নিভৃতে

রীনা গুলশান

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

: হা… হা… তো কি আর করবে? তোর তো দেখি জ্বালা তাহলে রবার্টের দরজা বন্ধ করা নিয়ে? তা তুইও একজন ওরকম ধরে ফেল। ডাউনটাউনে প্রচুর ঘুরছে ঐ রকম। আর তোর যে রকম চকোলেট মার্কা চেহারা?

: ছো: ছো: ভাগ। আর কথা খুঁজে পেলি না। তুই যাই-ই বলিস ঐ ব্যাটা রবার্ট একটা আস্ত খবিশ। চরম স্বার্থপর। চিন্তা কর, এতটা দিন হয়ে গেল একটি বার খোঁজও নিল না- আমরা মরলাম কি বাঁচলাম!

: চিন্তা করিস না দোস্ত! আমি সময় মত জায়গা বুঝে দেব একটা কোপ। তোর অবর্তমানে এই দায়িত্বটা আমিই পালন করবো।

: তোর কথা বুঝলাম না। আমার অবর্তমানে কথাটার মানে কি?

: কথাটার মানে হলো, আগামীকাল সকালেই তুই একাই লন্ডন (অন্টারিও)-তে যাচ্ছিস, আমি না।

: তুই এইসব কি বলছিস, ফাবি? রায়ান রীতিমত চিৎকার করে ওঠে।

: নারে দোস্ত, তুই প্লিজ। রাগ করিস না।

: রাগ করবো না মানে কি? আমি কি শুধু নিজের জন্য মামাকে বলেছি? এমনকি মামাও তো তোর আমার দুজনের কথাই বলেছে। তাহলে এখন তুই সুর পাল্টাচ্ছিস কেন?

: না, রায়ান প্লিজ, রাগ করিস না। আমি সুর চেঞ্জ করছি না। বরং আমার সারা জীবনের সমস্ত স্বপ্নের সুরগুলোকে একই স্কেলে রাখতে চাইছি।

: কিন্তু সেটাতো ওখানে গেলেও রাখা যাবে!

: না, যাবে না। রায়ান তুই তো আমার জীবনের সবই জানিস, তোর কাছে আমার কোন লুকোছাপা নাইরে। সেই যে মা চলে গেল সুইডেনে। যাবার আগে হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল গিটারখানা। সেই থেকে আমি ওটাকে ছাড়িনি। সেই জন্য মিউজিকের উপর মাস্টার্সও করলাম। আমার শুধু এটা ঘুমের ভেতরের স্বপ্ন নয়, দিবা স্বপ্নও এই গান। গানের বাইরে আমি আর কিছু চিন্তাও করতে পারি না। এই গানের কথা চিন্তা করে আমি কানাডাতে এসেছি। তা না হলে তুই-ই বল, ভ্যালেলংগাতে আমার কিসের অভাব ছিল? একটা ভাল ক্যারিয়ারের আশায় নিজের দেশ, নানী এবং আমার সারা জীবনের ভালোবাসার ডোরিনকেও ছাড়তে হলো। কিন্তু পৃথিবীর কোন কিছুর বিনিময়েও আমি গান ছাড়তে পারবো না!

: কিন্তু এখানে চাকরি হলো না। এরকম অবস্থায়- রায়ান আমতা আমতা করে।

: ও তুই চিন্তা করিস না দোস্ত, একটা পেট চলেই যাবে। যাহোক করে…

: কিন্তু আমি যদি একা চলে যাই এইভাবে, তোর নানীর কাছে আমি মুখ দেখাবো কি করে?

: নানীর কাছে যা বলবার আমি বলবো, তুই চিন্তা করিস না।

পর দিন সব গুছিয়ে রায়ান যখন বাস স্টপে গেল, তখন ফাবিয়ান ওকে ছাড়তে গেল। ওদের কাছে আর মাত্র ১৬০০ ডলার ছিল। ২০০ ডলার শুধু রায়ান নিল টিকিট এবং হাত খরচা। বাকি ডলার ওর কাছে দিলো খুব চিন্তান্বিত মুখে। সারা পথ বাস স্টপ পর্যন্ত  আবারো ওকে বোঝাতে বোঝাতে গেল। না পেরে, ফাবিকে বকাবকি ও করলো। ফাবিয়ান কোন জবাব দিল না। শুধু মিটি মিটি হাসলো। বাস ছাড়বার আগের মুহূর্তে হঠাৎ ওকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললো রায়ান-

: আমি কখনো ভাবিনি তোকে ছাড়া আমাকে একা একা এইভাবে চলে যেতে হবে। দেশ থেকে এত দূরে এলাম দুই বন্ধু কি এভাবে আলাদা থাকবার জন্য?

