নিভৃতে
রীনা গুলশান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সন্ধ্যা হতে খুব বেশি দেরি নাই। দুপুরের খাবার খাওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন যেন ভার ভার লাগছে। এ সময় শুতে নেই। তবু শরীরটা বেশ ধরপড় করাতে বারান্দায় পেতে রাখা একটা অনেক কালের পুরনো রকিং চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিল আমান্ডা। এখন তেমন কিছু করার নাই। ভাবছে আজ রাতে কিছুই খাবে না। ফাবিয়ান যাবার পর থেকে রান্নার কোন ঝক্কিই নাই। ১ দিন রান্না করে ৩ দিন খায়। সবই আগের মত আছে, আবার কিছুই আগের মত নাই। বেশি ক্ষিদে লাগলে ১ কাপ দুধ গরম করে খেয়ে নিবে। রকিং চেয়ারে শুয়েই উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কত কথা মনে পড়ে। ঐ যে উঠোনটা পেরিয়ে বড় বড় জলপাইয়ের গাছ। ওর মধ্যে সব চেয়ে মোটা যে গাছটা ওর তলাতেই তো তার ফাবিয়ান খেলা করতো ডোরিনের সাথে। খেলার থেকে ঝগড়া বেশি করতো। ডোরিন গাল ফুলিয়ে থাকলে আবার ফাবিই তার মান ভাঙাতে বসতো। তখন মান ভাঙ্গানোর উপাদান আমান্ডাকেই যোগান দিতে হতো। নানান রকম পিঠা, কেক, চকোলেট এসব বানিয়ে ঘরে রেখে দিতো। এসব সময় ওর থেকেই খাবার বের করে দুজনকে দিয়ে ঠান্ডা করতো। কত কথা মনে পড়ে আমান্ডার। এক সময় ঐ গাছ তলায় তার সারা আর রোডিকাও খেলতো। আজ কোথায় সব? ঐ বৃক্ষগুলো শুধু স্মৃতির ভার বহন করে আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। বড় একা। বড় নিঃসঙ্গ। এই জীবনের ভার বড় বেশি ভারবহ। জীবনের সব দায়িত্ব কর্তব্য তার শেষ হয়েছে। আর কারো কোন প্রয়োজন নেই তাকে। তবু ঈশ্বর তাকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছে কে জানে? মেয়েটাও সেই দূরে পড়ে রইলো। আর তার ফাবিও কোথায় কত দূর চলে গেল? কেন গেল? কে জানে? কিসের টানে পথে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তার সোনার পাখিটা? খেতে খুব ভালোবাসতো? প্রিয় কোন খাবার দেখলে হামলে পড়ে খেত। পেট ভরে যেত, তবু চোখ ভরতো না। তখন আমান্ডা হেসে হেসে বলতো-
: ঐ বাটির সবটাই তোর জন্য তোলা থাকবে সোনা, আর খাসনে তাহলে পেটে ব্যাথা করবে।
: দেখো, খবরদার কাউকে দিও না কিন্তু। তোমারতো আবার বাটি ভরে পাড়ায় বিলোনো অভ্যাস!
