ফেলে আসা দিনগুলি মোর
[অতীত জীবনের কিছু স্মৃতি]
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সাইদুল হোসেন
বাঙ্গালীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরূপ মনোভাবের আরো একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি, যদিও ঘটনাটা আরো প্রায় ১০-১১ বছর আগেকার। তখন ১৯৬০ সন, কর্পোরেশনে ততদিনে আমাদের কয়েকজনের প্রায় পাঁচ বছরের চাকরী হয়ে গেছে একই পদে। করাচি হেড অফিস থেকে প্রতি বছর ৩-৪ বার ইন্সপেকশনে আসতেন আমাদের বড়কর্তারা। আমাদের বসদের সংগে স্বভাবতঃই নানা বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত ইত্যাদি হতো। তেমনি এক সফররত বড় সাহেবকে একদিন আমরা কয়েকজন (আমাদের ডিপার্টমেন্টাল হেডের অনুমতি নিয়ে এবং তাঁরই উপস্থিতিতে) বললাম, “স্যার, পাঁচ বছর শেষ হতে চললো একই পদে, আমাদের প্রমোশনের সময় হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। এ সম্পর্কে আপনার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাই।”
জবাবে তিনি উর্দু ভাষার ব্যবহার করলেন যার বাংলা অনুবাদ এইরূপ : “মিঞা, চাকরী আছে, প্রতি মাসে বেতন পাচ্ছ, এটাকে মহাসৌভাগ্য বলে ধরে নাও, প্রমোশন নিয়ে হাল্লা করো না। হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে।” অপমানটা অবস্থাগতিকে চুপ করেই হজম করতে হলো। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের অফিসগুলোতে নিয়মিত প্রমোশন দেয়া হতো কর্মচারী ও অফিসারদের।

১৯৭১ সনে করাচি অবস্থানকালে একটা বেশ মজার ঘটনাও ঘটেছিল। আমাকে যে ড্রাইভার অফিসে-হোটেলে আনা-নেয়া করত সেও ছিল বাঙ্গালী। অফিসের শেষে মাঝেমাঝে ওকে নিয়ে এখানে-সেখানে কিছু কেনাকাটা করতেও যেতাম। একদিন এক দোকানে গিয়ে একটা শার্ট দারুণ পছন্দ হয়ে গেল। দোকানী চাইল ৪৫ টাকা, আমি বললাম ৪০টাকা। সেও নামতে রাজী নয়, আমিও বাড়তে রাজী নই। সুতরাং এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো। এমনি সময়ে আমি আমার সঙ্গের ড্রাইভারকে বাংলায় বললাম, “রফিক, উর্দুতো ভালো জানি না তাই দর কষাকষিটা ঠিকমত করতে পারছি না। পারলে হয়তো কিছু কমানো যেতো দামটা।” আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র দোকানী পরিষ্কার বাংলা ভাষায় বললেন, “উর্দু জানলেও কাজ হতো না, স্যার, কারণ শার্টটার পড়তা আমার ৪৩ টাকা, দু’টাকা লাভ না করলে আমার ব্যবসা যে লাটে উঠবে। সে যা হোক, আপনি বাঙ্গালী। আমাদের দেশের লোক, মন খারাপ করে দেশে ফিরবেন সেটা তো হতে পারে না। দিন, ৪৩ টাকাই দিন। এই নিন শার্ট।” তারপর বললেন যে তিনি ঢাকারই লোক, নাম চান্দ মিয়া। ঢাকার নওয়াবপুরে চান্দ স্টোর নামে একটা কাপড়ের দোকান আছে তাঁর। করাচির এই স্টোরের নামও চান্দ স্টোর। ব্যবসা ভালোই চলছে, তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যবসা গুটিয়ে সম্ভবতঃ ঢাকায়ই ফিরে যেতে হবে। অবশেষে অতি আপনজনের মত বিদায় সম্ভাষণ জানালেন।
৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে ভারত ও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। বাংলাদেশের ভূখন্ডে পাকিস্তানীদের বর্বরতাও সীমা ছাড়িয়ে গেল, জ্বালাও-পোড়াও এবং হত্যার উৎসবে মেতে উঠল ওরা। এমনি সময়ে, ৮ই অথবা ৯ই ডিসেম্বর কর্পোরেশনের উচ্চপদস্থ প্রায় ১০০ জন অফিসার সামরিক কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠি পেলাম ১২ই ডিসেম্বর বিকেলে গভর্ণর’স হাউসে উপস্থিত হতে। সামরিক কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করতে চান। চিঠি পেয়ে আমরা খুব শঙ্কিত/ভীত হয়ে পড়লাম। না গিয়ে যেমন উপায় নেই, গেলেও যে ভাগ্যে কোন সর্বনাশ অপেক্ষা করছে তাও জানার কোন রাস্তা নেই। দেশের সর্বত্র তখন পাইকারী হারে বাঙ্গালী হত্যা চলছে রাজাকার-আলবদর ও সামরিক বাহিনী দ্বারা। তাদের দোসর হয়ে কাজ করছে বিহারীরা। আল্লাহর অসীম রহমত। ১১ই ডিসেম্বর বিকেলে গভর্ণর ডঃ মালিকের অফিস থেকে আমাদের লিখিত জানানো হলো যে আমাদের যাওয়ার প্রয়োজন নেই ১২ তারিখ গভর্ণর হাউসে কারণ সেই মিটিং বাতিল করা হয়েছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কারণ খবর পেলাম যে দু‘দিন আগেই কোন এক মফস্বল শহরে (শহরের নামটা এখন স্মরণ করতে পারছি না) ঠিক এমনিধরণের মিটিং-এর নাম করে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রায় ৪০ জন অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে পাইকারী হারে। হয়ত ১২ই ডিসেম্বরের মিটিংএ আমাদের জন্য তাই প্ল্যান করা হয়েছিল। ডঃ মালিকের সাহসী হস্তক্ষেপের ফলে আমরা বেঁচে গেলাম।
সমির নামে ২২-২৩ বছর বয়সের এক বিহারী ছেলে ছিল আমাদের অফিসের এক পিয়ন। নভেম্বর অথবা ডিসেম্বর মাসের কোন একদিন সে আমার অফিস রুমে ফাইল দিতে এসে চলে যাওয়ার আগে জানতে চাইল প্রতি ভরি ৮০ টাকা দরে কিছু সোনা কিনব কিনা। অন্য অফিসাররাও কিনছে। শুনে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “সেসব সোনা তুমি কোথায় পেলে?” অম্লানবদনে সে জবাব দিল যে, সেসব সোনা আসলে সোনার অলঙ্কার, লুটের মাল। প্রচুর আমদানী। বললাম, “না, সেসব সোনার আমার প্রয়োজন নেই।” বুঝতে কোন কষ্ট হলো না কোথা থেকে লুট করা সোনা সেগুলো। বাজারে সোনার ভরি তখন ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ৮০ টাকা খুবই সস্তা দর বটে। কিন্তু তাই বলে হতভাগা বাঙ্গালীদের রক্তে রঞ্জিত সেই সোনা আমি কিনব? অথচ সমির বলে গেল যে অন্যান্য অফিসাররাও কিনছে। কারা ওরা যারা বাঙ্গালীদের সম্পদ লুট করতে বিহারীদের উৎসাহ জোগাচ্ছে নগণ্য লাভের লোভে? কথাটা ভাবতেই মনে ঘৃণার উদ্রেক হলো। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ঘটনাটা বলতেই সে কেঁদে দিল। বলল, “সেসব সোনা বিনাপয়সায় পেলেও ঘৃণ্যবস্তু, স্পর্শ করাও মহাপাপ।”
আমাদের বাড়ীওয়ালার ছোট ছেলে তসলিম, বয়স ২৩-২৪ বৎসর। মে মাসের কোন এক তারিখ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর ফিরলো না। বহু খোঁজাখুঁজি করেও তসলিমের কোন হদিস বের করতে পারলো না ওর বাবা এবং ভাইয়েরা। অবশেষে ধরে নেয়া হলো যে অন্যান্য হাজার হাজার যুবকদের মতো আর্মির লোকেরা অথবা বিহারীরা ওকেও ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। বাড়ীতে শোকের বন্যা, মা ওর কেঁদেকেটে অস্থির। কিন্তু কিইবা করার আছে? তাই মুখ বুজে শোক সহ্য করে দিন কাটাতে লাগলো ওর পরিবারের লোকেরা।
