নিভৃতে

রীনা গুলশান

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১৪
ফাবিয়ান খুব দ্রুত ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। খুব ক্লান্ত লাগছে। সারাদিনের এই পথ পরিক্রমণ এবং এই সব কিছু মিলিয়ে খুব খুউব ক্লান্ত লাগছে। মনে হচ্ছে এইটুকু পথও ও হাঁটতে পারছে না। সেকি শুধুমাত্র দীর্ঘ পথ যাত্রা করে এসেছে, তাই? নাকি আশা ভঙ্গের বেদনা? কিসের আশা ভঙ্গ? ও কি এখনো ডোরিনের কাছে কিছু আশা করেছিল যে ডোরিন তার জন্য উন্মুখ হয়ে পথ চেযে বসে আছে? সে আসলেই তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেবে? সে পথতো ওদের অনেক আগেই শেষ হয়েছিলো।
এতদিন পর নিজেকেই যেন পর্যালোচনা করতে শুরু করলো। নাহ্! এখন ওর কিছু আর ভাবতে ভালো লাগছে না। বড় বড় পা ফেলে বাড়ি চলে এলো।
নানী ওর জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষমান ছিল। ও যেতে তাড়া লাগালো-
: নাহ্ বাবা, তোরা পারিসও বটে! এত দূর থেকে এসেই পাশের বাসায় ছুট লাগালি। কি হতো যদি কাল সকালেই যেতিস?
: কিছুই হতো না নন্না, তবে আজ যেয়ে ভালোই হয়েছে! চারপাশের আবহাওয়াটা ভালো করে দেখে এলাম।
: ওহ্! তা ডোরিনের সাথে দেখা হলো? আমান্ডার বেশ সাবধানী গলা।
: হু! সবার সাথেই দেখা হয়েছে- বলতে বলতে ফাবিয়ান দ্রুত ওয়াশরুমে চলে গেল। নাহলে এই এখনি রাজ্যের কাসুন্দি গাইতে হতো। কি দরকার! ওর এখন গ্যাজাতে মোটেই ইচ্ছা করছে না।
গোসল করলো অনেকক্ষণ ধরে। এরপর বেশ ঝরঝরে লাগছে। যদিও মাথাটা এখনো বেশ ভার ভার লাগছে। ভাল একটা ঘুম দিতে হবে। খাবার ঘরে এসে দেখে এরই মধ্যে নানী ২/৩ পদের রান্না করে ফেলেছে।
: ইস্! দ্যাখতো কত রাত করে ফেললি। নে এখন ভাল করে পেট ভরে খা।
: ওমা, তুমি এত শিঘ্রি এত কিছু করলে কি করে?
: থাক, অত ঢং করতে হবে না- খাতো। আহারে আমার সোনারে, না খেয়ে খেয়ে শরীরটাতো দড়ি দড়ি হয়ে গেছে।
ফাবিয়ান নানীর কথা শুনে হেসে আর বাঁচে না। ইস্রে, এই সব খাবার আর এই সব নানীর ভালোবাসায় মাখামাখির সংলাপ- কি করে সে এতটা দিন ভুলে ছিল? কিভাবে কাটিয়ে দিল প্রায় ৫টি বছর? ফাবিয়ান খেতে খেতে তার খাবারগুলো আর দেখতে পারছিল না। সব ঝাপসা। চোখ দিয়ে টপটপ করে কান্না ঝরছিল তার অগোচরেই। তারপর চট করে নানীকে লুকিয়ে কান্না বা হাত দিয়ে মুছে ফেললো। নানী দেখলে আবার অনর্থ হবে। খাবার সময় কান্না ভালো কথা নয়। নানীর আবার নানান কুসংস্কার আছে। সে সব মনে করে আবার ফাবির হাসি পেয়ে গেল।
খাবার খেয়ে নানীর বিছানায় যেয়ে গড়িয়ে পড়লো-
: কিরে, তোর ঘরে যাবি না?
