দুরারোগ্য এক মরণ ব্যাধি কেড়ে নিল কানাডায় পড়তে আসা বাংলাদশী প্রিন্সের সব স্বপ্ন

আফিস মাহমুদ প্রিন্স। ছবি : ড্যারিল মারফি/ সিবিসি

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক , নভেম্বর ২৫ ২০২৫ : আফিস মাহমুদ প্রিন্স। যৌবনে পদার্পণের পর বাংলাদেশ থেকে সুদূর কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসাবে পাড়ি জমিয়েছিলেন জীবনটাকে আরো সুন্দর করে সাজানোর জন্য।
কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস- সেই প্রিন্স আজ যমের সাথে এমন এক লড়াই করছেন যে লড়াইয়ে জেতার কোন সম্ভাবনাই নেই। পরাজয় নিশ্চিত এবং তা এক দুই বছরের মধ্যেই। তার চিকিৎসকরা এমনটাই ভবিষ্যতবাণী করেছেন। সিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে আসিফ মাহমুদ প্রিন্স এর এই করুন কাহিনী তুলে ধরা হয় গত ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ সালে।
আসিফ মাহমুদ প্রিন্স কানাডায় এসেছিলেন উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায়। ভর্তি হয়েছিলেন মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অফ নিউফাউন্ডল্যান্ড এ। Newfoundland and Labrador প্রভিন্সে অবস্থিত এই ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। কিন্তু ২০২২ সালের আগস্ট মাসে প্রিন্সের জীবনে শুরু হয় অত্যন্ত বিষাদময় এক করুণ অধ্যায়ের। চিকিৎসকরা জানান তিনি মেটাস্ট্যাটিক থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এবং আরো খারাপ খবর হলো, এই রোগের কোন চিকিৎসা নেই। মৃত্যু অবধারিত এবং তা ঘটতে পারে পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই।
তবে একটি সুখবরও অপেক্ষা করছিল প্রিন্সর জন্য। স্থানীয় সেন্ট জনস শহরের সেন্ট ক্লেয়ার মার্সি হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার মাত্র কয়েকদিন পর প্রিন্স জানতে পারেন যে তিনি বাবা হতে চলেছেন।
প্রিন্স সিবিসিকে বলেন “আমি তখন আমার নিজের জীবন নিয়েই ভীত ছিলাম। ভীত হয়ে উঠেছিলাম বাবা হওয়ার বিষয়েও। তারপর বাচ্চার জন্যও ভয় পেয়েছি। কী করব আমি? আমি কি আমার সন্তানের জীবনে থাকব নাকি থাকব না?”
তার ডাক্তার অবশ্য এখন তার রোগটাকে কিছুটা উপশমযোগ্য বলে মনে করছেন, এবং প্রিন্সকে বলেছেন যে তিনি সম্ভবত আরও দুই থেকে তিন বছর বাঁচবেন।
প্রিন্সের ছেলে এখন দুই বছর বয়সী, এবং তার প্রাক্তন বান্ধবীর সাথে থাকে। প্রিন্স সপ্তাহে কয়েকদিনের জন্য ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এ ভাবেই তারা মা বাবা দুজনেই সন্তানটির অভিভাবকত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। প্রিন্স এর প্রাক্তন বান্ধবী কে সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। সিবিসি’র প্রতিবেদনে তার সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।
প্রিন্স এখন এতটাই অসুস্থ যে তিনি আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারছেন না। তিনি এখন কানাডায় ভিজিটর স্ট্যাটাস পেয়েছেন, যার অর্থ তিনি কাজ করতে পারবেন না, স্যোসাল এসিস্টেন্স বা সামাজিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। এমনকি ‘নিউফাউন্ডল্যান্ড এ্যান্ড ল্যাব্রাডর’ প্রভিন্সের চিকিৎসা সেবাও বিনা পয়সায় পাবেন না যা এখানকার ইমিগ্রেন্ট বা নাগরিকরা পেয়ে থাকেন। এমনকি যারা শরণার্থী স্ট্যাটাস নিয়ে কানাডায় অবস্থান করেন তারাও ফ্রী চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকেন।
প্রিন্স অবশ্য ইতিমধ্যে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সীর জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু ইমিগ্রেশন, রিফিউজি এবং সিটিজেনশিপ কানাডা (IRCC) বলছে যে সেটি অনুমোদনের জন্য তাকে অন্তত এক দশক অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে প্রিন্স জানান তার নিজের বা সন্তানের ভরণপোষণের জন্য অর্থ উপার্জনের কোনও উপায় তার সামনে নেই। তিনি আরো বলেন, এরকম একটি অবস্থায় কেউ কি আশা করতে পারেন যে তিনি মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করতে পারবেন বিশেষ করে যখন তার উপর নির্ভরশীল একজন শিশুর যত্ন নিতে হবে?
সিবিসি’র প্রতিবেদক অ্যাবি কোল যত্নের সঙ্গে প্রিন্সের কানাডায় থাকার লড়াই এবং কীরকম ঝুঁকিতে রয়েছেন তা নিয়ে রিপোর্ট করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রিন্সের অনিরাময়যোগ্য ক্যান্সার আছে। শারীরিক এই অবস্থায় উড়োজাহাজে করে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমোদন পেতে তার বেঁচে থাকার চেয়ে বেশি সময় লাগবে। অন্যদিকে তিনি চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। তার ছোট বাচ্চার ভরণপোষণের জন্য অর্থ উপার্জনও করতে পারছেন না।
‘নিউফাউন্ডল্যান্ড এ্যান্ড ল্যাব্রাডর’ প্রভিন্সের সেন্ট জনস-ভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী মেগান ফেল্ট বাংলাদেশী এই শিক্ষার্থী প্রিন্সকে কানাডায় স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া যায় কি না তার জন্য চেষ্টা করছেন এবং বলেছেন যে, এখন তার সামনে একমাত্র বিকল্প হল Humanitarian and compassionate grounds এর সুযোগ নিয়ে আবেদন করা।
কিন্তু সিবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে IRCC জানিয়েছে যে Humanitarian and compassionate grounds এর আবেদনপত্র প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রায় ১০ বছর।
প্রিন্সকে লেখা একটি চিঠিতে তার ডাক্তার জয় ম্যাকার্থি লিখেছেন, তার ক্যান্সার অনিরাময়যোগ্য, এবং এই অবস্থায় তার পক্ষে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়াও নিরাপদ নয়। কারণ ভ্রমণকালে উচ্চ রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি রয়েছে। সে কারণে ভ্রমণ করা তার পক্ষে নিরাপদ হবে না। প্রিন্স এই চিঠি সিবিসি’র সঙ্গে শেয়ার করেছেন।
প্রিন্স বলেন, এখন একমাত্র জিনিস যা তাকে টিকিয়ে রেখেছে তা হল তার ছেলে। তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য হল কাজ করা, কিছু সঞ্চয় করা, ছেলের সাথে কিছু সময় কাটানো এবং তার জন্য একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, যেকোনোভাবে, আমার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে।

