বিয়ের বেড়াজাল
সাইদুল হোসেন
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
একজন সরলমনা নারীর মুখে শুনা দু’টি কাহিনী
ঢাকা। ১৯৮৯ অথবা ১৯৯০ সন। স্থান : Personnel Training Institute Office
(এক)
আমার বড় বোনের কথা
আমরা চার বোন। বড় বোন বেশ সুন্দরী। চোখে পড়ার মত সুন্দরী সে। ক্লাস টেনে পড়ার সময়েই এক যুবক ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রেম নিবেদন করে। আমার বড়বোনও সেই ডাকে সাড়া দেয়। গভীর প্রেম। একে অন্যকে ছাড়া বাঁচবে না, এমনি অবস্থা। সময় যায় কিন্তু সেই প্রেমিক বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে না। ওদিকে বোন আমার বিয়ে করে ঘর-সংসার করতে, সন্তানের মা হতে আগ্রহী।
এমনি সময়ে এক ধনী লোক আমার বড় বোনকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বোন রাজী হয় না। “আমার একজন প্রেমিক আছে, আমি তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবো না। আমরা দু’জন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ”, জানালো সে অকপটে।
“আপনার সেই প্রেমিক কে?” জানতে চাইলো সেই লোকটা। বোন তার পরিচয় দিলে সে বললো, “আরে সে তো গরীব লোক। আপনাকে বিয়ে করে সে প্রতিপালন করবে কিভাবে?”
বোন বললো, “তাহোক আমি তাকেই বিয়ে করবো।”

বোন অধীর আগ্রহে বিয়ের প্রস্তাবের অপেক্ষা করছে। একদিন খবর পেলো যে তার প্রেমিক অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করছে।
খবরটা শুনে বোন আমার পাগলের মত দৌড়ে সেই ছেলের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত। সে বাড়িতেই ছিল। “তুমি অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছ একথাটা কি সত্যি?” বোন আমার জানতে চাইলো।
ছেলেটা নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল, “হ্যাঁ, কথাটা সত্যি।”
“তুমি আমাকে বিয়ে করার কসমটা কেন ভংগ করলে?” “তোমার চেয়ে আরো ভালো মেয়ে পেলাম, তাই।” জবাব দিল সে।
হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে এলো বোন আমার। কয়েক সপ্তাহ মন মরা অবস্থায় কান্নাকাটি করে আঘাতটা সামলে নিয়ে দেখা করতে গেল সেই ধনী লোকটার সাথে। তাকে বললো, “আপনার প্রস্তাবে আমি রাজী।”
লোকটা বললো, “দুঃখিত, বড় দেরী করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যে আমি তো বিয়ে করে ফেলেছি।”
শুনে আমার বোন বললো, “আপনি যদি রাজী থাকেন আমি আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে সতীন নিয়ে ঘর করতে রাজী আছি।”
লোকটা বললো, “আমাকে কিছুদিন সময় দিন, ভেবে দেখি।”
কয়েক সপ্তাহ পর সেই লোকটা আমাদের রাড়িতে এসে বাবা-মার কাছে প্রস্তাব দিলো, “আপনাদের বড় মেয়ে আমার ঘরে একজন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছে। সতীনের সংসারে ওর কোন আপত্তি নেই। আমি আমার স্ত্রীকে বুঝিয়েশুনিয়ে রাজী করিয়েছি। এখন আপনারা রাজী হলে বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য করতে পারেন।”
বাবা-মা বড় আপাকে ডেকে ওর মতামত জানতে চাইলে সে সম্মতি দেয়। বিয়ে হয়ে গেল একদিন। বড় বোন তার স্বামীর বাড়ি চলে গেল।
আমার বোনটা তার প্রেমিকের উপর প্রতিশোধটা নিলো এইভাবে বটে কিন্তু তার পর থেকে ওর সুন্দর মুখটাতে মিষ্টি সেই হাসিটা আর নেই, হারিয়ে গেছে। বেশ কিছু বছর হয়ে গেল, কোন সন্তানাদিও নেই এপর্যন্ত।
(দুই)
আমার কথা
