দীপাবলি: তমিস্রা অমানিশায় দেদীপ্যমান আলোর আরাধনা!

শৈলেন কুমার দাশ

সংস্কৃত শব্দমালার হরেক সুন্দর শব্দমালার একটি থেকে এই সুন্দর শব্দ ‘দীপাবলি’ এর উৎপত্তি। ‘দীপাবলি’ শব্দের  বাংলা অর্থ হলো ‘প্রদীপের সারি’ বা ‘আলোর সারি’। এই শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘দীপ’ (প্রদীপ) এবং ‘বলি/অবলি/ওয়ালি’ (সারি বা শ্রেণী) থেকে বাংলা শব্দমালার আসরে এসেছে। ‘দীপাবলি’ শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে ‘প্রদীপাঞ্জলি’ বা ‘প্রদীপ নিবেদন।’  কারণ সংস্কৃত ‘বলি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘অঞ্জলি’ বা ‘নিবেদন।’ ‘দীপাবলি’ হচ্ছে ভগবান এবং পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে ভক্তি ও প্রীতি সহকারে দীপের অঞ্জলি বা দীপ নিবেদন। এই দীপাবলি স্নিগ্ধ, জ্যোতির্ময় এক আলোর উৎসবকে বোঝায়। যে উৎসবে ঘরে, আঙ্গিনা, সরসী বা নদীর ঘাটে, কুঞ্জবনে বা শ্যামলী প্রান্তরে এবং শশ্মানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়। এই উৎসবে, সারিবদ্ধভাবে উজ্জল প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করা হয় এবং অমঙ্গলকে বিদায় জানানো হয়। অন্ধকার বা অমঙ্গলকে আলোর পরশে জ্যোতিস্নাত করে তোলাই এই দীপাবলি উৎসবের মূল দর্শন। সুন্দরে, সুকল্যাণে, সুশীল মননে, সম্প্রীতি ও সুশোভিত ভালোবাসার আলোর পরশে জীবনকে সাজানোর প্রতীকই এই বিভা-দ্যুতি উৎসব।

দীপ্তিময় রশ্মির বা উজ্জল উদ্ভাসিত অংশু পরশে তমিস্র আমানিশা দূর করার জন্য ভক্তি, প্রেমে, অনুরাগে ও দ্যুতিময় সুন্দরের অনুভবে আলপনার বর্ণময় সৌন্দর্য্যে প্রজ্জ্বলন করা হয় দীপশিখা এই উৎসবে।

সারি সারি প্রদীপ শিখার ময়ুখ দ্যুতির আলপনায় সেজে উঠে বাড়ির নির্মল সুন্দর আঙ্গিনা ভালোবাসা আর খুশির রাঙ্গা আবিরে। আমাদের জীবনের সাথে গভীর মমতার বন্ধনে জড়ানো চারিপাশের শ্যামল অঙ্গনের সকল তিমির তমসা দূর করার মানসে আয়োজিত হয় এই উৎসব। মঙ্গল ও শুভকর্মের প্রভাদীপ্ত প্রতীক এই দীপাবলি উৎসব উত্তর ভারতে শরৎকালে আর দক্ষিণ ভারতে বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়। সারা ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশের শ্যামলী প্রান্তরে কোথাও কোথাও একদিন নয়, পাঁচ দিন ধরে পালিত হয় এই বিভা উৎসব। ধনতেরাস, নরক চতুর্থী, অমাবস্যা, কার্তিক শুদ্ধ পদ্যমী বা বালি প্রতিপদা এবং ভাই দুঁজ বা ভাইফোঁটা নামে এই আলোর উৎসব পালিত হয় মঙ্গল ও শুভকর্মের মানসে।

