাঁর স্মরণে সবাই এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন।

মহাদেব চক্রবর্তী প্রবাসে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্ব যিনি নিজ সংস্কৃতি ও ভাষাকে ভালোবেসে কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। ১৯৯৯ সালে তিনি ও তাঁর আরো দুই সহযোগী মিলে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেছিলেন বাংলা ভাষার কোর্স। সহযোগী দু’জন ছিলেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপক মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী পলিন মজুমদার। পলিন জন্মসূত্রে ছিলেন স্কটিশ। মহাদেব চক্রবর্তী তাঁর সারা জীবনে অর্জিত অর্থের প্রায় সবটাই দান করে গেছেন এই বাংলা ভাষা কোর্সটি চালু করার জন্য।
প্রায় একযুগ ধরে অব্যাহত ছিল বাংলা ভাষার এই কোর্সটি। প্রথম দিকে কয়েক বছর চলার পর মজুমদার দম্পতি আর অনুদান দিতে পারছিলেন না। তবে মহাদেব চক্রবর্তী অর্থ যোগান দিয়ে ব্যয়বহুল এই কোর্সটি চালু রেখেছিলেন আরো কয়েক বছর। এক পর্যায়ে তিনিও আর পারছিলেন না অর্থ যোগান দিতে। ফলে অর্থাভাবে এবং শিক্ষার্থীর অভাবে এক পর্যায়ে কোর্সটি বন্ধ হয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে আলোচনা পর্ব ছাড়াও ছিল সাংস্কৃতিক পর্ব। এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান পরিবেশন করেন স্থানীয় শিল্পীরা।
সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের একটি গান পরিবেশন করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়ান কানাডায় তরুণ প্রজন্মের সুকণ্ঠী গায়িকা কাশফিয়া চৌধুরী। এরপর একে একে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান পরিবেশন করেন সুমি বর্মন, সহিদুর রহমান সোহেল, সংগীতা মুখার্জী, ফারহানা পল্লব ও রবার্ট বৈদ্য।
অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠেরও আয়োজন ছিল। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা পাঠ করেন মোহাম্মদ সালাম ও দিলারা নাহার বাবু।
আলোচনা অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন মোয়াজ্জেম খান মনসুর এবং সাংস্কৃতিক পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন ফারহানা পল্লব।
সন্ধ্যায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি শেষ হয় রাত দশটায়। বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো’র উদ্যোগে আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানটি সার্বিক বিবেচনায় ছিল সফল।
