কানাডায় চোর বা ডাকাত বান্ধব আইন বিদ্যমান!

খুরশিদ আলম

বাড়িতে চোর বা ডাকাত ঢুকেছে? সাবধান! লাঠি, ছুরি, দা, বা বন্ধুক নিয়ে তাকে মারতে যাবেন না। মারলে পুলিশ উল্টো আপনার বিরুদ্ধেই মামলা করে বসতে পারে! আদলত আপনাকে জেলেও পুরতে পারে! হতে পারে ৮ বছরের জেলও!

হ্যাঁ, কানাডায় এরকমই একটি আইন বলবৎ রয়েছে। আপনার বাড়িতে চোর এসেছে বা ডাকাত এসেছে, অথচ সম্পত্তি রক্ষা বা আত্মরক্ষার অধিকার আপনার সীমিত! কদিন আগে টরন্টোর উত্তরে অবস্থিত কাউয়ার্থা লেক এলাকায় এমনই এক ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার কেন্ট স্ট্রিটের এক এপার্টমেন্টে এক ভাড়াটিয়া ঘুমিয়েছিলেন রাতে। কিন্তু রাত তিনটার দিকে তার ঘুম ভেঙ্গে যায় ঘরের ভিতর কারোর পদচারণার শব্দ শুনে। তখন তিনি দেখেন একজন লোক তার ঘরে ঢুকেছে। অতরাতে চোর বা ডাকাত ছাড়া কেউ ঘরের ভিতর ঢোকার কথা নয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি তখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠেন। আর সেই শঙ্কা থেকেই একটি ছুরি নিয়ে তিনি ঐ অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। উভয়ের মধ্যে হয়ত ধস্তাধস্তি হয়েছিল। আর তারই এক পর্যায়ে অনুপ্রবেশকারী ছুরির আঘাতে আহত হন। এবং মারাত্মকভাবেই আহত হন। এরপর খবর পেয়ে পুলিশ আসে। পুলিশ আহত অনুপ্রবেশকারীকে দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করে। তার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগ দায়ের করা হয়। এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পুলিশ একইসাথে অভিযোগ দায়ের করে অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধেও! কারণ তিনি অনুপ্রবেশকারীকে মারাত্মকভাবে আহত করেছেন। তার জখম গুরুতর।

বিষয়টি মিডিয়াতে আসার পর পুলিশের বিরুদ্ধে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। একজন বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া তার সম্পদ রক্ষার জন্য এবং একই সাথে নিজের নিরাপত্তার জন্য এক অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে অনুপ্রবেশকারী আহত হয়েছেন। আর এ কারণে ভাড়াটিয়া আইনের চোখে দোষী হয়ে গেলেন!

অনেকের সাথে পুলিশের এহেন কাজের সমালোচনা করেছেন অন্টারিও’র প্রিমিয়ার ড্যাগ ফোর্ডও। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আরো সমালোচনা করেছেন কানাডার প্রধান বিরোধী দল ফেডারেল কনজার্ভেটিভ পার্টির প্রধান নেতা পিয়ের পলিয়েভ-ও।

ড্যাগ ফোর্ড বলেন, একজন চোর বা ডাকাত কারোর বাড়িতে বা এপার্টমেন্টে ঢুকে পড়লো চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে। বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া তখন আত্মরক্ষার্থে তাকে মারধর করে। আর এই ঘটনার পর পুলিশ বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনে। গত বুধবার ২০ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ফোর্ড এ কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, “আমি জানি যদি কেউ আমার বা অন্য কারো বাড়িতে ঢুকে পড়ে, তাহলে আমরা জীবন রক্ষার জন্য লড়াই করবো। পরিবারকে রক্ষা করার জন্য যতটা সম্ভব শক্তি প্রয়োগ করবো। আমি জানি সবাই করবে।”

উল্লেখ্য যে, এই অনুপ্রবেশকারীর নাম আগে থেকেই পুলিশের খাতায় কালো তালিকাভুক্ত অবস্থায় ছিল। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে আগে থেকেই বিভিন্ন অপরাধের কারণে।