: না, তুমি ভালো করেই জান আমি এখন তোমার সাথে গল্প করবো।
: কিন্তু এখন অনেক রাত হয়েছে। সারা দিন জার্নি করে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিস। এখন ঘুমিয়ে পড়- বলতে বলতে ফাবিয়ানের কাছে যেয়ে সেও ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। তারপর দুজন অনেক রাত ধরে পুটপুট করে কথার মালা গাঁথলো। কখন তারা ঘুমিয়ে পড়লো নিজেরাই জানে না। প্রায় ৯টার দিকে উঠলো আমান্ডা। নিজেই অবাক হলো এত বেলা পর্যন্ত সে কিভাবে শুয়েছিল? তাড়াতাড়ি নাস্তা বানাতে বসলো। টনিকে টাকা দিয়ে বাজারে পাঠালো। সব ফাবিয়ানের প্রিয় জিনিসের লিস্ট দিয়ে। নিজে এক কাপ চা খেল এক পিস বিস্কিট দিয়ে। আর তখনি সারাকে টেলিফোনও করলো।
: কি ব্যাপার মা? আজ যে এত্ত সকালে তুমি ফোন দিলে!
: হ্যাঁ দিলাম তো? বলতো কেন করেছি এরকম সকাল সকাল?
: নিশ্চয়ই রাতে ভালো ঘুম হয়নি। আমাকে নিয়ে কোন বাজে স্বপ্ন দেখেছো, ঠিক বলিনি?
: উহু! রাতে আর স্বপ্ন দেখবার সময়ই পেলাম কোথায়? সারা রাত তো প্রায় জেগেই ছিলাম।
: না, না- এটা ঠিক নয়। এ বয়সে এরকম রাত জাগা ঠিক নয়। তোমাকে কত বার বলেছি, টনিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাও। তা নয়, তুমিতো আমার কোন কথাই শুনতে চাও না।
: আরে বাপু, এতো আমার দুঃখের জাগরণ নয়। এ আমার সুখের জাগানীয়া। আরে বোকা মেয়ে, তুই এখনো আন্দাজ করতে পারলি না। তোর ছেলে এসেছে, আমার ফাবি…
: মা, মা- কি বললে; আমার ফাবি বাবা এসেছে? শেষ পর্যন্ত এসেছে? ওহ্! মা, আজ এই সকালে আমি কার মুখ দেখে উঠেছিলাম। উহ্! আমি, আমি ভাবতেই পারছি না। মা আমি আগামীকালই চলে আসবো, তুমি ওকে বল না কিন্তু। বেশ একটা সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে।
: সে তো বুঝলাম, তা তুই একাই আসবি- না বাচ্চাদেরও আনবি?
: না মা, আমি একাই আসবো। আমি আর ফাবি, এবারে আমাদের সাক্ষাতের মধ্যে কোন তৃতীয় মানুষ রাখতে চাই না। তুমিতো জানো মা, জন্মাবধি আমার পাশে আর কাউকে ও সহ্য করতে পারে না।
: ঠিক আছে বাপু, যা ভালো মনে করিস তাই কর।
: হ্যাঁ মা, তাহলে মনে রেখ কথাটা। খবরদার যেন ফাবি কোনভাবেই জানতে না পারে আমি আসছি।
: আরে বাবা, মনে থাকবে। তবে আমি বলি কি, কয়েকটা দিন পর আয়।
: কেন মা?
