সুফিবাদ ও বাংলাদেশ
অধ্যাপক ড. মো. গোলাম দস্তগীর
পর্ব – ৬
ঐতিহাসিক বরইতলা
‘ছিদরাতুল মুনতাহা’ বা বরইতলা হযরত এনায়েতপুরীর স্মৃতি বিজড়িত এক ঐতিহাসিক স্থান। এই বরই বৃক্ষের নীচে বসেই তিনি দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুরিদ মুসাফিরদের সহিত কথা বলেছেন। তাঁর দর্শনে ও উপদেশ শ্রবণে ভক্তরা অনুভব করতেন অতীন্দ্রিয়লোকের এক স্বর্গীয় অনুভূতি। হযরত এনায়েতপুরীর মুখাবয়বে সব সময় ছড়িয়ে থাকতো এক অনাবিল শান্তির স্নিগ্ধ সুষমা। সর্বসাধারণের নিকট তিনি ছিলেন প্রেমের প্রতীক। জাতি, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল এনায়েতপুরীর ভালবাসার দ্বার। কত দূরদেশী, ভীনদেশী আত্মীয়, অনাত্মীয় এনায়েতপুরীর অপার্থিব সান্নিধ্যের দুর্বার আকর্ষণ উপেক্ষা করতে না পেরে পার্থিব বন্ধন ছিন্ন করে চিরদিনের জন্য হয়েছেন তাঁর ছায়াসঙ্গী। যদিও এনায়েতপুরীর সাথে তাঁদের ছিল না কোন রক্ত-মাংস বা আত্মীয়তার সম্পর্ক।
অজস্র অলৌকিক ঘটনা বিজড়িত এনায়েতপুরীর প্রতিটি মুহূর্ত ছিল কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে স্নাত। তাঁর আধ্যাত্মিক রচনাবলীর ছত্রে ছত্রে বিধৃত আছে আল্লাহ রাসূলের প্রেম-প্রভার তীব্র তীক্ষè অগ্নি স্ফুলিঙ্গ। এই শ্লোকগুলি আধ্যাত্মিক সাধনার পথের পাথেয়, মারেফতের নেয়ামতে ভরা অলৌকিক ভান্ডারের রত্ন।
‘‘অল্পাহার, অল্পনিদ্রা, ক্বাল্বি-যিক্র, নবী প্রেম” এনায়েতপুরীর শিক্ষা ও দর্শনের মূলধারা। এনায়েতপুরীর বরইতলার ছোট্ট টিনের হুজরা ঘরটি এনায়েতপুরীর সাধনা জীবনের অজস্র এবাদতমুখর বিনিদ্র রজনীর নীরব সাক্ষী। এখানে বসেই তিনি তাঁর অগণিত যাকের-মুরিদদের মহান আল্লাহপাকের নিকট সঁপে ঐতিহাসিক বিদায় ভাষণ দিয়েছিলেন জীবনের শেষ লগ্নে। বাংলা ১৩৫৮ সনের ১৮ ফাল্গুন (১৩৭১ হিজরীর ৫ই জমাদিউসসানী, ২রা মার্চ ১৯৫২ ইং) রোজ রবিবার বেলা ১২:১৫ মিনিটে বাঙলা-আসামের লক্ষ লক্ষ মুরিদকে শোক সাগরে ভাসিয়ে খাজা এনায়েতপুরী দারুল বাকায় তশরীফ রাখেন।

বিশ্ব মুসলিমের প্রতি খাজা এনায়েতপুরীর উদাত্ত আহবান
গত শতকের প্রথমার্ধে এনায়েতপুরের এই শতাব্দী প্রাচীন বরই বৃক্ষের নীচের হুজরা ঘরটি থেকে সারা বিশ্বের মানুষের প্রতি রেখেছিলেন ঐতিহাসিক উদাত্ত আহবান। তিনি সকলকে ভ্রান্ত ধারণা পরিত্যাগ করে মহান ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে, কল্যাণময় অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে আহবান জানান। তাঁর তাওয়াজ্জুভরা এই ঐশী আহবানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত্ব হতে থাকে হৃদয় থেকে হৃদয়ে, মাঠ-ঘাট, পথে প্রান্তরে, তার ধাক্কা গিয়ে লাগে সুদূর ভূটানের গিরি শৃঙ্গে। মানুষ পঙ্গপালের মত ছুটে আসে তাঁর দরবারে, প্রচার হয় তাঁর বাণী দিক থেকে দিগন্তে। তিনি প্রতিটি মুসলমান নরনারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