অন্যদিকে ফেডারেল কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পোইলিভও বৃহস্পতিবার ২১ আগস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় এই মামলার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন: “যদি কেউ অনুপ্রবেশ করে, তাহলে আপনার প্রিয়জন এবং আপনার সম্পত্তি রক্ষা করার অধিকার আছে আপনার – এ নিয়ে আর কোন কথা নেই, ফুল স্টপ।”

এ নিয়ে সমালোচনার ব্যাপ্তি এতটাই ঘটে যে অবশেষে স্থানীয় কওয়ার্থা পুলিশ প্রধান কার্ক রবার্টসনের পক্ষ থেকে মিডিয়াতে এক বিবৃতি পাঠানো হয় বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে।

রবার্টসনের মতে, “কানাডার আইন অনুসারে, ব্যক্তিদের নিজেদের এবং তাদের সম্পত্তি রক্ষা করার অধিকার রয়েছে। তবে, এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে কানাডায় এই অধিকারগুলি সীমাহীন নয়। আইন অনুসারে যেকোনো প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হুমকির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। এর অর্থ হল, যদিও বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়াদের নিজেদের এবং তাদের সম্পত্তি রক্ষা করার অধিকার আছে, তবুও পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলপ্রয়োগ করা যেতে পারে যা যুক্তিসংগত হতে হবে।”

(উপরে) অনুপ্রবেশকারী মাইকেল কাইল ব্রিন। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি। (নিচে) অনুপ্রবেশকারী এরকম একটি crossbow বহন করছিল। ছবি: সংগৃহীত

এখন এই ‘যুক্তিসংগত হতে হবে’ বিষয়টি কি ভাবে স্থির করবেন একজন ব্যক্তি যখন তিনি অচমকাই দেখবেন যে তার বাড়িতে বা ঘরে এক বা একাধিক চোর কিংবা ডাকাত দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে? তখন তিনি কি হিসাব করতে বসবেন যে, সেই চোর বা ডাকাতকে প্রতিহত করার জন্য কতটা বল প্রয়োগ করা যায়? এরাতো সংখ্যায় একাধিকও হতে পারেন। হতে পারেন সশস্ত্র। হয়ত হাতে কোনো অস্ত্র দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার বা তাদের কোমড়ে যে পিস্তল বা রিভলভার ‍লুকানো নেই তার গ্যারান্টি কি?

বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া হয়ত দেখলেন অনুপ্রবেশকারীর হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তাই তিনি যুক্তিসংগত ভেবে একটি লাঠি বা বেসবল ব্যাট নিয়ে অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করলেন বা ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেন। কিংবা আঘাতই করে বসলেন। অনুপ্রবেশকারী তখন নিশ্চই তার আত্মরক্ষার জন্য পকেটে বা কোমড়ে লুকিয়ে রাখা ছুরি বা পিস্তল বের করবেন। অনুপ্রবেশকারীতো কখনোই নিরস্ত্র অবস্থায় চুরি বা ডাকাতি করতে যায় না। এদের প্রকৃতিও থাকে হিংস্র। অপরের সম্পত্তি চুরি করে বা লুট করে খাওয়াই তাদের ধর্ম বা পেশা। এবং এগুলো করতে গিয়ে তারা হিংস্রতার আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এরকম পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালার জীবন যে হুমকির মুখে পড়বে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

অন্যদিকে বাড়িতে বা এপার্টমেন্টে যখন চোর বা ডাকাত ঢুকেই পড়ে তখন তার সামনে ৯১১-এ কল করার সময় কোথায়? প্রতিটি সেকেন্ডই তখন গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি কোনোভাবে একটি কল করা যায়ও তখন ৯১১ এর অপারেটর এক থেকে দুই মিনিট সময় নিতে পারেন। তারপর পুলিশ আসতে আসতে আরো ৫ থেকে ৮ বা ১০ মিনিট লেগে যেতে পারে। ততক্ষণেতো অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে যদি বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া আত্মরক্ষার জন্য তাৎক্ষণিক জরুরী কোন ব্যবস্থা না নেন।

