অনুতপ্ত তরুণী

[অতীত জীবনের কিছু স্মৃতি]

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সাইদুল হোসেন

১৯৮১ সন। জুলাই মাস। বার্মাতে তিন সপ্তাহের একটা Study Tour শেষ করে রেঙ্গুন এয়ারপোর্টের প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে বসে ব্যাংকক থেকে বিমান বাংলাদেশ-এর ফ্লাইট আসার অপেক্ষা করছি, ঢাকা ফিরব। এমন সময় দেখি বাংলাদেশের বিখ্যাত পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গায়ক মোস্তফা জামান আব্বাসী কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে এসে উপস্থিত। আস্সালামু আলাইকুম, ওয়ালাইকুম সালাম বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আইতাচেন না যাইতাচেন?’ হেসে বললেন, ‘যাইতাচি। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে একটা আন্তর্জাতিক পল্লীগীতি সম্মেলন হচ্ছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেখানে যাচ্ছি। তারপর কিছু টুকরা কথাবার্তার পর ছুটলেন তাঁর প্লেইন ধরতে।

পরক্ষণেই এসে উপস্থিত স্বাস্থ্যবতী এক তরুণী, হাতে সাধারণ একটা ব্যাগ। মলিন মুখ। ঠিক আমারই পাশে বসে এসে বসলো। বললো, ঢাকা হয়ে ইন্ডিয়ার পুনা শহরে ওর গুরুদেবের আশ্রমে যাচ্ছে। এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। সে অস্ট্রেলিয়ান, পেশায় স্কুল টীচার। কথা বলতে বলতে আমাদের প্লেইন ছাড়ার সময় এসে গেল। দু’জনে একই সঙ্গে হেঁটে গিয়ে প্লেইনে চড়লাম, এবং দেখা গেল আমাদের দু’জনের সীট ঠিক পাশাপাশি, আমারটা আইল সীট আর ওরটা উইন্ডো সীট। ভালই হলো।

কিছুক্ষণ পর ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় বসে ইন্ডিয়ার গুরুদেবের সন্ধান পেলে কি করে এবং এত অল্প বয়সে গুরুদেবেরই বা প্রয়োজন পড়লো কেন?

আমার প্রশ্ন শুনে বেশ কিছু সময় সে চুপ করে রইলো, কি যেন একটা দ্বিধা বা বাধা কাটিয়ে উঠতে চায় কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। অবশেষে একটা করুণ হাসি হেসে বললো, “বিষয়টা খুবই লজ্জার কিন্তু তোমাকে খুলে বললে হয়তো মনের বোঝাটা হাল্কা হবে, চেপে রেখেও তো শান্তি পাচ্ছি না। বলেই ফেলি।” এরপর তরুণী শুরু করলো তার জীবনের এক অধ্যায়ের কাহিনী।

ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট আমি, শিক্ষকতা আমার পেশা সেটা তোমাকে আগেই বলেছি। ছোটবেলা থেকেই দেশ-বিদেশ দেখার খুব আগ্রহ, ইতিমধ্যে নিউজিল্যান্ড ঘুরেও এসেছি একবার। বরাবরই ইচ্ছা লম্বা একটা ভ্রমণে বের হবো, অনেকগুলো দেশ দেখে তবে ঘরে ফিরবো। সেজন্য চাই অনেক ডলার কিন্তু শিক্ষকতার আয় থেকে অত ডলার বাঁচানো অসম্ভব। তাই সুযোগের সন্ধানে ছিলাম সহজ উপায়ে মোটা আয়ের। লটারীও খেলেছি, কিন্তু কোন উপকার হয়নি। এমনি সময়ে একদিন আমাদের শহরের এক দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন- ফিশিং ট্রলার নিয়ে পাঁচ জন সমুদ্রে যাচ্ছে পাঁচ মাসের জন্যে, তাদের একজন মহিলা কুক দরকার। বেতন-ভাতা-বোনাস অত্যন্ত লোভনীয় অঙ্কের। খাওয়া-থাকা তো ফ্রী আছেই। হিসেব করে দেখলাম এই কাজটা পেলে পাঁচ-ছ’ মাসের মধ্যেই আমার আকাঙ্ক্ষিত দেশভ্রমণের খরচটা উঠে আসবে। আমার জমানো কিছু ব্যাঙ্ক ব্যালান্স তো রয়েছেই।

লোভ আমার ভালোমন্দ বিচারের শক্তি লোপ করে দিলো, হয়ে গেলাম অপরিণামদর্শী। রিস্ক থাকতে পারে এমন ধরনের কাজে সে কথাটা মনে আমলই দিলাম না। দিলাম দরখাস্ত করে। সাতদিনের ভেতরেই ইন্টারভিউ শেষে জব অফার হাতে পেয়ে গেলাম। আমি তো মহা খুশী, বারবার কত ডলার জমানো যাবে সেই হিসেব করতে লাগলাম। তারপর একদিন পাড়ি দিলাম ট্রলারে চড়ে গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে। ছ’মাসের ছুটি নিলাম স্কুল থেকে।

