সনাতন শাস্ত্রীয় ‘উপবাস’ ও কিছু কথা!

শৈলেন কুমার দাশ

ইদানিংকালে অনেক নব্য পন্ডিতজনেরা উপবাস শব্দের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন! আসলে এই শব্দের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তির কোন স্থান নেই! তাহলে দেখা যাক উপবাস শব্দটির অর্থ কি? উপবাস একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে উপ অর্থাৎ নৈকট্য বা নিকটে, কাছে বা সান্নিধ্যে, বাস অর্থাৎ অবস্থান। অর্থাৎ উপবাস শব্দটির অর্থ হচ্ছে নিকটে অবস্থান। আবার উপবাস বা উপোস অর্থ হচ্ছে অনাহার বা অন্নজল গ্ৰহণ থেকে বিরত থাকা। তাহলে দেখা যায় উপবাস শব্দটির দু’টি অর্থ রয়েছে। থাকতেই পারে। একাধিক অর্থ বিশিষ্ট শব্দের অর্থ নির্ভর করে কোন বাক্যে শব্দটি ব্যবহারের উপর। বাংলা একটি অতি সমৃদ্ধ ভাষা যা অতি সমৃদ্ধ সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তি। যাকে ‘দেবভাষা’ বা ‘পবিত্র ভাষা’ বলা হয়। তাই সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্য্যের বিচারে এই সংস্কৃত ভাষা অনন্য। এই ভাষায় একটি শব্দের এত সদর্থক শব্দ বা নঞর্থক শব্দ রয়েছে যা আন্য কোন ভাষায় সত্যি বিরল। ভাষার উপস্থাপন শৈলী, সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্য্য এই সদর্থক ও নঞর্থক শব্দমালার উপর নির্ভর করে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে একটি সমৃদ্ধ ভাষা তথা সংস্কৃত থেকে জন্ম নেয়া বাংলা ভাষাও একটি সমৃদ্ধ ভাষা। পৃথিবীতে সত্যি এমন সমৃদ্ধ ভাষা কমই আছে! তাছাড়া একই শব্দ ভিন্ন বাক্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। অর্থাৎ, আজ খুব শুভ দিন (দিবস)। আবার, আমাকে দশটি টাকা দিন (দেয়া)। একই শব্দকে আমরা দু’টি বাক্যে দু’টি অর্থে গ্ৰহণ করেছি। তেমনিভাবে উপবাস (আনাহার), বলি (নিবেদন বা নৈবিদ্য), লিঙ্গ (প্রতীক), বেশ্যা (বৈশ্যা, তন্ত্রে অভিষিক্তা রমনী), এসব শব্দকে তাদের ব্যবহার বিধির উপর নির্ভর করে সঠিক অর্থে গ্ৰহণ করতে হয়। এর জন্য জ্ঞানের সাধনা প্রয়োজন। বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জানা প্রয়োজন। না জেনে বা আংশিক জেনে তথ্য প্রচার মহাসংকটের কারণ বা মানুষের মনে কষ্টের কারণ হয়। আর মানুষের মনে কষ্ট দেয়াই পাপ বা অধর্ম। সনাতন ধর্ম তাই বলে। সুতরাং না জেনে বিভ্রান্তি প্রচার থেকে বিরত থাকুন।

মানব কল্যাণের জন্য বা পৃথিবীর কল্যাণের জন্য, মানব জীবনকে জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, বিজ্ঞানে ও পরিবর্তনের ধারায় সাধনা ও আরাধনার মাধ্যমে সুসজ্জিত করার সংস্কারের নামই সনাতন ধর্ম। শুধুমাত্র এই শাস্ত্রের উপবাসের বিধানটির কথা উল্লেখ করলেই বুঝা যাবে এই ধর্ম কতটা মানব জীবন সংশ্লিষ্ট ও বিজ্ঞান নির্ভর। এই সংস্কারে প্রতি মাসের একাদশী তিথিতে (মাসের একাদশতম দিন) উপবাসের বিধান এবং মাসের শেষ দিনে একটি করে পূজার আয়োজন ও উপবাসের বিধান রাখা হয়েছে। তাছাড়াও বিভিন্ন পূজা, পার্বণ যেমন, দুর্গাপূজা, লক্ষীপূজা, স্বরস্বতীপূজা, কালিপূজা, শ্রীরাম নবমী, শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী, শিব চতুর্দশী ইত্যাদিতে উপবাসের বিধান রাখা হয়েছে। আবার এসব পূজার পূর্বের দিন খাবারে সংযম অথাৎ পরিমিত পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের সব্জী, ডাল, বীজ সমৃদ্ধ খাবার, ফলার, দুধ, মাখন, ঘি অর্থাৎ নিরামিষ খবারের আয়োজন করা হয়। এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে এসব খাবার গ্ৰহণের মাধ্যমে একদিকে মানব শরীরের বিভিন্ন ধরনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা। অন্যদিকে খাবারে সংযম পালনের অর্থ হচ্ছে এর মাধ্যমে মন ও শরীরকে শান্ত ও পরিশুদ্ধ করারও এটি একটি প্রক্রিয়া।

হিসাব করলে দেখা যায় প্রতিমাসে ৫-৭ দিন উপবাস করার বিধান রয়েছে সনাতন শাস্ত্রে। কারণ সুপন্ডিত মহাত্মা প্রাচীন আর্য ঋষিরা জানতেন প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে উপবাস করা মানব শরীরের জন্য খুবই উপকারী। যা মানব শরীরের পুনঃসৃজন তথা মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে। কারণ উপবাস করলে মানুষের শরীরের বর্জ্য বা খারাপ কোষের মৃত্যু ঘটে। ফলে মানব দেহের রোগ মুক্তি হয় এবং শরীরের কোষ শক্তিশালী হয়। মানব শরীরের কোষ দীর্ঘ স্থায়ী হওয়া মানে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি হওয়া। এটি অনেকটা গাড়ির ইঞ্জিনের মত। মধ্যে মধ্যে গাড়ির ইঞ্জিনকে বিশ্রাম দিলে যেমন গাড়ির ইঞ্জিন দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করে তেমনিভাবে মানুষের স্টমাক মধ্যে মধ্যে বিশ্রাম পেলে পুনঃসৃজন হয় এবং এর আয়ুষ্কাল বেড়ে যায়। অর্থাৎ মানুষের আয়ু বেড়ে যায়। প্রাচীন প্রাজ্ঞ ঋষিরা এসব জ্ঞানে সুপন্ডিত ছিলেন। ঋষিরা উপবাসকে শরীর ও মনকে পবিত্র করার একটি উপায় হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁরা জানতেন এটি শারীরিক বর্জ্য দূর করে কোষের পুনঃসৃজনে সহায়তা করে এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা ও মনে প্রশান্তি আনয়ন করে। উপবাসের মাধ্যমে আর্য ঋষিরা কামনা-বাসনা ও ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেন। এটি দিব্য মানসিক প্রশান্তি এবং গভীর মনসংযোগ বা নিবিষ্ট একাগ্রতা অর্জনে সহায়ক। তাই আর্য ঋষিরা প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে ৫-৭ দিন মানুষকে উপবাস থাকার জন্য বিষয়টিকে পূজা, অর্চনার সাথে যুক্ত করেন। মানুষের কাছে দ্রুত এই অতি প্রয়োজনীয় জ্ঞান পৌঁছানোর জন্য। তা থেকেই বুঝা যায় আর্য ঋষিরা কতটা জীবন, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সুপন্ডিত ছিলেন!

জাপানি কোষ জীববিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহসুমিকে ২০১৬ সালে শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়েছিল অটোফ্যাজির প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছিলেন এই প্রক্রিয়াটি হল মানব শরীরের একটি কোষীয় পুনর্ব্যবহার বা পুনঃসৃজনের প্রক্রিয়া যা উপবাসের সময় সক্রিয় হয়। এটি নতুন কোন জ্ঞান বা আবিষ্কার নয়। লক্ষ লক্ষ বছর আগে থেকেই মহাত্মা আর্য ঋষিরা এসব জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। প্রাচীন আর্য চিকিৎসা বিজ্ঞান কতটা উন্নত ফিজিওলজি ও অ্যানাটমি জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিল আর্য চিকিৎসা শাস্ত্র যজুবেদ (Yajurveda) তার প্রমাণ। ইয়োশিনোরি তাঁর গবেষণা, যা মানব শরীরের ইস্টের (yeast) অটোফ্যাজির জিন এবং প্রক্রিয়াগুলি সনাক্ত করে, কোষগুলি কীভাবে স্বাস্থ্য বজায় রাখে এবং রোগে এই প্রক্রিয়াটি কেন গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছে। অটোফ্যাজি, বা “স্ব-খাওয়া” হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোষগুলি তাদের নিজস্ব উপাদানগুলিকে ক্ষয় করে এবং পুনর্ব্যবহার করে। উপবাস এই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান সক্রিয়কারী, যা ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর অংশগুলি অপসারণ করে শরীরের কোষীয় হোমিওস্ট্যাসিস বজায় রাখতে সাহায্য করে। মানব শরীরের ইস্ট হল এক ধরনের এককোষী ছত্রাক, যা উপকারী এবং ক্ষতিকর উভয়ই হতে পারে। কিছু ইস্ট (যেমন, Candida albicans) স্বাভাবিকভাবে শরীরে বাস করে এবং হজমে সাহায্য করে। আবার কিছু ইস্ট (যেমন, Candida auris) সংক্রমণ ঘটাতে পারে। যা বিশেষতঃ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। জাপানী এই বিজ্ঞানী মূলতঃ মহাত্মা আর্য ঋষিদের দেখানো পথে জ্ঞান আহরণ করে উপবাসের শরীরবিদ্যা সংক্রান্ত ইতিবাচক দিক তুলে ধরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু মহাত্মা আর্য ঋষিরা এ বিষয়ে দিব্য চিন্তায় আরও অনেক অনেক অগ্ৰগামী ছিলেন। তাঁরা জানতেন উপবাস, যেমনিভাবে শারীরিক বর্জ্য দূর করে কোষের পুনঃসৃজন করে তেমনিভাবে আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা ও প্রশান্তি আনয়নে সহায়তা করে। উপবাসকে মহাপন্ডিত আর্য ঋষিরা একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসেবে বিবেচনা করতেন যা ব্যক্তিকে তার সুশীল আত্মিক উন্নতি এবং আত্ম-উপলব্ধির পথে নিয়ে যায়। উপবাস শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনে এবং মনকে শান্ত করে। এটি মনের শক্তিকে দিব্য দর্শনের শক্তিতে রূপান্তিত করে। যা পরম শক্তির সাথে সংযোগ সাধনে সমর্থ করে তোলে।