এটা ঠিক আমান্ডার এ অভ্যাসটা আছে। বিশেষ করে কোন ভালো খাবার করলেই রোডিকার বাসায় এক বাটি দেবেই দেবে।
তবে আজকাল ডোরিন মেয়েটা আসে না বললেই চলে। এটাতো ঠিকই এই অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা তার মত একটা বুড়ির কাছে আসবেই বা কেন? তাছাড়া ফাবিও নাই, ডোরিন এসেই বা কি করবে? তবে হ্যাঁ, রোডিকা প্রায়ই আসে। এসে কত দুঃখের কথা বলে। গত বছরই ওর বাবা রবার্ট ফাচিপন্টি মারা গেল। রোডিকা খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। আহারে বুড়ো বাপটাকে কি সেবাটাই না করেছে। রবার্ট আর আলবার্ট ছোটবেলার বন্ধু। তবে আলবার্টের থেকে রবার্ট ফাচিপন্টি ৩/৪ বছরের বড় ছিল। আলবার্টতো সেই কবেই মারা গেল। ঐ বয়সেতো ওর চলে যাবার কথা না। অথচ রবার্ট এই সেদিন গেল। রীতিমত বিছানায় শুয়ে অনেক কষ্ট পেয়ে মরলো। রবার্টের সঙ্গে তার একদিকে বেশ মিল আছে, রবার্টের বৌ জেনিফার অর্থাৎ রোডিকার মাও মারা গিয়েছিল অনেক অল্প বয়সে। খুব সুন্দরী ছিল মহিলা। ডোরিনতো জেনিফারের মতই দেখতে হয়েছে। রবার্ট দেখতে মোটেই ভালো নয়। তবে রবার্ট সত্যিই জেনিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল। অত অল্প বয়সে স্ত্রী গত হলেও সে আর কখনো বিয়ের নামও করেনি।
তার আলবার্টও কত অল্প বয়সে তাকে ছেড়ে চলে গেল। যাবার তো কথা ছিল না। আসলে একমাত্র মেয়ের অপরিসিম দুঃখ সে সইতে পারেনি। কিন্তু তারপর সেই সারা কত সুখী হলো, ওর বাবা দেখে যেতে পারলো না। মানুষটা স্বপ্নের রাজপুত্রের মত দেখতে ছিল। কি লম্বা, চওড়া, কি সুন্দর চেহারা। যেমন ছিলো গায়ের রঙ, তেমনি মসৃণ ত্বক। মনে হতো মেয়েদের মত ত্বক। আর সেই রকম ছিল কঠোর পরিশ্রমি। আলবার্টের পাশে তো তাকে দেখাতো বিউটি এন্ড বিষ্টের মত। ওর পাশে সে ছিল রীতিমত খাটো। চেহারাও খুবই খারাপ। তবু আলবার্ট তার চেহারা নিয়ে কখনো কিছুই বলেনি। বরং তাকে যথেষ্ঠ ভালোবাসতো তার মত করে। কারণ, আলবার্টের প্রকাশ ক্ষমতা অন্যরকম ছিল। আমান্ডা তাকে খুব বুঝতো। সারা যখন পেটে এলো, তখন আলবার্ট তার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়াকে এনে রেখেছিল, তাকে সাহায্য করবার জন্য। তারপর একদিন ঘর আলো করে তার সারা এলো। ঠিক যেন বাপের ফটোকপি। কি সুন্দর। মনে হতো আকাশ থেকে নেমে আসা পরী। সে সময় যখন তখন বাড়ি চলে আসতো আলবার্ট। বাড়ি এসেই হাক পাড়তো – কৈ আমার চাঁদের কনাটা একটু কোলে দাওতা।
: ওমা! এটা কি বলছেন? আপনার হাত-পা ভর্তি ধুলোবালি।
: আচ্ছা বাবা, হাত ধুয়ে আসছি। তুমি কি ভাবো আমি কি আর এসব বুঝি না।
১২ বছর পর মেয়ে হয়েছিল তাই আমান্ডাও মেয়ের ব্যাপারে খুবই পজিসিভ ছিল। তারপর মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘণ্টা পার করে দিত। কত কি যে ছাইপাস বকতো মেয়েকে কোলে নিয়ে। মেয়ে হবার পর খুশিতে বৌকে একটা লম্বা সোনার চেন বানিয়ে দিয়েছিল। সাথে ছিল একটা লকেট (জেসাসের ছবি দেওয়া একটা ক্রস)। আমান্ডা জীবনে কোন দিন ওটা গলা থেকে নামায়নি। ভেবেছে যে দিন তার সোনা মানিক ফাবিয়ান বিয়ে করবে, ওর বৌয়ের গলায় পরিয়ে দেবে। অথচ তার সারা কত দিন চেনটা পরতে চেয়েছে, আমান্ডা গড়িমসি করেছে। দেয়নি। বলেছে, হারিয়ে ফেলবি। খুউব ভারী চেন।
এর মধ্যে কবে যেন সারা ফোন করেছিল, তখন আমান্ডা কথায় কথায় বলছিল যে, যখন ফাবিয়ান বৌ নিয়ে আসবে, তখন এই চেনটি পরিয়ে দেবে। এই কথা শুনে সারা খিলখিল করে হেসে উঠলো। তখন আমান্ডা বললো-
: কি রে হাসছিস কেন?