: ওকে একটু সময় দে, হয়তো নিজের থেকেই তোকে আসতে বলতে পারে।
: হু, তা ঠিক বলেছো। তবু আমি যখন আসবো ওকে সারপ্রাইজই দিবো কিন্তু।
: ওকে বাবা, তাই হবে।
আমান্ডা মনে মনে হেসেই আর বাঁচে না। মেয়েটা তার এখনো ছেলে মানুষই রয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই ওর সবাইকে সারপ্রাইজ করার সখ! সেটা আজও বজায় আছে। ওহ্! আমান্ডা এখন কোনটা রেখে যে কোনটা করবে। এখন ফাবির জন্য তার প্রিয় পিঠা বানাবে। এটা চালের গুড়া আর ময়দা মিশিয়ে মায়ান দিয়ে তারপর রুটির মত বেলে, তার মধ্যে আলু, ডিম, আর স্প্যাগেটি সিদ্ধ মিশিয়ে মধ্যে পেঁয়াজ আর ফ্রেশ গোল মরিচের গুড়ো টমেটোর (খুব বেশি পাকা না) কুচি, কিছু পার্সলি আর রেড চিলির ভাজা গুড়া মিশিয়ে রুটির মধ্যে দিয়ে বেশ টেনিস বলের মতো সাইজ করতে হবে। তারপর স্টিম করতে হবে। গরম গরম খেতে দারুন মজা। সাথে ঘরে বানানো সুইট এ্যান্ড সাওয়ার টমেটো সস তো আছেই। এটা এমনকি ফাবিয়ানের নানারও খুব প্রিয়। একবারে সে ২০/৩০টা পর্যন্ত খেতে পারতো। খুব খানেওয়ালা মানুষ ছিল। তেমনি শক্তিশালীও ছিলো। আমান্ডা মনেমনে ভাবে, সারা এলে আবারও বানাবো।
বেশ বেলা হয়েছে। সাড়ে দশটা বাজে। আমান্ডার সব রেডি। ফাবিয়ানতো ওঠে না। পিঠা বানিয়ে গরম স্টিমারের উপর রেখে দিয়েছে। সাথে আবার টমেটোর সস বাদেও অন্য আর একটা চাটনী বানিয়েছে মিনট আর বেজিলের সাথে কাঁচা টমেটোর কাঁথ, ঝাল এবং রসুন দিয়ে (এটা সারা বছরের মত বানিয়ে রাখে) মিশিয়ে বেশ ঝাল ঝাল একটা চাটনি। এটা গাঢ় সবুজ বর্ণের হবে। ফাবিয়ানের খুউব প্রিয়। নাহ্ এবারে ছেলেটাকে ওঠাতে হবে। ঘরে যেয়ে দেখে ফাবিয়ান ভুট হয়ে ঘুমিয়ে আছে। হাত, পা ছড়ানো বেশ আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। যেন কত দিন ঘুমায় না। আহারে আমার সোনার পাখিটা। ওকে ডাকতেও আমান্ডার কষ্ট হচ্ছে। তবুও অনেক বেলা হয়েছে, আর কখন সকালের খাবার খাবে? আমান্ডা ফাবির পাশে বসে ধীরে ধীরে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিল। পিঠে আদরের চাপড় মারলো। তখন ফাবিয়ান সাড়া দিল। উ! নন্না, আর একটু ঘুমাবো।
: ওঠ, বাছা আর কত ঘুমাবি? দ্যাখ বেলা কোথায় উঠেছে? একটু পরেই দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যাবে, আর সকালের নাস্তাতে তোর সব প্রিয় ডিশ বানিয়েছি। পিঠা বানিয়েছি, খাবি না? ঠাণ্ডা হলে ওগুলো আর ভালো লাগবে?
: পিঠা বানিয়েছো?
