ক্যালগেরির দুর্গাপূজা ২০২৫ ও কিছু ভাবনা!

শৈলেন কুমার  দাশ

পুরাণ অনুযায়ী, অসুর হিরণ্যাক্ষরের বংশধর ছিলেন এক মহাপরাক্রমশালী অসুর যার নাম দুর্গম অসুর। এই দুর্গম অসুর কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছে বর লাভ করে যে, সে যেকোন পুরুষ দ্বারা অবধ্য। এই বর পাওয়ার পরই দুর্গম অসুর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে দেবতাদের নিকট থেকে স্বর্গ ছিনিয়ে নেয়। স্বর্গহারা দেবতারা নিরুপায় হয়ে নিজেদের রক্ষা এবং স্বর্গ রাজ‍্য উদ্ধারের জন্য স মহেশ্বর শিবের দ্বারস্থ হন।  শিবের নির্দেশে দেবী পার্বতী এক উগ্র রূপ ধারণ করেন এবং তিনি দুর্গম অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বিন্ধ্যাচলে ১০ দিন ধরে এক মহাযুদ্ধ চলে। সেই যুদ্ধে দেবী দুর্গম অসুরের অসংখ্য সৈন্যকে হত্যা করেন। অবশেষে হত্যা করেন দুর্গম অসুরকেও। সংস্কৃত অভিধান ‘শব্দকল্পদ্রুম’ অনুযায়ী,

“দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা।” অর্থাৎ যিনি দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেন এবং যিনি নিরন্তর শত্রুদের বিনাশ করেন, তিনিই দুর্গা নামে পরিচিতা। সেই থেকেই দেবী মহাদেবী ‘দুর্গা’ নামে পরিচিত হন। দেবতারা ফিরে পান তাঁদের স্বর্গরাজ‍্য।

পরবর্তীকালে রম্ভা নামক এক অসুর শিবের কঠোর তপস‍্যা করে ত্রিলোক বিজয়ী পুত্রের বর প্রাপ্ত হন। যে পুত্রকেও কোন পুরুষ যোদ্ধা বধ করতে পারবে না বলে বর প্রাপ্ত হয় সেই রম্ভাসুর। এই অসুর রম্ভারই পুত্র মহিষাসুর। সে ব্রম্মঋষি কাশ‍্যপ এর বংশধর। অর্থাৎ সে ব্রাম্মণ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এই বর প্রাপ্তির কারণে মহা শক্তিশালী মহিষাসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য আবার দখল করে। যার ফলে দেবতারা আবারও দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হন এবং দেবী দুর্গা তাকে বধ করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দেন।

লংকা বিজয়ের সময় শ্রীরাম ত্রিলোক বিজেতা মহাপরাক্রমশালী লংকেশ্বর রাবণকে পরাজিত করার জন‍্য দেবী দুর্গার পূজা করেন। শ্রীরাম দেবীকে অকালে বোধন বা জাগ্রত করে শরৎকালে পূজা করেতে বাধ‍্য হন। কারণ দেবীর মূল পূজা ছিল বসন্ত কালে। শ্রীরামের অকালে দেবীকে আরাধনা ও কঠোর পূজায় দেবী সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে রাবণ বধের বর প্রদান করেন। সেই থেকে শ্রীরামের দেবীকে শরৎকালে পূজা অনুসারে শারদে দেবী পূজা বা বন্দনা শুরু হয়।

