ফেলে আসা দিনগুলি মোর

[অতীত জীবনের কিছু স্মৃতি]

দ্বিতীয় পর্ব

সাইদুল হোসেন

জুলাই ২, ২০২৫

ভেজা কাপড়চোপড়সহই বিছানায় শুয়ে থেকে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। ঘুম ভাংগলো কেউ একজনকে আমার বেডরুমে দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে ডাকতে শুনে- সাইদুল হোসেন সাহেব! সাইদুল হোসেন সাহেব!

ধড়মড় করে উঠে বসলাম। লক্ষ্য করে দেখলাম যে বেশ লম্বা গড়নের কেউ একজন তার হাতে জ্বালানো একটা হারিকেন ল্যাম্প নিয়ে আমাকে ডাকছেন। আমারই বয়সী। বললেন, “আসসালামু আলাইকুম, আমার নাম আবদুর রউফ। এখানে আমি রউফ সাহেব নামে পরিচিত। আমার পরিচয় হচ্ছে আমি একজন ফিল্ডম্যান। এই ব্যাচেলর্স কোয়ার্টার্সে আমি আপনার পাশের ডানদিকের রুমটাতে থাকি। অন্যান্য পরিচয় পরে হবে।”

“সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে, ডিনারের টাইম খুব কাছে। এবার উঠুন, কাপড়চোপড় ছেড়ে গোসলটা সেরে নিন। ঘরের বাইরেই টিউবওয়েল। আমি পানি তুলে দিচ্ছি। লুংগি-তোয়ালে হাতে নিয়ে ওখানে চলুন। বালতি ও মগ ওখানেই রাখা আছে।

গোসলটা সেরে ধোয়া শার্ট-প্যান্ট সুটকেইস থেকে বের করে পরে নিলাম। রউফ সাহেব আমার বেড়রুমে রাখা একটা হারিকেন ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর আমাকে তিনি নিয়ে গেলেন ডাইনিং রুমে। রান্না করা খাদ্যের সুগন্ধে পেটের ক্ষিধাটা জেগে উঠলো।

রউফ সাহেব ওখানে উপস্থিত অন্যান্যদের সংগে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। দ্রুত ডিনারটা শেষ করে তিনি আমাকে আমার রুমে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর বাথরুমটা এবং সেখানে পানি ভর্তি বালতি ও মগটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “আপনি খুবই ক্লান্ত। এখনি শুয়ে পড়ুন। সকালে এসে আপনাকে ব্রেকফাস্টের পর অফিসে নিয়ে যাবো। চোর-ডাকাতের কোন ভয় নেই। নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে পড়ুন। আস্সালামু আলাইকুম।

পরদিন সকালে তিনিই আমাকে সংগে নিয়ে Farm Superintendent – এর অফিসে পৌঁছে দিলেন, তারপর নিজের কাজে চলে গেলেন। সম্পূর্ণ অপরিচিত এই রঊফ সাহেবের সহৃদয়তা ও সাহায্য আজো আমি ভুলিনি যদিও ইতিমধ্যে সময় বয়ে গেছে ৬৯টি বছর। ভূমিকা শেষ। শুরু হলো আমার নূতন কর্মজীবন।

রংপুর জেলার সাঁওতালদের মাঝে বসবাস

উৎসবের সাজে সাঁওতাল রমনীরা। ছবি : কালবেলা

চাকরি জীবনে হাতেখড়ি হয় কলেজের ছাত্রাবস্থাতেই। গ্র্যাজুয়েশনের পর শহরের সেই চাকরি ছেড়ে বেশী বেতনের চাকরি পেলাম বটে কিন্তু পোস্টিং হলো ঢাকা থেকে বহু দূরে এক অজ পাড়াগ্রামে নবপ্রতিষ্ঠিত এক শুগার-কেইন কাল্টিভেশন ফার্মে। নিকটবর্তী রেল স্টেশন ১৪ মাইল দূরে, যাতায়াতের মাধ্যম হলো ঘোড়ায় টানা টমটম অথবা গরু-মোষের টানা গাড়ি। রাস্তা ভাঙ্গা, উঁচু-নীচু, ধূলিময়- এক কথায় প্রাগৈতিহাসিক। নিকটবর্তী মিলিটারী ক্যাম্প থেকে জীপ চালিয়ে রেল স্টেশনে আর্মির লোকেরা যখন আসা-যাওয়া করতো, তখন ধূলির কুণ্ডলীতে রাস্তার দুইপাশ আচ্ছন্ন হয়ে যেতো। আমাদের মতো নিরীহ পথচারীদের তখন হতো বড় দুর্দশা। সেই দুর্দশা আমাকে সপ্তাহে একবার, কোনো সপ্তাহে দু’বারও ভুগতেই হতো কারণ রেল স্টেশনের পাশে অবস্থিত শুগার মিলে অফিসের কাজে নিয়মিত সাপ্তাহিক যাতায়াত আমাকে করতেই হতো সারাটি বছর ধরে ফার্মের ঘোড়াটানা টমটমে চড়ে।

