যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি-কানাডিয়ান প্রযুক্তিবিদের বিশেষ কৃতিত্ব

প্রবাসী কণ্ঠ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত টেক্সাস এর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট পরিচালনার জন্য প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সেখানকার মর্যাদাপূর্ণ সিনিয়র রিয়েক্টর অপারেশন্স (SRO) সার্টিফিকেশন পেয়েছিলেন রায়হান খন্দকার। ২০১৯ সন থেকে ২১ মাস ট্রেনিং এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার পর এই সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। রায়হানই প্রথম বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশী যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ক্ষেত্রে এ ধরণের যোগ্যতায় এবং পদে ভূষিত হয়েছিলেন।

তারপরের ঘটনা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। শীতের মৌসুম। প্রবল তুষারঝড়ের কবলে পড়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল টেক্সাস। জমে অচল হয়ে পড়েছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। তীব্র শীতে বিদ্যুৎ, তাপ ও পানিহীন হয়ে পড়েছিলেন লাখো মানুষ। বৈরী সেই আবহাওয়ায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২১০ জনেরও বেশি। প্রবল শক্তিধর ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর এক দেশ আমেরিকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এমন ধস মেনে নিতে পারছিলেন না কেউ। সবারই প্রশ্ন ছিল- কীভাবে ঘটল এই বিপর্যয়?

সেদিনের সেই বিপর্যয়ের পর টেক্সাসের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য নেওয়া হয় এক বিশাল পরিল্পনা যাতে করে এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি আর হতে না হয়। আর সেই বিশাল কর্মযজ্ঞে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান রায়হান খন্দকার।

গত জানুয়ারিতে বাবা কাজিম খন্দকারের ৭০ তম জন্মদিনে মা ও স্ত্রীর সঙ্গে রায়হান

রায়হান একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী। বাংলাদেশে তার বাড়ি  খুলনায়। তিনি টরন্টো প্রবাসী লেখক, ঔপন্যাসিক ও প্রবাসী কণ্ঠের কলামিস্ট রীনা গুলশান এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান কাজিম খন্দকারের জ্যৈষ্ঠ পুত্র। কাজিম খন্দকার যুক্তরাজ্যের সম্মানজনক ‘আর্থার চার্লস অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশ থেকে ইমিগ্রেন্ট হয়ে বাবা মায়ের সাথে কানাডায় আসার পর রায়হান অটোয়া ইউনিভার্সিটিতে তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর বেশ কয়েক বছর কানাডার পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ বিভাগে কাজ করেছেন তিনি। চাকরী সূত্রে বর্তমানে তিনি পরিবারসহ টেক্সাসে বসবাস করছেন।

২০২১ সালের বিপর্যয়ের পর টেক্সাস কর্তৃপক্ষ তাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেয় তার আওতায় ছিল শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিশাল কর্মযজ্ঞ। এর মধ্যে ছিল ১৪৫০টিরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৬৭০০টিরও বেশি গ্রিড সাবস্টেশন। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন রায়হান খন্দকার।

জনকণ্ঠ জানায়, “তাঁর নেতৃত্বে গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা আর কাগুজে পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি—বাস্তবে রূপ নেয়, পরিমাপযোগ্য হয়। এর প্রমাণ মেলে পরবর্তী শীতগুলোতে। এর প্রভাব পরবর্তী শীতকালগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালের বিপর্যয়ের সময় টেক্সাস প্রায় ৩৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়েছিল যখন চাহিদা ৬৯ হাজার মেগাওয়াটেরও  বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে এলিয়ট, হেদার, কোরা এবং এনজো’র মতো চারটি বড় তুষারঝড় আঘাত হানলেও টেক্সাসের গ্রিড ছিল অবিচল। অথচ এই ঝড়গুলোর তীব্রতা ছিল ২০২১ সালের মতোই। এই ধারাবাহিক সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তুষারঝড় কিংস্টন ‘উইন্টার স্টর্ম কিংস্টন’-এর সময়। তখন টেক্সাসে বিদ্যুতের শীতকালীন চাহিদা ৮০,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশই সচল ছিল।”

উল্লেখ্য যে, সিনিয়র রিয়েক্টর অপারেশন্স এর সার্টিফিকেট প্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিউক্লিয়ার এনার্জি জগতে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এবং অবস্থানে কাজ করেন এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।
মর্যাদাপূর্ণ এই সার্টিফিকেট প্রাপ্তির পর রায়হান তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ইতিপূর্বে বলেছিলেন, “আমি এমন কিছু করতে চাই যার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাঙ্গালী ও বাংলাদেশের নাম উজ্জল হয়। দেশ থেকে দূরে থেকেও দেশকে গর্বিত করতে চাই। বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশী-আমেরিকান স্থপতি ও পুরকৌশলী কিংবদন্তী ফজলুর রহমান খান আমার অন্যতম আদর্শ পুরুষ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *