আমার বর্তমান জীবন

সাইদুল হোসেন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আমার জীবনটাকে নিয়ে যখন ভাবি, অতীত ও বর্তমানের দিকে যখন মনোনিবেশ করি, তখন একটা কথা বারবার মনে পড়ে যে আমি বুদ্ধিমানদের দলের একজন নই। যার ফলে আজ এই ৯৩ বছর বয়সে পৌঁছেও নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে পারলাম না, স্ত্রীসহ আমি সরকারী সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। বিরাট, বিষাদময় পরাজয় নিঃসন্দেহে।

সুদীর্ঘ কর্মজীবন নিজেরই বিচক্ষণতার অভাবে, সাহসের অভাবে হাতের কাছে আসা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। অন্যেরা এগিয়ে গেল, আমি পেছনে পড়ে রইলাম। আমার এই অসাফল্যের কারণে আমার স্ত্রী কষ্ট ভোগ করলো, কষ্ট পেয়েছে আমার সন্তানেরাও যদিও ওরা আজ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত নিজনিজ কর্মক্ষেত্রে এই ক্যানাডাতেই। সাফল্য আমার এটুকুই যে ওদেরকে প্রয়োজনীয় উচ্চ শিক্ষা দিতে  পেরেছিলাম, সৎচরিত্র নিয়ে জীবনযাপনে দীক্ষা দিতে পেরেছিলাম।

তবে আমার অসাফল্যের কারণে সৃষ্ট দারিদ্র্যের বোঝাটা আমার স্ত্রী আজো বয়ে বেড়াচ্ছে। সচ্ছলতার মুখ তাকে আমি দেখাতে সক্ষম হইনি। তথাপি চরম দুর্দিনেও সে আমাকে ত্যাগ করেনি আমার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কারণেই হোক অথবা তাকে বিহনে আমার অসহায়তার কথা ভেবেই হোক। তার প্রতি আমার ঋণের এবং কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই। আজ সেই আমার শেষ ভরসা।

অতীতে আমার নির্বুদ্ধিতার কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যা সমাধানে বহু আপন ও পর সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলো, অভয় দিয়ে এগিয়ে চলার সাহস জুগিয়েছেলো। আমি তাদের সবার কাছেই কৃতজ্ঞ।

তবে ভুলে যাইনি আমার সেই সব আপনজনদের কথাও যারা আমার চরম দুর্দিনে আমাকে পরিত্যাগ করেছিলো, আমার স্ত্রী ও বিপদগ্রস্ত সন্তানদের প্রতি নির্মম ব্যবহার করেছিলো।

আর্থিক অনটনের বেদনার পাশাপাশি আমার স্থায়ী দৈহিক সদাবর্তমান যাতনাও  (severe arthritic pain in the lower back and the two knees) আমাকে চিরতরে পংগু করে দিয়েছে। বারো বছর আগে (২০১৩) বাম পা’টাতে surgery করে একটা artificial knee লাগাতে হয়েছে।  Walker -এর সাহায্য ছাড়া দু’পাও হাঁটতে পারি না। ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে আবদ্ধ আমার জীবন। অসহায়। একমাত্র মৃত্যুই আমার এই যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে পারে।

নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। ছবি : ইটসে .কম

ঘরে স্ত্রী ছাড়া কথা বলার মত লোকজনও কমে গেছে। বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা কখনো ৮-১০ জনের বেশি ছিলো না। বাকিরা আমার মতই অথর্ব। তারাও আজ নিজেদেরকে সামলাতেই ব্যস্ত, আমাকে ফোন করার মত সময়ের বড় অভাব। তাছাড়া আমি তো কোন ধনবান অথবা খ্যাতিমান ব্যক্তিও নই যে যোগাযোগ রাখাটা লাভজনক। ফলে সপ্তাহেও একটা ফোন পাই না কারো কাছ থেকে। আমি নিজেও ফোন করার মত উৎসাহ বোধ করি না। সুতরাং অন্যদের দোষ দিই না।

বর্তমান বাসস্থানের দূরত্বের কারণে আত্মীয়-বন্ধুদের বেড়াতে আসাও কমে গিয়েছে যা ইতিপূর্বে টরন্টো শহরে থাকাকালীন সময়ে ছিলো নিয়মিত। পরিস্থিতির শিকার সবাই, তাই কাউকেই দোষ দিতে পারি না। ফলে আমাদের একাকীত্ব (isolation/loneliness)  ক্রমেই বাড়ছে। তবে অসুখ-বিসুখ হলে সবাই খোঁজ-খবর নেয়। উদ্বেগ প্রকাশ করে একথা ঠিক।

