এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাঙ্গালীর বিজয়
নজরুল ইসলাম
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১, তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স (সারওয়ার্দী উদ্যান ) ময়দানের সে বিজয় দেখা আমার সৌভাগ্য হয় নি। পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর এবং নব- বাংলাদেশের পক্ষে লিবারেশন ফোর্সের জয়েন্ট কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এই স্বাক্ষরিত অনুষ্ঠানটি প্রতিবারই টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় দেখানো হয়। এটা সত্যিই বাংলাদেশের জন্য একটা গৌরবময় মুহূর্ত ; পৃথিবী যতদিন টিকে থাকবে এই স্মৃতি ইতিহাসের পাতায় ছবি সহ লেখা থাকবে, এমন কি প্রচার মাধ্যমে বারবার আসবে, আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখে আনন্দে শিহরিয়া উঠবে, ভাববে যদি ওই বিশেষ মুহূর্তটি দেখতে পেতাম !
৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ জনতা রক্ত দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছে। পৃথিবীতে অনেক ধ্বংসাত্মক বড়ো বড়ো যুদ্ধ হয়েছে এবং আজ ও হচ্ছে- যেমন -প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৮), রাশিয়ান গৃহযুদ্ধ (১৯১৮-২০), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫), পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০–৯১), আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১–১৪), সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ (২০১২–),আরও কত কি ? কিন্তু বাংলাদেশ-পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ মূলত গেরিলা যুদ্ধ ; বাংলার দামাল ছেলেরা যে ভাবে নিজের যা কিছু সম্বল ছিল তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করেছে ,তা ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শহর বা গ্রাম সর্বত্রই অভূতপূর্ব সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে । গ্রামের কৃষাণ ছেলেরা প্রতিবেশী ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে একদিকে গ্রামকে পাহারা ও পাকিস্তানী সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিহত এবং পাল্টা আক্রমণ করেছে ;অপর পক্ষে মা-বোন ও বৃদ্ধরা মুক্তি যোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার নিরাপত্তা দিয়েছে । এ দিক থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কম -বেশি প্রতিটি পরিবার-ই দেশের স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে । এই যে এক কোটি শরণার্থী বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পথে জনগণ থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে,আহতদের সেবা দিয়েছে, ওদের অবদান কি ভুলে যাওয়ার ?
১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান, ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব দিকে ১২০০ মাইল দূরত্বে দুইটি অসংলগ্ন আঞ্চলিক সত্তা নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি জনগণ ধর্মের দিক থেকে মুসলমান /ইসলামী হওয়া সত্ত্বেও, জাতিগত, সংস্কৃতি এবং ভাষাগত ভিত্তিতে বিভক্ত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একমাত্র ভাষা বাংলায়;পশ্চিম পাকিস্তানে আঞ্চলিক ভিত্তিক -পাঞ্জাবি,সিন্দি,বেলুচি ও পশতু ভাষায় কথা বলে । উর্দু ছিল ভারত থেকে আগত মুষ্টিমেয় শিক্ষিত (এলিট), যাদের হাতে ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা ;ওরা উর্দু ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা নিয়েছে ।
বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যের সাথে সংযুক্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র ও অনেক সাহিত্যিকদের প্রভাব রাজনৈতিকভাবে সৃষ্ট সীমানা অতিক্রম করে বাঙ্গালী জনগণের সাধারণ ভাষাগত ঐতিহ্য হিসাবে দেখা দেয়, পূর্ব বাংলার জনগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে সাথেই পশ্চিমা উর্দু ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসাবে মেনে নিতে পারে নি।
