নিভৃতে
রীনা গুলশান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সূর্যটা ডুব মেরেছে অনেকক্ষণ হলো। যদিও উঠোনের উপর এখনো অবদি রয়েছে আলো-ছায়ার খেলা। রাতে কোন একটা নাম না জানা পাখি জলপাই গাছের মগডালের বসে সমানে ডেকে চলেছে। আর এটা তো সেই কুটুম পাখি। ওর শাশুড়ি বলতেন, এটাকে ‘কুটুম পাখি’ বলে। আমান্ডা হেসে ফেললো। রকিং চেয়ারে শুয়ে হেলান দিয়ে। ওর কাছে আবার কোন কুটুম (অতিথি) আসবে? আছেটা কে? মা-বাবা, ভাইবোন কেউ নাই। থাকার মধ্যে আছে ওর মেয়েটা আর নাতি ৩ জন! তার মধ্যে তার ফাবিয়ান তো কোথায় যে পড়ে রয়েছে, কে জানে? কত দিন আসে না? পায়ের ব্যাথা আর অসম্ভব ক্লান্তিতে আমান্ডা রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বুঝি একটু ঘুমিয়েই পড়েছিল। হঠাৎ কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে অথবা হালকা কোন শব্দে চোখ মেলে চাইলো। চোখ মেলেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইলো। দেখলো তার সামনেই দাঁড়িয়ে তার ফাবিয়ান। বুকের উপর দুই হাত দিয়ে সেই ছেলেবেলার মত মাথাটা হালকা কাত করে দুষ্টু দুষ্টু হাসছে। একি স্বপ্ন? হ্যাঁ, অবশ্যই স্বপ্ন। রাত-দিন ঐ পাজীটার কথা ভেবে ভেবে এই অবস্থা। আমান্ডা আবার চোখ বন্ধ করে ফেললো। ভাবলো অবশ্যই স্বপ্ন। স্বপ্নটা খুব সুন্দর। অতি আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন। হঠাৎ আমান্ডা দেখলো সেই স্বপ্নটা ঝুপ করে মাটিতে বসে ছেলেবেলার মত ওর কোমর জড়িয়ে ধরে ওর কোলে মুখ গুঁজে দিয়েছে। আমান্ডার মনে হলো একটা দীর্ঘ স্বপ্নের ভেতর দিয়ে দৌড়ে বাস্তবে লাফিয়ে আসলো তার আকাক্সক্ষা। ওমা! এ যে সত্যি! তার ফাবিয়ান। তার সোনা পাখি। ওহ্! হো…ও ও আমান্ডা ফাবির মাথাটা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। এই প্রায় ৫ বছরের জমানো মেঘ আজ বর্ষণের মধ্য দিয়ে ঝরিয়ে ফেললো। এদিকে ফাবিয়ানও নানীর কোলে মুখ ডুবিয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছিল। আর তার নানীর কোলে মুখ ডুবিয়ে তার বাল্যের, কৈশোরের এবং যৌবনের সেই সোঁদা গন্ধ নিচ্ছিলো। অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ কোন কথা বললো না। অনেকক্ষণ। কে জানে কতক্ষণ পর আমান্ডাই তার আদরের সোনা পাখির মুখ তুলে ধরে, কপালে চুমু দিলো। এতক্ষণে মুখ দিয়ে কথা বের হলো-
: ওঠ! পাগল ছেলে। কেমন করে মাটিতে লেপ্টে বসেছে সেই ছেলেবেলার মত। বড় আর হলো না। ওঠ, ওঠ-যা দৌড়ে যা একেবারে গোসল করে আয়। আমি তোর রাতের খাবারের যোগাড় করি।
: না, তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না- বলে ফাবিয়ান। ও ওর নানীকে আবার জড়িয়ে ধরে মুখে, কপালে অনেকগুলো চুমো খেলো।
: হু বললেই হলো, কিচ্ছু করতে হবে না। এখন তো আমান্ডার শরীরে হাতির শক্তি ফিরে এসেছে!