: দূর বোকা, বিয়ে করলেও তো আলাদা থাকতে হতো! আর এতো ২/৩ ঘণ্টার পথ। প্রায়ই দেখা হবে আমাদের। দাঁড়ানা আমি এখানে একটু জমিয়ে বসে নেই। তোকে আবার আনিয়ে নেব!

: দেখা যাক। ভালো থাকিস। আর যদি এর মধ্যে মনটা চেঞ্জ হয় তো আমাকে প্লিজ ফোন করতে দ্বিধা করিস না।

১১

রায়ান চলে গেছে প্রায় ২/৩ সপ্তাহের মতো। তখন ফাবিয়ানের যে কিভাবে চলছে, সে নিজেও জানে না। পাগলের মতো বিভিন্ন ক্লাবে ক্লাবে ঘুরছে। বিভিন্ন মিউজিক ডাইরেক্টরের কাছে ধর্না দিচ্ছে। কেউ কথা দিচ্ছে না। এমনকি এজেন্টদের কাছেও যাচ্ছে। তারা যে টাকার অংক বলছে, এই মুহূর্তে সেটা ফাবি দেবে কোথা থেকে? তার খাবার পয়সাই নাই। এমনকি নানীকে প্রায় ২ সপ্তাহ ফোনও করেনি, কারণ আড়াই ডলার বেরিয়ে যাবে। মাসের ৩০০ ডলার দিয়ে বাকি টাকাটা যক্ষ্মের ধনের মত সামলে রাখছে। এক বেলা পাস্তা সেদ্ধ খাচ্ছে বাকি দুই বেলা পানি খাচ্ছে! ল্যান্ড লেন্ডি এলিজাবেথ একদিন ওকে ধরে খুব বকাবকি করলো-

: ফাবি, তোমার খবর কি? চেহারার একি হাল হয়েছে!

: না, না- ভালোই আছি; নতুন জায়গাতো? তাছাড় রায়ানটাও চলে যাওয়াতে…

: হু! বুঝতে পারছি। খুব মিস করছো ওকে?

: হ্যাঁ, এলিজাবেথ- জন্মোবধি এক সাথে বড় হয়েছি আমি, রায়ান, জেসন আর ডোরিন।

: হু, বুঝতে পারছি। একাকিত্ব যে কি জিনিস বাবা আমার থেকে আর কে বেশি জানে? প্রিয়জন ছেড়ে থাকা। কাছে আছে, তবুও এই দূরত্ব- এলিজাবেথ খুব জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আনমনে বলে-

: বাবা, আজ রাতে আমার সাথে খেও।

: ঠিক আছে এলিজাবেথ।

কত দিন পর আজ মন এবং পেট পুরে খেল ফাবিয়ান। খাবার তেমন কিছু না। গারলিক ব্রেড আর বেকিং চিকেন। শেষ পাতে একটা ব্লুবেরীর দই দিল। আর দিল এলিজাবেথের মাতৃ হৃদয়ের আন্তরিকতা। আহ। কত দিন পর একটু তৃপ্তির ঢেকুর তুললো ঘরে এসে। এর মধ্যে সেল বেজে উঠলো-

রায়ান : এবং তার আনন্দে উদ্বেলিত চিৎকার ধ্বনি-

: আবে ইয়ার, তোর পাত্তা নেই কেন? তুই কি এখনো না খেয়ে বেঁচে আছিস? অথবা মরে ভুত হয়েছিস?

: বহাল তবিয়তে আছি ভায়া, এই মাত্র গুচ্ছের খেয়ে এলাম।

: বলিস কি? আমি তো ভাবলাম তুই অলরেডি কিং এন্ড ডাফরীনের মোড়ে টুপি পেতে ভিক্ষে শুরু করেছিস!

: নাহ্! এখন অবদি নয়। তবে খুব শিঘ্রিই সম্ভবত…

: হা… হা… দোস্ত, আব আয়া না উট পাহাড় কি নিচে…

: আরে না, এখনো পাহাড় অনেক দূরে। তা তোকে এত্ত খুশি লাগছে কেনরে?