জাতি যত বড় বা ছোট আকারের হোক না কেন,কেউ নিজের মায়ের ভাষাকে অবজ্ঞা করে না। কানাডার জনসংখ্যার ৭% লোক কুইবেক ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলে; এ দেশে ফ্রেঞ্চ কে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে সরকারিভাবে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কুইবেক প্রদেশের প্রধান সার্বভৌমত্ববাদী রাজনৈতিক দল, “পার্টি কুইবেকোইস,” দেশকে কানাডা থেকে আলাদা করার জন্য দুইবার ভোটাভোটিতে হেরে যায়। কিন্তু তাদের মুখের ভাষা(ফ্রেঞ্চ) দেশের গঠনতন্ত্রে দ্বিতীয় ভাষা, প্রতিটি স্কুল এবং অফিস আদালতে চালু রয়েছে।
অখণ্ড ভারতীয় মুসলিম লীগ গোড়া থেকেই পাকিস্তানের ভাষা উর্দু হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
দেশ ভাগ হওয়ার পর থেকেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ,লিয়াকত আলী খান,আয়ুব খাঁন আর ও অনেকেই ছলেবলে পূর্ব বাংলায় উর্দু ভাষা চালু করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। ১৯৫২র ২১শে ফেব্রুয়ারী পূর্ব বাংলার গভর্নর নুরুল আমিন ঢাকার ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়ার ফলে – সালাম , বারকাত , রফিক , জব্বার এবং শাফিউর শহীদ হয়।
পাকিস্তানী চক্র উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র বন্ধ করে নি। ১৯৫৮ সনে আয়ুব খান ক্ষমতায় এসে পূর্ব পাকিস্তানের স্কুলে উর্দু ভাষা চালু করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এ দেশের নেতৃবৃন্দ এবং জনগণ তা মেনে নেয় নি।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান জাতীয় সংসদে সদস্য হিসাবে তার নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লা থেকে প্রতিনিধিত্ব করে ছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা করার আহ্বান জানিয়ে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশীদের কাছে সর্বাধিক স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই বক্তব্য নিয়ে জাতীয় সংসদে দত্ত সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও কর্তৃত্ববাদের প্রতি দত্তের জোরালো যুক্তির কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের তিন দিন পর, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ দত্তকে কুমিল্লায় তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে সহ ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
এ সময় আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পবেলপুর (বেসামরিক)কর্মরত ছিলাম। ১৯৭০ সনের অক্টোবর কি নভেম্বরের দিকে জুলফিকার আলী ভুট্টো ভোট প্রচার অভিযানে ক্যাম্পবেলপুর জনসভা করেছিলেন। আমরা অফিস থেকে অনেকে ওর বক্তব্য শুনার জন্য ওই জনসভায় উপস্থিত ছিলাম। ভুট্টো বক্তৃতার প্রায় পুরো সময় পূর্ব পাকিস্তান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। পাকিস্তানী জনগণের মধ্যে এ নিয়ে সর্বদাই আলোচনা হতো এবং অফিসে অনেকে এ নিয়ে আমাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন ।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকাতে, পূর্ব পাকিস্তানে কোথায় কি হচ্ছে সীমিত আকারে পত্র -পত্রিকায় আসতো। এই ছোট্ট শহরে আমরা সবাই মেস করে থাকতাম এবং আর্মি অফিসার্স মেসে দুবেলা খাওয়া হতো। রুটি, মাংস, ডাল ও সপ্তাহে একদিন একটু ভালো খাওয়া । খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে মাঝে মধ্যে নিজেরা রান্না করে ডাল ভাত খেতাম। অফিসে হালকা কাজ, বিকেলে পায়ে হেটে শহরে ঘোরাঘুরি করে রাতে খেয়েদেয়ে কেউ কেউ তাস খেলা এবং আমি লাইব্রেরি থেকে কিছু বই এনে সময় পার করতাম।
কয়েক মাসের মধ্যেই আমি ক্লান্ত হয়ে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ইসলামাবাদ কৃষি মন্ত্রণালয়ে নতুন চাকুরী নিয়ে চলে গেলাম। জি ৬-২ আপপাড়া কয়েকজন মিলে এক বাসায় থাকি । রাত হলেই ট্রানজিস্টর নিয়ে নাড়াচাড়া করি মুক্তিযুদ্ধের খোঁজখবর নেয়ার জন্য। কিন্তু কোনো ক্রমেই ১২ ০০ মাইল দূরে কোথায় কি হচ্ছে, কিছুই জানতাম না। নভেম্বর ১৯৭১ এর দিকে অফিস থেকে আমাদের চাকুরী থেকে ছাঁটাই করে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। ঢাকা চলে আসতে চাই, প্লেনের টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না, তাছাড়া এরোপ্লেন ভর্তি সেনাবাহিনীর লোক নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আব্দুস সাত্তার (সিএসপি) কাবুল বর্ডার দিয়ে পার হতে গিয়ে ধরা খেয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন। আমাদের