: সারা দিন ঠিক মত খেয়েছিস কিনা তার নাই ঠিক।
: নন্না, আমি কি এক ছুটে ও বাড়ি হয়ে আসবো?
: মানে, ডোরিনদের বাড়ির কথা বলছিস? আমান্ডাকে কি রকম সঙ্কুচিত এবং ভিত দেখালো।
: না, না- তার আর দরকার নাই। এখন প্রায় রাত ১০টা বাজে, ওরা আজকাল খুব জলদি জলদি ঘুমায়।
: কি যে বল তুমি নন্না, তার নাই ঠিক। ডোরিন রাত ১২টার আগে বিছানায়ই যায় না। তুমি খাবার রেডি কর আমি এক ছুটে একটু হাই বলে আসি।
: আচ্ছা! তাহলে জলদি করে আয়।
ফাবিয়ান প্রায় ছুটতে ছুটতে ডোরিনদের বাড়ির দিকে চললো। তার বুকের মধ্যে যেন ড্রামের বীট হচ্ছিল। একটা অসম্ভব ভালো লাগায় হৃদয়ের ভেতরে দ্রবীভূত হচ্ছিলো। নাম না জানা ভালোবাসায় আচ্ছন্ন ছিল শরীরের প্রতিটি তন্ত্রী। আবার বেশ খানিকটা আশঙ্কা কাজ করছিল। সব মিলিয়ে দারুণ একটা উত্তেজনা ছিল। বাড়ির সামনে গিয়ে সে অবাক হলো। সত্যি বাড়িটা কি রকম নিঝুম মেরে আছে। কোন সাড়া শব্দ নাই। ভেতরের দিকে অবশ্য একটা টিমটিমে বাতি দেখা গেল। ফাবিয়ান খুবই ইতস্তত মনে ওদের ডোরবেল বাজালো। ২/৩ বার ডোরবেলের শব্দে একটা শব্দ এলো-

: কে? আঙ্কেল কেভিনের কণ্ঠ।
: আমি ফাবি, দরজাটা কি একটু খোলা যাবে?
খুব দ্রুত একটা চম্পলের শব্দ করে একটা মানুষ দরজার কাছে এলো। আর তখুনি সবগুলো বাতি জ্বলে উঠলো যেন এক সাথে। কেভিনের প্রায় পেছনেই রোডিকাও চলে এলো দরজার কাছে। দরজা খুলেই প্রচণ্ড বিস্ময়ে ফাবিয়ানের দিকে চেয়ে রইলো ওরা দুজন। দুজনেরই মুখে একই সাথে খেলা করছিল নানান অভিব্যক্তি। আনন্দ, বিস্ময় আবার একই সাথে কেমন যেন সংকোচ।
: ফাবিয়ান তুমি, কখন এলে? কেভিন আর রোডিকা প্রায় একই সাথে জিজ্ঞাসা করলো চেঁচিয়ে।
: এই তো আঙ্কেল ঘন্টা খানেক আগে। এখনো এমনকি ফ্রেশ রুমেও যাইনি। তার আগেই ছুটে এলাম আপনাদের একটিবার দেখতে।
: আচ্ছা, আচ্ছা। আগেতো ওকে ভেতরে আসতে দাও, বলতে বলতে রোডিকা ফাবিয়ানকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। ফাবিয়ান মনে মনে খুবই বিস্মিত হলো রোডিকার কান্নায়। তবু ভেতরে গেল আন্টির হাত ধরে। লিভিং রুমে বসে চার দিকে চাইলো। নাহ্! ঘরের কোন কিছু তেমন বদলায়নি। শুধু মানুষগুলোই এই মাত্র ৫ বছরেই কেমন যেন খুব দ্রুত বদলে গেছে। আঙ্কেল কেভিন কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে। আর রোডিকা আন্টি এমনিতেই বেশ স্লিম ছিল, কিন্তু এখন আরো অনেক শুকিয়ে গেছে। আর কপালে বেশ অনেকগুলো বলিরেখা পড়েছে। মুখের সেই চকচকে ভাবটাও নাই। কত আর বয়স? তার মায়েরই সমবয়সী। তাহলে এই বয়সে এ রকম অবস্থা কেন?