পূজা হচ্ছে ঈশ্বর বা স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পনের একটা উপাসনা পদ্ধতি। উপবাসের মাধ্যমে পন্ডিত ঋষিরা এমন একটি মানসিক অবস্থা অর্জন করতে সমর্থ  হতেন যেখানে তাঁরা পূজার মাধ্যমে দেবতার সাথে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারতেন। এটি তাঁদের নিজেদের এবং দেবতার মধ্যে একটি “দিব্য দর্শন” (দেখা ও দেখার মাধ্যমে সংযোগ) তৈরি করতে সাহায্য করত। বেদের মত দিব্য জ্ঞান আর্য ঋষিরা এভাবেই প্রাপ্ত হন। যা মানব কল্যাণে অনন্য ভূমিকা পালন করে।

আবার কিছু লোক বলে আমি পূজা করি না বা এসবের কাছেও যাই না! এসব মূর্খামি করে নিজেকে সেকুলার প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু সেকুলারিজম তো কথার বিষয় নয়। এটি অর্জনের বিষয়। যা জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শান্ত, স্নিগ্ধ, পূণ্যময় ও সুন্দর চিত্তের মাধ্যমে অর্জিত হয়। আর পূজা হচ্ছে সেই সুন্দর, জ্ঞান, প্রীতি, সৃজন ও মিলনের সাধনা যা আরতী, আরাধনায়, সংগীতে, সুরে, মঙ্গল প্রদীপের জ্যোতিমর্ময় আলোকের দেদীপ্যমান শিখায় মানুষের মনে আলোকিত, শান্ত, সুধীর, পূণ্যময় এক মানুষ জন্ম দেয়। যে সমাজ, সংস্কৃতি ও সংস্কার, অন্তরীক্ষ, আকাশ, বায়ু, জল, প্রকৃতি সবার সাথে মিথস্ক্রিয়ার বন্ধন অনুভব করে অন্তরের গভীর মমতায়। সে শুধু মানুষকে নয়; সমস্ত জীবকেই ‘শিব’ তথা সৃষ্টির মঙ্গলের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করে তাই হল সনাতন সংস্কার। সেকুলারিজমের চেয়েও উৎকৃষ্ট মানবিক ও ধরিত্রী কল্যাণের শিক্ষা তো এই সংস্কারের অন্তরেই প্রোথিত। মহাত্মা আর্য ঋষি, মুনিদের হাত ধরেই তো এই জ্ঞান সনাতন সংস্কারের সাথে পথ চলেছে সৃষ্টির আদিকাল থেকে। যা অপুরুষজাত শাস্ত্র ‘বেদ’ সেই জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত। মানব কল্যাণের জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের ধারায় এই বেদের জ্ঞান চির উজ্জ্বল। সুতরাং পূজা, পার্বণের সংস্কারের মধ্যে দিয়ে মানুষ সুন্দর, পরিমার্জিত, সুস্হির চিত্তের অনুপম মানবিক জ্ঞানের আলোকে আলোকিত মানুষ হয়ে উঠে। সেজন্যই তো তপোবনে মহাত্মা আর্য ঋষিদের সাধনা, যজ্ঞ ও গবেষণার মূল বিষয়ই ছিল জগত কল্যাণ। সুতরাং পূজার মাধ্যমেই জগত কল্যাণের ভাবনার আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা।

শৈলেন কুমার দাশ

লেখক, কলামিস্ট

ক্যালগেরি, কানাডা।

১৯.১০.২০২৫।