গোটা বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মত গভীর আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধায় কানাডার ক্যালগেরি শহরেও দুর্গাপূজা উদযাপন করেন বাংলাদেশী কানাডিয়ান সনাতন ধর্মের অনুসারীরা। এখানে বাংলাদেশী কানাডিয়ানদের তিনটি গ্রুপ যেমন, বাংলাদেশ পূজা পরিষদ, আমরা সবাই এবং বেঙ্গলি এসোসিয়েশন এ বছর দুর্গাপূজা উদযাপন করছে। এর মধ‍্যে প্রথম গ্রুপটি তিথি অনুসারে ২৭সেপ্টেম্বর-১লা অক্টোবর পূজা সম্পন্ন করেছে নগরীর সাউথ ভিউ কম‍্যুনিটি এসোসিয়েশন অডিটোরিয়ামে। অন‍্য দু’টি গ্রুপের পূজা চলমান। এখানে কাজের জায়গা থেকে লোকজনের ছুটি এবং হলরুম পাওয়া এবং আরও অনেক বিষয়ের কারণে সব সময় তিথি অনুযায়ী পূজা উদযাপন সম্ভব হয় না। তবে আমার মনে হয় তিথি অনুযায়ীই পূজা করার চেষ্টা করা উচিত।

নগরীর সাউথ ইস্ট কম‍্যুনিটিতে সদ‍্য আসার কারণে এখানকার সনাতন কম‍্যুনিটির সাথে আমার তেমন যোগাযোগ নেই। একদিন পূজাতে যাওয়া প্রয়োজন মনে করে বন্ধু, সজ্জন মাসুদ ভাইকে কল করি আমাদেরকে দুর্গাপূজাতে নিয়ে যাবার জন‍্য। নবমী পূজা তথা ৩০শে সেপ্টেম্বর অফিস ছুটি থাকার কারণে তিনিও রাজী হন। বাংলাদেশ পূজা পরিষদের সময় সুচি অনুযায়ী ৫.৩০টায় সন্ধ‍্যাপূজা। আমরা যথারীতি সময়মত গিয়ে  উপস্হিত হই। গিয়ে দেখি মাত্র ৩জন মানুষ। পাশে একটি সুন্দর বিশাল মাঠ। সেই মাঠে একটু সান্ধ‍্য বিহার করে ৬টার দিকে আবার হল রুমে আসি। হলরুমে বসতেই নজরে আসে কিছু ফেষ্টুন যার প্রত‍্যেকটিতে লেখা দুর্গোৎসব। মাসুদভাইও আমাকে বললেন দুর্গাপূজাকে কেন এরা উৎসব বলছে। আমি বললাম দুর্গাপূজাই হওয়া উচিৎ। পূজা আর উৎসব এক বিষয় নয়। কমিটি হয়তো বিষয়টি খেয়াল করেনি। তাহলে এবার দেখা যাক পূজা এবং উৎসব বলতে কি বুঝায়?

“পূজা”একটি সংস্কৃত শব্দ, এর অর্থ হচ্ছে শ্রদ্ধা, সম্মান ও উপাসনা করা বা গভীর উপাসনার সাথে নিবেদন। অর্থাৎ অভিষ্ট দেবতাকে পবিত্র, সংযম চিত্ত ও সুন্দর চিন্তায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে পুষ্পরাজি, ফলাদি, মিষ্টি, মিষ্টান্ন, পবিত্র গঙ্গাজলসহ মঙ্গল প্রদীপে সাজানো নৈবিদ‍্যের প্রেমপূর্ণ উৎসর্গ করাই পূজা। পূজার সাথে আরতি, আরাধনা, সংগীত, সুর, সৃজনশীলতা ও সুন্দরের এক অপূর্ব মিথস্ক্রিয়া বিদ‍্যমান। এটি সনাতন হিন্দু ধর্মের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা অপরিহার্য অনুষ্ঠান। উপাসক প্রতিমায় তাঁর প্রাণের দেবতাকে খোঁজেন পরম মমতায় ও নিবিষ্ট শ্রদ্ধায়। উপাসকের বিশ্বাস ও ভালোবাসায় মৃন্ময়ী প্রতিমায় তাঁর উপাস‍্য দেবতা দৃশ্যমান হন, এবং উপাস‍্য দেবতাও উপাসককে দেখেন তাঁর ভক্তির মাঝে ও সুন্দর নিবেদনের মাঝে। এই হচ্ছে পূজার দর্শন। পূজা হচ্ছে মানুষের মিলনের এক আধ‍্যাত্বিক তীর্থভূমি। যা মানুষের মনে নির্মল আনন্দের পাশাপাশি এক পবিত্র প্রীতির বন্ধন রচনা করে।