পুলিশের কথাই ধরা যাক। তারা যখন কোন অপরাধীকে ধরার জন্য অপারেশনে যান তখন সর্বদাই প্রস্তুত থাকেন যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য। এবং অপারেশনে তারা দলবদ্ধ হয়েই যান সাধারণত। তাদের হাতে থাকে বন্দুক। শরীরে থাকে বুলেটপ্রুফ বর্ম। কিন্তু তারপরও যদি তারা দেখেন ধরতে যাওয়া অপরাধীর হাতে বন্দুক আছে, তখন পুলিশ কিন্তু দ্বিতীয়বার চিন্তা করেন না কি করতে হবে। তারা তাৎক্ষণিকভাবেই অপরাধীকে লক্ষ্য করে গুলি করে বসেন।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, বছর তিনেক আগে স্কারবরোর পোর্ট ইউনিয়ন এলাকায় এক তরুণকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিল। কারণ সে স্থানীয় একটি এলিমেন্টারী স্কুলের কাছে কাঁধে বন্দুক নিয়ে ঘুরছিল। সেদিন স্থানীয় লোকদের কাছে ফোন পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় এবং সেই তরুণকে বন্দুকসহ দেখতে পেয়ে সাথে সাথে গুলি চালায়।

পুলিশ কোনো রিস্ক নিতে চায়নি। কারণ, বন্দুকধারী তরুণটি যে কোনো ধরনের অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারতো। উল্লেখ্য যে, তার মাত্র দু-দিন আগে আমেরিকার টেক্সাসে ঘটে গিয়েছিল চরম হৃদয়বিদারক এক হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। সেখানে ১৮ বছর বয়সী এক বন্দুকধারী একটি এলিমেন্টারি স্কুলে প্রবেশ করে ১৯ জন শিশু এবং দুই শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করেছিল।

কিন্তু তারপরও স্কারবরোর পোর্ট ইউনিয়নে যে ঘটনা ঘটেছিল সেটি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে। কারণ, পুলিশ সেই তরুণটিকে বন্দুকসহ দেখতে পেয়েছিল স্কুলের বাইরে। সে যে বন্দুক নিয়ে স্কুলে ঢুকবে বা ঢুকতে পারে সে ব্যাপারে তো পুলিশ নিশ্চিত ছিল না। তাছাড়া তরুণটি ছিল একা। আর ট্রেনিংপ্রাপ্ত সশস্ত্র পুলিশের সংখ্যা ছিল বেশ কয়েকজন। তারা তো ঐ তরুণটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাকে নিরস্ত্র করে গ্রেফতার করার চেষ্টা করতে পারতো গুলি করার আগে। কিন্তু পুলিশ তা করেনি। আগেই বলেছি, তারা কোনো রিস্ক নিতে চায়নি।

বন্দুকধারী ব্যক্তিরা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এমন আরো অনেক ঘটনার কথাই জানা যাবে খোঁজ নিলে। আবার বন্দুকধারীদের গুলিতে বেশ কিছু পুলিশ নিহত হয়েছেন এমন ঘটনাও আছে কানাডায়।

মোট কথা নিরাপত্তা। পুলিশ দুর্বৃত্তদের গুলি করে নাগরিকদের নিরাপদে রাখার জন্য এবং একই সাথে নিজের নিরাপত্তার জন্যও। দুর্বৃত্তরাও গুলি করে। তবে সেটা শুধু তার নিজের নিরাপত্তার জন্য বা ধরা পড়লে শাস্তি পেতে হবে সেই ভয়ে। পুলিশের গুলি করার পিছনে বৈধ বা যৌক্তিক কারণ থাকে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা যখন গুলি করে তখন তার পিছনে কোন বৈধ কারণ থাকে না।

কাউয়ার্থা লেক এলাকায় সেই ব্যক্তিটি যখন মাঝ রাতের পর নিজ ঘরে একজন অনুপ্রবেশকারীকে আবিষ্কার করলেন তখন তিনি নিজ সম্পত্তি রক্ষা এবং নিজের জীবন রক্ষার তাগিদে অনুপ্রবেশকারীর উপর হামলা চালিয়েছিলেন। হয়ত দৃশ্যত তিনি দেখতে পেয়েছিলেন অনুপ্রবেশকারী নিরস্ত্র। (পরে জানা যায় অনুপ্রবেশকারী একটি তীরসহ ধনুক অর্থাৎ crossbow বহন করছিল) কিন্তু সেই অনুপ্রবেশকারীর পকেটে বা কোমড়ে যে কোন আগ্নেয়াস্ত্র বা ধাড়ালো ছুরি লুকানো ছিল না সেটি তিনি তখন কি ভাবে নিশ্চিত হবেন? তিনি সেই অনুপ্রবেশকারীকে ধরতে গেলে বা আটক করে পুলিশে খবর দিতে গেলে নিজেই হামলার শিকার হতে পারতেন। এবং সেটি মারাত্মক ধরনের হামলাও হতে পারতো। জীবন নাশের কারণও হতে পারতো সেই হামলা।