: আবে দোস্ত, চাকরিতো পেয়েছিই তারপর বেজমেন্ট সুন্দর সাজানো ঘর পেয়েছি। খাবারও চিন্তা নাই। রেস্টুরেন্টে তো মারছি তিন বেলা। আবার আন্টির প্রায়ই দাওয়াততো আছেই। কিন্তু আনন্দের কারণ অন্য…

: হুম! লেট মি গেস্- নিশ্চয়ই কোন চমনবাহারের সন্ধান পেয়েছিস!

: আরে ইয়ার, একদম তাই। হানড্রেট পারসেন্ট সহি নিশানা। কিন্তু সন্ধান করতে হয়নি, একেবারে চোখের উপরে- ওহ্! একেবারে পটাকা। হানড্রেট পাওয়ারের পটাকা। কি চোখ, কি হাসি আর ফিগার? একেবারে ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এর সাইজ…

: নিশ্চয়ই তোর ঐ আঙ্কেলের মেয়ে, ঐ মটু মামার মেয়ে।

: হা… হা… ঠিক ধরেছিস।

: তা তোরও যা একখানা চেহারা, একেবারে ব্রাড পীট!

: আরে রাখ তোর ব্রাড পীট! আমি তো ওর থেকেও হ্যান্ডসাম।

: এ ব্যাপারে অবশ্য আমি তোর সাথে একমত, তা চেহারাটা এবারে কাজে লাগা।

: আরে অর্জুন-এর তীর একেবারে ইশারামে…

: বলিস কি, তা ফুলঝুরির নাম কি?

: মিরান্ডা গ্যারিসটো, এখনই সে খাবার নিয়ে আমার ঘরে চলে আসবে।

: আচ্ছা। তাহলে তো খুবই ভালো হলো- লেগে থাক। আমি আছি তোর পেছনে। সময় মত গ্র“ম ব্রাদার হবার জন্য হা… হা…।

: শোন, কোন অসুবিধা হলে ফোন দিস। আর চলে আসতে লজ্জা পাস না।

: আরে না, তোর কাছে আবার কিসের লজ্জা।

এরপরও ৩/৪ মাস চলে গেল খুড়িয়ে খুড়িয়ে। পকেটে রেস্ত প্রায় জীরোর কোঠায়। এ মাসের আজ ১৭ তারিখ। শেষ হতেও আর বাকি নাই। খাওয়ার চিন্তার থেকেও ঘর ভাড়া কিভাবে দিবে, সে চিন্তাই দিন রাত্রি ফাবিয়ানকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এখন প্রায় সাড়ে তিনটার মত বাজে। সকাল থেকে পেটে কোন দানাপানি পড়েনি। ভোর হতেই ঘাড়ে গিটার খানা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। কুইনের প্রায় প্রতিটি ক্লাব এবং রেস্টুরেন্টে হানা দিয়েছে যদি কোন কাজ পাওয়া যায়! কিন্তু না। বিফল মনোরথ ফাবিয়ান ডানডাস এন্ড ইয়াং-এর মোড়ে একটা ‘টিম হর্টনে’ ঢুকে একটা বেইগল আর কফি নিল। ১ ডলার ৬৪ সেন্টের মধ্যে হয়ে গেল। ওটাই তাবিয়ে তাবিয়ে খেল। তারপর কফি শেষ করে বেরিয়ে এলো। দেখলো ডানডাস স্কোয়ারের মোড়ের উপর ৭০-এর কাছাকাছি একটা চুলদাড়ি লম্বা লোক অনেকক্ষণ ধরে গান গাইছে। সামনে তার গিটারের বক্স খোলা, ২/১টা লুনি, টুনি আছে। তেমন কেউ পয়সা দিচ্ছে না। মানুষটা খুব ক্লান্ত হয়ে এখন বসে পড়েছে। ফাবিয়ান হাটি হাটি তার কাছে গেল। ওকে হাই বলে কথা শুরু করলো। লোকটা বললো, ও একজন মিউজিশিয়ান ছিল। এখন ফুসফুসে পানি জমেছে। ভালো করে গান গাইতে পারে না। একটা গাইলেই হাফ ধরে যায়। নাম তার জনাথন। ফাবি তার অনুমতি নিয়ে বলল-

: আমি কি তোমার জন্য একটা গান গাইবো?

: আমার জন্য? মানে ঠিক বুঝলাম না!