: হ্যাঁরে পাগলা, আবার খেয়ে একটু ডোরিনদের বাসায় যেতে হবে। তোর কেভিন আঙ্কেল তোকে ডাকতে এসেছিল। তুই ঘুম শুনে চলে গেছে। আজ নাকি ডোরিনের ছুটি। পার্লারে যাবে না। তাই হয়তো…
: ওহ্! তাই নাকি? আচ্ছা, তুমি খাবার ঘরে যাও, আমি এক দৌড়ে আসছি।
ফাবিয়ান ডাইনিং-এ যেয়ে দেখলো মোটামুটি পাহাড় পরিমাণ নাস্তা বানিয়ে আমান্ডা বসে আছে। ফাবি সব নাস্তা অল্প চাখলো, তারপরই পিঠার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আজ তার নানার রেকর্ড ভাঙতে হবে। উহ্! কি মজা, খেতে খেতে ওর আনন্দের চোখটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ নাওমীর মুখটা মনে হলো, আহারে নাওমী থাকলে পিঠাটা খেতে পারতো। ইস্! নাওমীকে এখনো পর্যন্ত পৌঁছানো সংবাদই দিল না। বড় ভুল হয়ে গেছে। আসবার সময় নাওমী কি দৌড়াদৌড়িই না করেছে। সত্যি বড্ড ভুল হয়ে গেছে।
: কিরে, কি ভাবছিস? পিঠা ভাল হয়নি?
: আমার খাওয়া দেখে বুঝতে পারছো না?
: হু, পারছি তো, হঠাৎ যেন একটু চিন্তিত দেখছি?
: হ্যা, নন্না একটা খুউব ভুল হয়ে গেছে। আসবার পর এখনো পর্যন্ত নাওমীকে একটা পৌঁছানো সংবাদ দেইনি। জানো তো মেয়েটা আমার জন্য কিনা করেছে। রায়ানকেও একটা ফোন দিতে হবে।
: আহারে সত্যিই বড্ড ভুল করেছিস। আচ্ছা তুই খা, আমি তোর সেল ফোনটা নিয়ে আসছি।
আমান্ডা এক দৌড়ে ফাবিয়ানের সেল ফোনট নিয়ে এলো। খেতে খেতেই ফাবিয়ান নাওমীকে রিং দিল। একটি রিং শেষ না হতেই নাওমী হ্যালো বললো। ফাবিয়ান খুব অবাক হলো। আরো অবাক হলো নাওমীর কণ্ঠস্বর খুবই ভাঙা ভাঙা এবং ভেজা কণ্ঠস্বর-
: নাওমী, আমি খুবই দুঃখিত দেরীতে ফোন দেবার জন্য। কাল রাতটা আসলে কিভাবে যে গেল বুঝতেই পারিনি। আর আজ এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলাম!
: ইটস ওকে, ফাবিয়ান। আমি বুঝতে পারছি তোমার পারিপার্শ্বিকতা। কত দিন পর নন্নাকে পেয়েছো। তাছাড়া আরো সব্বাই কে, তাই না? তারপরও যে আমাকে মনে করে ফোন দিয়েছো সে জন্য অজস্র ধন্যবাদ।
: নাওমী, তোমার কি হয়েছে? শরীর খারাপ? নিশ্চয়ই খুব ঠাণ্ডা লাগিয়েছো? গলাটা একদম ভেঙ্গে গেছে…
: বাদ দাও ওসব, আগে বল নানী কেমন আছে? আমার, হাই বলনা উনাকে প্লিজ।
: ওকে বলছি (নন্না তোমাকে নাওমী হাই বলছে- নন্না খুব মধুরভাবে হেসে মাথা নাড়লো)! আর কিছু ম্যাডাম?
: হু! বল? ডোরিনকে কেমন দেখলে? ভালো তো?
: হু! মন্দ না।
: এ আবার কেমন উত্তর! আর শোন, শুধু এনগেজমেন্টই করো না, পারলে একেবারে বিয়েটাও সেরে এসো, বুঝলে?
: হুম।
: আবার হুম, হয়েছেটা কি তোমার। তোমার তো আবার কিছু মনে থাকে না। তোমার স্যুটকেসের ডানদিকে সেভিং কিটস্ এর ব্যাগের ভেতরেই দেখবে র‌্যাপিং করা ডায়মন্ডের রিং-এর বাক্সটা আছে। আজ যখন যাবে তখন ওটা নিতে ভুলো না। বুঝলে? আর যাবার সময় ভাল করে শেভ করে, ঐ যে দেখো হালকা আকাশী রঙের ‘হুগো বস’ সার্ট- ওটা পরে যেও। আর এ্যাশ রঙের জিনসটা পরবে। বুঝলে বোকাচন্দর!