“হে তামাম দুনিয়ার মোমেন মুসলমানগণ, যদি আপনারা খোদার গজব হইতে বাঁচিতে চান তাহা হইলে শেষ রাতের সুখের বিছানা ছাড়ুন আর আল্লাহ পাককে এই নাম ধরে ডাকুন, ‘ইয়া আল্লাহ, ইয়া রাহমানু, ইয়া রাহিম’। তবেই আপনারা খোদার গজব হইতে বাঁচিবেন, তবেই তামাম দুনিয়া আল্লাহর রহমতে ভরিয়া যাইবে, তবেই তামাম দুনিয়ার শান্তি। কোনই সন্দেই নাই।”
বাংলাদেশে হযরত এনায়েতপুরীকে ১৪০০ হিজরী শতকের মহান মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) বলা যায়। তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন মুসলমানের চরম দূর্দিনে। তখন পৃথিবীতে চলছিল প্রলয়ংকারী অর্থহীন ধ্বংসযজ্ঞের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভয়াবহ মন্বান্তর (দুর্ভিক্ষ) ও পৃথিবীর বুকে ঘটেছিল নাস্তিকতাবাদের অভ্যুত্থান। ঠিক এমনই এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘোরতর দূর্দিনে এতদঞ্চলের দিশেহারা মানুষের মাঝে উপস্থিত হয়েছিলেন খাজা এনায়েতপুরী (র.) মহান আল্লাহর রহমত ভরা আর্শীবাদ নিয়ে। তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে সকল মুসলমানকে আশ্বস্ত করে দিয়েছিলেন তাঁদের হারানো সালতানাত ফিরে পাওয়ার ঐতিহাসিক সু-সংবাদ।
এনায়েতপুরীর জীবনের অলৌকিক অধ্যায়
চাঁদের জ্যোৎস্না, ফুলের সুরভী, মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রভৃতি যেমন আল্লাহ প্রদত্ত তেমনি আল্লাহর অলীদের জীবন ঘিরে রয়েছে বিস্ময়কর সব ঘটনা। যার কোনই জাগতিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। হযরত এনায়েতপুরীর জীবনে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে যা সাধারণ বুদ্ধির ব্যাখ্যার অতীত। যদিও এনায়েতপুরীর কেরামতি মূখ্য না হয়ে এনায়েতপুরীই মূখ্য হয়ে আছেন ভক্তের হৃদয় সাম্রাজ্যে। একটি অলৌকিক ঘটনার বিবরণ এখানে সন্নিবেশিত করা হলো।
একদা দূরদেশী দুইজন ছাত্র নিজেদের মধ্যে একান্তেই বলাবলি করছিল, “আমরা এত বড়পীরের মুরিদ হয়েছি। অথচ আজ অবধি তাঁর কোনই কেরামতি দেখতে পেলাম না।” এমন সময় এনায়েতপুরী নামাজের জন্য বাইরে এসে তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা বাবা কতদিন থেকে মুরিদ হয়েছো?” তারা বলল, “হুজুর আমরা প্রায় দুই মাস হয় আপনার মুরিদ হয়েছি।”
– “তখন কি তোমরা ক্বলব্রে ভিতর যিক্র বুঝতে?” হুজুর জিঙ্গাসা করলেন।
– না।
– এখন বুঝতে পার?