উৎসব হলো বিশেষভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয় বা বিশেষ কোন দিন, ঘটনা বা ঐতিহ্যগত কোনো বিশেষ বিষয় উপলক্ষ্যে আনন্দ আয়োজন বা উদযাপনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত সমাবেশ বা অনুষ্ঠান। যেমন, সাংস্কৃতিক উৎসব, সংগীত উৎসব, বৈশাখী উৎসব ইত‍্যাদি। সুতরাং পূজা ও উৎসব এক বিষয় নয়।

সন্ধ‍্যা ৭টার দিকে মানুষজন আসা শুরু করে। যথারীতি সন্ধ‍্যাপূজা সম্পন্ন করেন পুরোহিত মহাশয়। সুবর্ণ সাজে সজ্জিত নারীরা দেবীর পূজায় সহযোগিতা করেছেন পুরোহিত মহাশয়কে। শিশু, কিশোর কিশোরী ও সুন্দর সাজে সজ্জিত নারীদের দেবীর বেদীতে বসে ছবি তোলার বিষয়টি ছিল আনন্দ ও উচ্ছাসপূর্ণ। মাসুদভাই এর মধ‍্যে ব‍্যস্ততার কারণে আমাকে রেখে চলে গেলেন। আমি হয়ে গেলাম একা। আমি একজন মানুষকেও চিনি না। এক ভদ্রলোক দূর থেকে  আমাকে বললেন “শৈলেন বাবু কেমন আছেন।” দূর থেকে হাত নাড়া ছাড়া উপায় ছিল না। তখন দেবী বন্দনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। তখনও শ্রীচন্ডীর স্তোত্র উচ্চারণ, মোহনীয় আগমনী সুরের ঝংকার আর ঢাকের মৃদু বাজনায় হল রুমে পূজার মোহনীয় আবেশ জড়ানো ছিল। এর মধ‍্যে সবাই প্রসাদ নিয়ে ব‍্যস্ত। আমি একটি আসনেই বসে রইলাম।

একা একা বসে থাকা অনাহুত মনে হচ্ছিল। একবার ভাবলাম চলে যাই। তারপরও বসে রইলাম পূজা নিয়ে লেখার জন্য কিছু ছবি তোলার জন্য। এর মধ্যে আকর্ষণীয় উচ্চারণ ও সুন্দর কণ্ঠে সঞ্চালিকা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঘোষণা করেন। স্হানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় দেবী বন্দনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উৎকর্ষতার মানদন্ডে বিশেষ না হলেও ভক্তি, অনুরাগ, অনুভূতি ও আন্তরিক প্রচেষ্টার কমতি ছিল না। প্রথমেই শিশু কিশোরীদের নৃত্যে ঝংকার তুলে। ড. শ্রাবণী ও ড. অর্পিতার নৃত্যে ছিল আধুনিকতা ও ক্ল্যাসিকাল নৃত্যের বিচিত্র মিশ্রণ। খোকন দেবনাথের “ভ্রমর কইয়ো গিয়া” গানের সুর হল রুমে ক্ষণকাল সুরের শিহরণ জাগায়। পরে আরও দু’জন শিল্পী গান করেন।