: মানে হলো, আমি তোমার জন্য গাইবো। পয়সা যা হবে সব তোমার, আমি নিব না।

: তুমি ঠিক বলছো? ওকে তবে গাও, লোকটা মিনমিন করে বললো, ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না।

ফাবিয়ান তার গিটার খানা খুলে মাথার ক্যাপ চোখের কাছাকাছি নামিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে গাওয়া শুরু করলো। সে যে কি গান! মনে হচ্ছে গাছের পাতা পড়ে যাবে। তন্ময় হয়ে জীবনের সমস্ত পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে যেন ও গান গাইছে। প্রতিটি শব্দ থেকে যেন ব্যাথা ঝরে পড়ছে। (গান)

Oceans apart day after day
And I slowly go insane
I hear your voice on the line
But it doesn’t stop the pain

If I see you next to never
How can we say forever

Wherever you go, whatever you do
I will be right here waiting for you
Whatever it takes or how my heart breaks
I will be right here waiting for you

রিচার্ড মার্কসের এই বিখ্যাত গানটি যখন ফাবিয়ান গাইছিল, এমনকি জনাথনের চোখ দিয়েও টপটপ করে অশ্র“ ঝরে পড়ছিল। ওদের ঘিরে বেশ একটা ভিড় হয়ে গেল মানুষের। সবাই টপটপ পয়সা ফেলছে। এক বুড়োতো চোখ মুছে ১০ ডলারের একটা নোট দিল। বক্সটা প্রায় ভরে গেল খুচরো এবং নোট-এ। জনাথনের ক্লান্ত দুঃখী চোখে আনন্দাশ্র“। গান শেষে ফাবিয়ান তার গিটারের বাক্স বন্ধ করে চলে যাবার সময় জনাথন বললো-

: তুমি কে বাবা জানি না, তবে আজ আমার জন্য তো দেবদূত হয়ে এসেছো। তুমি বাবা এখান থেকে অর্ধেক পয়সা নিয়ে যাও। না হলে আমার একটুও ভালো লাগবে না।

ফাবিয়ান মিষ্টি করে হেসে তার হাত বাড়িয়ে শেকহ্যান্ড করলো, তারপর দুঃখী গলায় বললো-

: আমি ফাবিয়ান। আমার খুব মন খারাপ ছিল তাই তোমার জন্য গাইলাম। আবার দেখা হবে জনাথন। আমার জন্য দোয়া করবে, বলেই ফাবিয়ান ডানভাস স্কোয়ারের রোড ক্রস করলো। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ বললো-

: এক্সকিউজমি, আমি কি তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারি?

ফাবিয়ান খুব অবাক হয়ে পেছন ফিরে দেখে, একটা মেয়ে খুব কৌতুহলী চোখে ওর দিকে চেয়ে আছে।

: শিওর। বলুন কি বলতে চান?

: নাহ্ মানে একটু কথা বলতাম আর কি? তার আগে পরিচয়টা সেরে নেই, আমি নাওমী সুলেভান বলেই নাওমী হাত বাড়িয়ে দিল। ফাবিয়ান অসম্ভব বিস্মিত হয়ে তার হাত বাড়িয়ে শেক হ্যান্ড করতে করতে বললো-

: আর আমি ফাবিয়ান ফ্রাঞ্জিপেনে।

: আচ্ছা, যদি কিছু মনে না কর, বাকি কথাবার্তা আমরা এই ‘বার্গার কিং-এ’ বলি।

: ওকে, ততোক্ষণে ফাবিয়ানের কৌতুহলে প্রায় নাবিশ্বাস অবস্থা। কারণ, সে জানে এখানেও কাউকেই চেনে না। একে তো নয়ই। তাহলে কে এই মেয়েটি? জীবনে কখনো দেখেছে বলেও মনে পড়ে না। যাই হোক, মেয়েটির পিছু পিছু গিয়ে ‘বার্গার কিং’-এর ভেতরে ঢুকলো। তার দোস্ত এরকমই একটা বার্গার কিং-এ কাজ করে। ফাবিয়ান অবশ্য ইটালিতে প্রচুর খেয়েছে। তবে কানাডাতে এখনই প্রথম ঢুকলো। নাওমী ভেতরে ঢুকে একে একটি টেবিলের পাশের চেয়ার দেখিয়ে বললো-

: প্লিজ একটু বসো এখানে, আমি খাবার নিয়ে আসছি। তুমি চিকেন অথবা বীফ কোনটা পছন্দ কর?