ছবি : ফ্রিপিক

সপ্তাহ-দশদিন ভালোই কাটলো। আমি রান্না করি ট্রলারের অপর পাঁচ জন খায়, প্রশংসা করে। ওরা পাঁচজনই পুরুষ, ৩০ থেকে ৪০ বছরের মাঝেই ওদের বয়স। সবারই অমায়িক ব্যবহার। রান্না আমি ভালোই জানি, তাই ভাবলাম আমার হাতের রান্না খেয়ে ওরা খুব খুশী। হাল্কা মন নিয়ে তাই দিন কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু তারপরই সব ওলটপালট হয়ে গেল।

একদিন ডিনারের পর ওদের একজন আমাকে উদ্দেশ করে বললো, “মার্থা, তোমাকে একটা কথা বলা দরকার। সেটা হলো এই যে, প্রকৃতপক্ষে আমাদের কুকের প্রয়োজন অতি সামান্যই, আমরা সবাই মোটামুটি ধরনের রান্না জানি, সেটা কোন সমস্যা নয়। আমাদের যা প্রয়োজন সেটা হলো একজন শয্যাসঙ্গিনীর। সেজন্য মহিলা কুক চাই বলে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম।”

কথাটা শুনে আমি চমকে উঠলাম, ভয়ও পেয়ে গেলাম দারুণ রকম। এই গভীর সমুদ্রে আমার প্রতিবাদ করার বা পালিয়ে যাবার পথ রুদ্ধ, নারাজী দেখালে প্রাণের আশঙ্কাও বিদ্যমান। খাঁচায় বদ্ধ পাখী আমি, বড় জোর পাখা ঝাপটাতে পারি তার বেশী কিছু নয়। চুপ করে বসে ঘামতে লাগলাম, পয়সার বিনিময়ে দেহদান করতে হবে?

তখন অন্য একজন বললো, “তোমার ভয়ের কিছু নেই। এটাকে যদি সহজভাবে গ্রহণ কর তাহলে কোন সমস্যাই নয় তোমার জন্যে। কো-অপারেশনটা উত্তম বস্তু। তাছাড়া আমাদের প্রস্তাবের একটা আর্থিক দিকও রয়েছে যা শুনলে তুমি দেখবে যে আমরা লোকগুলো অবিবেচক নই। আমাদের সঙ্গে সহযোগিতার পুরস্কারস্বরূপ তোমাকে আমরা তোমার চুক্তির বাইরেও আরো দশ হাজার ডলার দেবো। সুতরাং ভেবে দেখ, এখনি জবাব দিতে হবে না তোমাকে।”

ডাইনিং টেবিল ছেড়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে আমার বেডরুমে ঢুকলাম। সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। পরের দু’রাতও এমনি করেই কাটলো, ওরা কোন তাড়া দিলো না। কিন্তু আমাকে তো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতেই হবে। অবশেষে যা অপ্রতিরোধ্য তাকে সহজভাবে মেনে নেয়াটাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হলো। বললাম, “হ্যাঁ, তোমাদের প্রস্তাবে আমি রাজী আছি।”

পাঁচ মাস নরকবাস শেষে ডাঙ্গায় ফিরে এলাম। লিখিত এবং মৌখিক চুক্তির পাই-পয়সা হিসাব করে আমার পাওনা মিটিয়ে দিলো ওরা, আর জানালো অজস্র ধন্যবাদ।

ঘরে ফিরে এসে এই জঘন্য জীবন কাটানোর জন্যে পাপবোধ আমার সমস্ত সত্ত্বাকে কুরেকুরে খেতে লাগলো। নিজেকে মনে হতে লাগলো এক ঘৃণ্য প্রাণী যার দেহ হয়েছে উচ্ছিষ্ট, অপবিত্র; যার আত্মা গিয়েছে মরে। ঘৃণ্য পাপী, নরকের কীট আমি। কিছুতেই শান্তি পাই না। ছুটে বেড়াই চার্চ থেকে চার্চে; এক পাদ্রীর কাছে গিয়ে করলাম কনফেশন। কিন্তু কোথায় শান্তি? কোথায় স্বস্তি? কাউকে খুলেও বলতে পারি না কি জ্বালায় জ্বলছি আমি অহরহ।