আর এক অফিসার, দেশে স্ত্রী ও মাবাবা কে কোথায় আছে,খবর না পেয়ে অস্থির। সে একটা চিঠি লিখে রেখে আত্মহত্যা করেছে। এ নিয়ে পুরা ইসলামাবাদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রথম দিকে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির আকাশে ভারতীয় আক্রমণ শুরু হলো। প্রতিরাতেই ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি শহরে ব্ল্যাক আউট এবং এয়ার সাইরেন শুনা যাচ্ছে। সারা শহর অন্ধকার ; এক রাতে আমাদের বাসার দরোজায় কড়ানাড়ার আওয়াজ হচ্ছে। আমরা ৪ জন বাংলাদেশী যুবক ভয় পেয়ে ভিতর থেকে বলছি কে কে ? উর্দুতে বলে আমরা তোমাদের প্রতিবেশী; ভয়ে দরজা খুলছি না। ওরা বলে তোমরা আকাশে টর্চ মেরে শত্রুকে বোম্বিং করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছো । আমরা হতভম্ব হয়ে যত বলি এটা হতেই পারে না। কোনো অবস্থাতেই দরজা খুলছি না , শেষে আমাদের শাসিয়ে চলে যায়।
দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো । পূর্ব পাকিস্তান থেকে দুই সংসদ সদস্য নুরুল আমিন(মুসলিম লীগ ) ও রাজা ত্রিদিব রায় (স্বতন্ত্র) ইসলামাবাদ ছিলেন; নুরুল আমিন সাহেব কে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রাজা ত্রিদিব রায়কে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দিলেন। পাকিস্তান /আফগানিস্তান বর্ডার কিছুটা শিথিল হলে আমরা কয়েকজন মিলে দালালের স্বরণাপন্য হয়ে পায়ে হেটে কাবুল, আফগানিস্তান পৌঁছি। কাবুল থেকে দিল্লি হয়ে দেশে পৌঁছতে প্রায় তিন সপ্তাহ লেগেছিলো।
১৩
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট
১
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে প্রায়শই সরকার ও বিরোধী শক্তির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগে থাকে। এর একমাত্র কারণ এ সব দেশে নামে গণতন্ত্র,কাজে অগণতন্ত্র, অর্থনৈতিক হতাশা, ক্ষমতাসীন দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের সুবিধাভোগী কার্যকলাপে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বল্গাহীন অবস্থায় থাকে। । প্লেটোর ভাষায় “গণতন্ত্র গরিব ও অশিক্ষিত সমাজে অযোগ্য। ” গরিব দেশে মানুষের প্রথম চাহিদা হলো ভাত (রুটি) ,অতি সাধারণ পরিধেয় বস্ত্র এবং বেঁচে থাকার জন্য চিকিৎসা, ও জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী সবার জন্য মুক্ত শিক্ষানীতির প্রবর্তন করা। অনুন্নত দেশগুলিতে এই তিনটি অধিকারের কোনটিই পুরাপুরি নেই। এক শ্রেণীর লোক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুবিধা ভোগ করে; কিছু লোক সরকারের ধামাধরা নীতির ফলে নিজেরা ও সুবিধা ভোগ করে। বাকি জনতা এ সব সুবিধাভোগীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা নিয়ে গণমিছিল, জ্বালাও পোড়াও থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
প্লেটোর মতে গণতন্ত্র বলতে জনগণের অনিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থা , অনাকাঙ্খিত বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বুঝায় । স্বৈরাচারী সরকার জনগণকে মিথ্যা প্রতিচ্যুতি দিয়ে ক্ষমতা দখল করে যে তার শাসনামলে গণতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাবে। কিন্তু তা বাস্তবে সম্ভব হয় না । অনুন্নত দেশগুলিতে শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেয়া হয় না ; তাছাড়া জনগণের শিক্ষার প্রতি মনোভাব ও পাল্টায় না । গরিব ঘরের যেখানে দুবেলা রুটির ব্যবস্থা নেই,ওদের পক্ষে ছেলেমেয়েদের সময় নষ্ট করে স্কুলে পাঠানো দরকার নেই বলে অনেক বাবামায়ের অভিমত । এক যুগে আমাদের সমাজে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা করানো বিলাসিতা বলে গণ্য হতো , অনেকেই মনে করতো অযথা অর্থ ও সময়ের অপচয়। যে সমাজের মানুষ অশিক্ষিত,ওরা গণতন্ত্রের মূল্য বুঝবে না। যে সমাজে অর্থের বিনিময়ে ভোট বিক্রি হয়, মিথ্যা মামলা দিয়ে লোক ফাঁসানো হয়, খুন হলে খুনির শাস্তি হয় না ; সে সমাজে গণতন্ত্রের সঠিক মূল্যায়ন হতে পারে না।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে স্বচ্ছ জবাবদিহি সরকারি নির্বাচন বা দেশ পরিচালনা হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশে গত কয়েকটি নির্বাচন সঠিক হয়নি বা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে অনেকের ধারণা। এ দেশে একদলের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা এবং অপর দল মিছিল,হরতাল,জ্বালাও পোড়াও কাজে ব্যস্ত থাকে; দেশের বড় দুইটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই মেরুতে বাস করে। দেশে অনেক অগ্রগতি হয়েছে ; তবে দুর্নীতি চরমে পৌঁছেছে বলে অনেকের ধারণা।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট ‘ :