: চিকেন প্লিজ।

: ধন্যবাদ, বলেই এক ছুটে দুটো চিকেন বার্গার, অনিয়ন রিং এবং দুটো পেপসি অর্ডার করলো। তারপর বিল দিয়ে নিজেই ট্রেটা হাতে করে আনলো। এসে নিজেই ফাবিয়ানের হাতে ১টা প্যাকেট ধরিয়ে দিল। ফাবিয়ান দেখলো প্যাকেটে অনেক কিছু। একটু কুণ্ঠিত হলো এই জন্য যে ওর পকেট প্রায় শূন্যের কোঠায়। কিন্তু নাওমী বেশ দ্বিধাহীনভাবে খাওয়া শুরু করলো। এতক্ষণে ফাবি মেয়েটিকে একটু খুটিয়ে দেখলো। নাওমী বেশ ফ্যাকাশে সাদা, হালকা লালচে ব্লন্ড চুল, চোখগুলো মাঝারি আকারের গাঢ় নীলাভ সবুজ, মুখটা পাতলা লম্বাটে, স্লিম ফিগার, লম্বায় সম্ভবত ৫ ফুট ৫ বা ৬ ইঞ্চি। তবে মেয়েটার সবচেয়ে সুন্দর ওর হাসি। অপূর্ব ঝকঝকে নির্মল হাসি। কে যেন বলেছিল, যার হাসি যত সুন্দর এবং নির্মল, তার হৃদয়ও নাকি ততোটাই সুন্দর। কে বলেছিল? ধুৎ ছাই মনে পড়ছে না। ফাবিয়ান একটু লজ্জা পেল, এভাবে সদ্য পরিচিত কোন মেয়েকে দেখে নাকি? মেয়েটা তার সম্পর্কে কি ভাবছে কে জানে?

: ফাবিয়ান, তুমিতো খুব সুন্দর গাও, তো পথে গান গেয়ে ভিক্ষা করছিলে কেন? আর কোন সুযোগ কি পাওনি? তাছাড়া তুমি তো খুবই ইয়াং।

: তুমি এক সঙ্গে তিনটে প্রশ্ন করেছো, প্রথমটার উত্তর আমি ভিক্ষা করছিলাম না। আমি ঐ মানুষটাকে সাহায্য করছিলাম যে কিনা এক সময় মিউজিশিয়ান ছিল। এখন তার শরীর খুবই খারাপ। আমি টিম হর্টনে কফি কিনে হঠাৎ ওর অবস্থা দেখে খুব মায়া হলো, তাই ওকে এইভাবে একটু সাহায্য করলাম। কারণ, অর্থ দিয়ে সাহায্য করবার মত আমার নিজেরই দশা নাই। কিন্তু, যেহেতু গানটা একটু জানি, তাই ওটা দিয়েই সাহায্য করছিলাম। দ্বিতীয় উত্তর, আমি সত্যিই কোন সুযোগও পাইনি। যদিও আমার কানাডার অবস্থানও খুব বেশি দিন নয়।

: তাই নাকি? তা কোথা দিয়ে এসেছো?

: আমি ইটালিয়ান। মাত্র ৬/৭ মাস হলো এসেছি। তো বিভিন্ন জায়গাতে রিজ্যুমি দিচ্ছি, কোথাও থেকে ডাক আসছে না। আর আমি মূলত গানের উপরই চেষ্টা চালাচ্ছিলাম এতদিন।

: ওহ্! তা তোমার গানের উপর কোন একাডেমিক সার্টিফিকেট আছে নাকি?

: হ্যাঁ, আমি মিউজিকের উপর কালাব্রীয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছি।

: বলকি?

: হ্যাঁ, তাছাড়া আমার নিজের একটা গানের দলও ছিলো।

: তা এখানে কেন এলে?

: আসলে আমার এক বন্ধু রবার্ট ওর নাম, ওর মাধ্যমে শুনলাম এখানে লেগে থাকলে ভাল সুযোগ পাওয়া যাবে। তাই অত সাত পাঁচ না ভেবেই চলে এসেছি। তবে বর্তমানে পকেটের অবস্থা বেশ খারাপ।

: হু। এত খারাপ, তবুও তো ঐ লোকটা তোমাকে ওর ডলারের অর্ধেক নিতে বললো, তাও তো নিলে না?