আমি কোন সুন্দরী নারী নই, তবে লোকমুখে শুনতে পাই যে আমার মাঝেও নাকি আকর্ষণীয় কিছু আছে। কিন্তু সেসব জানার বা অনুসন্ধান করার কোন সুযোগ আমি পাইনি। আমার বয়স যখন মাত্র ১২-১৩ বছর, এক এম.বি.বি.এস. ডাক্তার আমাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দেয়। “আমাদের মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি” বলে যতই আমার বাবা-মা আপত্তি জানায়, ডাক্তার ততই বলে, “সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি একজন ডাক্তার, আমি জানি।”
আমার জন্য একজন ডাক্তার স্বামী খোঁজা মা-বাবার ধারণাতেই ছিল না। সেই লোভনীয় পাত্র এখন সামনে হাজির। বিয়ে করতে আগ্রহী। বলছে, কোন খরচও লাগবে না। মেয়েকে তো একদিন বিয়ে দিতেই হবে। আবার এমন সুযোগ আসবে না। এসব কথা বিবেচনা করে তাঁরা রাজী হয়ে গেলেন।
বিয়ে হয়ে গেল। স্বামীর বাড়ি চলে গেলাম আমি। ছ’ মাস না যেতেই প্রেগন্যন্ট হয়ে গেলাম। সময়মতই এক কন্যা সন্তান প্রসব করলাম। সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী কন্যা। ডাক্তার দারুণ খুশী। খুশী আমিও।
কিন্তু খুশী-আনন্দটা বেশীদিন স্থায়ী হলো না। মেয়ের বয়স যখন ছ’ মাস, ডাক্তারের ব্যবহারে পাগলামীর লক্ষণ দেখা দিলো এবং মাস তিনেক পরেই বদ্ধ পাগল হয়ে কোথায় যে চলে গেলো, কোন সন্ধানই করতে পারলাম না আমরা।
শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে মেয়েটাকে সংগে নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলাম। দিন যায় কিন্তু স্বামীর দেখা নেই। মা-বাবা আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমি নিজেও। দু’বছর চলে গেল এমনি করে করে।
আমাকে আবার বিয়ে দেয়ার চিন্তা শুরু হলো। কিন্তু আমি তো এখনো একজনের স্ত্রী, সেটার কি হবে?
মা-বাবা ও শ্বশুর-শাশুড়ী গেলেন মসজিদে ইমাম ও মুল্লাদের পরামর্শ নিতে। ঘটনার বিবরণ শুনে তাঁরা বললেন যে আমি বর্তমানে একজন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কারণ ইসলামী শারী’আ আইনের বিধান অনুসারে পাগল স্বামীর স্ত্রী পাগলামী শুরুর দু’বছর পর automatically তালাক হয়ে যায়। আর এই ক্ষেত্রে তো সেই পাগল স্বামীও নিখোঁজ। সুতরাং আগ্রহী কোন পাত্র পেলে আপনাদের মেয়েকে নির্ভাবনায় আবার বিয়ে দিতে পারেন। কোন সমস্যা নেই।
আরো এক বছর পর এক আগ্রহী পাত্র এগিয়ে এলো। বললো যে আমার সন্তানটি সহই সে আমাকে বিয়ে করতে রাজী আছে। বিয়ে হয়ে গেলো। পাতলাম দ্বিতীয় সংসার। সেঘরে এলো পরপর আরো দু’টি মেয়ে। ম্যাটৃকটা পাস করলাম এসব ঝামেলার মাঝেই। স্বামীর অফিসেই একটা ছোটখাট কাজও জুটিয়ে দিলেন তার বস। দু’জনের আয়ে সুখেদুঃখে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। আমার এই স্বামীটা একজন উত্তম লোক, সে আমাকে খুব ভালোবাসে। আমার বয়স এখন ২৮ বছর।
(তিন)
ইয়েস অর নো?
১৯৯৫ সনের জুন অথবা জুলাই মাসের ঘটনা। টরন্টো শহরের কোন এক ঠিকানায় আমার যাওয়া দরকার ছিল কিন্তু জায়গাটা আমার অপরিচিত। তাই খোঁজ খবর নিয়ে সাবওয়েতে গিয়ে ট্রেনে চড়লাম এক সকালে। ট্রেইন থেকে নেমে উপরে উঠলাম বাস ধরতে। আমাকে বলা হয়েছিল সাউথবাউন্ড বাসে চড়তে কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজি করেও সাউথবাউন্ড বাসস্টপ পেলাম না, পেলাম নর্থবাউন্ড বাসস্টপ। সেখানে একজন মাত্র বৃদ্ধ যাত্রী দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁকে আমার সমস্যার কথা বললাম। শুনে তিনি বললেন, “তুমি ঠিক জায়গাতেই পৌঁছেছ। সাউথবাউন্ড কোন বাস নেই এখানে, তুমি যেখানে যেতে চাচ্ছ সেখানে এই নর্থবাউন্ড ধরেই যেতে হয়। আমি তো ওখানেই যাচ্ছি। ফলো মি। ইয়েস অর নো?”