আজ থেকে ৬৯ বছর আগের কথা। সেই অঞ্চলটি ছিল সাঁওতাল অধ্যুষিত। অন্য যারা ছিল তাদের মাঝে হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ই ছিল। কাছেই অন্য দু’চারটি গ্রামকে ‘বার্মা রেফিউজী ক্যাম্প’ নামে পরিচয় দেয়া হতো কারণ ১৯৪২-৪৩ সনে বৃটিশ শক্তি জাপানের কাছে বার্মা রণাঙ্গণে হেরে গেলে হাজার হাজার বাঙ্গালীকে সেখান থেকে তদানীন্তন বেঙ্গল প্রোভিন্সের ভেতরে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে আনা হয়, যাদের কিছু অংশকে ঐ গ্রামগুলোতে নতুন আবাস গড়ে তোলার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়, ফলে স্থানটির নতুন নামকরণ হয় বার্মা রেফিউজী ক্যাম্প।

চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে আত্মীয়-বন্ধুদের খবর দিলাম। কলেজের এক সহপাঠী (পাবনায় বাড়ি) জায়গাটির নাম শুনেই বলে উঠলো, অবশেষে তুমি ‘বাহের দেশে’ চাকরি করতে চললে? কথাটা বুঝতে না পারায় সে বলল, তোমার পোস্টিং তো রংপুর জেলায়। নর্থ বেঙ্গলে রংপুর জেলার স্থানীয় পরিচয় হলো বাহের দেশ, কারণ রংপুরের লোকেরা তাদের কথাবার্তায় ‘বাহে’ কথাটা খুব ব্যবহার করে থাকে। যেমন, কুটি যাচ্ছেন বাহে? (কোথায় যাচ্ছেন?), কি করিচ্ছেন বাহে? (কি করছেন?), কি খালেন বাহে? (কি খেয়েছেন?) ইত্যাদি। যাহোক, বোঁচকা-বুঁচকিসহ ১৯৫৬ সনের জুন মাসের এক প্রবল বর্ষণমুখরিত দিনে রংপুরের মহিমাগঞ্জ স্টেশনে ট্রেইন থেকে নেমে ছইওয়ালা এক মোষের গাড়ি ভাড়া করে ভিজে-চুপসে ভরসন্ধ্যা বেলা কর্মস্থল সাহেবগঞ্জে পৌঁছলাম। থাকার জায়গা পেলাম বাঁশের বেড়া, ঢেউটিনের ছাউনি দেয়া ব্যাচেলার্স কোয়ার্টার্সের এক রুমে। সমবয়সী সহকর্মীর অভাব হলো না। পরদিন ফার্ম সুপারিন্টেন্ডেন্টের অফিসে গিয়ে জয়েনিং রিপোর্ট সাবমিট করলাম। অতি অমায়িক লোক। দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন, তবে বললেন তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ধীরেসুস্থে বিদায়ী অ্যাকাউন্টেন্টের কাছ থেকে কাজকর্ম বুঝে নিতে। শুরু হলো কর্মজীবন সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশে। অ্যাকাউন্টেন্ট-ক্যাশিয়ার-স্টোরকীপার এই তিন দায়িত্বই আমার একার।