Dry eyes condition -এর কারণে চোখে জ্বালাপোড়া নিয়ে কষ্ট করে দিনগুলো কাটে। Unknown virus -এর তীব্র আক্রমণে অসহনীয় কাশিতে ভুগেছি মে-জুন ২০২৫-এ। তাই পড়াশোনা এবং লেখালেখি দু’টি কাজই কমিয়ে দিতে হয়েছে।  যেটুকুই করতে পারছি সেটুকুই পারতাম না যদি সহৃদয় বন্ধুর স্ত্রী সেগুলো computer typing করে, email ইত্যাদি করে আমাকে অনবরত সাহায্য না করতেন। ধন্যবাদ। হাতে প্রচুর অবসর সময়, তার কিছুটা অংশ দিনের বেলাতে ঘুমিয়ে কাটাই। নিজেকে খুবই ক্লান্ত বোধ করি।

মুখে দারুণ রকম অরুচি, কোনকিছুই আর স্বাদ লাগে না। ক্ষুধা কমে গেছে, হজম শক্তিও কমে গেছে। ফলে খাওয়ার পরিমাণও কমিয়ে দিতে হয়েছে। এতে অবশ্য কোন কষ্ট হয় না, অভ্যস্থ হয়ে গেছি। অন্য কোথাও নিমন্ত্রণ সাধারণতঃ গ্রহণ করি না।

চলাফেরার অপারগতার কারণে আজ প্রায় ১০ বছর ধরে মসজিদে গিয়ে শুক্রবারের জুমার সালাত আদায় করতে পারি না। বছরের দু’টি ঈদের দিনও ঘরে বসেই কাটে, ঈদের জামাতে নিয়ে যেতে কেউ ride দিতে আসে না। সেই উপলক্ষ্যে কিছু visitor -এর দেখা অবশ্য পাওয়া যায়। আমার স্ত্রীর হাতের রান্নার খুব সুনাম।

চোখে জ্বালাপোড়া এবং দৈহিক ক্লান্তি সত্ত্বেও গত কয়েক মাসে নূতন একটা গল্পের বই লিখতে পেরেছি “জীবনের বহু রং।” বহু স্বাদের গল্প-কাহিনী আছে তাতে। অনলাইন পাবলিশ করেছেন মাসিক প্রবাসী কণ্ঠ ম্যাগাজিন টরন্টো থেকে। ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ইতিপূর্বেও তাঁরা আমার কয়েকটা গল্পগ্রন্থ অনলাইন পাবলিশ করেছেন।

বই লেখা প্রসংগে একথাটা যোগ করা যেতে পারে যে যদিও লেখক হওয়ার মত আমার কোন ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো না তথাপি ঘটনাচক্রে কলম হাতে নিতে হয়েছে সেই ১৯৯২ সন থেকে ক্যানাডায় টরন্টো শহরে এসে। টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা দেশে বিদেশে পত্রিকাতে সর্বপ্রথম লেখালেখিতে হাতেখড়ি। কোন মাদ্রাসা-মক্তবে লেখাপড়া না থাকা সত্বেও আমার ২০০৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রকাশিত ২৩টি বইয়ের মাঝে ১৫টিই ইসলাম ধর্মের নানা প্রসংগ নিয়ে লেখা। বাকিগুলো ছোটগল্প, selfhelp এবং কবিতা।

২০১৯-২০২৫ পর্যন্ত নূতন লেখা বইয়ের সংখ্যা ১৪টি (ইসলামী ৯টি এবং গল্প-কবিতা -selfhelp ৫টি)। দু’টি গল্পগ্রন্থ published online .বাকি ১২টি আজো অপ্রকাশিত।

বলতে গেলে এই সাহিত্যকর্মই আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য achievement.

ইতিমধ্যে আরো একটা কাজ করেছি। আমার তিনটা ভিন্নভিন্ন বই থেকে তিনটা লেখা একসাথে করে একটা আলাদা বই রচনা করেছি (২৩ পৃষ্ঠা), নাম দিয়েছি “আদর্শ জীবন” (আত্মউন্নয়ণমূলক কিছু আলোচনা)। বইটার ৩০টা কপি করে দেশে ও বিদেশে আত্মীয়-বন্ধুদের কাছে একে একে পাঠিয়ে দিয়েছি। কাজটা করতে পেরে আমি খুব তৃপ্তি বোধ করছি।

একটা সরকারী সিনিয়র্স বিল্ডিংয়ে বর্তমানে আমরা বাস করি। ছেলেরা নিয়মিত খোঁজখবর নেয়। সরকারের দেয়া মাসিক Old Age Security পাই, আর্থিক কোন সমস্যা নেই। স্বাস্থ্যগত সমস্যা যদিও সদাবর্তমান। Doctor’s appointments  আমরা স্বামীস্ত্রী দু’জনেই করি। Transport -এর ব্যবস্থাও আমরাই করি। জীবন একেবারেই নিশ্চল নয়। প্রাণের স্পন্দন আজো আছে।