কিন্তু প্রায় চার মাস পর সেপ্টেম্বরের শেষে হঠাৎ একদিন বিকালে তসলিম বাড়ী ফিরে এলো। সম্পূর্ণ ভগ্নস্বাস্থ্য, শুকিয়ে দড়িদড়ি শরীর, দেহের রং ঘোর কালো, মাথার চুল কামানো, কথা বলতে গেলে হাঁপাতে থাকে। ওর মুখ থেকে ধীরে ধীরে জানা গেল যে, আর্মির ট্রাক ওকে রাস্তা থেকে উঠিয়ে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় এবং সেখানে আরো বহু বন্দীর সঙ্গে নানা অত্যাচার-অনাহার সহ্য করতে হয়। বিনা কারণে মারপিট। নানা প্রশ্নের জবাব চায় যার কোন সঙ্গতি নেই। রাতদিন শারীরিক পরিশ্রম, রাত জাগা। সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা। এই অমানুষিক অত্যাচারে বহু লোক প্রাণ হারিয়েছে ওরই চোখের সামনে। বাঁচার আশা যখন ছেড়েই দিয়েছে তখন হঠাৎ একদিন এক মেজর সাহেব ওকে ডেকে নিয়ে বলল, “আমার গাড়ীতে ওঠো।” তসলিম ভাবলো, এই শেষ, এখন তাকে কোথাও নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হবে। সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। মেজর তখন তার হাতের ব্যাটন দিয়ে সামনে দাঁড়ানো জীপের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, উঠো! কি আর করে সে। কাঁদতে কাঁদতে সেই জীপের পেছনে গিয়ে উঠে বসল। মেজর এসে গাড়ী স্টার্ট দিলো। এ-রাস্তা ও-রাস্তা ঘুরে পি.জি. হাসপাতালের কম্পাউন্ডে গাড়ী ঢুকিয়ে তসলিমকে মেজর বললো, “যাও, এখন বাড়ী চলে যাও।” বলে কি! বাড়ী যাও, ঠাট্টা নয় তো? বিশ্বাসই হতে চায় না ওর। তাই চুপ করে বসেই রইলো সে গাড়ীতে। মেজর তখন আবার বলল, “ঘাবড়াও মাৎ, ঘর যাও।” সে তখন ধীরে ধীরে জীপ থেকে নেমে মেজরকে সালাম জানিয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল এবং হেঁটেই বাসায় পৌঁছল।
“পূবাইল হাউস” সিদ্ধেশ্বরী মৌচাক মার্কেটের অতি নিকটে অবস্থিত একটা তিনতলা বাড়ী। বাড়ীর মালিকের নাম ছিল সম্ভবতঃ মুইজ উদ্দীন। তাঁর ছিল চার ছেলে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের। মুক্তি বাহিনীর সদস্য সন্দেহে একদিন আর্মির লোকেরা এসে বাড়ীতে তখন উপস্থিত তিনটি ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। খোঁজখবর নিতে গিয়ে ওর বাবা ও আত্মীয়স্বজন কয়েকদিন পর মীরপুরের কোন এক স্থান থেকে তিনটি ছেলেরই নানা অত্যাচারে জর্জরিত মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। উর্দুভাষী ইসলাম ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগণ সেই একই রাষ্ট্রের বাংলাভাষী নাগরিকদের প্রতি এই বর্বরোচিত, অমানবিক আচরণ করে কু-শাসনের এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেল বিশ্বের ইতিহাসে।
উর্দুভাষী পাকিস্তানীদের এই চব্বিশ বছরের কু-শাসন, বৈষম্যমূলক আচরণ, বাঙ্গালী হত্যা ও নারী নির্যাতন এবং পরমত অসহিষ্ণুতা একথাও নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে গেল যে, বিভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন সংস্কৃতির অনুসারী এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগণের কোন দেশে সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মভিত্তিক কোন রাষ্ট্রে নিরপেক্ষতা বা সু-শাসন প্রত্যাশা করা যায় না। সেইধরনের কোন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। (চলবে)
সাইদুল হোসেন
মিসিসাগা, অন্টারিও
কানাডা
