স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্ন : কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেকেই ভুগছেন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, অক্টোবর ৮, ২০২৫ : সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আর তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেকেই তাদের গভীর একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির কারণে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা করছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে senecajournalism.ca তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছিল।
অতি সম্প্রতি একই চিত্র তুলে ধরে canadianimmigrant.ca তাদের এক প্রতিবেদনে। গত আগস্ট মাসে প্রকাশিত ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডার আন্তর্জাতিক শিক্ষার উত্থানের আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, যারা একসময় সুযোগের প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট ছিল, এখন তারা বিচ্ছিন্নতা, ক্লান্তি এবং হতাশার মুখোমুখি।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য নিবেদিতপ্রাণ সংস্থা guard.me-এর মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা ফুর্তাদো এই সংকটের উত্থান প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা যেসব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে সহায়তা করি তাদের বেশিরভাগই উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী চাপের সম্মুখীন হয়।” এই মানসিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলি আবাসন, আর্থিক এবং একাডেমিক চাপের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

কানাডিয়ান ব্যুরো ফর ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের এক জরিপেও দেখা গেছে যে ৬৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী একাডেমিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন।
ক্রিস্টিনা ফুর্তাদোর মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলির শিকড় আরও গভীরে। “অনেক শিক্ষার্থী এমন সংস্কৃতি থেকে আসেন যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করা নিষিদ্ধ। তাই যখন মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সহায়তা পাওয়া যায়, তখনও তারা তা পেতে দ্বিধা করেন।”
ক্রিস্টিনা ফুর্তাদোর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো ঔষধ হিসেবে মাদক ব্যবহারের বৃদ্ধি। তিনি বলেন, “আমরা দেখছি আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী মজা করার জন্য নয়, বরং উদ্বেগ, চাপ এবং অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যালকোহল বা গাঁজার দিকে ঝুঁকছে। তাদের অনেকেই অবশ্য এই মাদক গ্রহণের হাত থেকে মুক্তি পেতে চান কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব তা জানেন না। তারা ভয় পান এই ভেবে যে, সাহায্য চাওয়া হলে হয়তো কানাডায় তাদের স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস বা অভিবাসনের সম্ভাবনা বিপন্ন হতে পারে।”
উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেকেই শুধু যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছেন তা নয়। কেউ কেউ আত্মত্যাও করছেন। গত বছর নিউ কানাডিয়ান মিডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে গত পাঁচ বছর ধরে আমরা কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাড়তে দেখেছি। অত্যন্ত দ্রুত মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া, সেইসঙ্গে স্নায়ুবিধ্বংসী কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক আঘাত এবং সামাজিক একাকীত্ব ইত্যাদি হলো কয়েকটি কারণ যে জন্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদেরকে “কানাডীয় জীবনসংগ্রামের” চরমতম ভার বহন করতে হয়।
canadianimmigrant.ca জানায়, আর্থিক ও মানসিক চাপ বাড়ার সাথে সাথে আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ গৃহহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিচ্ছেন। প্রায়শই রিফুউজি ক্লেমেন্টদের সাথে থাকার জায়গা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। Immigration, Refugees and Citizenship Canada (IRCC)-এর তথ্য অনুসারে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা রেকর্ড সংখ্যায় (২০,২৪৫ জন) রিফিউজি হিসাবে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। শুধুমাত্র ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকেই, ৫,৫০০ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রিফিউজি হিসাবে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
ক্যালগেরির ব্রুকস কলেজের মানবসেবা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং অভিবাসী শিক্ষার্থীদের পক্ষে একজন প্রবক্তা মেলানি কুইমসন canadianimmigrant.ca-কে বলেন, “অনেক শিক্ষার্থী কানাডায় আশা নিয়ে আসেন কিন্তু একটা পর্যায়ে ঋণ বা মানসিক ট্রমায় নিমজ্জিত হন। তখন তারা কী পদক্ষেপ নেবে তা জানেন না। আমাদের অনেক তরুণ প্রতিভা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।”
কুইমসন আরো বলেন, তিনি যেসব শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলছেন, তাদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে শোষণের শিকার হচ্ছেন, বিশেষ করে মজুরি চুরি এবং অনিশ্চিত চাকরিতে কম বেতনের সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। “নিয়োগকর্তারা তাদের হতাশার সুযোগ নেন।” পরিহাসের বিষয় হল, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কানাডার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুধুমাত্র ২০২২ সালেই তারা কানাডার অর্থনীতিতে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছেন।
তবে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, কানাডা এখনও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগের ভূমি হতে পারে যারা প্রকৃত তথ্য অবগত হয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে এবং সমর্থিতভাবে আসেন। দেখা গেছে প্রায়শই, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা গ্লোসি পেপারে চকচকে ছাপানো ব্রোশিয়ার এবং তাতে বর্ণিত আশাবাদী স্বপ্ন নিয়ে কানাডায় আসেন। কিন্তু কানাডায় আসার পর তাদেরকে যে সব বিরুপ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে না। এর মধ্যে আছে -আর্থিক, মানসিক এবং পদ্ধতিগত বাধাসমূহ।
কলেজ স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্সের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আকসনুর সিং কানাডায় আসতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য কানাডা সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য এবং কানাডায় আসার পর তারা কি কি পরিস্থিতির সন্মুখীন হতে পারেন সে বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উপর জোর গুরুত্বের দেন। তিনি বলেন, ” কোন কোন এজেন্সী এবং কনসালটেন্টরা বিদেশে শিক্ষার্থীদের কাছে ভুয়া স্বপ্ন বিক্রি করছে। সেই কারণেই এই অভিবাসন উপদেষ্টাদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
উল্লেখ্য যে, সাসকাচোয়ান, ম্যানিটোবা এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার মতো প্রভিন্সগুলি আন্তর্জাতিক নিয়োগ এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যাতে শিক্ষার্থীরা সঠিক তথ্য এবং মানসম্মত সহায়তা পায়। এই প্রোগ্রামগুলি কানাডিয়ান আইন, অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রদেশে পড়াশোনা, বসবাস এবং কাজ করার সুবিধাগুলি অন্তর্ভুক্ত করে। মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে অংশীদারিত্বে পরিচালিত, এই প্রোগ্রামগুলি প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী এজেন্টদের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করে, জালিয়াতি এবং ভুল তথ্য প্রতিরোধে সহায়তা করে।