অনুমোদনের অপেক্ষায়


অভিবাসন আইনজীবী মেগান ফেল্ট নিশ্চিত যে প্রিন্সের আবেদন সফল হবে কারণ তার একটি ছোট সন্তান রয়েছে যার হেফাজত তাকে করতে হচ্ছে এবং অন্যদিকে তার নিজের চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়াকরণের দীর্ঘ অপেক্ষার সময় বিবেচনা করে ফেল্ট বলেন যে, তারা নীতিগতভাবে অনুমোদনের জন্য আরেকটি বিকল্প আশা করতে পারেন –যেটি হতে পারে IRCC থেকে একটি চিঠি, যেখানে বলা থাকবে যে আপনার আবেদন কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে, তবে আপনাকে এখনও অন্যান্য ব্যাকগ্রাউন্ড চেক প্রক্রিয়া পাস করতে হবে।
প্রিন্স অবশ্য ইতিমধ্যে সেন্ট জনস ইস্টের এমপি জোয়ান থম্পসন এবং ফেডারেল ইমিগ্রেশন মন্ত্রী লেনা মেটলেগ ডিয়াবের কাছে তার অবস্থার কথা বর্ণনা করে চিঠি পাঠিয়েছেন এবং অনুরোধ করেছেন যাতে তারা তার অবেদনটির প্রক্রিয়াকরণের ধাপগুলো দ্রুততর করতে সাহায্য করতে পারেন।
সিবিসি নিউজের সাথে শেয়ার করা ইমেলগুলি দেখিয়ে প্রিন্স জানান, থম্পসনের অফিস IRCC ’র কাছে একাধিকবার জরুরী প্রক্রিয়াকরণের অনুরোধ করেছিল — কিন্তু আইআরসিসি ধারাবাহিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে।
একটি ইমেল বিবৃতিতে IRCC নিশ্চিত করেছে যে প্রিন্সের আবেদন এখনও নিয়মিত সারিতে রয়েছে এবং বর্তমান প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রায় ১০ বছর বা এক দশক।
IRCC আরও লিখেছে যে আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সময় বিভিন্ন কারণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে আছে অভিবাসন লক্ষ্যমাত্রা, কোন বিশেষ মামলার জটিলতা, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং আবেদনকারীদের কাছে কোন তথ্য চেয়ে পাঠালে তারা কত দ্রুত সাড়া দেয় এ সবের উপর।
নিউফাউন্ডল্যান্ড এ্যান্ড ল্যাব্রাডরের Jobs, Growth and Rural Development বিভাগের মুখপাত্র অ্যালিসন কিং সিবিসি নিউজকে একটি ইমেলে বলেছেন যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি প্রদান ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব, তবে প্রদেশটি প্রিন্সের সাথেও যোগাযোগ করেছে। আমরা তার স্বাস্থ্যগত সংগ্রাম, একজন অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সচেতন।
আইনজীবী ফেল্ট বলেন, কানাডার পক্ষ থেকে প্রিন্সের Humanitarian and compassionate grounds এর ভিত্তিতে আবেদন অনুমোদন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ তার সামনে একটি কানাডিয়ান সন্তানের আইনি হেফাজত পালনের দায়িত্ব রয়েছে।