: হাসবো না? মা, তোমার মনে পড়ে ঐ চেনটা আমি কত বার পরতে চেয়েছি, তুমি আমাকে দাওনি। আর এখন তুমি নিজে থেকে ফাবির বৌকে দিতে চাইছো।
: আসলে তোকে তখন না দেবার কারণ, তুই বুঝবি না মা।
: কেন বুঝবো না? তুমি আসলে যাই বল মা, তুমি এমনকি আমার থেকেও ফাবিকে অনেক বেশি ভালোবাস।
: হয়তোবা। তবে চেনের ব্যাপারটা আলাদা, চেনটা আমি কখনো খুলিনি কারণ সব সময় মনে হতো ওটা তোর বাবার ভালোবাসায় ভরা দুটি বাহু। ঐ চেনটার মধ্যে যেন আমি তোর বাবার অস্তিত্বকে অনুভব করতাম।
: তাহলে এখন দিতে চাইছো কেন?
: কারণ, বয়স হয়েছে। আর ক’দিনই বাঁচবো, তবে তোর যদি চেনটার উপর এখনো আকর্ষণ থাকে তবে এটা তুই-ই নিস!
: না মা, আমি তো মজা করছি। ফাবিকে দিলেও তো সেই আমাকেই দেওয়া হবে- সারার কণ্ঠে আনন্দ বেদনায় ভরা।
মেয়েটা যখন তখন ফোন করে। এ ঘরের ছেলে। মেয়ে দুটোতো বড় হয়ে গেছে। ডেভিডের তো এখন ১৮/১৯ বছর বয়স হতে চললো। মেয়েটা দুই বছরের ছোট। প্রতি বছরই একবার-দুইবার আসে। ছেলেটা সারা-স্টিভেনের মিলিয়ে হয়েছে। তবে মেয়ে নাটালী একদম মায়ের মত হয়েছে। স্টিভেনের সাথে বিবাহের পর সারা সত্যিই সুখি হয়েছে। ছেলেটা সত্যিই ভালো। স্টিভেন এমনকি ফাবিয়ানকেও অনেক ভালোবাসে। বার বার ওকে কাছে টানতে চেয়েছে। ফাবি ওকে পাত্তাই দেয় না। স্টিভেন কষ্ট পেয়েছে তবু ফাবিকে দূরে রেখে দেয়নি। জানে ফাবি, সারার জানের জান। যেমন চরিত্রবান, তেমনি ভদ্র। সারাকে এখনো পর্যন্ত পাগলের মত ভালোবাসে। একটা মানুষের সুখের জন্য পার্থিব যা কিছু প্রয়োজন তার সবই সারার আছে। তবুও মেয়েটা কাঁদে। অঝোরে কাঁদে। এত কান্না যে আমান্ডা সইতে পারে না। সব থেকে কষ্ট লাগে তখন, যখন দেখে তার কান্না যার জন্য সেই ফাবিয়ানকে এতটুকুনও স্পর্শ করে না। ফাবিয়ান তার নানীর জন্য পাগল। যখন তখন ওর কাছে ফোন করবে। ঘণ্টার পর ঘন্টা কথা বলবে। কিন্তু যখনি আমান্ডা একটু কায়দা করে সারার প্রসঙ্গে কথা তুলবে, তখনি ফাবি কোন অজুহাত দিয়ে ফোন রেখে দেবে। এই একটা জায়গায় ফাবিয়ান কেমন যেন আটকে গেছে। হৃদয়ের ভেতরে নিজেই নিজের দরজা বন্ধ করে রেখেছে সারার জন্য। আর চাবিটাতো ওরই হাতে। সারার প্রতি ফাবিয়ানের অনুভূতি ও কাউকে বুঝতে তো দেয় ন্ াতবু আমান্ডাই এক মাত্র বুঝতে পারে। আজও ফাবিয়ানের জীবনের একমাত্র ভালোবাসার নয়নমণি সারা। আবার দুঃখ, যন্ত্রণা, জেদ- সবই সারা। সে দরজা খুলবার সাধ্যি কারো নাই। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই বোধ হয় এরকম। এক জায়গাতে আটকে যায়। আর এটা তার অন্যতম দুর্বল জায়গা। সেখানে স্পর্শ করবার অধিকার ফাবিয়ান কাউকে দেয় না।
এই তো গতকালই হঠাৎ করে সারা তার মাকে ফোন করলো। ফোন করেই অঝোরে কান্না শুরু করলো-
: কিরে কাঁদছিস কেন?