: তো আপনারা সবাই কেমন আছেন?
: আর! আমাদের আবার থাকা। বেঁচে আছি বাবা- কেভিনই জবাব দিল কেমন যেন বিষন্ন কণ্ঠে।
ফাবিয়ান খুব অবাক হলো। কারণ, আঙ্কেল কেভিন জীবন দর্শনে খুবই পজেটিভ ধরনের মানুষ। সারা জীবন দেখেছে তাকে সারাক্ষণ হৈ চৈ করে থাকতে। রোডিকা আন্টি বললো-
: তো হঠাৎ করে এলি যে বড়?
: না, ঠিক হঠাৎ নয়। মানসিক প্রস্তুতি ছিল অনেক দিন ধরেই। শুধু পাসপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ওটা হাতে পেলাম ২/৩ মাস আগে। তবে এসেছি না জানিয়ে যে, আপনাদের একটু অবাক করে দেবো।
: রায়ান এসেছে?
: না, ও আসবে আগামী বছর। ওর গত মাসে এনগেজমেন্ট হয়েছে।
: তাই-ই, দারুন খবর। কার সাথে হলো?
: ঐ, ওর সেই মটু মামার মেয়ে মিরান্ডার সাথে।
: ও! তা তুই কিছু খাবিতো?
: নাহ্! আন্টি আমি এখনো ধরা চুড়োই ছাড়িনি। গোসলও করিনি। নন্নাকে তো জানেনই এতক্ষণে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে আমার খাবারের জন্য। তো আন্টি ডোরিনকে দেখছি না যে। এতক্ষণে দেখলাম না।
: ও, ওতো- মানে এখনো পর্যন্ত কাজ থেকেই আসেনি।
: সেকি? এত রাত, এখনতো প্রায় রাত এগারোটা।
: হু! জানি না, আজ কেন এত দেরি হচ্ছে- বলেই রোডিকা চকিতে তার স্বামীর দিকে চাইলো। এমন সময় বাইরে একটা গাড়ির জোর ব্রেক করার শব্দ শুনলো। ওদের লিভিং রুমের জানালা দিয়ে বাড়ির সামনের গেইটের সমস্তটা দেখা যায়। ফাবিয়ান পর্দাটা সরিয়ে বাইরে দেখলো, একটা ঝকঝকে গাড়ি (মনে হচ্ছে ক্যাডিলাক! এই ছোট্ট শহরে এত দামী গাড়ি। রাতের বেলায় তাই দূর থেকে রঙটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। স্বল্প আলোয় মনে হচ্ছে সিলভার এ্যাশ রঙের গাড়িটা) থেকে ডোরিন নামলো। আর ড্রাইভিং সিট থেকে একটু টলমলে পায়ে একজন যুবক নামলো। তারপর ডোরিনকে জড়িয়ে চুম্বন করলো। না, এটা বিদায়ী চুম্বন না, গভীর নিমগ্ন প্রেমময় চুম্বন। দুজন যেন দুজনকে ছাড়তেই চাইছে না। তারপর ডোরিন কোনমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। একটু পর বেশ টলমলে পায়ে দরজায় বেল টিপলো। আর দরজা খুললো স্বয়ং ফাবিয়ান। ডোরিনের অবশ্য কোন দিকে দেখবার মত শারীরিক অবস্থানে ছিল না। কোন মতে ঘরে ঢুকে তার বেডে শুয়ে পড়তে চাইছে। কাজ শেষ হয়েছে সন্ধ্যা ৬টায়। তারপর থেকে ম্যাথিউয়ের সাথে নাইট ক্লাবে হৈ হুল্লাড়ে মেতে ছিল। আজ আবার ওদের একটা কমন বন্ধু ব্রোনটি জেলিশপাই-এর জন্মদিন ছিল। ও আবার ক্লাবে জন্মদিনের পার্টি দিয়েছিল। অজস্র মদের ফোয়ারা। যে যত খুশি খাও আর সাথে ছিল পিৎজা আর ক্রিসপি ক্যাসুনাট। আজ ডোরিন মারাত্মক ড্রাঙ্ক হয়ে গেছে। অবশ্য প্রায় প্রতি