তারপরই আমি বেড়িয়ে পড়ি বাড়ির পথে। সুন্দর আবহাওয়া থাকার কারণে সুবিশাল মাঠের পাশ দিয়ে হাটতে থাকি। আর ভাবতে থাকি ক্যালগেরিতে স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশী সনাতন হিন্দুদের বসতি। সবাই মিলে কেন এক জায়গায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে বৃহৎ পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে পারেন না? তাহলে তো নিজেদের সুন্দর ধর্মীয় সাংস্কৃতির বিকাশ ও কানাডীয় সমাজের উন্নয়নে এর ভূমিকাকে গতিশীল করা যায়! সম্প্রীতির সুশীল শিক্ষায় গড়ে তোলা যায় আগামী প্রজন্মের মানুষগুলোকে। যারা এই শিক্ষা নিয়ে দ্যূতি ছড়াতে পারে কানাডিয়ান সমাজে। এর মূল সমস্যা যদি হয় কম্যুনিটির নেতা সাজার সমস্যা নিয়ে তাহলে তিন গ্ৰুপ থেকে তিনজন করে নিয়ে প্রতি পজিশনে বসিয়ে দিলেই হয়! তাহলেই আমাদের ধর্মীয় সংস্কারের জাগরণ এবং আমাদের সুন্দর জীবন দর্শন ও ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি মানুষকে ও রাষ্ট্রকে আকৃষ্ট করা সম্ভব। তা নাহলে আমাদেরকেও অন্যন্য সংস্কারের মানুষ এবং রাষ্ট্র হীন চোখেই দেখবে। বড় কিছু আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হবে না। এমনকি স্হাপন করা সম্ভব হবেনা সুদৃশ্য ও সুদর্শন, বৃহৎ মন্দির। যেখান থেকে প্রতি ভোরের গীতি আর কুসুমের প্রীতি ছড়াবে!

এসব ভাবতে ভাবতেই বাংলাদেশ থেকে একটি ফোন কল আসে। অপরপ্রান্তে ছিলেন দু’জন সজ্জন মানুষ হারুণভাই ও ওয়াহিদা। তাঁরা দু’জনে পরিচালনা করছেন নিজ হাতে গড়া ‘লাইট হাউজ’ নামে একটি সুন্দর এনজিও। হারুণভাই প্রথমেই জানতে চান দুর্গপূজা কেমন করছি? তিন দলের দুর্গাপূজার আয়োজনের কথা বলতেই তিনি হতভম্ভ! বলেন তিন দল কেন? সবাই মিলে সুন্দর শহরে বিশাল করে পূজা করবে। নিজেদের শৌর্য্য ও সৌন্দর্য্যের বিকাশ ঘটাবে। মানুষ অনুসরণ করবে! এখানেও বিভক্তি? তিনি আরও বলেন আমি তো ভাবছিলাম সুশীল হিন্দু জনগোষ্ঠী এক্ষেত্রে অগ্রগামী! তিনিও চরমভাবে হতাশ হন। তাঁর বাংলাদেশী ক্যালগেরি কম্যুনিটির প্রতি আগ্ৰহের কারণ উনাদের সুন্দর দুই ছেলে মেয়েই ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। আমার এ লেখা পড়ে যদি তিন সনাতনী দলের মহান নেতারা একটু ভেবে চিন্তে ভবিষ্যতে সবাই মিলে একসাথে অগ্ৰসর হবার চিন্তা করেন তবেই আমাদের কর্ম, চিন্তা ও সংস্কারের সৌন্দর্য্য কানাডার মত সুন্দর দেশের সুবিশাল প্রান্তরে আলো ছড়াবে।

পরিশেষে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই সার্বজনীন পূজায় জড়িত ছিলেন পৃথিবীব্যাপী প্রায় একশ পঞ্চাশ কোটি মানুষ। এমন সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে থাক সসাগরা বসুধার কোণে কোণে; জড়িয়ে যাক প্রতিটি প্রাণে প্রাণে। মহাদেবী মহেশ্বরীর প্রীতির অমিয় সৌন্দর্য্যে সেজে উঠুক শ্যামলী বসুমতি। শান্তির স্নিগ্ধ জ্যোতির্ময় রংগে উজ্জল হোক পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তর।

“দেহি সৌভাগ্যম আরোগ্যম, দেহি মে পরমং সুখম।

রূপম দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেবি দ্বিষো জহি।”

অর্থাৎ সৌভাগ্য, আরোগ্য, পরম সুখ, রূপ, জয় এবং যশ ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বচরাচরে, আর সেই সাথে বিনাশ ঘটুক সকল অশান্তি ও অশুভ শক্তির।

লেখক,  কলামিস্ট

ক্যালগেরি, কানাডা

৩০ শে সেপ্টেম্বর।