আমেরিকা ও কানাডা শরণার্থীর দেশ
নজরুল ইসলাম
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
“১৯৮৬ সালের অভিবাসন সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ আইন, আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে আইনে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে রিগ্যান কোনো এক সময় বলেছিলেন, “ জাপানের মতো ধনী দেশেও যদি অবৈধ অভিবাসী বা উদ্বাস্তু প্রবেশ করে, সে দেশের সরকার ওদের স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার দেয় না। কিন্তু আমরা অবৈধ অভিবাসীদের সে সুযোগ দিয়ে থাকি। এই দেশের আনাচে কানাচে যে সব বহিরাগত অবৈধ লোক সূর্যের আলোতে গা ঢাকা দিয়ে জীবিকা অর্জন করে, তাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার সুযোগ দেব। ”
আমেরিকা ও কানাডাকে শরণার্থীর দেশ (refugee country ) বলা হয়। আলবার্ট আইনস্টাইন একজন জার্মান নাগরিক; অ্যাডলফ হিটলার জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে নাৎসি “নির্মূলের যুদ্ধে” জড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তাঁকে আমেরিকান নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ছিলেন স্কটিশ বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান-মার্কিন উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী যিনি প্রথম ব্যাবহারিক টেলিফোনের আবিষ্কারক। আমেরিকা এবং কানাডায় যত বড়ো বড়ো ব্যক্তি, সবাই ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ থেকে এসে কঠোর পরিশ্রম করে এ দেশকে ঢেলে সাজিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পর থেকে ইউরোপের শরণার্থী আমেরিকা ও কানাডায় এসে আশ্রয় নিয়েছে, আমাদের দেশের লোকেরাও ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া বাস করে। আফ্রিকার প্রতিটি দেশে ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোক বাস করে আসছে। ঋষি সুনাক, ভূতপূর্ব ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ১৯৬০ এর দশকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে তাঁর পিতামাতা ব্রিটেনে অভিবাসিত হয়েছিলেন। কমলা হ্যারিস, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট; তিনি প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান, প্রথম এশীয় আমেরিকান এবং প্রথম মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্ট। কমলা হারিস বর্তমানে প্রেসিডেনশিয়াল নোমিনেশন নিয়ে ডোনাল ট্রাম্পের সঙ্গে নির্বাচনে নেমেছেন, কে জানে হয়ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবেন। ঐতিহ্যগতভাবে, নেটিভ আমেরিকানরা উত্তর-পূর্ব এশিয়া থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। আজ কানাডা বিশ্বের সবচেয়ে বহু-সাংস্কৃতিক দেশ, এবং বিশ্বের প্রতিটি দেশ থেকে প্রতিটি জাতিগত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর অভিবাসীদের আবাসস্থল। কিন্তু কানাডায় বসবাসকারী একমাত্র মানুষ ছিল কানাডার “আদিবাসী “জনগোষ্ঠী বা কানাডার মূল বাসিন্দা, যারা অনেকাংশে অবহেলিত এবং সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
২
কিন্তু সব দেশ কি মানুষকে সে ভাবে মূল্যায়ন করে?
মায়ানমারে অনেক জাতিগত সংখ্যালঘু যেমন : শান, বার্মিজ, চীনা, মগ, রোহিঙ্গাসহ আরও বহু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। রোহিঙ্গারা মূলত মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস করে। ঐতিহাসিকভাবে, তারা কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ছিল। নিরীহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন শ্রেণির বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত, ওই দেশের সামরিক সরকার তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে, দেশের মৌলিক পরিষেবাগুলিতে সীমিত প্রবেশাধিকার দিয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত করেছে।

বহুদিন থেকেই মায়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার। এই রোহিঙ্গারা মায়ানমারের অনেক জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটি। ২০১৭ সালের শুরুতে মায়ানমারে প্রায় ১০ লাখ বা তার ও বেশি রোহিঙ্গা ছিল, তারা দেশটির অনেক জাতিগত নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের মধ্যে অন্যতম। তাদের “রোহিঙ্গা মুসলিম”, “মুসলিম আরাকানিজ” এবং “বার্মিজ মুসলিম” বলা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫ ) সময়, রোহিঙ্গারা ব্রিটিশদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিলো, যদিও মায়ানমারের জাতীয়তাবাদীরা জাপানিদের সমর্থন করেছিল। যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা রোহিঙ্গাদের কিছু কিছু লোককে মর্যাদাপূর্ণ সরকারি পদে পুরস্কৃত করে এবং তাদের কে স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র দেওয়ার অঙ্গীকারও করে, যদিও তা বাস্তবে দেয়া হয়নি।
মায়ানমার ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর রোহিঙ্গারা প্রতিশ্রুত স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রের দাবি জানালেও মায়ানমার কর্মকর্তারা তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। তাদেরকে বিদেশি আখ্যায়িত করে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে। ১৯৫০ সালে কিছু রোহিঙ্গা নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তারা নাগরিকত্ব দাবি করে, তারা সেই স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র চেয়েছিল যা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়াও হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী সেই আন্দোলনকে দমন করে।
১৯৮২ সালে প্রণীত মায়ানমারের নাগরিকত্ব আইন আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার অস্বীকার করে। তাদেরকে বিদেশি আখ্যায়িত করে এবং সেনাবাহিনী তাদের উপর হত্যা, নির্যাতন চালায়, ধর্ষণ করা হয় অসংখ্য নারীকে। তারা রোহিঙ্গাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তারা বেসরকারি রোহিঙ্গা ব্যাবসাও বন্ধ করে দেয়, যার ফলে গোষ্ঠীটি আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। উপরন্তু, রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক শ্রম, নির্বিচারে আটক এবং শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছিল।
২০১৭ সালে মায়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের উপর নতুন করে আক্রমণ চালায়, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় এবং দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এ পর্যন্ত এগারো লক্ষ (১.১ মিলিয়ন ) বা তার ও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী মায়ানমারে জাতিগত ও ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্যের উচিত, মায়ানমারের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রেরণ করা। ভেদাভেদ ভুলে, সকল সদস্য দেশ এগিয়ে এসে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির স্থায়ী নিষ্পত্তি করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মায়ানমারে সামরিক শাসন দীর্ঘদিন স্থায়ী ছিল এবং ২০২১ সালে পুনরায় অং সান সু চি’র বেসামরিক নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুনরায় ক্ষমতা দখল করে। মায়ানমার ২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে সম্মত হলে ও বাস্তবে হয়নি।
যে সব দেশে সামরিক সরকার একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে বসে, সে সব দেশে গণতান্ত্রিক সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, মায়ানমারে ও তাই হচ্ছে। এ দেশটি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি ও বিপর্যয়ের মুখে। কোনো দেশেই স্বৈরাচারী সরকার সুষ্ঠুভাবে বেশিদিন দেশ পরিচালনা করতে পারে না। লিবিয়ার গাদ্দাফি স্বৈরাচার সরকার চলে যাওয়ার পর, দেশ আজ পর্যন্ত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে এবং স্থিতিশীল সরকার গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। সিরিয়ার হাফেজ আসাদ চলে যাওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরি বাসার আসাদ এবং দেশের অরাজকতা চরমে, এ দেশটিও বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে।
মায়ানমারের ১.১ মিলিয়ন শরণার্থী বাংলাদেশের জন্য বিরাট সংকট নিয়ে এসেছে; প্রতি বছর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের থাকা খাওয়া ও বিবিধ খরচের জন্য প্রচুর পরিমাণ অর্থ সাহায্য দরকার। এ ছাড়া এদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বাড়তি খরচ ও প্রয়োজন। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ, এ দেশে এই বাড়তি জনসংখ্যা স্থায়ীভাবে রাখা কোনোক্রমেই সমীচীন হবে না। চীন এবং রাশিয়া সহ প্রতিটি UNO সদস্য দেশ এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসে মায়ানমারের সামরিক সরকারকে চাপ দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। “জোর যার মুল্লক তার” এই নীতির ফলে সারা দুনিয়াতে অশান্তি চরমে পৌঁছেছে। সবাই মুখে মুখে বলে ” আমরা শান্তি চাই “; কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত।
নজরুল ইসলাম
টরন্টো
ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫
