শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত রায়রামানন্দ সংবাদ
শুভ্রা শিউলী সাহা
ছোট বেলায় দিদিমা, মা কে দেখতাম দুপুর বেলা সবার খাওয়া শেষ হলে চরিতামৃত নিয়ে পড়তে। মা বলতো গ্রন্থ পাঠে আত্মর শান্তি হয়, অন্তর ঈশ্বরমুখী হয়। দিদিমা তাঁর মোটা গ্লাসের চশমা দিয়ে বই পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামত। দিদিমাকে খুশী করার জন্য মাঝে মাঝে বানান করে এই বাংলা, প্রাকৃত ও সংস্কৃত শব্দের সংমিশ্রণে রচিত এই চরিতামৃত পড়ে শুনাতাম। পড়া শেষে দিদিমা তাঁর তিলক কাটার রূপোর বাটি থেকে একখানা সিকি বা আধুলি হাতে তুলে দিতেন। আমি তখন গ্রেড ৩ কিংবা ৪ এ পড়ি, কিছুই বুঝতাম না এসব সাধ্য বা সাধন তত্ত্বের। দীর্ঘদিন পর হিন্দু মন্দিরে শ্রীচৈতন্য গবেষণা কেন্দ্রের গৌড় ভক্তবৃন্দ ও মন্দিরের নিয়মিত কীর্তনীয়াদের অনুপ্রেরণায় ও কৃষ্ণ কৃপায় তাঁদের প্রতিমাসের চরিতামৃত পাঠে অংশগ্রহণ করি ও চরিতামৃত গ্রন্থখানি হতে তুলে নেই জানার অভিপ্রায়ে। কমিউনিটির সকল গৌর ভক্তদের প্রতি বিনীত অনুরোধ রইল হিন্দু মন্দিরে শ্রীচৈতন্য গবেষণা কেন্দ্রের এই প্রতি মাসিক চরিতামৃত পাঠ ও আলোচনায় আংশগ্রহনের জন্য। আশাকরি কৃষ্ণ কৃপায় আপনারা অপার আনন্দের সন্ধান পাবেন।
আদি, মধ্য ও অন্তলীলার এই তিন পর্বের গ্রন্থখানির মধ্যলীলার অষ্টম পরিচ্ছেদে রায়-রামানন্দ সংবাদ পড়তে পড়তে উপলব্ধি করলাম সত্যিকার অর্থে কৃষ্ণ মাধুর্য অমৃতের সিন্ধু। প্রভুর অপার করুণায় এই গ্রন্থখানি পড়তে পড়তে অসীম আনন্দ অনুভব করলাম। এখানে প্রেমময় গৌরসুন্দর সমুদ্র আর ভক্ত রায়রামানন্দ যেন মেঘ। সমুদ্র থেকে যেমন মেঘে জল সঞ্চারিত হয়, তেমনি রায়রামানন্দরুপ মেঘে ভক্তিবারি ( কৃষ্ণ ভক্তি) অমৃত সঞ্চারিত হল। কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর দৃষ্টান্ত : জল সাগরেরই, দিয়েছে সে গোপনে সঞ্চার করে মেঘেকে। দেয়া বস্তই আবার ফিরে পাওয়া।
প্রভু নিজে আচরণ করে বিণয় ও ভক্তি শিখিয়েছেন রায়রামানন্দকে, শিখিয়েছেন প্রেমভক্তি, দাস্য প্রেম, বাৎসল্য প্রেম, সখ্য প্রেম, ব্রজলীলা, জ্ঞানশূণ্যভক্তি, জ্ঞানামিশ্র ভক্তির আর সচ্চিৎ আনন্দময় কৃষ্ণের স্বরূপ পর্যায় ক্রমে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মহাপ্রভু আর রায়রামানন্দ যে সংলাপ তা যে কোন ভক্তরে মনে কৃষ্ণ বিরহ আর কৃষ্ণ প্রেম জাগিয়ে তোলে। শ্রীচৈতন্য তার প্রেমের জ্যেতি দিয়ে তার মনকে দ্রবিভুত করেছেন, করেছেন কৃষ্ণমুখী আর বুঝিয়েছেন নানা ভাবে ভক্তির সকল স্তর, কেবল প্রেমের দ্বারাই কৃষ্ণহৃদয় বিগলিত হয়। কৃষ্ণের অনন্ত শক্তির ( চিচ্ছক্তি, মায়াশক্তি, জীবশক্তি) কথা শুনে রায়রামানন্দ ভাবে আপ্লুত হয়। মহাপ্রভুকে দৃঢ় আলিঙ্গন করে তার মাঝে প্রেমের উদয় হল, প্রেমাবেশে দুইজনে গলাগলি করে ক্রন্দন করে। মানব জনম সার্থক হল রায়রামানন্দের। এক পর্যায়ে প্রভু হেসে যখন তাকে আপন স্বরূপ দেখালেন, রায়রামানন্দ আনন্দের আঘাতে মূর্ছিত হল, দেহ ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল। মিলন আর বিরহ সমান্তরাল কিন্তু অসীমে মিশে যায়। প্রভু তাঁকে হস্ত স্পর্শ করে চেতন করালেন। চাঁদের কিরণে ফুল ফোটে, সবাই জানে। চাঁদ দেখি, চাপার কুড়ি দেখি, আর ফুটন্ত চম্পক দেখি। কেমন করে যে চাপার কোমল পাপড়িগুলি খোলে তা কখনো আমরা দেখিনা। রায়রামানন্দ তা দেখেছেন। প্রভু নিজেকে লুকালেন মায়াবাদী সন্ন্যাসী বলে। রায়রামানন্দ বলেন : রাধাকৃষ্ণ তোমার মহাপ্রেমে হয়, রায় কহে- তুমি প্রভু ছাড় ভারিভূরি, মোর আগে নিজরূপ না করিহ চুরি”।
প্রভু বোঝালেন, রায়রামানন্দ শ্রেষ্ঠ ভক্ত তাই তুমি সর্বত্র কৃষ্ণকে দেখতে পাও। গীতায় ভগবান বলেছেন, যিনি সকল জীবের মধ্যে নিজের উপাস্য শ্রীভগবানকে বিদ্যমান দেখেন এবং যিনি নিজের উপাস্য ভগবানের সকল প্রাণীকে দেখতে পান, তিনিই ভাগবতোত্তম অর্থাৎ ভগবানের শ্রেষ্ঠ ভক্ত। মানবতা আর কৃষ্ণপ্রেম কে একাকার করে উপহার দিয়েছেন কলির জীবের উদ্ধারের জন্য, শান্তিুর জন্য। দুঃখকে আমরা কেউ চাইনা, সবাই সখু চাই কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক জাগতিক সংসারে সুখ ধরা দেয় না। সুখ তখনই পাওয়া যায় যখন মানুষ বিষয় বাসনা শূন্য হয়, যখন অন্তরে কৃষ্ণ প্রম-অনল জ্বলে শ্রীমতী রাধারানীর মত। আর তখনই হৃদয়ের সব দ্বার খুলে যায়। আত্মার শুদ্ধি হয়, এগিয়ে যায় আধ্যাত্মিক পথে ঠিক রায়রামানন্দ যেমন বিষয় বাসনা সব ছেড়ে বৈষ্ণব হয়েছিলেন।
ড. মহানাম ব্রতজী তার গৌর কথায় বলেছেন, যে উপায়ে সাধক সাধ্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয় তাই সাধন। জীবের অভীষ্ট বা কাম্যবস্তুই হল সাধ্য আর সাধ্য বস্তু পাওয়ার হল সাধনা। মানুষ ছুটে যায় ভগবানের দিকে সাধনায় আর ভগবান ছুটে আসেন ভক্তের কাছে করুণায়। যেমন করে নরসিংহ রূপী ভগবান দেখা দিয়েছিলেন ভক্ত প্রহল্লাদকে। কন্যারূপী মা তারা ছুটে এসেছেন সাধক রামপ্রসাদের ডাকে। সিংহ যেমন অন্যের কাছে উগ্র বা ভয়ংকর হয়েও নিজের শাবকের কাছে শান্ত স্নেহকোমল। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন কে বলছেন- তুমি যা কিছু কাজ কর, যা কিছু ভোজন কর, যা কিছু দান কর, যা কিছু যাগযজ্ঞ কর এবং যা কিছু তপস্যা কর সে সমস্ত আমাকেই অর্পণ কর। সর্বধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমারই শরণ নাও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে উদ্ধার করবো। উদ্ধবকে বলছেন, যে সর্বধর্ম পরিত্যাগ করে আমাকে ভজনা করে সেই ব্যক্তি সাধুশ্রেষ্ঠ। মহাপ্রভু আর রায়রামানন্দের কথোপকথন আলোচনা থেকে বুঝা যায় শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করাই হল বিষ্ণুভক্তি। ভক্তি প্রেমের গতি উভয়মুখী, ভক্ত ধায় ভগবানের দিকে আর ভগবান আসেন ভক্তের দিকে।”তাই তো, প্রভু যেথায় এল নেমে তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে …। গুরু কৃপাহি কেবলম।
শুভ্রা শিউলী সাহা
টরন্টো
লেখক পরিচিতি : পেশাগত জীবনে শুভ্রা শিউলী সাহা একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ, সংস্কৃতি কর্মী। টরন্টোর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে দীর্ঘ দিন ধরেই জড়িত। জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণায় সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে। তিনি প্রকৃতি প্রেমিক এবং কবিতা পড়তে ভালোবাসেন। প্রবন্ধ, গল্প লেখা তার শখ।