বিরাট এলাকা জুড়ে সেই ফার্ম, ট্র্যাক্টরে আখের জমি চাষ করা হতো কিন্তু আখ বপন করা, জমি পরিস্কার করা, সার ছিটানো, আখ কাটা, গরু-মোষের গাড়ীতে বা ট্র্যাক্টরে তা বোঝাই করা, ফার্মের কাজে নিয়োজিত মোষগুলোর জন্যে ঘাসের চাষ করা ইত্যাদি সব কাজই করাতে হতো শত শত শ্রমিক দিয়ে। সেই সব শ্রমিকের প্রায় ষোলআনাই ছিল স্থানীয় আদিবাসী সাঁওতাল। নারী-পুরুষ সবাই কাজ করতো। ওদের দৈনিক মজুরীর কথা ভাবলে আজো আমার অবাক লাগে- পুরুষ এক-টাকা চার-আনা, নারী চৌদ্দ-আনা, ছোটছোট ছেলেমেয়েদের দশ-আনা মাত্র! সপ্তাহ শেষে মজুরী পরিশোধ করা হতো। সেদিন ওদের কি আনন্দ, কি উল্লাস! সেদিন স্থানীয় হাটের দিনও ছিল। মেয়েরা সুন্দর-সুন্দর শাড়ি-ব্লাউজ পরে চুলে তেল দিয়ে, খোঁপায় নানারংয়ের ফুল গুঁজে ওদের ভাষায় অনবরত কথা বলতো। একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়তো খিলখিল করে হাসতে হাসতে। সমস্ত অফিস প্রাঙ্গণটা ঘন্টাকয়েকের জন্যে উচ্ছল প্রাণের স্পন্দনে ভরে উঠতো। মাস্টার রোলের পাতায় ছেলেরা বাঁ-হাতের বুড়ো আঙ্গুলের এবং মেয়েরা ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলের কালির টিপছাপ দিয়ে পয়সা বুঝে নিতো। হিসাব তেমন বুঝতো না। বলতো, “হেই বাবু, তুই ঠিক গুনে দে, হামি গুনতে লারি!” তারপর কি হাসি। পয়সা বুঝে নিয়ে কলকল করে কথা বলতে বলতে হাটের দিকে পা চালাতো দলে দলে। ওরা চলে গেলে চারদিক চুপচাপ হয়ে যেতো, যেন মস্ত বড় একটা শব্দময় রঙ্গীন বেলুন হঠাৎ করে চুপসে যেতো। হাটের শেষে আবার দল বেঁধে গান গাইতে গাইতে নিজেদের ঘরে ফিরে যেতো।

ওরা গরু পালতো, জমিতে চাষ করতো, গাইয়ের দুধ বিক্রি করতো। আমরা সবাই ওদের কাছ থেকে মাসিক/সাপ্তাহিক হিসেবে দুধ নিতাম। পরিস্কার উজ্জ্বল কাঁসার ঘটিতে করে সদ্য-দোয়ানো গরুর দুধ নিয়ে বাসায় আসতো মেয়েরা। আমার সঙ্গে তখন আমার মা, ছোট দুই বোন ও এক ভাই থাকে, ফ্যামিলি কোয়ার্টার্স পেয়েছি। ওদের উপর মা দারুণ খুশী ছিলেন। একে তো খাঁটি দুধ পাওয়া যেতো, তদুপরি প্রয়োজনে হৃষ্টপুষ্ট মুরগী এবং বড় কথা, ঘরের মেঝে ও চারধারে বড় বড় ইঁদুর গর্ত খুঁড়ে উৎপাৎ শুরু করলে ওদের ডাকলেই ওগুলোকে ধরে নিয়ে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলতো। অন্তুতঃ কিছুদিনের জন্যে ইঁদুরের উৎপাৎ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতো। আমার মা রান্না করতেন। এছাড়া সংসারের যত কিছু কাজ সাঁওতাল মেয়েরা করে দিতো, মাসের শেষে পয়সা  নিতো। বড় সৎ চরিত্র ছিল ওদের,  কোনদিন কোন জিনিস চুরি হয়নি।

সাঁওতালরা ছিল প্রকৃতির পূজারী, ভূতপ্রেতে ওদের প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল। দেবতার নাম ছিল বোংগা, সবচেয়ে বড় দেবতার নাম ছিল মারাং বোংগা। শূকর বধ করে, হাড়িয়া মদ বা মহুয়ার ফল পচিয়ে তৈরী মদ খেয়ে, ঢাক-ঢোল-বাঁশী বাজিয়ে, নেচে-গেয়ে মারাং বোংগার পূজা করতো ওরা।