১৯৪৭ সনের ভারত ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানের ২৩ বৎসরের ইতিহাসে একটি মাত্র নির্বাচন (১৯৭০ ) সঠিক ভাবে হয়েছিল যা তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মেনে না নিয়ে ৯ মাস পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ বেঁধে দেয়ার ফলে ১৯৭১ সনে দেশ ভাগ হয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সন থেকে দেশে দুর্ভিক্ষ,অনাবৃষ্টি ,অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা, খাদ্য সংকট কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লেগেছে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী সম্পদের ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে আমাদের ঠকিয়েছে। দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষ, খাদ্য সমস্যা তো ছিল ; উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে দুর্ভিক্ষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা , সেনা অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ছিল । এ সব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক সময় লেগেছে।
১৯৪৭ সনে পূর্ব বাংলা শিক্ষা, শিল্প,কল- কারখানায় অনগ্রসর এবং ব্রিটিশ আমলে যা কিছু উন্নতি হয়েছিল কলিকাতা ভিত্তিক। ভারতের হিন্দু মাড়োয়াড়ি ও মধ্যম শ্রেণীর ব্যাবসায়ী যা কিছু অর্থ বিনিয়োগ করেছে ,সবই পশ্চিম বঙ্গে তথা কলিকাতায় । মুসলমান মেজরিটি হলেও -গরিব মজুর, রিকশা চালক, খেটে খাওয়া বাঙ্গালী। এমন একটি ভূখণ্ড নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান তৈরি হলো যার হৃদপিন্ড পশ্চিম বঙ্গে ; এ নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শহীদ সারওয়ার্দী বলিষ্ঠ কণ্ঠে আপত্তি জানিয়ে ছিলেন। ১৯৪৬ সনের কলিকাতার হিন্দু -মুসলমান দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমান প্রাণ দিয়েছিলো ; তা কোনোদিন ভুলে যাওয়ার মতো না। গানের ভাষায় বলা হতো “রানাঘাট, শিয়ালদহ আজ ও আছে ভাই ,আমি যাবো আমার দেশে সোজা রাস্তা নাই। ” এ সব সমস্যা কাটিয়ে আজকের বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ, রাস্তাঘাট এবং শিল্পে অনেকখানি এগিয়েছে- এই অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে হলে, দেশে আস্থাশীল সরকার থাকা দরকার।
ক) দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট বিদ্যমান থাকলে বিদেশী বিনিয়োগ ক্রমেই হ্রাস পাবে। রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কালো ছায়া ফেলছে। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং অর্থনীতিবিদরা উদ্বিগ্ন যে রাজনৈতিক দলগুলি রাস্তায় নেমে যেভাবে সহিংসতা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাতে ব্যবসা, বাণিজ্য এবং শিল্প কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হচ্ছে।
খ ) হরতাল,অবরোধ অবশ্যই অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর- যদি এখনই গণতান্ত্রিক সরকার না আসে,এতে পুরো দেশ আরও বড় সমস্যায় পড়বে।
গ ) আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলির উপর নির্ভর করছে দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা। আজকের দুনিয়া একে অপরের দেয়া- নেয়া, একের প্রতি অন্যের বিশ্বাস স্থাপনের উপর নির্ভর করে। যদি দেশে রাজনৈতিক শান্ত পরিবেশের অভাব হয়,তা বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের উপর প্রভাব পড়বে , এতে দেশের ক্ষতি ও জনগণের ভোগান্তি বাড়বে। সবাইকে নিয়ে “হারিজিতি নাহি লাজ ” পলিসি নিয়ে দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে নেয়ার বিকল্প কোনো পথ নেই।
২
