এবার নতুন আরেক ইতিহাস গড়লেন করলেন ডলি বেগম
প্রথমবারের মতো ফেডারেল এমপি নির্বাচিত হলেন কোন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান
প্রবাসী কণ্ঠ, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ : বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এবার ফেডারেল এমপি নির্বাচিত হলেন ডলি বেগম। সৃষ্টি করলেন নতুন আরেক ইতিহাস। তাঁর এই ঐতিহাসিক জয়ে আনন্দে ভাসছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত ফেডারেল উপনির্বাচনে ডলি বেগম ভোট পেয়েছেন মোট ২০,১১৪টি (৭০%)। গ্রেটার টরন্টোর স্কারবরো সাউথওয়েস্ট নির্বাচনী এলাকা বা রাইডিং থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি এই বিজয় ছিনিয়ে নেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত আরও দুটি উপ নির্বাচনে জয়লাভ করেন লিবারেল পার্টি অব কানাডার প্রার্থীরা। এরা হলেন টরন্টোর ‘ইউনিভার্সিটি–রোজডেল’ নির্বাচনী এলাকার ড্যানিয়েল মার্টিন এবং কুইবেক এর ‘টেরেবোন’ নির্বাচনী এলাকার তাতিয়ানা অগাস্টে।

এই বিজয় এবং এর আগে মোট ৫ জন বিরোধী দলের এমপি ফ্লোর ক্রস করে মার্ক কার্নির লিবারেল দলে যোগ দেওয়ায় দলটি এখন পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো। লিবারেল পার্টির আসন সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে মোট ১৭৪টি। ফলে কার্নির লিবারেল পার্টিকে পার্লামেন্টে আইন পাশ করার জন্য এখন থেকে আর কোন বিরোধী দলের সমর্থন লাগবে না।
উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালে অন্টারিও পার্লামেন্টের নির্বাচনে প্রথমবার জয়ী হয়ে ডলি বেগম প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন এক ইতিহাস। অন্টারিওসহ কানাডার অন্য কোন প্রভিন্সে কোন বাংলাদেশি কানাডিয়ান তখন পর্যন্ত এরকম মর্যাদায় ভূষিত হননি। এবং এখন পর্যন্তও না। এমপিপি বা এমপি কোনো পদেই ডলি বেগম ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশি -কানাডিয়ান পাশ করতে পারেননি।
পরবর্তী নির্বাচনেও ডলি বেগম একই রাইডিং থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এমপিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার রাইডিং এর ৪৭.১% ভোটার তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি মোট ভোট পেয়েছিলেন ১৫,৯৫৪ টি।
এখানেই শেষ নয়, অন্টারিও’র পার্লামেন্ট নির্বাচনে তৃতীয়বারও বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ডলি বেগম ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। ঐ নির্বাচনে ডলি বেগম ভোট পেয়েছিলেন ১৪,৫৫৭ টি যা ‘স্কারবরো সাউথওয়েস্ট রাইডিং’ এ প্রদত্ত মোট ভোটের ৪২.৮৯%।
আর এবার ফেডারেল উপ- নির্বাচনে একই রাইডিং থেকে অংশ নিয়ে জয়ী হলেন লিবারেল পার্টির এমপি হিসাবে। এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি নতুন আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করলেন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান হিসাবে।
উল্লেখ্য যে, স্কারবরো সাউথওয়েস্ট রাইডিং- এর সাবেক এমপি ও মন্ত্রী বিল ব্লেয়ার যুক্তরাজ্যে কানাডার রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করাতে ঐ আসনটি খালি হয়ে যায়। এর পরপরই, ফেডারেল লিবারেলরা নিশ্চিত করে যে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট এর প্রাক্তন এমপিপি ডলি বেগম তাদের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ইতিপূর্বে ডলি বেগম স্কারবরো সাউথওয়েস্ট রাইডিং থেকে প্রভিন্সিয়াল এনডিপি’র হয়ে পরপর তিনবার এমপিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দলটির ডেপুটি লিডারও ছিলেন। স্কারবরো সাউথওয়েস্টে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর এই এলাকায় প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী বাস করেন।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ডলি বেগম প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সমাবেশে বলেছিলেন, “গত তিন টার্মে এমপিপি হিসাবে আমি স্কারবরো সাউথওয়েস্ট এর বাসিন্দাদের সেবা করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এবার আমি আরো বৃহৎ পরিসরে অত্র এলাকার বাসিন্দাদের সেবা করতে চাই। আর সে কারণেই আমি এবার ফেডারেল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবং সেটি লিবারেল পার্টি অফ কানাডার হয়ে।”