হেসে বললাম, “ইয়েস। থ্যাঙ্কস্। তবে রাস্তার পুলিশ অফিসার এবং বাসে যেতে হলে বাস ড্রাইভারই হচ্ছে বেস্ট গাইড। বাস আসলে ড্রাইভারকেও জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে।” বলতে বলতেই দূরে একটা বাস আসতে দেখা গেল। বৃদ্ধ বললেন যে ওটাই আমাদের নর্থবাউন্ড বাস। বাস এসে আমাদের ঠিক সামনেই থামল। দেখলাম, হ্যাঁ, ১৮নং নর্থবাউন্ড বাসই বটে। বৃদ্ধ আমার পিঠে হাত রেখে প্রশ্ন করলেন, “ইয়েস অর নো?” বললাম, “ইয়েস।” তারপর বললাম, “আপনি আগে উঠুন, আমি আপনাকে ফলো করব।”
বাসে উঠে ড্রাইভারকে আমার গন্তব্যস্থানের কথা বললে সে জানাল যে আমি সঠিক বাসেই চড়েছি, নো প্রোবলেম। বৃদ্ধ তাঁর পাশের সীটে আমার জন্যে জায়গা দখল করে রেখেছেন। আমার কথা শেষ হতেই তিনি ইশারায় আমাকে তাঁর পাশে গিয়ে বসতেই তিনি প্রশ্ন করলেন, “ড্রাইভার কি বলল? আমি যা বলেছিলাম তা ঠিক? ইয়েস অর নো?” বৃদ্ধের কথাবার্তায় আমি খুব মজা পাচ্ছিলাম। তাই হেসে বললাম, “ইয়েস।” ইতিমধ্যে বাস চলতে শুরু করেছে। তিনি তাঁর বাঁ হাত বাড়িয়ে একটা রাস্তা দেখিয়ে আমাকে বললেন, ওই দিকটা হলো সাউথবাউন্ড কিন্তু কোন বাস ওদিকে রান করে না। দেখবে আমাদের বাসটা রাইট টার্ন নেবে, সে-দিকটা হলো নর্থ।
বাস ঠিক তাই করল। তখন উজ্জ্বল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়েস অর নো?” পূর্ববৎ হেসে জবাব দিলাম, “ইয়েস।”
তারপর প্রসঙ্গ বদলে প্রশ্ন করলেন, “ডু আই লুক লাইক আ ক্যানাডিয়ান? লুক এট মাই ফেইস এ্যান্ড সে ইয়েস অর নো।” তাঁর গায়ের চামড়ার রঙ এবং ইংরেজী বলার ধরণ কোনটাই ক্যানাডিয়ানদের মত নয়। তাই বললাম, নো। তিনি সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “রা-ই-ট! নো ডাউট এ্যাবাউট ইট। পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এদেশে বাস করছি বটে তবে আসলে আমি একজন পর্তুগীজ, পর্তুগাল হচ্ছে আমার দেশ।” বাস চলছে।
সামনে একটা মেজর রোড ইন্টারসেকশন। ওটা দেখিয়ে তিনি বললেন, “ওখানে আমরা নামব।” নামলাম। দেখলাম আমার হাতের কাগজে লেখা অফিসের নাম, রাস্তার নাম ও নাম্বার এবং টেলিফোন নাম্বার একটা সাইনবোর্ডে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে। বৃদ্ধ আমার হাত ধরে রাস্তা পার করালেন এবং ঠিক সেই অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে বড় একটা হাসি দিয়ে আমার দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি তাঁর হাত আমার হাতে নিলাম। বললেন, “আমি তোমাকে ঠিক বলেছিলাম না? ইয়েস অর নো?”
বললাম, “ইয়েস এ্যান্ড থ্যাঙ্কস্।” আমার ডান হাতে চাপ দিতে দিতে আবার বললেন, “অলওয়েজ ট্রাস্ট অ্যান ওল্ডম্যান।” বললাম, “ইয়েস এ্যান্ড আই উইল রিমেম্বার দ্যাট।” শুনে আমার হাতে একটা ঝাঁকি দিয়ে ছেড়ে দিলেন। তারপর ‘বা-ই বলে হাত নাড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে একটা ওয়াকওয়ে ধরে একটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার ভিতর ঢুকে গেলেন। এবার আমিও সেই অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। এবং ভাবতে লাগলাম, কি বিচিত্র এই জগৎ!