: মা, আমি- আমি একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।
: কি দেখেছিস?
: আমার ফাবিয়ানকে নিয়ে, খুউব খারাপ স্বপ্ন। তারপর আমি উঠে গেছি। আর ঘুম আসেনি। মা, আমার খুবই অস্থির লাগছে, আমি কি করি?
: কি আর করার আছে, বল? দোয়া করা ছাড়া। আমরা কি-ই বা করতে পারি, বল? তবু আজ চার্চে গিয়ে ৫টা ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে আসিস।
: ঠিক আছে মা। মা, তুমি আমাকে একটা প্রমিস করবে?
: কিসের প্রমিস?
: ঐ, মানে- আমার ফাবি যদি কখনো তোমার কাছে আসে, তুমি সাথে সাথে আমাকে ফোন করবে।
: আচ্ছা করবো, আগে তো ওকে আসতে দে, সে কবে থেকেইতো বলছে আসবে আসবে।
: মা, প্লিজ – ভুলে যেওনা কিন্তু!
কবে আসবে বাছাটা কে জানে? ওর নিজেরই এত টেনশন। এখনো তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে নাই। বড় একজন মিউজিশিয়ান হবার। হাজার হাজার ডলার ঢালছে এজেন্টের কাছে। নিজের সুরারোপিত গানের সিডি, বিভিন্ন এ্যাড এজেন্সি, সিনেমা প্রডাকশন, অফিসে দিয়ে আসে। কেউ ডাকছে না। একবারই একটা এ্যাড এজেন্সিতে নিজের সুরারোপিত জিঙ্গেল করেছিল। কিন্তু তাতে মোটেই ফাবিয়ান খুশি নয়। ফোন করলেই এ কথা সে কথার পরই বলবে-
: নন্না একটু দোয়া কর প্লিজ, হৃদয় উজাড় করে দোয়া কর আমার জন্য।
: করিতো সোনা, তুই ছাড়া আমার আর কেই বা আছেরে? রাত-দিন তোর জন্যই তো দোয়া করি।
: তাহলে ম্যাজিকটা লাগছে না কেন, বলতো? আহ্! আমার শুধু চাই একটি চান্স, একটি শুধু একটি- ব্যস আর কেউ তাহলে আমার সামনে এগিয়ে থামাতে পারবে না।
: হয়তো আমি পাপী বান্দা। আমার দোয়া তোকে লাগছে না।
: কি যে বল, তুমি পাপী। হা… হা… তাহলে এই জগত সংসারে কে আছে পূণ্যবান?
: নারে ফাবি, এই দুনিয়ায় সবাই আমরা কমবেশি পাপ, পূণ্যে জড়াজড়ি করে থাকি। কারণ, আমরা তো কেবলই মানুষ। আর মানুষেরাই শুধু বার বার ভুল করে। তারপর সেই ভুল থেকে এগিয়ে যাবার পথ খুঁজে ন্যায়।
: নন্না, মাই… মাই… তুমি দেখি একেবারে বিরাট মাপের দার্শনিক হয়ে গেছো।
: আরে বোকা, এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের হৃদয়ের গভীরে একটা করে দার্শনিক থাকে।
এভাবেই ফাবিয়ান প্রায়শই নানীকে কথার জালে জড়িয়ে রাখে অহর্নিশ। দূর থেকে আমান্ডা টেলিফোনের তারে তার নয়নের মণির প্রশ্বাস নেবার এবং নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শোনে। ওর প্রতিটি শ্বাস যে তার শ্বাসের সাথে জড়িয়ে থাকে এটা ও ফাবিয়ানকে বলতে পারে না।
আমান্ডা খুব স্বপ্ন দেখেছিল তার আদরের নাতি বড় হবে, বিয়ে দিবে, বউটা টুকটুক করে ঘুরে বেড়াবে। আর ফাবিয়ানের সাথে সারাদিন খুঁনশুটি করবে। দূর থেকে সে সব দেখে আমান্ডার কতকালের স্বপ্ন সাধ পূরণ হবে। হায়রে স্বপ্নরা, ওরা যে কেবলই মরিচিকা হয়ে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়। কখনওকি এইসব মরিচিকা ধরা দেয় কারো স্বপ্নের বাইরে? আর যাকে নিয়ে এইসব স্বপ্নের জ্বাল বুনেছিল, সেই ডোরিন? এই তো ক’দিন আগেও একবার সারা তাকে ডোরিনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলো-
: মা, তোমার কি মনে হয় ফাবিয়ান আর ডোরিনের আর কোন সম্ভাবনা আছে?