পুলিশের কর্তা বাবু তো বলেই খালাস যে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারী কতটা বিপজ্জনক, তার কাছে কোন মরণঘাতি অস্ত্র আছে কি না বা সে বিশালদেহী ও বেশ শক্তিশালী কি না এগুলো বিবেচনায় রেখে সেই মাত্রায় তার উপর হামলা চালাতে হবে। তিনি অবশ্য বিদ্যমান যে আইন রয়েছে সেই আইনের কথাই বলেছেন। কিন্তু সেই আইন কি বাড়িওয়ালার বা ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তাকে শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছে এ ক্ষেত্রে?

পুলিশের হাতে অস্ত্র থাকে। থাকে ট্রেনিং। তারা শারীরিকভাবেও থাকে বেশ ফিট। আসামি ধরতে গেলে পুলিশ প্রয়োজনে গুলি চালাতে পারে। কিন্তু একজন বাড়িওয়ালার ক্ষেত্রে সাধারণত এই সুবিধাগুলো থাকে না। আর কানাডায় খুব কম সংখ্যক লোকের বাড়িতেই বন্দুক থাকে। সুতরাং বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া আত্মরক্ষার জন্য তখন মরিয়া হয়ে বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে হাতের কাছে যা পান তা দিয়েই অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত বা আটক করার চেষ্টা করেন। কাউয়ার্থা লেক এলাকায় সেই ভাড়াটিয়াও তাই করেছিলেন। আর অনুপ্রবেশকারী তখন নিশ্চই প্রবলভাবে বাধা দিয়েছিলেন আটক হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে। আর তখনই হয়ত দুর্ঘটনাটি ঘটে। তাছাড়া অনুপ্রবেশকারী একটি crossbow বহন করছিলেন যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে মারাত্মকভাবে আহত করা যায়। এমনকি এর আঘাতে মৃত্যুও হতে পারে। আর অনুপ্রবেশকারী যদি বাধা না দিতেন তাহলে তিনি আহত হতেন না নিশ্চিতভাবেই। অথচ আইনের দোহাই দিয়ে অনুপ্রবেশকারীর সাথে ঐ ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের করা হয়।

কাউয়ার্থা লেক এলাকায় সেই ভাড়াটিয়ার আইনজীবী ‘নিউজ টক ১০১০’ কে বলেন যে, “তার মক্কেল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং বিশ্বাস করেন যে অনুপ্রবেশকারী প্রতি তার আচরণ বৈধ ছিল।”

উল্লেখ্য যে, পার্শ্ববর্তী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে ক্যাসেল ডকট্রিন নামে এক বিধি (Castle Doctrine) চালু রয়েছে, যা একজন ব্যক্তিকে অনুপ্রবেশকারীর বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তিসংগত শক্তি, যার মধ্যে মারাত্মক শক্তিও রয়েছে, ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। কিন্তু কানাডায় সেই প্রথা চালু নেই।

সিটিভি নিউজ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে কানাডার কয়েকজন আইনজীবীর সাথে। তারা বলেছেন, বিচারে আত্মরক্ষার দাবি সফল নাও হতে পারে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফৌজদারি আইনের অধ্যাপক কেন্ট রোচ সিটিভি-কে বলেন, “২০১২ সালে কানাডার আত্মরক্ষা আইন পরিবর্তনের পর থেকে এই ধরনের মামলাগুলি আরও সাধারণ হয়ে উঠেছে। তারপর থেকে, আত্মরক্ষার দাবি বৈধ হবে কিনা তা ভবিষ্যদ্বাণী করা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।”

তিনি আরো বলেন, “শেষ পর্যন্ত, অভিযোগ আনার কোনও কারণ আছে কিনা তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব পুলিশের উপর বর্তায়। আর বাড়ির মালিক অবশ্যই আদালতে আত্মরক্ষা এবং সম্পত্তির প্রতিরক্ষার যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। তবে এটি বিচারে সফল হতে পারে বা নাও হতে পারে।” 