ছবি : সংগৃহীত

দীপাবলি আমাদের দেশের সবচেয়ে সুপ্রাচীন মঙ্গল উৎসব। মহাভারতের যুগেও এই উৎসব রাজ্যের শ্যামল প্রান্তরের ঘরে ঘরে এবং রাজপ্রাসাদে আনন্দ ও আড়ম্বরের সাথে পালন করা হতো এই পবিত্র স্নিগ্ধ আলোর উৎসব। তারও পূর্বে সুখে, সমৃদ্ধিতে, সুশাসন ও শান্তিতে ভরপুর রাম রাজত্বেও প্রতিটি গৃহে গৃহে আনন্দ, উচ্ছাস ও আড়ম্বরের সাথে পালন করা হতো দীপাবলি উৎসব। রামায়ণের কাল থেকে এই পবিত্র দীপাবলি বা আলোর উৎসবের সূচনা হয়। শ্রীরামচন্দ্র চৌদ্দ বছর বনবাস ও লংকা বিজয়ের পর অযোধ্যায় ফিরে আসা উপলক্ষ্যে রাজ্যবাসী আনন্দে গোটা রাজ্যময় প্রদীপ জ্বালিয়ে শ্রীরামকে বরণ ও স্বাগত জানানোর জন্য দীপাবলি বা আলোর উৎসব পালন করেছিলেন। শ্রীরাম দেবী সীতা, ভ্রাতা লক্ষণ ও পাত্র মিত্রসহ রাবণের পুষ্পক বিমানে ফিরতে সন্ধ্যা আসন্ন হয়ে গিয়েছিলো। আর সেই তিথিটিও ছিল আজকের এই অমাবস্যা বা অন্ধকার তিথি। তাই রাজ্যবাসী শ্রীরাম তথা মঙ্গলের আগমনে, অশুভ শক্তির উপর শ্রীরামের বিজয়ের আনন্দে এবং অযোধ্যার চৌদ্দ বছরের অন্ধকার সমাপ্তির প্রতীক হিসাবে জলে, স্থলে, বৃক্ষশাখে সর্বত্র প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে। সেই থেকে শ্রীরামের লংকা বিজয়কে তথা অশুভ রাক্ষস শক্তির বিরুদ্ধে শুভ রাম শক্তির বিজয়কে স্মরণ করে দীপাবলি উৎসব পালন করা হয়। পরে এই উৎসব ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে দীপাবলি উৎসবে পরিণত হয়। তবে এই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের সূচনা হয়েছিল অযোধ্যায় শ্রীরামচন্দ্রের জন্মদিন উপলক্ষ্যে। আবার রাম-রাবণের যুদ্ধে।

শ্রীরামের জয়ের সংবাদে অযোধ্যায় পৌঁছলে সে রাতেও অযোধ্যাবাসী দীপাবলি উৎসব পালন করে। আজও তাই উত্তর ভারতের মানুষসহ সারা বিশ্বের সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন দীপাবলি উৎসব পালন করে থাকেন।

দীপাবলির আধ্যাত্মিক দিক:

প্রত্যেক মানুষের মনের গহন নানা রকমের তমসায় আচ্ছন্ন থাকে। সেই অন্ধকার সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কারণে। মানূষের ষষ্ট রিপু যেমন  কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ (অহংকার), এবং মাৎসর্য (ঈর্ষা) এসব কারণে হতে পারে। তেমনিভাবে অর্থ, ধন, প্রভাব-প্রতিপত্তি, খ্যাতির জন্য মানুষের মনে জন্ম নেয় অহংকার। এই অহংকারের অন্ধকার মানুষ হিসাবে সুন্দর  হয়ে উঠার পথে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দীপাবলি বা আলোর উৎসবে গৃহে প্রতিটি প্রদীপ জ্বালিয়ে উজ্জ্বল আলোর পরশে অন্ধকার দূর করার পাশাপাশি মনের গভীরে জমা সকল অন্ধকারের বিসর্জন দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যাতে মানুষ অহংকার পরিহার করে জীবনের পথে সত্য ও সুন্দরকে অনুসরণ করে অগ্ৰসর হতে পারে। এছাড়াও অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতার অন্ধকারকে দূর করে জ্ঞানের প্রদীপ শিখায় জীবনকে জ্যোতির্ময় করে তোলতে দীপাবলি উৎসবকে এক মহান প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তমসাচ্ছন্ন নিশীতে একটি ক্ষীণ প্রদীপ শিখাই সুর্যালোকের মত দেদীপ্যমান হয়ে উঠে। অবলীলায় পথ দেখায় তমিস্রার পথ মাড়িয়ে। দীপাবলির শত শত প্রদীপের বর্ণালী আলোর স্নিগ্ধ পরশে মানুষ মনে সাহস ফিরে পায়। মন সেজে উঠে আলোর শক্তির প্রেরণা নিয়ে। সুন্দর, উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন ও প্রকাশের পথ ধরে অগ্ৰসর হতে প্রেরণা যোগায় এই দীপাবলির থরে থরে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের আলো।

দীপাবলির পৌরাণিক দিক:

