ওবিসিএস ও সাহিত্য পরিষদের যৌথ উদ্যোগে টরন্টোতে মহান বিজয় দিবস উদযাপন

মোয়াজ্জেম খান মনসুর : গত ২০শে ডিসেম্বর ,শনিবার ২০২৫ টরন্টোর স্কারবরোতে অবস্থিত Highway Gospel Church এর (৫৩০ মিডল্যান্ড এভ্যেনু) মিলনায়তনে অন্টারিও বাঙ্গালী কালচারাল সোসাইটি (ওবিসিএস) এবং বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো, ক্যানাডা এর যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের ৫৪তম মহান  বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়।

ডিসেম্বরের তীব্র শীতের আঁচলে ঢাকা টরন্টো শহর, হিমাংকের ০৭ ডিগ্রী নীচের তীব্র হিমেল হাওয়া ঠেলে -ঠেলে জড়ো হয়েছিলেন শহরের এক ঝাঁক কবি, লেখক, সাংবাদিক, উপন্যাসিক, গবেষক, কন্ঠশিল্পী, আবৃত্তি শিল্পী এবং সংস্কৃতিমনা বাঙালি ও বোদ্ধা জনরাও যারা স্বল্পকালীন ও সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রবাসে বসবাস করেও দিন রাত হৃদ মাঝারে ধারণ করে আছেন লাল সবুজের বাংলাদেশকে।

অন্টারিও বাঙালি কালচারাল সোসাইটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জসীম উদ্দীনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির সূচনা হয় । এরপর সমবেত কন্ঠে বাংলাদেশ ও কানাডার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন স্থানীয় শিল্পীবৃন্দ। এই সময় সবাই দাঁড়িয়ে দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

এরপর শুরু হয় আলোচনা পর্ব। আলোচনা পর্বের শুরুতে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।

এই পর্বটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো এবং সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলা সাহিত্য পরিষদের আহ্ববায়ক কবি মোয়াজ্জেম খান মনসুর।

আলোচনা পর্বে অংশ গ্রহণ করেন লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক সোনা কান্তি বড়ুয়া, কবি অধ্যাপক ড. গাওসর রেজা, লেখক অধ্যাপক মাহমুদা নাসরিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা চন্দন কুমার সাহা এবং কবি দেলওয়ার এলাহী। আলোচনা সভায় বক্তারা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ও মব জাস্টিসের ভয়াবহতা, হত্যা এবং মুক্তিযোদ্ধের প্রতি ভয়নক অবমাননার কথা তুলে ধরেন। একাত্তরে পাকবাহিনীর দোসর, গনহত্যার সহযোগী জামায়েত ইসলাম এই বিজয়ের মাসে ‘একাত্তর একটি নস্ট প্রজন্ম’ বলে যে চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছে সেকথা উল্লেখ করেন।

বক্তারা বলেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বিচারবহির্ভূত যে বিভৎস নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড চলছে এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম! আমরা আশাবাদী ধর্মের নামে ঘন অন্ধকার অধর্ম বর্বর হত্যাকান্ডের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ অসম্প্রদায়িক সোহার্দপূর্ণ মমতায় ভরা পথের দেখা পাবে। রাজনীতির ময়দানে হত্যা, সহিংসতা, ক্রোধ, প্রতিহিংসা, মব ভায়োলেন্সের নিষ্ঠুর বর্বরতা একদিন বিদায় নিবে প্রিয় মাতৃভূমি থেকে।

আলোচনা পর্ব শেষে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা চন্দন কুমার সাহা’র হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন অন্টারিও বাঙালি কালচারাল সোসাইটির সভাপতি জসীম উদ্দীন এবং বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো’র আহব্বায়ক মোয়াজ্জেম খান মনসুর।

গ্রেটার টরন্টোতে বসাবসরত রণক্ষেত্রের বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ কিং হোসেন, কাজী সরওয়ার এবং ইমদাদুল হক’কে ফুল দিয়ে শুভেছা জানান বাহাউদ্দিন রতন ,লাভলী রহমান ও রিনা ঘোষ। দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মাননা সনদ দেওয়া হয় সম্পাদক খুরশিদ আলম এবং বুয়েট এলামনাই এসোসিয়েশন কানাড ‘র সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুস  সালামকে । তাদের হাতে সনদ তুলে দেন অন্টারিও বাঙালি কালচারাল সোসাইটির পরিচালক মোনা দেওয়ান এবং সদস্য মাহবুব উদ্দিন আলো। স্বেচ্ছাসেবক সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় অহনা,ভূমি এবং লাজিমকে।

অনুষ্ঠানে সুনীতি সর্দারের নেতৃত্বে সমবেত কন্ঠে সংগীত পরিবেশন করেন মোনা দেওয়ান, সৈয়দা রুখসানা বেগম , রিনা বেগম,লাভলী রহমান, নুরুন বেগম এবং গোলাম মহিউদ্দিন। একক সংগীত পরিবেশন করেন কাশফিয়া চৌধুরী,সৈয়দা রুখসানা বেগম, রেহেনা মশিউর, সুনীতি সর্দার ও রাজিয়া সুলতানা মুন্নী। নৃত্য পরিবেশন করেন ভূমী। আবৃত্তিতে অংশ গ্রহণ করেন সাংবাদিক তাপস কর্মকার, গোলাম মহিউদ্দিন ও মোহাম্মদ সালাম। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন অন্টারিও বাঙালি কালচারাল সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ফারহানা পল্লব , গোলাম মহিউদ্দিন এবং বাংলা সাহিত্য পরিষদের মোয়াজ্জেম খান মনসুর।

৫৪ তম বিজয় দিবস উপলক্ষে অন্টারিও বাঙালি কালচারাল সোসাইটি এবং বাংলা সাহিত্য পরিষদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয় একটি সংকলন ‘অবিনাশী মুক্তিযুদ্ধের প্রতিলিপি’এই শিরোনামে। এই সংকলনে লিখেছেন গ্রেটার টরন্টোতে বসবাসরত একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা। তারা রণাঙ্গনে তাদের নিজ -নিজ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এই সংকলনে। পাশাপাশি সাহিত্য পরিষদের লেখকরা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক  প্রবন্ধ। সংকলনটি’র সম্পাদনায় ছিলেন খুরশিদ আলম।

অনুষ্ঠানটির মঞ্চ সজ্জায় ছিলেন জনাব লুৎফর রহমান এবং শব্দ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন গোলাম মহিউদ্দিন ও মোহাম্মদ সালাম।

মহান বিজয় দিবসের মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি হয় রাত সাড়ে দশটায়।