পৃথিবীতে অনেক দেশ রয়েছে, যে সব দেশে স্বৈরাচার ও অনভিজ্ঞ সরকারের দরুন জনগণের দুর্ভোগ চরমে -তাদেরই একটি সুদান। সুদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় অবস্থিত, আয়তন ১,৮৮৬,০৬৮ বর্গ কিলোমিটার বা ৭২৮,২১৫ বর্গমাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। দেশটির দুই অংশের লোক সংখ্যা ৫০ মিলিয়ন , যার ১০ মিলিয়ন দক্ষিণ সুদানে এবং ৪০ মিলিয়ন উত্তর সুদানে। ব্রিটিশ ও মিশরীয় উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর গৃহ যুদ্ধ শুরু হয়; সুদান তেল সমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও নানা সমস্যার মধ্যে তেল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
১৯৫৬ সনে সুদান ব্রিটিশ ও মিশরীয় উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।স্বাধীনতার ৬ মাসের মাথায় এই দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। জনসংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে উত্তর সুদানে 97% মুসলিম এবং দক্ষিণ সুদানে ৬১% খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী। দুই অংশের মধ্যে বহুদিনের ধর্ম ও নানা দিক নিয়ে সমস্যা ও গৃহযুদ্ধ চলে আসছে। সুদানের প্রথম গৃহযুদ্ধ শুরু হয় যখন ব্রিটিশ ও মিশরীয় শাসকরা এই অঞ্চলকে উপনিবেশ মুক্ত করে। দক্ষিন সুদানের জনগণ উত্তর সুদানের কর্তৃত্ব মেনে নিতে পারে নি যার ফলে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং দক্ষিণ সুদান ২০১২ সালে সমগ্র সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভের পর নিজেদের মধ্যে সংঘাতপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
২০১৯ সালের এপ্রিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে সুদান রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,সামাজিক এবং আরও নানা কারণে সুদানে সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। সুদানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জাতিগত সংঘাত গুলির উল্লেখযোগ্য হ’ল দারফুর সংঘাত এবং দক্ষিণ সুদানের গৃহযুদ্ধ । দারফুর সংঘাত ২০০৩ সালে শুরু হয়েছে এবং এর ফলে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
দুর্বল প্রশাসন : দেশে সঠিক আইনের প্রয়োগ নেই । অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি এবং সামাজিক অস্থিরতা দেশে বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি করেছে। সরকার ও বেসরকারি গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বহুদিন থেকে চলে আসছে ।
তেল সম্পদ ব্যবস্থাপনার সমস্যা : সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সুদান তেল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উৎপাদনের সঠিক অর্থ দেশের কাজে ব্যবহৃত না হয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ক্ষমতালোভীদের সংঘাত : সুদানে ক্ষমতার লড়াই সামরিক বাহিনী এবং প্যারামিলিটারি বা রেপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) মধ্যে দীর্ঘদিনের সমস্যা। দুটি গোষ্ঠী রাষ্ট্র এবং এর সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করছে।
দক্ষিণ সুদানের গৃহযুদ্ধ, সরকার, বিরোধী বাহিনীর মধ্যে একটি বহুমুখী দ্বন্দ্ব এবং এই সংঘাতের ফলে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ মারা যায় ; বহু লোক দেশের ভিতর ও বাহিরে আশ্রয় নিয়েছে।
দারফুর সুদানের একটি অঞ্চল যা সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশগত সংকট, প্রাকৃতিক সম্পদ কে নিয়ন্ত্রণ করবে এ নিয়ে প্রতিযোগিতা, এবং বিরূপ শাসনের একটি জটিল ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েছে। এই অঞ্চলটি মিলিশিয়াদের সহিংসতায় ভুগছে ;যারা গ্রামগুলি পুড়িয়ে দিয়েছে, লুটপাট করছে । আইনের শাসন, নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তার অভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন প্রত্যাহারের ফলে এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির সঠিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে । এ সব দেশে শিক্ষা নিম্নমানের, গণতন্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে । ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নিজেদের ও সরকারি শক্তি কাজে লাগিয়ে শাসনের নামে শোষণ করে। দেশের মঙ্গলের চেয়ে নিজের আত্ত্বতৃপ্তির কথা ভেবে পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতি দিয়ে দেশ পরিচালনা করে।