সমস্ত এলাকা জুড়ে ছিল ঝোপজঙ্গল, সেখানে বাস করতো নানাধরনের প্রাণী- খরগোস, শিয়াল, বন-মোরগ, তিতির, কচ্ছপ, সাপ, বড় বড় ব্যাঙ। সেগুলোই ছিল ওদের খাদ্য। ভাত খেতো সবাই ওরা। বর্ষার দিনে প্রচুর বর্ষণের পর বদ্ধ পানিতে সোনালী রঙের বড় বড় ব্যাঙগুলো যখন গ্যাং গ্যাং করে ডাকতে থাকতো, দলবদ্ধভাবে সাঁওতাল নারীপুরুষেরা হাতে মুখবন্ধ খাঁচা নিয়ে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যতগুলোকে সম্ভব ধরে সেই খাঁচায় বন্দী করে ঘরে নিয়ে যেতো। অতি সুস্বাদু খাবার ছিলো ওগুলো ওদের। গর্ত থেকে সাপ ধরে মাথাটা কেটে ফেলে চামড়া ছাড়িয়ে আগুনে পুড়িয়ে খেতে দেখেছি ওদের।

পলাশ-শিমুল-মাদার গাছে অঞ্চলটি পূর্ণ ছিল। লাল লাল ফুলে ভর্তি সেসব গাছ রাস্তার দু’পাশে অপূর্ব শোভা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। চাঁদনী রাতে সাঁওতালদের নাচ-গানের শব্দ আমাদের কানে আসতো স্পষ্টভাবেই। বিকালে কাজের শেষে মাঝেমাঝে আমরা বেড়াতে যেতাম সাঁওতাল পাড়ায়। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ছিমছাম ঘরবাড়ি ছিল ওদের। সরল প্রকৃতির মানুষ ছিল ওরা। বেড়াতে গেলে আমাকে ওরা খেতে দিতো পরিস্কার কাঁসার বাটিভর্তি গরম দুধ। কিন্তু আমার এক সহকর্মী আনিসকে দিতো বোতলভর্তি মদ ও কাঁচের গ্লাস। আনিস খুবই নেশাগ্রস্ত ছিল মদ এবং সিগারেটের। নেশা বেশী হয়ে গেলে আনিস বলতো, “আপনি আমার পেছনে পেছনে আসুন। জমির আইল ধরে হাঁটতে গিয়ে যদি দেখেন আমার পা ঠিক যায়গায় পড়ছে না, অথবা আমি পড়ে যাচ্ছি, তাহলে আমাকে সামলাবেন।” বহুদিন সামলাতে হয়েছে আনিসকে।

সাঁওতালদের পাশাপাশি কিছু হিন্দু-মুসলমানেরও বাস ছিল ঐ অঞ্চলে। হিন্দুরা ছিল ব্যবসায়ী, দোকানদার। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসই ওদের দোকানে পাওয়া যেতো। লেখাপড়া জানতো সবাই। বাঞ্ছারাম সাহা এবং সতীশ সাহার গদীতে এলাকার বহু লোকেরই বাকীর খাতা ছিল, ঋণের বোঝাও ছিল ভারী। ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ ছিল ঐ দুই ব্যবসায়ী। মূলতঃ ওরা ছিল পাবনা জেলার লোক। ব্যবহার ছিল অতি অমায়িক। আমরা যারা ফার্মের অফিসে কাজ করতাম, আমরা ছিলাম ওদের স্পেশাল খাতিরের দলভুক্ত।

আর এক শ্রেণী ছিল কন্ট্র্যাক্টর। নানাধরণের কাজ আমাদের হামেশা লেগেই ছিল ফার্মে যা টেন্ডার ডেকে এসব কন্ট্র্যাক্টরদের দ্বারা করানো হতো। দু’জন কন্ট্র্যাক্টরের নাম আজো মনে আছে। হারান ঠাকুর ও কসিমুদ্দিন। দু’জনেই পঞ্চাশোর্ধ বয়সের লোক। হারান ঠাকুর ছিলেন ব্রাক্ষ্মণ, তিনি ছিলেন স্থানীয় পোস্টমাস্টারও। প্রায়ই তিনি আমাকে তাঁর বাড়িতে সেবা করার (অর্থাৎ খাওয়ার) জন্যে অনুরোধ জানাতেন।

আর দাঁত ফোকলা কসিমুদ্দিন ছিল নামসইসর্বস্ব শিক্ষিত কন্ট্র্যাক্টর। মূলতঃ সে ছিল বিরাট জোতদার, প্রচুর পয়সার মালিক। একদিন আমাদের অফিসে এসে কসিমুদ্দিন আমাদের উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে নিবেদন করল, “তোমরা সগ্লি (সকলে) আগামী অবিবার (রবিবার) বিকালে হামার উটি (আমার ওখানে/বাড়িতে) যাবেন। এনা (কিছু) খাওয়াদাওয়া হবি। যাওয়াই নাগ্বি (যেতেই হবে)।” হাতজোড় করা অবস্থাতেই হেসে একটু লজ্জিত মুখে বলল, “হামি আবার শাদী কন্নু (করেছি)। তাই তোমাদেক্ একবার দাওয়াত দেওয়া নাগে।” সেবারে কসিমুদ্দিন তার এই চতুর্থ বিয়ে উপলক্ষে আমাদের যথেষ্ট ভূরিভোজন করিয়েছিল আজো সেটা মনে আছে।

আমাদের এক সহকর্মী (আবদুর রউফ) একদিন এক বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে নিজেই বিয়ে করে সস্ত্রীক ফিরে এলো। সে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা গেল যে বিয়ের মজলিশে দেনাপাওনার দাবী মিটল না বলে বরপক্ষ বিয়ে না করিয়েই বর নিয়ে চলে গেলে কনেপক্ষকে ঐ আকস্মিক অপমানজনক পরিস্থিতির হাত থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই মেয়েটিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। কনেপক্ষ হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো সৌভাগ্য মনে করে বিয়েটা পড়িয়ে দেয়।

এলাকার লোকজন ছিল অতি সহজ-সরল, ধর্মভীরু, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বছরের পর বছর ঐ ১৪মাইল পথ টমটমে চড়ে সঙ্গে হাজার হাজার টাকা ব্রীফকেসে ভরে রাতেদিনে যাওয়া-আসা করেছি। আমাদের ফার্মের টমটমটা ছিল এলাকার অতি পরিচিত, সঙ্গে আমিও। টমটমে আমি আছি মানেই হলো আমার সঙ্গে বহু হাজার টাকাও রয়েছে, এটা ছিল সর্বজনবিদিত। অথচ কোনোদিন কোনো ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের সম্মুখীন হয়নি। টমটমের ড্রাইভার ছিল রমজান এবং কার্তিক। মাসিক বেতন ছিল ৫০-৬০ টাকার মতো। কখনো কখনো মাঝরাস্তায় হাটে নেমে গেছি, টাকাভর্তি ব্রীফকেসটা যেকোনো একজন ড্রাইভারের হাতে দিয়ে বলেছি, “বাসায় চলে যাও, ব্রীফকেসটা আম্মার হাতে দিয়ে তুমিও ঘরে যাও।” কোনোদিন এক পয়সারও হেরফের হয়নি। অথচ বর্তমানের বাংলাদেশের ছিনতাই-রাহাজানির খবর নিত্যনৈমিত্তিক, শুনলেই গা শিউরে উঠে। ভাবি, কি সুখের স্বস্তির দিনই না ছিল ওগুলো।

সাঁওতালদের ভাষায় মানুষকে ওরা বলতো ‘হড়’। মুসলমানদের নাম ছিল মুস্লা হড়, হিন্দুরা ছিল হিন্দু হড়। ‘চল যাই’ কথাটা সাঁওতালীতে ছিল “দেলা দেলা।” এই এতো দীর্ঘদিন পর বাকী সব ভুলে গেছি, বেশ কিছু কথা শিখেছিলাম তখন। খুবই সত্যবাদী এবং ধর্মভীরু লোক ছিল ঐ সাঁওতালরা।

আমাদের অফিস, ফ্যামিলি কোয়ার্টার্স, ব্যাচের্লাস কোয়ার্টার্স ইত্যাদি ছিল একটা মস্ত বড় পুকুরের চার পাড় জুড়ে। সেই পুকুর বর্ষায় পানিতে টইটুম্বর থাকতো, আমরা সেটাতে সাঁতার কাটতাম, গোসল করতাম। আবার সেই পুকুরই গরমের দিনে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতো। সেটা তখন হয়ে পড়তো আমাদের ফুটবল খেলার মাঠ। আমার এক সহকর্মী চমৎকার হিন্দি গান গাইতে পারতো, অপর দু’জন গাইতো বাংলা। দিনগুলো ছিল বড় আনন্দের। সেই স্মৃতি আজো জীবন্ত, অম্লান। (চলবে)

সাইদুল হোসেন

মিসিসাগা, কানাডা