– হুজুর, পারি।
– “তা হলে এর চেয়ে বড় কেরামতি আর কি দেখতে চাও?” হুজুরের উত্তর।
‘কেরামতি অন্বেষণ করা বোকামি। আল্লাহর অন্বেষণ কর বুদ্ধিমানের কাজ।’
ছাত্রদ্বয় এতে হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ, তাঁদের এই গোপন কথা অন্য কেউ শোনে নি এবং তাঁদের অজান্তে কখন তাঁদের অন্তরে আল্লাহর যিক্র শুরু হয়েছে এটাও তাঁরা বুঝতে পারে নি। এনায়েতপুরীর তাওয়াজ্জে মানুষ আজও অন্তরে আল্লাহর যিক্র করার এক অপার্থিব শক্তি অর্জন করছে। এটা সমুদয় পৃথিবীর যাবতীয় নেয়ামতের চেয়েও শ্রেষ্ট প্রাপ্তি।
মানুষ মরণশীল। তাই কেউ আধ্যাত্মিক প্রয়োজনের উর্দ্ধে নয়। কুরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ভয় কর যেমন ভয় করা উচিৎ। আর পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না।’ তাই এনায়েতপুরী (র.) প্রত্যেক মুসলমান নরনারীকে সতর্কতার সঙ্গে বলেছেন,
‘আপনারা আল্লাহর যিকরে ক্বল্ব তাজা করিয়া তবেই কবরে যান। তা হলে অনন্তের অনন্তকাল ধরে আপনাদের উপর আল্লাহর রহমতের বারি বরিষণ হইতে থাকিবে।’
অতএব এ্টা সহজেই অনুমেয় যে, কামেল মোকাম্মেল পীরের মুরিদ হয়ে অন্তরের তাছফিয়া (শুদ্ধিকরণ) লাভ করা মানব জীবনের জন্য একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়।
বাংলাদেশে মুজাদ্দেদিয়া তরিকা ও খাজা এনায়েতপুরী
পীর-আউলিয়ার দেশ বাংলাদেশ। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে বহু পীর, দরবেশ, আউলিয়া এসে বসবাস করতে থাকেন সেই সুদূর অতিত থেকে এবং এটাকে তাঁরা তাঁদের স্থায়ী বাসভূমিরূপে গ্রহণ করেন। এ দেশে যাঁরা ইসলাম প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছেন তাঁরা ছিলেন হাক্কানী আলেম, আধ্যাত্মিক সাধক, পীর, ফকির, সুফি, দরবেশ। কারণ, ইসলাম ধর্ম থেকে জন্ম নিয়েছে সুফিসাধনা। তাঁদের একনিষ্ঠ সাধনা, ত্যাগ তিতিক্ষার ফলেই আজ এদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯০% মুসলমান। কালের বিবর্তনে সময়ের ব্যবধানে এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শোষন নির্যাতন, নিপীড়ন, বঞ্চনা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, শিরক, বিদআত এমনভাবে বাসা বেঁধে ফেলেছিল যে, মুসলমানগণ অত্যন্ত হীনবল ও আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়ে। এমন কি অনেকাংশে ইসলামের মূূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়। এহেন অবস্থায় মুসলিম সমাজকে সচেতন করে তোলার জন্য এবং ইসলামের মূল শিক্ষাকে অক্ষুন্ন রাখার মানসে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এগিয়ে আসেন সচেতন উলামায়ে কেরাম, পীর, মাশায়েখ ও সুফিসাধকগণ। তাঁদের মধ্যে ছিল নিরহংকার স্বভাব, সাম্য, শান্তি, উদারতা ও মানবিকতর মূর্ত রূপ। ফলে অতি সহজেই তাঁরা মানুষকে আপন করে কাছে টানতে পেরেছিলেন। ইসলামের সাম্য ও ন্যায়ের আদর্শে এবং সুফি দরবেশদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় আপ্লুত হয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও স্বেচ্ছায় ব্যাপকভাবে স্ব-ধর্ম হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা ও সমাজ সচেতনতায় উজ্জীবিত করে তোলেন। এমনই একজন মহান ব্যক্তিত্ব, মহামনীষী ও সুফিসাধক হলেন হযরত খাজা এনায়েতপুরী (র.)।
তাঁর পিতা হযরত মাওলানা শাহ আবদুল করিম (র.) এবং মাতা তাহমিনা বেগম (র.) উভয়ই কামেল অলী ছিলেন। তিনি ভারতের কোলকাতার মহাতাপস শাহসুফি সৈয়দ ওয়াজেদ আলীর (র.) মুরিদ হয়ে তাঁর আস্থানায় দীর্ঘ ১২ বছর কঠোর সাধনা করে খিলাফত প্রাপ্ত হন এবং তাঁর নির্দেশেই ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। এখানে মুজাদ্দেদিয়া তরিকার উৎপত্তি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে বাংলাদেশ মুজাদ্দেদিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে খাজা এনায়েতপুরী (র.) এর অবদান আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশে সুফি তরিকার বিকাশ