এমনি যখন আমার মনের অবস্থা তখন একদিন লক্ষ্য করলাম যে শহরের একটা গলিতে বেশ কিছু লোকজনের ভীড় যেখানে অনেক নারী-পুরুষের পরনেই ইন্ডিয়ান পোশাক। পাগড়ী, শাড়ী, ধুতি ইত্যাদি। উৎসুক হয়ে সেখানে গিয়ে দেখি একটা বড় হলের ভেতরে একজন বৃদ্ধ লোক পদ্মাসনে হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বসে আছেন। কিছু লোক তাঁর পাশে এবং বাইরে থেকে বহু নরনারী সেই বৃদ্ধের কাছে পৌঁছাতে চাচ্ছে। বৃদ্ধের পরণে হলুদ রঙের একটা ধুতি, গায়ে কোন কাপড় নেই একটিমাত্র পৈতা ছাড়া। নানাবিধ আলোচনা চলছে বাইরে মুখেমুখে। কয়েকজনকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম যে তিনি একজন সিদ্ধ পুরুষ, গভীর জ্ঞানী, পাপীতাপীদের ভগবানের দয়া লাভ করার রাস্তা দেখিয়ে দেন, তাঁর সান্নিধ্যে গেলে আত্মা শান্তির সন্ধান পায়। বলে কি! এই তো আমি চাই! ভীড় ঠেলে আমি এগিয়ে যাচ্ছি দেখে লোকেরা আমার জন্যে পথ করে দিলো। আমি সেই বৃদ্ধের সম্মুখে গিয়ে জোড় হাত করে বসলাম কারণ অন্যরাও ঠিক এমনি করেই বসে আছে তাঁর সামনে এবং আশেপাশে। ওরা সবাই ইন্ডিয়ান, শুধু আমিই ব্যতিক্রম। তিনি আমাকে সামনে এগিয়ে যাবার ইঙ্গিত করলে আমি এগিয়ে গেলাম। কাছে পৌঁছলে তিনি জানতে চাইলেন আমি কি চাই। বললাম আমি পাপী, শান্তির সন্ধানী আমি। শুনে বললেন, তুমি পাশের কামরায় গিয়ে অপেক্ষা কর। উপস্থিত লোকজনদের সঙ্গে আমার আলোচনা সেরে আমি তোমার কথা গুনবো, তবে তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে, মা।

বহুক্ষণ পর তিনি এসে আমার সামনে রক্ষিত চেয়ারে বসলেন। শুনলেন আমার সব কথা। অবশেষে বললেন, “দেখ, পাপীর আশ্রয় সর্বদাই ভগবানের পায়ে। অনুতাপে দগ্ধ পাপীদের তিনি ক্ষমা করেন এই বিশ্বাস নিয়ে এবং নিজের জীবনকে কলুষমুক্ত রেখে তবে ভগবানের দরজায় ধর্ণা দিতে হবে। কঠিন সাধনা সেটা, তার জন্যে তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু তুমি তো হিন্দু নও, খ্রীষ্টীয়ান। হিন্দু ধর্মের ভগবানে কি তোমার বিশ্বাস হবে? আমি বলছি না তোমাকে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে হবে, মোটেই তা নয়, বলছি শুধু ভগবানে অকপট, অবিচল বিশ্বাসের কথা। যদি সেই ভক্তি, সেই বিশ্বাস তোমার মনের গভীরে স্থাপন করতে পারো, তাহলে গুরুদেব সম্ভবতঃ তোমার পাপমোচনের, শান্তিলাভের পথ বাৎলে দিতে পারেন।”

আমি তখন জানতে চাইলাম গুরুদেব কে এবং তিনিই বা কে? তিনি কি গুরুদেব নন? অত্যন্ত বিনীতভাবে কপালে জোড়হাত ঠেকিয়ে তিনি জানালেন যে, না তিনি গুরুদেবের একজন নগণ্য শিষ্য মাত্র, গুরুদেব তাকে স্নেহ করেন। গুরুদেব থাকেন ইন্ডিয়ার পুনা শহরে, সেখানে তাঁর আশ্রম রয়েছে আমার মত পাপমুক্তি-প্রত্যাশী নরনারীর জন্যে। ওখানে যাওয়া-আসার খরচ নিজের কিন্তু থাকা-খাওয়ার খরচ আশ্রমের। তবে আশ্রমে যাওয়ার আগে এখানে কয়েক সপ্তাহ যাতায়াত করতে হবে, কিছু নিয়মপদ্ধতি শিখতে হবে, তারপর তিনি আমার সম্পর্কে গুরুদেবের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন।

আমি তাঁর কথামত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছি, নিজেকে ধিক্কার দেয়ার মাত্রাটা কমেছে, তবে পাপমোচনের জন্যে যে সাধনা সেটাই বাকি রয়ে গেছে। যাচ্ছি গুরুদেবের কাছে, দীক্ষা নেবো তাঁর কাছে, তিনি পথ দেখাবেন এই পাপিনীকে। এই বিশ্বাসই আমার এখন পথ চলার সম্বল। জানি না কখনো গ্লানিমুক্ত জীবন ফিরে পাবো কিনা।

সাইদুল হোসেন

মিসিসাগা