: চেষ্টা করবো, ফাবিয়ান অনেক কষ্টে দীর্ঘশ্বাস চাপলো। একটা মানুষ কোন পর্যন্ত ভালো হলে তার ভালোবাসার মানুষটাকে আর একজন নারীকে হাসতে হাসতে দিয়ে দিতে পারে!
: ওকে ফাবি, গুডলাক ফর এভরিথিং।
: ধন্যবাদ।
: আমান্ডা, অবাক হয়ে ওদের কথা শুনছিল। মেয়েটা শুধু ভালোই না। রীতিমত মহিয়সী রমণী। আমান্ডা ফাবিয়ানর জীবনের সব কিছু জানে। কারণ, ফাবি তার কাছে কিছু গোপন করে না। এমনকি সিসিলিয়ার কথাও। আর বাকিটা গতকাল রাতে ফাবিয়ান তাকে সবই বলেছে। এমনকি আসবার ঘন্টা খানেক আগে ফাবিয়ান আবিস্কর করেছে যে, নাওমী তাকে সেই প্রথম পরিচয়ের শুরু থেকেই ভালোবাসে। এ কথা শোনার পর আমান্ডা একটুও অবাক হয়নি। আমান্ডা উল্টো বলেছে ফাবিয়ানকে-
: আমি তো শুরু থেকেই এটাই সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু তোরা পুরুষরা সর্বদা উপরটা দেখিস। সব সময় হীরা ফেলে কাঁচ ধরিস। ভালোবাসার গভীরতায় তোরা যেতেই পারিস না। আর একটা নারীই ক্যাবল এরকম নির্লোভ এবং নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে।
: নন্না তাহলে সিসিলিয়ার ব্যাপারে কি বলবে?
: কিছুই বলবো না, গোবরে যেমন পদ্মফুল হয়- তেমনি গোলাপেও কাঁটা থাকে, মনে রাখিস।
এমন নাস্তা করলো যে ফাবিয়ান উঠতেই পারছে না। যাই হোক, নানীকে নিয়ে ঘরে গেল। তারপর স্যুটকেস খুলে সবার গিফট দেখালো। নানীকে নাওমী যা যা দিয়েছিল সব নানীর হাতে দিল। সে নিজেও যার যার জন্য যা কিছু কিনেছিল তাও দিল নানীকে। হার্বাল ওষুধ আর আইস বাম পেয়ে নানী খুব খুশি হলো। তারপর অন্যদের গিফটও দেখালো। নাটালি আর ডেভিডের গিফটও নানীকে দেখালো। এমনকি সারার স্বামী স্টিভেন গ্যালাটির জন্য খুব সুন্দর একটা ব্রান্ডেড ডার্ক ব্লু রঙের ব্লেজার এনেছে। এসব দেখে আমান্ডা খুব অবাক হলো মনে মনে। মুখে অবশ্য কিছু বললো না। এমনকি টনি আঙ্কেলের জন্যও একটা সার্ট এনেছে। কেভিন এবং রোডিকার জন্য পারফিউম এনেছে। সবেশেষে ডোরিনের জন্য আনা একটা দামী পারফিউম, সেটাও নানীকে দেখালো। তারপর ডায়মন্ডের রিংটা অবশেষে নানীর হাতে তুলে দিল, বললো-
: এটা তোমার কাছে রেখে দাও। যদি দরকার হয় তোমার কাছে থেকে নিয়ে নিব। যদিও আমি জানি যে আমার মন তৈরি নাই। আবার এটাও মনে হচ্ছে যে, সম্ভবত এ আংটিটার দরকারও হবে না।
: তাহলে কিনেছিস কেন?
: আমিতো কিনিনি নন্না। ঐ বোকা এবং মহৎ মেয়েটা যার মাথায় ক্যাবলই মহান হবার ভুত চেপেছে। ঐ নাওমীই কিনেছে।
: সত্যি! আশ্চর্য! আমার জানিস নাওমীকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে! এত্ত মহৎও কোন মানুষ হয়?