রামায়ণ অনুসারে অযোদ্যার যুবরাজ শ্রীরাম পিতৃসত্য পালনের জন্য চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গমন করেন প্রিয়তমা পত্নী সীতাকে সংগে নিয়ে। সহযাত্রী হয়েছিলেন প্রিয় অনুজ লক্ষণ। তারপর ঘটনা পরম্পরায় ত্রিলোক বিজেতা  রাক্ষস রাজ লংকেশ রাবণ সীতাকে পঞ্চবটি বনের বনবাস কুটির থেকে ব্রাহ্মণ সেজে ছল করে দেবী লক্ষীর অবতার সীতা দেবীকে হরণ করে সোনার লঙ্কায় নিয়ে যায়। দেবী সীতার ঐশ্বরিক বর থাকার কারণে দুষ্ট রাবণ সীতা দেবীর সস্মতি লাভের হাজার চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং সীতা দেবীকে অশোক বাটিকায় রাক্ষসীনীদের কঠোর পাহারায় রাখে। এদিকে শ্রীরাম ও আনুজ লক্ষণ সীতা দেবীকে খুঁজতে খুঁজতে কিসকিন্দা নরেশ বানর রাজ সুগ্ৰীবের সাথে মিত্রতা হয়। বানর রাজ সুগ্রীব ও তাঁর ঐশ্বরিক বলশালী ও বুদ্ধিমান মন্ত্রী বজ্রংবলী হনুমান, বুদ্ধিমান জাম্বুমান ও  সুমেরু অঞ্চলের বিলাশ বানর বাহিনী নিয়ে লংকা আক্রমণ করেন। লংকা বিজয়ের পর শ্রীরাম দেবী সীতা, অনুজ লক্ষণকে নিয়ে হনুমান, বিভীষণ, বানর রাজা সুগ্রীব এবং অন্যান্য বানর মিত্রসহ রাবণের পুষ্পক বিমানে অযোধ্যার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শ্রীরামচন্দ্রের চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ বিরহে অযোধ্যাবাসী যখন প্রাণহীন হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীরাম পরম ভক্ত হনুমানের মাধ্যমে প্রিয় ধর্মপরায়ণ ভ্রাতা ভরতের কাছে তাঁর অযোধ্যা নগরীতে ফিরে আসার বার্তা প্রেরণ করেন। এ খবর বিদ্যুত গতিতে সমস্ত অযোধ্যা নগরে পৌঁছে যায়। অশুভ, অসুন্দর পাশবিক শক্তিকে নাশ করে পবিত্র দামোদর মাসের (কার্তিক মাস) কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে তিনি অযোধ্যা নগরীতে তার প্রাণপ্রিয় পরিবার পরিজন ও প্রজাকুলের মধ্যে ফিরে আসবেন। এ খবর পেয়ে অযোধ্যাবাসী, রাজকর্মচারী, রাজ মাতাত্রয় ও পরিরাবার পরিজন তাঁদের প্রাণপ্রিয় শ্রীরামকে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।

কারণ তাঁর বেদনায় শ্রীহীন অযোধ্যায় আবার দশদিকে শ্রী ফিরে আসবে। ধন্য হবে এই অযোধ্যা নগরী আবার শ্রী ভগবানের অবতার শ্রীরামের স্পর্শে।

অগ্ৰজ ভ্রাতা শ্রীরামের আগমন বার্তা পেয়ে নন্দীগ্ৰামের কুটিরে বনবাস তুল্য রাজা ভরত সমগ্র নগরে উৎসবের ঘোষণা দিলে সমগ্র নগরী আলোর উৎসবের সাজে সজ্জিত হয়ে ওঠে। সব অমঙ্গল, অকল্যাণ দূর হবে এই শুভ কামনায় পথে পথে, নগরে বন্দরে, বাড়িতে বাড়িতে, গৃহে গৃহে,  বৃক্ষে বৃক্ষে, উদ্যানে উদ্যানে, নদীতে, জলাশয়ে অর্থাৎ অযোধ্যা নগরীর সব জায়গায় মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন অযোধ্যাবাসীরা। আলোর এক মহাপ্লাবনে যেন ভাসছিল অযোধ্যা নগরী। শ্রীরাম অমাবস্যার অন্ধকারে প্রত্যাবর্তন করবেন অযোধ্যার পূণ্যভূমিতে। সেজন্য সমগ্র অযোধ্যা নগরী আলোয় আলোয় সাজানো হয় যেন তাঁদের প্রাণপ্রিয় রাজা শ্রীরাম অমাবস্যার অন্ধকার দূর করে জ্যোতিস্নাত মঙ্গল আলোকের দীপ্তিময় কিরণের বর্ণালী সাজে সজ্জিত নগরীতে প্রবেশ করেন।