ইসলামি শরিয়াতের চার উৎস হলো কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস। এই চারটির মধ্যে কুরআন ও হাদিসের নির্দেশসমূহের ক্ষেত্রে কোন রকম বিতর্কের সুযোগ না থাকলেও ইজমা ও কিয়াসের ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আর এ থেকেই বিভিন্ন তরিকার সূত্রপাত হয়েছে। আসলে ইসলাম প্রচারকারী সুফি সাধকের শিক্ষাকে কেন্দ্র করে নতুন তরিকার উদ্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে আসলে সুফি তরিকার সংখ্যা কত এ নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ বা বির্তক রয়েছে। কারো কারো মতে প্রায় চারশত (৪০০)।
সুফি তরিকা বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে টিকে আছে। ফকির আব্দুর রশিদ সুফি দর্শন গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ইসলামি সুফিদর্শনে চার পীর বা চার তরিকার ও চৌদ্দ খান্দান প্রসিদ্ধ। চার পীর হচ্ছেন চিশতিয়া তরিকার পীর ও ইমাম হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (র.), কাদেরিয়া তরিকার পীর ও ইমাম হযরত শেখ আবদুল কাদের জিলানী (র.), নকশবন্দিয়া তরিকার পীর ও ইমাম হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (র.) এবং মুজাদ্দেদিয়া তরিকার পীর ও ইমাম হযরত আহমদ সিরহিন্দ মুজাদ্দিদ-ই আলফে-সানী (র.)। আর চৌদ্দ খান্দান হলো চিশতিয়া তরিকার ৫টি শাখা ও কাদেরিয়া তরিকার ৯টি শাখা। তবে এ প্রসঙ্গে খাজা ছায়েফ উদ্দিনের একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি তাঁর আদর্শ মুর্শিদ গ্রন্থে বলেন, ‘যে আউলিয়া যে তরিকা প্রচার করেছেন তাঁর নামানুসরে সেই তরিকার নামকরণ হয়েছ্।ে আউলিয়াকুল শিরমনি হযরত আবদুল কাদের জিলানীর (রাঃ) কর্তৃক যে তরিকা প্রচারিত হয়েছে তাঁর পবিত্র নামানুসরে ঐ তরিকা কাদেরিয়া তরিকা নামে অভিহিত হয়েছে। অলিয়ে হিন্দি হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.) কর্তৃক যে তরিকা প্রচারিত হয়েছে তাঁরই মোবারক নামানুসারে ঐ তরিকার নাম চিশতিয়া তরিকা হয়েছে। এভাবে সুলতানুল আরেফীন হযরত শেখ আহমদ সিরহিন্দি মুজাদ্দেদ আলফে-সানী (র.) কর্তৃক যে তরিকা প্রচারিত হয়েছে ঐ তরিকার নামানুসরে মুজাদ্দেদিয়া তরিকা নামে প্রকাশিত হয়েছে।’
একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেক তরিকার সিলসেলাই হযরত নবী করিম (সা.) হতে শুরু হয়েছে এবং পীর পরম্পরার দ্বারা বর্তমান যুগ পর্যন্ত চলে এসেছে। বিভিন্ন উৎস থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে বিকশিত যেসব তরিকার নাম অবগত হওয়া সম্ভব হয়েছে নিুে সেগুলোর একট সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ
১. কদরখানী তরিকা
বাংলাদেশ দেবগাঁও, মোহিসুন, দেওতলা, নারকোটি ও সোনারগাঁওয়ে বসবাসকারী মুসলমানদের মধ্যে এই তরিকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কদরখানী তরিকার প্রচারক হযরত শায়খ শারফুদ্দীন তাওয়ামা (র.) সোনারগাঁওয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত আছেন। তাঁর প্রধান মুরিদ হযরত শায়খ শারফুদ্দীন মানেরী (র.) হযরত বদর আলম এবং বরদ আলম জাহেদী। তবে কেউ আবার কদরখানী তরিকাকে কাদেরিয়া তরিকার বিকৃতরূপ বলে অভিহিত করেছেন।
২. কাদেরিয়া তরিকা