রাতেই ফেরে মদ খেয়ে। মাঝে মধ্যে রাতে ফেরেই না। কোন কোন সময় ৭/৮ দিনের জন্য ম্যাথিউকে নিয়ে কোথাও হলিডে স্পেন্ড করতে যায়! ম্যাথিউ ছেলেটা দারুন, ওর জীবন যাপন, শারীরিক, মানসিক, এমনকি অর্থনৈতিক দিক দিয়েও সব কিছু বদলে দিয়েছে। মনটাও খুব বড়। ধনী হলেই যে তার মনটা বড় হবে এমনতো কোন কথা নেই। তো ম্যাথিউ আসলেও বিশাল হৃদয়ের। ওকে যখন তখন খুবই দামী দামী উপহার দিয়ে দারুণ সারপ্রাইজ করে দেয়। এমনকি ম্যাথিউ-এর বাড়িতে যে ‘স্পা এবং বিউটি সাপ্লালাইয়ের’ যে পার্লার দিয়েছে, সেখানে আগে ও শুধু একজন ‘হেয়ার স্টাইলিস্ট’ই ছিল। কিন্তু এখন তা নয়। এখন ম্যাথিউ তাকে ওটার ম্যানেজার করে দিয়েছে। ম্যাথিউ তাকে শুধু যে স্বপ্ন দেখায় তাই-ই নয়, সে তাকে স্বপ্নের বেদিতে বসিয়ে দেয়। ওর বাবা-মাও খুব ভালো মানুষ। তারা অবশ্য এখানে থাকে না। কিন্তু ৫/৬ মাস পর পরই আসে। ম্যাথিউর বাবা ‘রোমে’ থাকে। ওখানেও ওদের অনেক বড় ব্যবসা। কিন্তু ম্যাথিউ নিজে কিছু করতে চাইছিল। অন্য কোন শহরে। ওখানে তার ভাল লাগছিল না। ওর সব সময় ছোট শহর ভাল লাগে। ওদের একমাত্র বোন নিকোল গ্যারিসটো, প্যারিসের একজন ‘বিউটি আর্টিস্ট’। নিকোল প্যারিসে বেশ ভালভাবে জমিয়ে বসেছে। আগে চাকরি করতো। এখন নিকোল এবং তার বহু দিনের বয়ফ্রেন্ড ববটেইলর নিজেদের ব্যবসা খুলে বসেছে। নিকোল ম্যাথিউর থেকে ৩/৪ বছরের বড়। এরাও একবার এসেছিল ভ্যালেল্যংগাতে। ডোরিনকে দেখে গেছে, তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। ম্যাথিউয়ের বাবা-মায়েরও গোড়া থেকেই ডোরিনকে খুবই পছন্দ। কারণ, ম্যাথিউয়ের বাবাই এখানে একদা বেড়াতে এসে এই ভ্যালেলংগা এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, সে এখানে সেটেলড করার কথা ভেবেছিল। পরে তারা আবার রোমে ফিরে গেলেও ম্যাথিউ আর যায় নাই। সেও তো সাড়ে ৪ বছর আগের কথা। আর ম্যাথিউ সেই প্রথম দেখাতেই ডোরিনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
আজ ব্রোনটির জন্মদিনের পার্টি আসলে একটা অবতারণা, ডোরিনকে মজা করে প্রোপোজাল করবার। যার জন্য ওদের পার্লারের সবাইকে ইনভাইট করেছে। এছাড়া ম্যাথিউয়ের বেশ কিছু বন্ধুদেরও ইনভাইট করেছে। ডোরিনও আজ মাতাল করা সাজে এসেছিলো। গোল্ডেন কাঁধ খোলা লং ড্রেস, মাথার মধ্য ভাগ পর্যন্ত উঁচু করে পনিটোল। গলায় একটা লম্বা কুন্দনের সোনালী রঙের চোখার। মনে হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসা পরি।
কেক কাটার আগেই হঠাৎ ম্যাথিউ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, আমি কিছু কথা বলতে চাই, তোমাদের কারো কোন আপত্তি আছে?