জগত কল্যাণে লোকশিক্ষার জন্য অশুভ শক্তির প্রতীক, মহাপরাক্রমশালী অসুর ত্রিলোক বিজেতা রাবণকে বিনাশ করে এই পুণ্যলগ্নে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র তাঁর প্রিয় প্রজা ও স্বজনদের মধ্যে ফিরে এসেছিলেন। আজ আমরা যে তিথিতে দীপাবলি উৎসব পালন করছি ত্রেতা যুগে সেই তিথিতেই লংকা বিজয় শেষে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন শ্রীরাম।

শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে দীপাবলি:

বিষ্ণুর বরাহ অবতারের সময় বরাহরূপী বিষ্ণূর ঔরসে মাতা ধরিত্রীর গর্ভে জন্ম হয় এক অসুর স্বভাব বিশিষ্ট পুত্র নাম নরকাসুরের। যৌবনে নরকাসুর তাঁর পিতার নিকট থেকে  প্রাগজ্যোতিষপুর অর্থাৎ কামরূপের রাজসিংহাসন প্রাপ্ত হয়। দেবী কামাখ্যাকে তুষ্ট করে ও পিতামহ ব্রহ্মার কঠোর উপাসনা  করে বর প্রাপ্ত হয়, যে সে তাঁর মা ছাড়া কারো হাতে মৃত্যু বরণ করবে না। মা তাঁর পূত্রকে কখনোই মারতে পারবে  না বিধায় সে চরম অত্যাচারী হয়ে উঠে। নরকের মহাপরাক্রমে সবর্ত্র ত্রাহি ত্রাহি অবস্হা। এমনকি স্বয়ং দেবতাদের জন্যও সে মহাত্রাস হয়ে ওঠে। মাতা ধরিত্রী তাঁর পূত্রের এমন অধঃপতন দেখে সহ্য করতে না পেরে নিজেই দেহ ত্যাগ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর নরকাসুর মনে করে সে অমর হয়ে গেছে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালে তাঁর অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। তার অত্যাচারে সর্বত্র ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। দেব, দানব, গন্ধর্বকুল থেকে সে ষোল হাজার সুন্দরী রমণীদের বলপূর্বক হরণ করে এক পাহাড়ে নির্মিত বন্দিশালায় আটকে রাখে। শুধু তাতেই সে ক্ষান্ত হয়নি, উদ্ধত নরক দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে দেবমাতা অদিতির কর্ণকুন্ডলও লুন্ঠন করে।

এ সময়ে দ্বারকার অধিপতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি নরকাসুরের নারকীয় কুকীর্তির কথা শুনে তাকে বধ করার জন্য যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন প্রাগজ্যোতিষপুরের দিকে। সাথে এই মহাযুদ্ধে অংশ নেন শ্রীকৃষ্ণের তিন রাজ মহিয়সীর এক মহিয়সী সত্যভামা। তিনি বৃষ্ণিবংশীয় রাজা সত্রাজিতের সুকন্যা। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে সত্যভামা ভূদেবী বা বসুমতী/বসুন্ধরার অবতার। অর্থাৎ তিনি নরকাসূরের মায়ের অবতার। তিনি ছাড়া স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণও এই অসুরকে বধ করতে পারবেন না। দেবী সত্যভামা যখন শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র এই অসুরের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেন তখন সুদর্শন মহাশক্তি রূপ ধারণ করে নরকাসুরের উপর আঘাত হানে। তখন নরক নিজেও বুঝতে পারে দেবী সত্যভামা তার মায়ের অবতার এবং আজই তার শেষ দিন। তখন সে তার মাকে শেষ প্রণাম করা মাত্রই সুদর্শন তার মস্তক ছিন্ন করে। নরকের পতনের পর শ্রীকৃষ্ণ ষোল হাজার এক শত বন্দিনীকে মুক্ত করেন এবং সমাজে তাঁদের মর্যাদা দেয়ার জন্য এই নরীদের আকুল প্রার্থনায় শ্রীকৃষ্ণ বেদযন্ত্র উচ্চারণ করে তাঁদেরকে স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দেন। এই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের ষোল হাজার এক শত স্ত্রী ‘র কাহিনী। তিনি সবাইকে তাঁর রাজধানী দ্বারকায় নিয়ে এসে পূর্ণ মর্যাদায়  রাজকার্যসহ বিভিন্ন যোগ্যতম স্হানে ভূমিকা রাখার সুযোগসহ সব সুযোগ সুবিধা প্রদান করেছিলেন। যারা সবাই পূর্ব জন্মে ভগবান কে স্বামী হিসাবে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলন। নরকাসুরের দানবীয় অত্যাচার ও নারী নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তিলাভ করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সেদিন গৃহ সাজিয়েছিল জ্যোতির্ময় আলোকমালায়। প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে দ্বারকা পর্যন্ত পূর্ব পশ্চিমে প্রায় দু’ হাজার মাইল বিস্তৃত ভারতবর্ষ আত্মপ্রকাশ করেছিল সেদিন দ্বীপান্বিতা বা দীপাবলি রূপে। দ্বাপর যুগে দীপাবলি উৎসবের সূচনা এই দিন থেকে।