ফৌজদারি আইনজীবী জোসেফ নিউবার্গার সিটিভি নিউজকে বলেন, কানাডিয়ানদের অধিকার রয়েছে নিজেদের সম্পত্তি অথবা তাদের বাড়ির যে কাউকে হুমকি থেকে রক্ষা করার। তবে, তিনি বলেন যে অনেক মামলাই অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের জন্য কী অস্ত্র ব্যবহার করছে তার উপর নির্ভর করে।

তিনি বলেন, “যদি অনুপ্রবেশকারী এক বা একাধিক ব্যক্তির কাছে ছুরি থাকে, তাহলে অবশ্যই এটি বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়ার জন্য একটি বর্ধিত ঝুঁকি যেখানে ক্ষতি বা মৃত্যুর স্পষ্ট আসন্ন ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপনি সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তাড়ানোর জন্য যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন। কারণ আপনি আপনার বাড়ির অন্যদের এবং নিজেকে রক্ষা করছেন। আপনার কাছে তখন কোনও বিকল্প নাও থাকতে পারে।”

একই কথা প্রযোজ্য যদি অনুপ্রবেশকারী এক বা একাধিক ব্যক্তির কাছে বন্দুক থাকে, যা বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়াকে ক্ষতি বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। নিউবার্গার বলেন, সেই ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি মারাত্মক শক্তি সহ উল্লেখযোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে পারেন।

কিন্তু যদি বাড়িওয়ালা অনুপ্রবেশকারীকে কোনোভাবে পরাস্ত করতে পারেন বা আটকাতে পারেন এবং এরপরও যদি তার উপর লাঠি বা বেসবল ব্যাট জতীয় কিছু দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন তাহলে সেই পরিস্থিতিকে “অতিরিক্ত বল প্রয়োগ” হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং নিউবার্গারের মতে, বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে তখন আক্রমণের অভিযোগ বা আরও গুরুতর অভিযোগ আসতে পারে।

আমরা জানি না কাউয়ার্থা লেক এলাকার সেই ভাড়াটিয়া তার এপার্টমেন্টে অনুপ্রবেশকারী সেই ব্যক্তিকে কিভাবে আহত করেছেন। প্রথমে জানা যায়নি অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তির হাতে বা সাথে লুকানো কোন অস্ত্র ছিল কি না। সেই বিষয়ে পুলিশের রিপোর্টে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি প্রথমে। পরে জানা যায় অনুপ্রবেশকারী নিরস্ত্র ছিলেন না।   

কিন্তু ঐ পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়া যদি সাহস নিয়ে অনুপ্রবেশকারীতে প্রতিহত বা আটকানোর চেষ্টা না করতেন অথবা ভয় পেয়ে যদি পিছিয়ে যেতেন তবে তার ঘর থেকে অর্থকড়িসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যেত। তবে তিনি সেটি হতে দেননি। আত্মরক্ষা এবং সম্পদ রক্ষার জন্য সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছেন অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করতে। সেই সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ভাড়াটিয়া নিজেও ছুরিকাঘাতের শিকার হতে পারতেন। বিপন্ন হতে পারতো তার নিজের জীবনও। তখন তার দায়ভার কে নিত?

আমরা জানি জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার বা রাষ্ট্রের। কিন্তু সেই সরকার বা রাষ্ট্র যদি তার দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয় এবং উল্টো এমন আইন করে রাখে যা চোর-ডাকাতদের পক্ষে যায় তখন তা নিয়ে কথা ‍উঠতেই পারে। হতে পারে সমালোচনা। অন্টারিও’র প্রিমিয়ার ড্যাগ ফোর্ড এবং কানাডার প্রধান বিরোধী দলের নেতা পিয়ের পলিয়েভ এই বিষয়ে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এবং সাধারণ মানুষও যে রকম সমালোচানা মুখর হয়ে উঠেছেন তাতে এই আইনটি সংশোধন করা জরুরী বলে আমাদের কাছেও মনে হয়েছে। এখন অপেক্ষার পালা এটি দেখার জন্য যে, সরকার এ বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেয়।

খুরশিদ আলম

সম্পাদক ও প্রকাশক

প্রবাসী কণ্ঠ