বড়পীর হযরত শায়েখ সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (র.) এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি এই তরিকার শ্রেষ্ট ইমাম ও কুতুব। তাঁকে গাউসুল আজম মাহবুবে ছোবহানী, মুহিউদ্দিন প্রভৃতি বিভিন্ন নামে ভূষিত করা হয়। তিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (র.) এবং বংশধর। তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ, মানতিক, তাসাউফ ও বিভিন্ন মাযহাব সংক্রান্ত দ্বীনের খুটিনাটি বিষয়ে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল গুনিয়া লি তালিবি তারীক আল হাক্ক। এ গ্রন্থেই তাঁর বক্তৃতা, উপদেশ, প্রার্থণা এবং রচনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ গ্রন্থে এমন কিছু নেই যা চরম গোঁড়াপন্থীরও শ্রদ্ধা লাভ করে নাই। এতে যে ধর্মীয় অনুশীলনের বিষয়ে অনুমোদিত হয়েছে তা যে কোনরূপ আপত্তির উর্ধ্বে। তাঁর সত্যবাদিতা, অসাধারণ চরিত্রবল, পবিত্রতা ও অগাধ পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে শত শত ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এই তরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রসার লাভ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আরব, তুরস্ক, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকার বহু মুসলিম দেশে এই তরিকা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
৩. চিশতিয়া তরিকা
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী আজমীরী (র.) চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পাক-ভারত উপমহাদেশে তরিকতের ইমাম ছিলেন। তাঁর থেকেই পাক-ভারতে ইলমে মারফতের সূচনা হয়। তাঁর থেকেই পাক-ভারতে চিশতিয়া সিলসিলার প্রচলন হয়। তাঁর কামালাত সাগরের ন্যায় বিশাল। কথিত আছে যে, তিনি যার দিকে দৃষ্টি দিতেন সেই ইলমে মারেফতে বিশেষজ্ঞ হয়ে যেত। জাহিরী ও বাতেনী উভয় ইলমেই তিনি পরিপূর্ণতা লাভ করেছিলেন। তবে এই তরিকার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেহ কেহ মনে করেন হযরত আলীর নবম বংশধর হযরত আবু ইসহাক শামী চিশতী (র.) এই তরিকার প্রবর্তক। আবার অনেকে মনে করেন খাজা আবু আহমদ (র.) এই তরিকার প্রবর্তন করেন। আবার কেহ কেহ বান্দা নওয়াজকে এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন। বাংলাদেশে এই তরিকার দুটি প্রধান উপশাখা প্রচলিত রয়েছে। একটি হল হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া (র.) এর নামানুসরে নিজামিয়া তরিকা আর অন্যটি হলো হযরত আহমদ সাবের কালিবী (র.) এর নামানুসারে সাবেরিয়া তরিকা।
৪. কলন্দরিয়া তরিকা
ভ্রাম্যমান ফকিরদিগকে সাধারণত কলন্দর নামে অভিহিত করা হয়। ইহার আদি প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আব্দুল আজিজ মক্কি নামক জনৈক দরবেশের নাম উল্লেখ করা হয়। এই দরবেশই প্রথম নিজেকে কলন্দর নামে পরিচয় দেন। তবে অনেকে আবার পানিপথের বিখ্যাত আওলিয়া হযরত শরফুদ্দিন বু-আলী কলন্দরকে কলন্দরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম বলে মনে করেন। এই তরিকার অনুসারীদের নির্দিষ্ট কোন স্থান ও নির্দিষ্ট কোন নিয়ম-নীতি ছিল না। এ তরিকার মূল বিষয় হলো তারা ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত ছাড়া আর কোন ইবাদাত বন্দেগীর পক্ষপাতী নয়। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে উত্তর ভারতীয় কলন্দর নামধারী দরবেশগণ দলে দলে ইসলাম প্রচারের জন্য আসেন এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে তা সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প বিস্তর এখনো এদেশে এ তরিকার প্রভাব রয়েছে।
৫. উয়ায়েসিয়া তরিকা
এই তরিকার প্রতিষ্ঠা হলেন শাহ আবদুর উয়ায়েসী। হরিরামপুর থানার ডাকরখালী গ্রামে শাহ আবদুর রহীমের জন্ম। এই ডাকর খালীকে কেন্দ্র কবেই এই তরিকার প্রচারকার্য শুরু হয়। ১২৯৮ বঙ্গাব্দে মুহাম্মদী বেগ নামক গ্রন্থের মাধ্যমে সর্বপ্রথমে বাংলদেশে উয়ায়েসিয়া তরিকার প্রচারকার্য বাংলাদেশে শুর হয়। এ গ্রন্থের রচয়িতা হচ্ছেন শাহ আবদুর রহীম উয়ায়েসী। এই তরিকার উৎপত্তি ও বিকাশ বাংলাদেশেই।
৬. নকশেবন্দিয়া তরিকা