সবাই সমস্বোরে চিল্লালো, নাই-ই, বল? কি বলবে?
ম্যাথিউ আস্তে আস্তে ডোরিন-এর দিকে এগিয়ে এলো। হঠাৎ ওর এক হাত সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো এবং দু’হাত দুদিকে দিয়ে নাটকীয় কায়দায় এক চিৎকার করে বললো-
: হে আকাশ থেকে নেমে আসা পরি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। সারা জীবন পাগলের মত ভালোবাসতে চাই। তোমার উত্তরাধিকারদের বাবা হতে চাই! তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে সম্মত আছো? বলেই পকেট থেকে একটি আংটি বের করলো, আর ডোরিনের সামনে তুলে ধরলো।
সবাই চিৎকার করে হ্যাঁ বল, হ্যাঁ বল করে তালি দিয়ে যাচ্ছে!
ডোরিন লাজুক হেসে বাম হাত বাড়িয়ে বললো, বিয়ে করবো কিনা জানি না, তবে এই মুহূর্তে বাম হাতের অনামিকায় তোমার আংটি পরতে রাজি!
সবাই হৈ হৈ করে তালি দিয়ে উঠলো। ম্যাথিউ উঠে দাঁড়িয়ে ওর অনামিকায় আংটি পরিয়ে দেয়।
আংটি দেখে ডোরিন অভিভূত। রুবি, ওভেল শেফ আর চারপাশে ডায়মন্ড। অনেক আগে কথা প্রসঙ্গে ডোরিন ম্যাথিউকে এমন একটি পছন্দের কথা বলেছিল। ডোরিনের চোখে আনন্দ অশ্র“ এসে পড়লো। ম্যাথিউ ওর হাত নিয়ে চুম্বন করলো।
তারপর তারা পার্টিতে প্রচুর হৈ চৈ করলো। আনন্দে আজ দুজন প্রায় মাতাল হয়ে গেলো।
তারপর ম্যাথিউ ডোরিনকে নিয়ে চলে এলো, ডোরিনকে ড্রপ করবার জন্য।
তবে আজ ম্যাথিউ বিশেষ কথা বলছিল না। ডোরিনই আনন্দে অনেক কথা বলছিল।
তবে তার বাবা-মা, বোনদের জলদিই ডাকবে তার বিয়ের জন্য। এটা কনফার্ম করলো। তখন ডোরিন হাসতে হাসতে বললো-
: কি ব্যাপার, আজ দেখি তোমার মুখে কোন কথা নাই। অন্যদিন তো তোমার কথার তোড়ে আমার শব্দ হারিয়ে যায়।
: কি করবো বল? তোমাকে কাছে পেলে শব্দের পাখিরা ডানা মেলে উড়ে যায়। তাই, কি যে বলবো বুঝেই পাই না।
: ইস! এ যে একেবারে কবি কবি ভাব।
: হু! তাহলেই বোঝ তোমাকে ভালোবেসে আমি আরো যে কত কি হবো, বুঝতে পারছি না।
: ওকে বাপু, আজই মা-বাবাকে বলবো। হলো এবার?