: কি জানি? বুঝছি না। সম্পর্কগুলো বড়ই গোলমেলে! বড় সাধ ছিল ওদের দুজনকে নিয়ে। কি জানি কার যে নজর লাগলো!
: কারো নজর লাগেনি মা। সবই আমার পোড়া কপাল! ছেলেটার জন্মই হলো যেন আজন্মের দুঃখী হওয়া কপাল নিয়ে। যে কারণে বাপ থেকেও বাপকে পেল না। রাগ করে মায়ের কাছে আসলো না, কি আর বলবো? কি জানি ওর কপালে কি আছে?
: বালাই ষাট! ওসব বলতে নেই। সব সময় সন্তানের জন্য ভালো মনোস্কামনা করবি, দেখবি ওদের জীবনের দুকুল ছাপিয়ে সুখের জোয়ার আসবে। আর দুঃখগুলো ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে।
: কই আর আসলো? জন্মাবধি বাপের ভালোবাসা যে কি জিনিস সেটাই পেল না। ঐ না পাওয়াটা যে কতটা শূন্যতা সৃষ্টি করে, সেটা মা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। যখন দেখি স্টিভেন, নাটালি আর ডেভিডকে নিয়ে কি রকম ভালোবাসায় ডুবিয়ে রাখে, তখন আমার হতাশার আর সীমা থাকে না। আমার ফাবিয়ান ছোটবেলায় কেমন কাঙালের মত চেয়ে থাকতো, যখন কেভিন খুব আদর করতো ডোরিনকে। কত দিন আমার সোনা চুপি চুপি বালিশের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে কাঁদতো! তোমার মনে আছে মা? বিশেষ করে ঋধঃযবৎং ফধু-এর দিন।
: তাকি আমি জানি না বাছা! কত দিন আমাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছে, ‘ও নন্না, সবার বাবা আছে আমার বাবা নেই কেন?’
: তাই তো, বল দেখি- কেন আমার সোনার ছেলেটার জীবনটা এরকম হয়ে গেল? তারপর আমি তার মা হয়ে আমিও তাকে ছেড়ে এই এত্ত দূরে চলে এলাম- সারা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে।
: থাক মা, এসব নিয়ে আর কথা বলে কি হবে বল?
: তোরও তো বাকি জীবন পড়েছিল, ঐ একরত্তি ছেলেইতো তোর বাকি জীবনটাকে বহন করতো না? জীবনটা সময় সময় খুব দীর্ঘ হয়ে যায়রে মা! জীবনের প্রতিটি ধাপ বড়ই গোলমেলে।
: কিন্তু দ্যাখো মা, আমার ফাবিয়ান সারাটা জীবন আমাকে আর ক্ষমা করতে পারলো না।
: আসলে এই ক্ষমা করতে না পারাটাতে ওকে দোষারোপ করার কোন অর্থ হয় না। সেই সময়টা যে পরিবেশে বা যে পরিস্থিতিতে ও বড় হয়েছিল, চিন্তা করে দ্যাখ- ডোরিন, রায়ান, জেসন- এদের সবার ছিল বাবা-মা একটা সুস্থ জীবন; ভালোবাসা ভরা জীবন। আর ওর? জীবনে বাবার মুখই দেখলো না। তোরও নতুন জীবনের জন্য সমঝোতা করতে হলো। বল তাহলে? ওকে কি কোন দোষারোপ করা যায়?
: না মা, আমিতো ওকে কখনো দোষারোপ করিনি। উল্টো নিজেকেই সারাক্ষণ দোষী ভাবি। তবুও মা বড় কষ্ট। কত দিন ওর মুখ থেকে মা ডাক শুনি না। (চলবে)

লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।