ইহাকে তরিকায়ে আলিয়া (শ্রেষ্ট তরিকা) নামে অভিহিত করা হয়। হযরত খাজা মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দ আল বোখারী (র.) এই তরিকার প্রবর্তক। তিনি এই তরিকার ইমাম ও সর্বশ্রেষ্ট কুতুব। তাঁর পূর্ণ নাম হলো মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন বোখারী নকশবন্দ (র.)। ‘নকশবন্দ’ শব্দের অর্থ চিত্রকর। তিনি প্রথম জীবনে তাঁর পিতার সাথে নকশা খচিত কাপড় বয়ন করতেন। সুফিসাধক ও পীররূপে পরিগণিত হবার পর তিনি যেদিকে তাকালে সেদিকেই ‘আল্লাহ’ নামের নকশা অঙ্কিত হয়ে যেত। আবার অনেকে মনে করেন তিনি ‘আল্লাহ’ এই নাম অংকন করে শিষ্যদিগকে সে অনুযায়ী ধ্যানে নিমগ্ন হতে নির্দেশ দিতেন। কিছুক্ষন ধ্যানে নিমগ্ন থাকার পর সালেকদের অন্তরে আল্লাহ নামের নকশা অঙ্কিত হয়ে যেত। তাঁর এই অলৌকিক ক্ষমতার গুণে লোকে তাঁকে নক্শেবন্দি বলে অভিহিত করে। এই তরিকায় উচ্চস্বরে যিকরের পরিবর্তে নীরবে যিকরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদে এবং ধর্ম-কর্মে সুন্নাহ ও শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ এই তরিকার অন্যতম নীতি। কেউ কেউ মনে করেন নকশেবন্দিয়া তরিকা কাদেরিয়া তরিকার উপশাখা, কারণ কাদেরিয়া তরিকার সাথে এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফে-সানীর (র.) মাধ্যমে ইহা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই তরিকার প্রসার ঘটে।
৭. মুজাদ্দেদিয়া তরিকা
হযরত শায়েখ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী (র.) হলেন মুজাদ্দেদিয়া তরিকার প্রবর্তক। তিনি শরিয়ত ও সুন্নাহর যথার্থ ধারক ছিলেন। তিনি মুজাদ্দেদ-ই-আলফে-সানি নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তিনি সুফি তরিকাকে কক্ষ্যচ্যুত পথ হতে এর প্রকৃত কক্ষপথে পুনঃস্থাপন করে শরিয়ত এবং তরিকেতের সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করেন। এ কারণে তাঁকে ‘সেনাই’ (শরিয়ত-তরিকতের সমন্বয়কারী) বলা হয়। দ্বিতীয় শতকে ভারতবর্ষে অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার, শিরক, কুফুর, বিদআত, জাহেলী রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান প্রভৃতির সয়লাবে মুসলিম সমাজ অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে সময়ে মুজাদ্দিদ আলফে-সানি সেগুলোকে সমূলে উৎপাটিত করার জন্য কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি ইসলামের এক নব প্রাণের সঞ্চার করেন এবং মূল ইসলাম পুন:প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময়ে আধ্যাত্মিক সুফিসাধক মহাপুরুষ ইসলামের সংস্কারে গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাঁকে মুজাদ্দেদ আলফে-সানী বা দ্বিতীয় শতকের সংস্কারক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এ প্রসঙ্গে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে-সানীর একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, “শরিয়তের আকীদা বিশ্বাসের ওপর অবিচল প্রত্যয় ফিকাহের বিধানসমূহ সহজভাবে মেনে চলার মতো মানসিক প্রস্তুতি সৃষ্টি করাই হচ্ছে তাসাউফের আসল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া তাসাউফের আর কোন উদ্দেশ্য নেই।” তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ ছিল “প্লোটিনাস এবং তাঁর গুরু থেকে সরে দাঁড়াও এবং মুহাম্মদ (সা.) এ ফিরে যাও।” তবে মুজাদ্দেদিয়া তরিকার উৎপত্তি ভারতে হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে তা ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বার্মা, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাংলাদেশে এই তরিকার প্রচারে শাহসুফি খাজা এনায়েতপুরীর অবদান সবচেয়ে বেশী। (চলবে)
অধ্যাপক ড. মো. গোলাম দস্তগীর
টরন্টো