ডোরিনের মন আজ সত্যিই আনন্দে ভরপুর। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে ওর মত সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নাই। জীবনে যা কিছু চেয়েছে, সব ওর হাতের মুঠোয়! এ যেন সেই একটি অনামিকা, একটি আংটি, আর এক মুঠো স্বপ্ন ভরা সুখ। ডোরিন তাই আনন্দে অনেক বেশি মাতাল হয়ে গেছে। কিছু কিছু অনুভূতি থাকে যার জন্য মাতাল হতে খুব ভালো লাগে। খুউব বেশি দুঃখ আবার খুব বেশি আনন্দ। বেশ টাল হয়ে ছিল। এলোমেলো পায়ে এসে বেল বাজালো। মুহূর্তে দরজা খুলে দিলো ফাবিয়ান।
ডোরিন বেশ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ নাকি বহুক্ষণ, তারপর দরজার চৌকাঠ ধরে চোখ টেনে ধরে ফাবিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসলো-
: আরে মিস্টার ফাবিয়ান! কো… থা থেকে উদয় হলে? আসমান থেকে? নাকি পাতাল ফুড়ে?
: এই তো- ফাবিয়ান বেশি কথা বলতে পারে না। আসলে বহু দিনের অন্তর্হিত আবেগ ওর কণ্ঠের মধ্যে দলা পাকায়। মারাত্মক আবেগে দিশেহারা অবস্থা। তাছাড়া ডোরিনকে দেখেই ওর জীবনের সমগ্র অতীতটা যেন সামনে এসে দাঁড়ালো। আবার ডোরিনকে এভাবে দেখবার জন্যও ফাবি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। ওর এখন এমন অবস্থা যে, না পারছে কথা বলতে, না পারছে নিজেকে থামাতে। অজস্র কথার মালা যা ও প্লেনে আসবার সময় গেঁথেছে, তার সব একে একে বলবার জন্য ওর হৃদয় আকুপাকু করছে। কিন্তু ডোরিন তার সমস্ত আবেগের পরে নির্জলা খুব শীতল জল ঢেলে দেয়।
: ওহ্! ফাবি, আমি খুবই দুঃখিত। অসম্ভব ক্লান্ত আমি- বলতে বলতে বড় করে হাই ওঠায় তারপর ফাবির দিকে না তাকিয়েই বলে-
: ওকে, কাল দেখা হবে- বলেই শ্লথ গতিতে তার শোবার ঘরে যেয়ে দরজা বন্ধ করে।
ফাবিয়ান অবাক হতেও যেন ভুলে গেল। আন্টি রোডিকার এবং কেভিন আঙ্কেলের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিলো যে, ডোরিনের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এমনকি তার নানীও বারবার ডোরিনের প্রসঙ্গে অন্য কথার অবতারণা করছিল। জেসন আর ওর বৌও বারবার ডোরিনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছিলো। ফাবিয়ান ধারণা করেছিল যে, ডোরিন তাকে আর পছন্দ করে না। আর এটাই হয়তোবা এদের সকলের এড়িয়ে যাবার কারণ। কিন্তু এভাবে ও কল্পনাও করেনি। মানুষতো পরিবর্তনশীল। ডোরিনেরও যে পরিবর্তন হবে, এটা অবশ্যাম্ভাবী। কিন্তু এরকম পরিবর্তন ডোরিনের ক্ষেত্রে ঠিক ও আশা করেনি। ফাবিয়ানের আত্মস্থ হতে সময় লাগলো। ও বেশ তাড়াতাড়ি রোডিকা এবং কেভিনের কাছে বিদায় চাইলো-
: ওকে তাহলে আমিও যাই, রাত হয়েছে- নানী অপেক্ষা করছে। কাল আসবো। কালতো ডোরিনের ছুটি বললেন।
: হ্যাঁ, হ্যাঁ ফাবি, সেই ভালো। একেবারে কালই এসো। আমরা এক সাথে লাঞ্চও করবো।
: ঠিক আছে কাল আসবো। তবে লাঞ্চের কথা ঠিক বলতে পারছি না। নানীকে তো আপনারা জানেনই। (চলবে)

রীনা গুলশান, টরন্টো
gulshanararina@gmail.com
(লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।)