: ঠিকই বলেছো। আমি নিজেও আজ ২ দিন ধরে ক্যাবোলই এটাই ভেবে চলেছি।
: ফাবি, তোর হাত ব্যাগটাতো খুললি না? ওটার মধ্যে কিরে? বলতে বলতে আমান্ডা নিজেই ব্যাগটার চেইন খুলে ফেললো। দেখলো, ২/৩টা পুরনো সার্ট ফাবির আর একটা রূপালী রঙের র‌্যাপিং পেপারে মোড়া একটা বাক্স।
: নন্না, না, না- ওটা খুলো না প্লিজ।
: ওকে বাবা, খুলছি না- বলে আমান্ডা মুচকি হাসলো। ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে ওর ভেতরে কি আছে? অবশ্যই সারার জন্য কিছু এনেছে। কিন্তু মায়ের ব্যাপারে সকলের সামনে এতটাই নেগেটিভ মাইন্ডেড থাকে যে, তার অসম্ভব এবং চাপা দেওয়া ভালোবাসাকে ও ক্যাবোলই লুকিয়ে রাখে। কিন্তু আমান্ডা তো শুধু ওর নানীই না, ওর বন্ধুও বটে! তাই আমান্ডা হাসি চেপে বলে-
: তা হ্যাঁরে, এসব শপিং করলো কে? তুইতো আবার শপিং করবার মানুষ না।
: হ্যাঁ নন্না, ঠিকই বলেছো। যা কিছু দেখছো এর সবই আমি আর নাওমী কিনেছি। অবশ্য তোমার জন্য মালিশ করবার মলম তোমার পায়ের ব্যাথার জন্য ইলেক্ট্রিক প্যাড সব ও কিনেছে।
: নাহ্! মেয়েটাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
: হু! তাতো দেখবেই। তুমি তো খুব শিঘ্রিই যাবে, তাই না?
: ক্যানো বাপু, এই বুড়িটাকে টানাটানি করছিস? তোর নানার ভিটেতেই আমাকে মরতে দে।
সাথে সাথে ফাবিয়ান ঝাঁপিয়ে পড়ে নানীর মুখ চেপে ধরে। এবং নানীর কোমর জড়িয়ে ধরে কোলের মধ্যে মুখ লুকায়-
: আচ্ছা পাগল ছেলে তো! আরে বাপু, বুড়ো হয়েছি, মরতে তো একদিন হবেই। আমান্ডা ফাবির পিঠের উপর আদরের চাপড় মারতে মারতে বললো-
: না, তুমি কখনো এই কথাটা বলবে না। যদি বলো আমার মরা মুখ দেখবে।
: বালাই ষাট, ওকি কথা? আমার সাথে তোর কি তুলনা। আচ্ছা রূপালী র‌্যাপ করা প্যাকেটের জিনিসগুলো কে কিনেছে রে? সেটাতো বলবি?
: উ… উ… সব গিফটই নাওমী আর আমি মিলেই কিনেছি। শুধু তোমার গুলো ও একাই কিনেছে।
: ও বাব্বা, কত কি?
ফাবিয়ান ঐ প্রসঙ্গ ঘুরাবার জন্য তাড়াতাড়ি কিছু গিফট হাতে নিয়ে (রোডিকা আন্টিদের) বাসায় যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। তারপর নানীকে বললো-
: ওকে নন্না, আমি তাহলে ও বাড়ি থেকে ঘুরে আসছি। আর বিকালে রায়ানদের বাড়ি যাবো ওদের গিফট দিতে।
: তা দুপুরের খাবার কি ও বাড়ি থেকে খেয়ে আসবি?
: বুঝতে পারছি না। পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। (চলবে)

রীনা গুলশান

রীনা গুলশান, টরন্টো
gulshanararina@gmail.com
(লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *