কানাডায় আমার মা হবার গল্প

শুভ্রা শিউলী সাহা

আমি এখন ছোট্ট সৌদিমিনির ঠাকুরমা । ভোলানাথের অশেষ কৃপায় ও সকলের আশীর্বাদে  বড় ছেলে অনিক সদ্য বাবা হলো ৯ জুন ২০২৫। ছেলে- বৌমার রাত-দিন খাটাখাটুনি, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতায় বিনিদ্র রাত , বিশাল দায়িত্বশীলতা দেখে সত্যি বিস্মিত হই। এটি কেবল শারীরিক নয়, এটি একটি মানসিক, সামাজিক এবং মাধুর্যময় আধ্যাত্মিক যাত্রা, নিষ্কাম কর্মযোগ। মাতৃত্ব মানেই শুধুই সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, যত্ন এবং সুরক্ষা প্রদান করাই নয় বরং কানাডার নতুন নতুন অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও দক্ষতা অর্জনের চলমান পরীক্ষা । আনন্দ -উৎকণ্ঠা তো আছেই তবে বর্তমান সমাজে জেন্ডার রোলের বিশাল পরিবর্তন দেখে খুব ভালো লাগে। প্রার্থনা করি একসাথে শুদ্ধচিত্তে সুখ দুঃখের অনেক সুন্দর স্মৃতিপট তৈরি করুক। কোন দীর্ঘশ্বাস যেন এ বাকী জীবন টুকুকে আর না ভাবায়। একে অপরের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসায়, হাসি কান্নার একে অপরের সাথী হয়ে থাকুক প্রাণে প্রাণে বন্ধন অব্যাহত থাকুক। এমন বন্ধু হয়ে থাকাটা ঈশ্বরের অপার করুনা,  আশীর্বাদ । বাবা-মা কী মায়ায় কী পরম মমতায় সন্তানকে বুকে তুলে নেয়, কেবল দেবার ব্যথা বাজে বুকের তলে। সাধুবাদ জানাই সকল আনন্দময়ী ধ্রুব জ্যোতি মায়েদের আর মাতৃত্বের প্রতি। ৩৬৫ দিনই যে  মাতৃ দিবস। প্রতি মুহূর্তে বুকের গভীরে নিজের মাকেও অনুভব করি – একবার বিরাজ গো মা হৃদি কমলাসনে। পরম স্নেহ ভালোবাসায় ছেলে-বৌমার নবজাত কন্যার লালন পালন ভালোবাসা আমাকে মনে করিয়ে দেয় কানাডায় আমার সেই সংগ্রামী  মাতৃত্বের সোনালী দিনগুলো। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে মা হবার ব্যথা বেদনা যা সন্তান বুকে নিয়ে ম্লান হয়ে যায় ।

চোখে এক সমুদ্র রঙিন ঝলমলে স্বপ্ন নিয়ে ২৯ জুন ২০০4 টরন্টোতে রওনা হবার সময় অভিক ছিল আমার গর্ভে । চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা আমি, পরিবারে সবাই কে ছেড়ে আসার কষ্ট তো ছিলই তবে Cathay Pacific  এয়ার হোস্টেসদের অতুলনীয় সেবা, আতীথিয়েতায় শারীরিক কষ্টের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল ঠিকই। তারপরও প্লেনে  দু চারবার বমি হয়েছিল । এয়ারপোর্ট থেকে গভীর আন্তরিকতায় নিলয় দা আমাদের নিয়ে এলেন। অপুর হাতের ইলিশের পাতলা ঝোল আর গরম ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। সকালে উঠে মনে হলো এতবড় জার্নির পর ডাক্তারের একটু চেকআপ দরকার। কিন্তু তার জন্য নাকি হেলথ কার্ড লাগবে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাপড়ি আপা এখানে Wood Green Community সেন্টারে কাজ করে। তাকে ফোন করলাম। সে খানিকটা research করে বলল East End Community সেন্টারে যাও সেখানে যাদের health card নেই তারাও ডাক্তার দেখাতে পারে। সেই মত নিলয় দা নামিয়ে দিলেন।

গাড়ির সিডি তে বাজছে রবীন্দ্র সংগীত – সেই যে আমার নানা রঙের দিন গুলি…. গাড়ীতে যেতে যেতে  এ আলো আধারীর জীবনের কত পুরোনো কথা, আত্মীয়— পরিজনের সবার কথাই মনে পরছিল। মা, বাবা, শাশুড়ি সবাইকে মিস করতাম। আত্মীয়পরিজন , পরিবারের সকলের সহযোগিতায় আমাদের পথ চলা। জীবনের সর্বাধিক আনন্দ হল ভালবাসা। যারা ভালোবাসতে জানে তাদের জীবনে ভালোবাসার অভাব হয় না।

সপরিবারে শুভ্রা শিউলী সাহা

প্রবাসে দেখলাম রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও সবাই কেমন আত্মীয় পরিজনের মত কাছের মানুষ হয়ে ওঠে । East End এর প্রাকটিশনার  নার্স অনেক যত্নের সাথে সব রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালো সব ঠিকঠাক আছে । গাইনী ডাক্তার Dr. Remond কে রেফার করে দিল। ডাক্তার মেয়েটিকে দেখলেই শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় শান্তিতে বুক ভরে যায়, মনে হয় আমার কত আপন। কত রকমের সাহস যে দিত। দেশে থেকে মা, দিদি বা অন্য কাউকে caregiver করে visa apply করার জন্য চিঠি লিখে দিয়েছিল। যদিও আমি তা কাজে লাগাতে পারিনি। সব সময় জানতে চাইতো তোমার কি কখনো কান্না পায়? একা লাগে? সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে আলাপ করার জন্য সোশ্যাল ওয়ার্কারের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিল। গর্ভবতী মায়েদের গ্রুপের সাথে আমাকে সংযুক্ত করে দিলো। সেখানে গেলে সবাইকে দেখে আমার খুব ভালো লাগতো। কত কি শেখাতো, পুষ্টিকর খাবার বানানো , গান গাইতো আবার প্রতি সেশনে জনের জন্য free গ্রোসারী কার্ড দিত। আমি বিশ্বাস করি মা হওয়া মানেই সবকিছু ফুলস্টপ নয় – নতুন দেশে সংসার গোছানো, লেখাপড়া, কাজ খোঁজা সবই তো করতে হবে। সেই মনের জোরেই এগিয়ে চললাম। নৃত্যগুরু প্রিয় বিপ্লব কর দাদার বাড়ির দোতালায় তখন আমরা ভাড়া থাকি। নিজের গর্ভের সন্তান অভিক বেড়ে উঠছে। মাতৃত্ব বা motherhood একটি গভীর আবেগপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা নারী জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মা কিংবা শাশুড়ি মা কেউ তো কাছে নেই। তাই নিজের যত্ন নিজেকেই করতে হয়। মাঝে মধ্যে ক্লান্তিতে কষ্ট হত। অন্য সকলের মত আমিও কোন কিছু কেনার আগে বাংলা টাকাতে তার দাম হিসেব করতাম। কোন বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছে করলেও তার দামের কথা চিন্তা করে কিনতাম না।

Esat End Community Center থেকে check করে ফেরার পথে ঢুকলাম queen এবং Coxwell  এর McDonald এ ছেলেদের জুনিয়র চিকেন কিনে দেবার জন্য । Store  ম্যানেজারকে বললাম – আমি এখানে কাজ করতে চাই। বলল কাল সকাল ৮ টায় সাদা শার্ট আর কালো ড্রেস প্যান্ট পরে আসতে। সেই মত এলাম। ১ ঘণ্টা job shadowing পর, বলল কাল তোমার অরিয়েন্টেশন। Front cash counter এ দাঁড়ালাম। কিন্তু তখনও আমি টুনি, লুনি কিংবা সব খাবারের আইটেমগুলোর নাম ধাম কিছুই তেমন ভাবে জানিনা। নতুন একটা দেশে আসার পর প্রতিদিনই নতুন নতুন জিনিস শেখা। এদের সংস্কৃতি, ভাষা, পোষাক চালচলন আরও কতকি। McDonald এ দু তিন সপ্তাহ কাজের পর মনে হলো এভাবে বরফ ভাঙ্গা কিংবা মেশিনে কোক ঢাললে আমার বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। সেদিনই Mainstreen subway থেকে নেমে Timhortons এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, একজন লেডী দরজার কাঁচ পরিষ্কার করছে – নেইম প্লেট দেখলাম তার নাম Karen. বললাম Karen তোমাদের এখানে কাজ করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। আমি খুব কাছেই থাকি। বলল চল ভেতরে, দেখি তোমার সাইজের Uniform আছে কিনা। শুরু হলো বিকেলের শিফটে কাজ করা আর সকলে কলেজ একাউন্টিং কোর্স করা। সব কাজ সেরে রাত ১১ টা থেকে ২ টা এই ছিল আমার study plan. একদিন টিমহরটনে গার্বেজ ফেলতে গিয়ে চাবি হারিয়ে  আটকা পরে ছিলাম গার্বেজ রুমে কয়েক ঘণ্টা।

এই কাস্টমার সার্ভিস job করেই শিখেছিলাম – নিজেকে সব সবসময় হাসিখুশি রাখা যায় । McDonald আর Timhortons এর job করতে করতে অনুভব করেছিলাম – কথায় কথায় Thank you বা কাউকে দেখে Good morning বলার অভ্যাসটা আমাদের কম। কেন যেন আমাদের মাঝে positivity এর অভাব। Negative টাই চোখে পরে বেশি। অন্যকে কৃতজ্ঞতা জানানো বা Appreciate করার অভ্যাস করতে অনেকটাই সময় লেগেছে  যা একটা মানুষের সাফল্যের জন্য বিশাল ভূমিকা রাখে। এ জীবনের  পাতায় পাতায় কিছু তো ভুল ত্রুটি থাকবেই তবে  নিজের প্রতি আমার অনেক বিশ্বাস । মস্তিষ্ক আমাদের পরিচালনা করে, যদি ভাবতে পারি “yes I can “ তখন ঠেকায় কে। কোন বাঁধাই যে আর থাকে না। আমি একরকমের কর্মযোগী মানুষ। গত ২৮ বছর যাবত বিরামহীন কাজ করে চলেছি ঈশ্বরের ব্রত হিসেবে। কখনো প্রত্যাশা নিয়ে কোনো কাজ করিনি।  যখন যা করেছি খুব মন প্রাণ ঢেলে দিয়ে দৃঢ়তার সাথে করেছি। এ দেশের Mainstream Economy তে সম্পৃক্ত হতে গেলে লেখাপড়ার কোন বিকল্প নেই। Guelph University তে পিএইচডি করার জন্য যোগাযোগ করেছিলাম। Agricultural Cooperative এর উপর কাজ করার জন্য । Admission জন্য কাগজ পত্রও process করেছিলাম । আমার husband তার সিভিল ইন্জিনিয়ারিং প্রফেশনাল লাইসেন্সের জন্য এগোচ্ছে  তাই ছেলেদের কথা ভেবে নিজের প্রফেশনাল  Agricultural Economics লাইনে পড়াটা স্থগিত করলাম। কলেজে Accounting পড়তে শুরু করলাম। 

কানাডা খুব সুন্দর দেশ । অনেক ধরনের Opportunity, যে যার ইচ্ছে মত কাজে লাগাতে পারে। তখন দু দশক আগে টরেন্টোর বাঙালি কমিউনিটির তেমন কাউকেই চিনতাম না। আর তথ্য প্রযুক্তি এত সহজলভ্য ছিল বললেই চলে। ইন্টারনেট কিংবা সেল ফোনের ব্যবহার এতটা ছিল না। অরিত্রর স্কুলে এদিন parent council মিটিং এ দেখা হল রোজিনা করিম কনকের সাথে। অনেক আলাপ হলো। জানলাম তার সিটি ফান্ডেড হোম ডেকেয়ারের কথা । আমাকে শিখিয়ে দিল কি ভাবে আবেদন করতে হবে। ওর টিপস গুলো খুবই কাজে দিয়েছে। আমি সেই মত আবেদন করলাম। পরিবারের আয় অনুযায়ীই ফি দিতে হয় ।

অপু বেশ ঘটা করে আমাকে সপ্তামৃত দিল। কলেজের আর টিমহরটন এর বন্ধুরা baby Shower দিয়ে দিয়েছিল। কলেজে আমার একটি আর্মেনিয়ান বন্ধু প্রায়ই আমার জন্য এটা সেটা রান্না করে নিয়ে আসতো। আমি শুধু ওদের assignment এবং project এ help করতাম। Accounting software গুলো শিখতে একটুও বেগ পেতে হয়নি। এ দেশে এসব practical applied লেখাপড়া খুব সহজ মনে হয়েছে দেশের মত কঠিন কিছু নয় । সেই সাথে চলছে অজয় বণিক দাদার কাছে ড্রাইভিং শেখা। দাদার বকা গুলো এখনো মনে হয় । কাজের ব্যস্ততায় শরীরের তেমন কোন কষ্ট অনুভব করার সুযোগ পাইনি। নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপে গেছি।পরিবার বা অন্যদের জন্যও নিজের যত্ন করাটা জরুরী। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া , নিজেকে সময় দেয়া , আমার আমিটাকে চেনা বড্ড প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ৫ মাস পেরিয়ে গেল। একদিন রাত ১১ টায় কাজ থেকে ফিরে সব কাজ শেষে যখন বিছানায় গেলাম তখন ব্যথা অনুভব করতে শুরু করলাম। ডাক্তার তার personal confidential একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল সব সময় থাকে রাখতে যখনই খারাপ লাগবে এ নম্বরে ফোন করতে। এ কমাস ফোন করার প্রয়োজন পরেনি কিন্তু আজ ফোন করতেই ডাক্তার নিজেই ফোনটা রিসিভ করলো। বললো Esat Toronto General Hospital এ চলে যেতে। আমাদের কোনো গাড়ি ছিল না তখন । দুজনই তখন আজয় দার driving school এর ছাত্র ছিলাম। আমার স্বামী খানিকটা নার্ভাস হয়ে নিলয় দা আর অপুকে কল করলো। ওরা যথারীতি ৯১১ করতে বলল। কিন্তু নতুন এদেশে এসে আমার স্বামী ভাবতো ৯১১ মানে পুলিশ আর পুলিশ মানেই সাংঘাতিক কিছু। দেশের সেই বদ্ধমূল ধারণাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতো । এদেশের মত 911 কিংবা এত নাগরিক সুবিধা কিংবা নিরাপত্তা নেই আমাদের দেশে। ওদেশে এখানকার মত এত বেশি ট্যাক্স দিতে হত না আমাদের।