তিনি বলেন, “অত্র এলাকার জনগণের অনেক ইস্যু আছে যেটা নিয়ে তাঁরা ভাবছেন। আগে অনেকেই আমার কাছে ফেডারেল লেভেল এর ইস্যু নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আমি তখন প্রভিন্সিয়াল লেভেলে কাজ করেছি বলে সেগুলো নিয়ে কোনো কিছু করতে পারিনি।”
ডলি বেগম আরও বলেন, “আমি একুট ক্লারিফাই করতে চাই কেন আমি এনডিপি ছেড়ে ফেডারেল লেভেলের লিবারেল পার্টিতে যোগ দিলাম। আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে এই প্রশ্ন করেছেন। সত্যি বলতে কি, আমি কয়েকমাস আগেও দল পরিবর্তনের বিষয়টি একেবারেই ভাবিনি। এই জাতীয় কোনো চিন্তা আমার মাথায় ছিলই না। তবে অতি সম্প্রতি কমিউনিটির কিছু শুভানুধ্যায়ী এবং পরামর্শক এবং লিবারেল পার্টির কিছু সিনিয়র মেম্বার ও প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাথে কথা বলে আমি বুঝতে পেরেছি যে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের মানুষের জন্য আমরা আরও অনেক কিছু করতে পারি। এবং আপনারা সবাই জানেন যে স্কারবরো সাউথওয়েস্ট এর মানুষজন সর্বদাই আমার নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি। আমার জন্য আমার কমিউনিটির মানুষ সবসময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে এটি খুবই জরুরি যে আমি সত্যিকার অর্থেই এই এলাকার মানুষদের জন্য কিছু করতে চাই আরও ব্যাপক প্রাসপেক্টিভে।”
আলোচনা সভায় উপস্থিত কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে ডলি বেগম আরও বলেন, “আপনারা জানেন গত আট বছরে আমরা এই কমিউনিটির জন্য কিছু চমকপ্রদ কাজ করতে পেরেছি বিশেষ করে হাসপাতাল, হাউজিং এ সব বিষয়ে। আর যখন আমরা ফেডারেল লেভেলে এই কাজগুলো করতে পারবো তখন আমাদের কমিউনিটি আরো বেশি মাত্রায় উপকৃত হবে। হতে পারে এটি হাউজিং বিষয়ে, সিনিয়র সিটিজেনদের বিষয়ে বা অন্য কোনো বিষয়ে। ”
ডলি বেগম বলেন, “স্কারবরোতে আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজনদের জন্য একটি বড় কমিউনিটি সেন্টার নেই। এ কারণে অনেক সিনিয়র সিটিজেন আছেন যাদের সামাজিক মেলামেশার কোনো জায়গা নেই, যেখানে গেলে তারা বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটি করতে পারতেন যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারতো। আমাদের লংটার্ম কেয়ার ইস্যু, হাউজিং ইস্যু রয়েছে। হাউজিং এর জন্য কত মানুষকে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে যা সত্যি বেদনাদায়ক। বার বছর, চৌদ্দ বছর অপেক্ষা করেও অনেকে হাউজিং পাচ্ছে না। আমরা চাই এই ইস্যুগুলো ফেডারেল লেভেলে উত্থাপন করতে এবং তা জোরালো ভাবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালে প্রথমবার অন্টারিও পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর প্রবাসী কণ্ঠে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে ডলি বেগম বলেছিলেন, আমি আসলে কখনোই দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না আগে। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল কীভাবে মানুষকে সাহায্য করতে পারবো, কমিউনিটিকে সাহায্য করতে পারবো।
তিনি আরও বলেছিলেন, রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে আমি অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তবে এ ক্ষেত্রে আমি আমার মা’র কথাই আগে বলবো। কারণ, উনার ইচ্ছাশক্তি খুবই প্রবল এবং খুবই শক্তিশালী। দুর্ঘটনায় আমার বাবা আহত হওয়ার পর থেকে আমাদের পুরো পরিবারটিকে উনিই টেক কেয়ার করেন। সে কারণে স্পষ্টতই উনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখার আছে। আমি এখানে মূলধারার কয়েকজন রাজনীতিকের সঙ্গেও কাজ করেছি। যেমন বিচেস ইস্ট ইয়র্ক এলাকার ওয়ার্ড ৩১ এর সিটি কাউন্সিলর (সাবেক) জেনেট ডেভিস। এরকম আরো কয়েকজন এর সঙ্গে কাজ করেছি। আর তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েও রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি এবং আগ্রহী হয়ে উঠেছি।
ডলি বেগম স্কুল এবং ইউনিভার্সিটিতে অত্যন্ত ভাল রেজাল্ট করে নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন আগেই। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো বিশ্বসেরা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি। সেখান থেকে পলিটিক্যাল সাইন্সে ডিগ্রি নিয়ে Development Administration and Planning এর উপর মাস্টার্স শেষ করেন ব্রিটেন থেকে।