এছাড়াও পুরাণ মতে অনেকেই মনে করেন আজকের দিনে দেবী লক্ষ্মী পালন কর্তা বিষ্ণুর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাই অনেক হিন্দু বাড়িতে দীপাবলির দিনে লক্ষ্মী নারায়ণের পূজা ও  আলোকসজ্জা হয়ে থাকে। অন্য মতে এই তিথিতেই মাতা লক্ষ্মী জন্মগ্রহণ করেন। তাই প্রতিটি গৃহে মাতা লক্ষীর শুভজন্ম উপলক্ষ্যে এই দিন লক্ষীপূজা ও আলোকসজ্জা করা হয়। কোথাও কোথাও দীপাবলির দিন অলক্ষ্মী বা অমঙ্গলকে বিদায় জানিয়ে লক্ষ্মীকে সমারোহে গৃহে স্থাপন করা হয়। তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে বরণ করা হয় গৃহে গৃহে। আগের দিন অর্থাৎ ভূত চতুর্দশী থেকে এই আয়োজনের সূচনা হয়। অশুভ শক্তি যাতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে বা অপশক্তিকে পরাভূত করার জন্য মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে সব আলোকে সূচিস্নাত করা হয়। অন্ধকার থেকে আলোয় শুভাগমনের দিন দীপাবলি।

জৈন ধর্মেও  এই দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তীর্থঙ্কর মহাবীর এই দিন পরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। বিক্রমাব্দ অনুসারে দীপাবলি থেকে নতুন বছর আরম্ভ হয়।

সারা ভারত তথা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় দীপাবলি উৎসব। এই উৎসব প্রত্যেক হিন্দু বাড়িতে মহাধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। এছাড়াও সমগ্র ভারত জুড়ে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে অনেকেই এই উৎসব পালন করে থাকেন। এই উৎসব কোন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উৎসব না থেকে বর্তমানে একটি “আন্তর্জাতিক” উৎসবে পরিণত হয়েছে। যেখানে বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ধুমধামের সঙ্গে এই উৎসব পালন করে থাকে। সকল ভারতবাসীর কাছে তথা বিশ্ববাসীর কাছে দীপাবলি হল আলোর উৎসব।

বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ গ্রন্থে প্রথম দীপাবলির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে একে যমরাত্রি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বৃন্দাবনে ব্রজবালারা দীপান্বিতা অমাবস্যায় গিরিরাজ গোবর্ধনের পুজো করে বৃন্দাবনকে দীপমালায় শোভিত করেছিলেন। এই বর্ণনা রয়েছে ‘শ্রীমদ্ভাগবত’ গীতাতে। শ্রীহর্ষ তাঁর ‘নাগানন্দ’ গ্রন্থে একে উল্লেখ করেছেন ‘দীপ প্রতিপাদ্য’ উৎসব হিসেবে। আলবিরুনি তাঁর ‘তাহকক ই হিন্দ’ গ্রন্থে একে ‘দীপাবলি’ বলেই বর্ণনা করেছেন।

শৈলেন কুমার দাশ

লেখক, কলামিস্ট

ক্যালগেরি, কানাডা।

২০.১০.২০২৫।