অবশেষে আমাদের বিপ্লব দা আর তার বন্ধু গাড়ি করে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে গেল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। সিজার হবার সময় আমার হাসব্যান্ড আমার সমানেই ছিল। ১২ ডিসেম্বর রাত দুটোর সময় অভিকের কান্নার আওয়াজ পেলাম ও হা … ও হা… । hospital এ announcement শুনলাম Shownak has arrived. ছেলেটি যখন মায়াবী চোখ দু-খানি তুলে তাকালো আমার দিকে, নিমেষেই ভুলে গেলাম সব ব্যথা বেদনা। কেমন যেন কোথা থেকে শক্তি ফিরে পেলাম ওকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর। কানাডাতে আসার  ৫ মাস পরেই অভিকের জন্ম ডিসেম্বরের এক বরফঢাকা  সকালে। ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম সেলভেশন আর্মির কয়েক জন্য বৃদ্ধা অভিকের জন্য ফুল , নানাবিধ উপহার নিয়ে এসে মেরী খৃষ্টমাসের এর গান গেয়ে বেবীকে welcome করছে। কী ভালো লাগছিল, শরীরের ব্যথা ভুলে গিয়ে মনে হয়েছিল ওদের সাথে আমিও নাচ গান করি। ওরা মনে করিয়ে দিল – সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। এদের স্বাস্থ্যসেবা দেখে আমি অভিভূত, মনে হলো আমি স্বর্গে আছি। এত মানবিক আর ওদের কথা বলা, যত্ন সব দেখে মনে হল – সত্যি জীবে প্রেম করে যেই জন সেই সেবিছে ঈশ্বর।  বিকেল বেলা কাজ থেকে ফেরার পথে বরফ ঠেলে অভিকের বাবা এসে দেখে যেতো।

কোনো অনুযোগ নেই, যতটুকু দিয়েছো ততটুকুই শিরে ধারণ করে রাখবো হে বিশ্ব পিতা! আমার পতিদেবতাকেও ধন্যবাদ জানাই সে আমার সঙ্গে থাকে সব কিছুতেই! উঁচু নীচু পথগুলো তে হাত বাড়িয়ে দিয়ে পার করে! সাথে নিয়ে পথ চলে, হাত ধরে সাহস জোগায়!  একদিন তার সাথে এলেন আমাদের প্রনবেশ দা । বাচ্চার জন্য RESP ( Registered Education Savings Plan) খুলতে বললেন। হাসপাতালে ৫ দিন আমি একাই ছিলাম । জানতাম না যে হসপিটালে থেকে বাচ্চা নিয়ে যাবার দিন কার সিট লাগবে। একজন নার্সের সহযোগিতা একটা কার সিট জোগাড় হলো। কমলা রঙের বেক ট্যাক্সি করে বরফ ঠেলে অভিকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছলাম। পরদিন থেকে বাড়িতে নার্স প্রেট্রিশিয়া আসতো। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো, বুকের দুধ সংরক্ষণ করার কৌশল ও অন্যান্য সবকিছু চেক করতে। কী যে ভালো বলে বোঝানো মুশকিল। আমাদের ভালো থাকা নিয়ে কি যে তার প্রচেষ্টা । পরের সপ্তাহ থেকে হোম ভিজিটর ইন্দিরা আসতো। কী যে সাহস আর মনোবল পেতাম, ওর সাথে চমৎকার সময় কাটতো। টানা ১ বছরে ও আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিল। বৌমা বলল কোভিডের পর এখন নাকি এসব হেলথ কেয়ার সুযোগ সুবিধা আর নেই। হাসপাতালগুলোতেও বাজেট স্বল্পতা। ডাক্তার ও নার্সদের স্বল্পতা কারণ কভিডের পর অনেকেই এ প্রফেশনাল ছেড়ে দিয়েছে। তবে কি কানাডার স্বাস্থ্য সেবার মান কমে গেছে? এটা মেনে নিতে পারছি না। এদেশটিকে সুন্দর ও সচল রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সকল সম্পদের যত্ন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পৃথিবীটা যেন অন্যের বাসযোগ্য হয় সে দায় আমাদের সকলের। চারদিকে এখনো  কোভিডের ঢেউ কত নতুন নতুন রোগ শোক । শরীরের, মনের যত্ন নেয়া উচিত । কী খেলে , কী আচরণ করলে ভালো থাকা যাবে এই শিক্ষাটা আত্মস্থ করা জরুরী। শোভন অশোভন  ভেবে চিন্তে পথ চলতে পারলে আমাদের মত সাদামাটা মানুষদের জীবনটা কিছুটা হলেও সহজ হয় ।

নিজের কত দোষ তারপরও অন্যের ছিদ্র অন্বেষণ করতে সদা ব্যস্ত থাকি। সাধন ভজনের সময় কোথায় ? কথামৃতে ঠাকুর বলতেন আলু পটল সিদ্ধ হলে যেমন গলে যায় তেমনি মানুষ যখন ব্রহ্ম জ্ঞান লাভ করে তখন সিদ্ধপুরুষ অর্থাৎ তার মাঝে তখন অভিমান, হিংসা, দ্বেষ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ থাকে না। আমি আবার কলেজ আর কাজ শুরু করলাম । অভিকের ১১ দিন বয়স থেকে রোজিনার হোম ডে কেয়ারে দিয়ে যেতাম । সকালের বরফ ঠেলে অভিককে  ডে care এ রেখে যেতাম সঙ্গে ৬ টি বোতলে বুকের দুধ দিয়ে যেতাম। ওর ভাইয়েরা অনিক আর অরিত্র  বিকেলে স্কুল থেকে এসে নিয়ে আসতো।  কনকই ওর দ্বিতীয় মা হয়ে উঠলো। তবে আমার বড় দুই ছেলে এদেশে আসার পর থেকেই সব রকমের সীমাহীন সহযোগিতা করেছে। ওদের ছিল না কোনো আবদার বা চাহিদা। যা দিতাম তাই খেতো। নিজেদের মত করে পড়াশুনা করতো। দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া দ্বন্দ্ব হিংসা কিছুই ছিল না। ছোট ভাইটিকে পেয়ে ওরা খুব খুশী হয়েছিল। সংসারে কী যে মায়ার খেলা- ছোট শিশুটির কোমল মুখ খানাতে কী মায়া তা সুখ- সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয় । ভগবানের  দেয়া উপহার আমাদের প্রাণে  দিয়েছে আনন্দ, হৃদয় ছুঁয়ে যায় শিশুর হাসি। যদের অবদানে  জীবন সুন্দর গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের । উপহার শুধু জিনিস নয়, এ ভালোবাসা এবং যত্নের প্রতীক। এই তো আমরা একে অপরের সহমর্মিতায়, ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে যাপন করি আমাদের প্রতিটি মুহুর্ত আনন্দময় হয় যখন ভগবানকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সকল ক্ষুদ্র দুঃখ তুচ্ছ করে এগিয়ে যাই। জীবনে সুখী থাকার জন্য তেমন কিছু দরকার নেই। দামী পোষাক গহনা আর রং মেখে নিজের সৌন্দর্য বাড়ানো যায় না। সৌন্দর্য নির্ভর করে তার মনের স্বচ্ছতা ও ব্যক্তিত্বের উপর। গান্ধী জী ট্রেনে 3rd ক্লাশে চলতেন, তাকে এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে বলতো ট্রেনে 4th class নেই বলে। কত তার চাহিদা । কত কি যে দরকার । যারা স্মরনীয় মা সারদা, নিবেদীতা, বেগম রেকেয়া, মাদার তেরেসা, বিদ্যাসাগর, রামমোহন সবাই খুব সাধারণ জীবনযাপন করেছেন আর কাজ করেছেন অপরের জন্য। সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে। পাশের মানুষ গুলোকেএকটু ভালোবাসি, দু দণ্ড শান্তিতে রাখতে পারি , যাদের  আদরে, ত্যাগে ও স্নেহে আমাদের এই প্রবাসে জীবন ।  (চলবে)

লেখক পরিচিতি : পেশাগত জীবনে শুভ্রা শিউলী সাহা একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ, সংস্কৃতি কর্মী। টরন্টোর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে দীর্ঘ দিন ধরেই জড়িত। জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষনায় সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন জাতিসংঘের কর্মকান্ডে। তিনি প্রকৃতি প্রেমিক এবং কবিতা পড়তে ভালবাসেন। প্রবন্ধ, গল্প লেখা তার শখ।