কানাডার অতি দক্ষ অভিবাসীরা দ্রুততম সময়ে দেশ ত্যাগ করছে

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ০২ জানুয়ারি, ২০২৬ : বর্তমানে এমন এক সময় চলছে যখন কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রয়েছে।  আর ঠিক এই সময়টাতেই একটি নতুন সমীক্ষা প্রশ্ন উঠিয়েছে এই বলে যে, দেশটির অভিবাসন নীতি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় বৈশ্বিক প্রতিভা ধরে রাখতে সক্ষম কিনা। সিটিভি নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

উচ্চ শিক্ষিত এবং দক্ষ অভিবাসীদের কানাডায় প্রবেশের পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডা ত্যাগ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ছবি : প্রবাসী কণ্ঠ

ইনস্টিটিউট ফর কানাডিয়ান সিটিজেনশিপ (ICC) কর্তৃক পরিচালিত একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ শিক্ষিত এবং দক্ষ অভিবাসীদের কানাডায় প্রবেশের পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডা ত্যাগ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

গত মাসে প্রকাশিত “দ্য লিকি বাকেট ২০২৫” শীর্ষক এক প্রতিবেদনে আইসিসি দেখেছে যে, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে গৃহীত হওয়ার ২৫ বছরের মধ্যে প্রতি পাঁচজন অভিবাসীর মধ্যে একজন কানাডা ত্যাগ করেন। “অনওয়ার্ড মাইগ্রেশন” নামে পরিচিত এই প্রবণতা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।

আরও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান হলো, যেখানে দেখা যায় যে, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের তুলনায় ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের কানাডা থেকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণেরও বেশি। অভিবাসীরা যখন এমন চাকরির সম্ভাবনার মুখোমুখি হন যা আয় বৃদ্ধি করে না, তখন এই সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে যায়।

ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যানিয়েল বার্নহার্ড বলেন, অভিবাসন নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় প্রতিভা হ্রাসের দিকে পরিচালিত করছে, যা কানাডার বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে তিনি মনে করেন।

উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগামী দশকে কানাডার বাইরে রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তবে বার্নহার্ড বলেছেন যে, দক্ষ অভিবাসীদেরকে  হারানো কানাডার জন্য ক্ষতিকর হবে।

“এই অভিবাসীরাই কানাডায় তৈরি করেছে – রেলওয়ে, অবকাঠামো, আবাসন প্রকল্প। যখন আমরা এই লোকদের হারিয়ে ফেলি, তখন আমরা দক্ষতা হারিয়ে ফেলি। এই লোকেরা কানাডাকে সফল হতে সাহায্য করে।” সিটিভি নিউজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বার্নহার্ড এ কথা বলেন।

২০২৫ সালের অভিবাসন সংক্রান্ত সংসদে প্রদত্ত বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফেডারেল সরকার পরবর্তী তিন বছরের জন্য অর্থাৎ ২০২৮ সাল পর্যন্ত ৩ লক্ষ ৮০ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের পলিসি স্থিতিশীল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ইনস্টিটিউটটি অনুমান করছে যে, যদি অভিবাসনের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩১ সালের মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি অভিবাসী কানাডা ত্যাগ করবেন।

বার্নহার্ড বলেন, “আমাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করার জন্য যারা অনন্য অবস্থানে আছেন, তারাই দ্রুততম সময়ে কানাডা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।”

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্রুততম বর্ধনশীল পেশাগুলির মধ্যে রয়েছে ব্যবসা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও স্থাপত্য ব্যবস্থাপনা, সেইসাথে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ প্রকৌশলের ক্ষেত্র। কিন্তু এই পেশাগুলোতে দক্ষ অভিবাসীদের ধরে রাখার প্রচেষ্টা বেশ দুর্বল।

আইসিসির পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে, অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক এবং নির্বাহীরা ১৯৩ শতাংশ হারে দেশ ত্যাগ করছেন সকল অভিবাসীদের তুলনায়। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা পেশাদাররা ৩৬ শতাংশ বেশি হারে দেশ ত্যাগ করছেন।

উল্লেখ্য যে, গত বছর জুলাই মাসে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার বরাত দিয়ে দি ডেইলি ভয়েস জানিয়েছিল যে, ২০২৪ সালে কানাডায় দেশ ত্যাগীদের হার অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে যে কোনও বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি অধিবাসী কানাডা ছেড়েছেন। ২০২৪ সালে কানাডা ত্যাগ করেছেন ১০৬,১৩৪ জন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩% বৃদ্ধি এবং এই দেশ ত্যাগীদের সংখ্যা গত প্রায় ছয় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

দেশ ত্যাগের এই প্রবণতার কেন্দ্রস্থল হিসেবে অন্টারিও প্রভিন্সের নাম উঠে এসেছিল গবেষণায়। যারা কানাডা ত্যাগ করেছেন তাদের শতকরা ৪৮ জনই ছিলেন অন্টারিও’র অধিবাসী।

তবে ২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক অধিবাসী কানাডা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও দেখা গেছে এই একই বছরে রেকর্ড সংখ্যক নতুন ইমিগ্রেন্টকে স্বাগত জানিয়েছে কানাডা। এদের সংখ্যা ছিল ৪৮৩,৫৯১ জন।
রেকর্ড সংখ্যক কানাডিয়ান অধিবাসী বিদেশে চলে যাওয়া বা দেশের অভ্যন্তরে এক প্রভিন্স থেকে অন্য প্রভিন্সে স্থানান্তরিত হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে মূলত অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার মান এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের ভূমিকা রয়েছে। স্ট্যাটিসটিকস কানাডার সমীক্ষা এই জটিল চিত্রটি তুলে ধরেছে।
আরেকটু বিস্তারিত ভাবে বলতে গেলে যে বিষয়গুলো সামনে আসে তা হলো, প্রধানত উচ্চ আবাসন খরচ, কম বেতন এবং আর্থিক সুযোগের অভাবের মতো অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণগুলো লোকজনের স্থানান্তরের পিছনে বড়ো ভূমিকা রাখছে। অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে উন্নত চাকরির বাজার খোঁজ করা এবং সেই সাথে উচ্চ কর ও দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ।