মানুষের মন মানসিকতার উচ্চতা তেমন বাড়তে পারেনি : আফজাল

অভিনেতা আফজাল হোসেন সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন রাজধানীতে উঁচু তলা ভবন নির্মিত হয়েছে কিন্তু তার সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের মন মানসিকতার উচ্চতা তেমন বাড়তে পারেনি। আর অনেকেই আছে আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি চরিত্রের, নিয়ম মানলে ছোট হয়ে যাবে, মনে করে। তিনি বলেন, মানুষ আসলে খুবই অদ্ভুত প্রাণী, নিজেকে না চিনেই পুরো একটা জীবন কাটিয়ে দেয়। বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো-

আগে কী পরিচয় ছিলো সে কথা থাক, ঢাকা এখন এ‍্যাপার্টমেন্টের শহর। এ‍্যাপার্টমেন্টগুলোর গর্বের শেষ নেই, এ বলে আমাকে দেখো, ও বলে দেখো আমাকে।

এই উঁচুতলা ভবনগুলো শহরের চেহারা বদলে দিয়েছে। বদল হতে হতে আগের ঢাকার মাধুর্য কোথাও থাকলো না।

নতুন হতে পারলে পুরানো থাকতে কে চায়? শহরের সাথে মানুষেরাও হতে চেয়েছে নতুন, সে নতুন হতে পারা খুব সহজ কম্ম নয়।

আফজাল হোসেন। ছবি : ফেসবুক

গাছপালা ঘেরা ফুলের বাগানঅলা বাড়িতে একসময় একটা পরিবার বাস করেছে। খোলা পরিবেশে মনের উদারতা বেঁচে ছিলো। সময়ের কানপড়ায় সেইসব বাড়িগুলো একদিন ভাঙা শুরু হয়ে যায়। ভাঙা শেষে শুরু হয়ে যায় আধুনিক এক স্বপ্নের নির্মান কাজ।

নির্মান শেষ হয়ে গেলে দশ, কুড়ি, ত্রিশটা পরিবার নিজ নিজ স্বপ্ন নিয়ে ঢুকে পড়ে নয়া এক জীবনযাত্রার ভিতর। অনেকে সে নতুনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে, অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

এ‍্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলো মানুষদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছে, আবার পরস্পরকে বিচ্ছিন্নও করেছে।

শহরে কেউ মাথা গোঁজার মতো একটা ঠাঁইয়ের জন‍্য নিজের রক্ত ঘাম পানি করেও বুঝেছে ঠাঁই কেনা সহজ নয়। ধার দেনায় ডুবে তারপর হয়তো হয়েছে স্বপ্নপূরণ।

শহর আর একদল মানুষেরও। তারা প্রথম দলের বিপরীত। ইচ্ছা হলেই এই শ্রেণী তুড়ি মেরে ইচ্ছা পূরণ করতে পারে যখন তখন।

আজব ও সব সয়ে নিতে পারা এই শহরে একসময় শোনা গেছে, ছোট মাপের, ফ্ল‍্যাট বিক্রি হতে সময় নেয়। দ্রুত গতিতে বিক্রি হয়ে যায় মাথা ঘুরিয়ে দেয়া দামের বড় আকৃতির এ‍্যাপার্টমেন্টগুলো।

নতুন শহর, নতুন ও অদ্ভুত এক জীবনযাপন। কুড়ি ত্রিশটা পরিবার একসাথে থাকবে, কেউ কাউকে ভালো করে চিনতে চাইবে না। সবাই বিশ্বাস করে, বেশ আছি, ভালো আছি।

উঁচু তলা ভবন নির্মিত হয়েছে কিন্তু তার সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের মন মানসিকতার উচ্চতা তেমন বাড়তে পারেনি। অনেকগুলো পরিবার একত্রে বাস করার জন‍্য যে মন মানসিকতার প্রয়োজন পড়ে, তার দেখা অনেক জায়গায় মেলে এবং বহু জায়গাতে মোটা দাগে তা অনুপস্থিত।

অনেক ভবনে ভালো থাকবে বলে মানুষ নিয়ম কানুন, উচিত অনুচিত মেনে চলে। তাতে কিছুটা ভালো থাকা হয়। অনেকেই আছে আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি চরিত্রের, নিয়ম মানলে ছোট হয়ে যাবে, মনে করে। ভাবে, নিজের টাকায় কেনা বাড়িতে থাকি, অন‍্যের মর্জি বুঝে চলতে হবে কেনো? এরা কারো তোয়াক্কা না করে একত্রে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে চায়।

নিজেরটা ষোলো আনা বুঝে নিতে চাওয়া মানুষেরা জানালা দিয়ে ঘরের ময়লা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে নিজের ঘর ও জীবন পরিস্কার রাখে। বাজার থেকে ফিরে এরা লিফটের মেঝেতে মাছের পানি, মাংসের রক্ত ফেলে যায়। এ প্রসঙ্গে কেউ কিছু বললে গোপনে ক্ষুব্ধ হয়। এরা ভেবে দেখে না, জীবনকে ভালোবাসলে ভবনটার প্রতিও মায়া থাকতে হয়।

সেদিন এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা মজার গল্প শুনি। এই শহরে এক খন্ড জমির মালিক ছিলেন এক লোক। দেনা পাওনার অংক কষে তার জমির উপর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উঁচু ভবন নির্মান করবে, এমন চুক্তি হলো।

তৈরি হয়ে গেলো সেই ভবন। জমির মালিকানা হয়ে গেলো পনেরোজন মানুষের। দুই যুগ পার হয়ে গেছে এখনও সুযোগ পেলেই সে লোক মানুষদের শুনিয়ে দেয়- আমি এই জমির মালিক। ১৯৬৮ তে কীভাবে অল্পবয়সে জমির মালিক হতে পেরেছিলো, সে গল্পও সে সবাইকে বিস্তারিত শোনাতে চায়।

লোকটা নাকি লুঙ্গি পরে প্রায়ই ভবনের পার্কিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং পরের গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী আর নিরাপত্তা প্রহরীদের সাথে অযথা হম্বি তম্বি করে বোঝাতে চায়, এই ভবনটা যে জমির উপরে দাঁড়িয়ে, সেটার মালিক আসলে সে ছিল এবং এখনও আছে।

মানুষ খুবই অদ্ভুত প্রাণী, নিজেকে না চিনেই পুরো একটা জীবন কাটিয়ে দেয়। তাঁদের দাবী আকাশছোঁয়া কিন্তু নিজেকে না চেনা মানুষ কার কাছে দাবী জানায়?

দেশটাকে যদি একটা এ‍্যাপার্টমেন্ট ভবন ধরে নেই, সেখানে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন‍্য নিজের কর্তব্য কী তা জানবো না, চলবো বলবো ভাববো নিজের মতো করে- এমন স্বার্থপরতা কী ভালো থাকার উপায়?

বুক ফুলিয়ে অনেকেই বলতে পছন্দ করি, দেশ ভালোবাসি। তা বলতে, ভাবতে ভালো লাগে কিন্তু নিজেকে না চিনে দেশটাকে চিনেছি, ভালোবেসেছি- এমন দাবী করাটা বোকার মত শোনায়। হাস‍্যকরও। সেই মালিকের মতো, যে জমি হারিয়েছে কিন্তু মালিক ভেবে এখনও গৌরববোধ করে।