: কারণ, তাহলে তো ওকে আমার সাহায্য করা হতো না। উল্টো, সাহায্য নেওয়া হতো।

: হ্যাঁ, হ্যাঁ তা ঠিক।

: আসলে এখনও ঠিক অতটা নিচে নামতে পারিনি।

: শুনে ভালো লাগলো। তবে কিনা বিপাকে পড়লে মানুষকে সবই করতে হয়।

: ঠিকই বলেছো, তা ২/৪ দিনে আমিও কিছু ম্যানেজ না করতে পারলে, আমাকেও জনাথনের সাথে হাত মিলাতে হবে!

: হা… হা… হি… হি… তুমি তো খুব রসিক।

: খুব না, তবে পেটে খাবার পড়েছে তো, তাই একটু হাসির কথা বলতে পারছি।

: বেশ তাহলে খাওয়া হলো। অল্প স্বল্প গল্পও হলো। এবারে তাহলে আমার সাথে চলো।

: তোমার সাথে? কোথায়?

: কেন, আমার সাথে যেতে আপত্তি আছে?

: না, তা অবশ্য নাই। শুধু জানতে চাইছিলাম কোথায়? কারণ এখনতো বিকাল ৫টা বাজে।

: হ্যাঁ, এটাই আমার অফিসের সময়- বলতে বলতে বেশ দ্রুত লয়েই হাঁটতে আরম্ভ করে দিল। ফাবি তাকে অনুসরণ করলো।

: আমার কাজের সময় আসলে ৬টায়। তবে এক ঘণ্টা আগে কাজে যেতে হয়। কারণ ড্রেস চেঞ্জ করা লাগে। আমি একটা নাইট ক্লাবে ‘বারটেনডারের’ কাজ করি। এই তো প্রায় এসে পড়েছি। অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। বেশ ক্ষিধা পেয়েছিল। খাবার জন্য এদিকটাতে এসেছিলাম। হঠাৎ তোমার গান শুনে থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অনেক দিন পর এত সুন্দর একটা কণ্ঠ শুনলাম-

: ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ।

: তাছাড়া ‘রিচার্ড মার্কসের’ এই গানটা আমার নিজেরও অসম্ভব প্রিয়। রোজই বলতে গেলে একবার গানটি শুনি।

: তাই নাকি? আমারও খুব প্রিয়। বিশেষ করে যখন আমার পুরানো কোন দুঃখেরা আমাকে পরিবেষ্টিত করে, তখনই এই গানটির মধ্যে আমি নিজের সুখ খুঁজি।

: বলকি, দুঃখের গানে সুখ খোঁজ?

: কেন জানো না, বিষে বিষ ক্ষয়!

: ওহো, হো…

কথা বলতে বলতেই কখন জানি ওরা নাইট ক্লাবটির সামনে উপস্থিত হয়েছে। ফাবিয়ান দেখলো অনেক বড় করে লেখা ‘হীচ হাইকার’।

: শিঘ্রি চলো, আজ যে কপালে কি আছে কে জানে? নাওমী বেশ ছুটতে ছুটতেই ভেতরে ওকে নিয়ে ঢুকে পড়লো।

: এই যে সুন্দরী! এতক্ষণে আসা হয়েছে? একটা বিশাল হেড়ে গলার চিৎকারে ফাবিয়ান চমকে পেছনে ফিরে দেখলো, একটা বিশাল দেহী মানুষ ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

: ফাবিয়ান এই যে আমার বস্। এ্যান্থনি বারজেস। বস্ এ ফাবিয়ান ফ্রাঞ্জিপেনে।

: এটাকে আবার কোথা থেকে উঠিয়ে আনলে? আর তুমি আজও বারো মিনিট লেট। তোমাকে কিন্তু এবারে আমার এই লাস্ট ওয়ার্নিং।

: ওকে বস্। আমি বুঝতে পেরেছি। বস আমার একটা আর্জি আছে প্লিজ, একটু কথা বলতে দাও আমাকে।

: আচ্ছা, আচ্ছা- কি বলতে চাও।

: বস, এই ছেলেটা অপূর্ব গান গায়। আমি নিজে শুনেছি আজ। তোমার ঐ গাইয়ে ছেলেটি মানে মাইলস ওর থেকে ফাবিয়ান মিলিয়ন গুন ভালো গায়।

: আচ্ছা! এ্যান্থনির গলায় বিদ্রুপ।

: না, বস আমি সত্যি বলছি। তুমি অন্তত একটি বার ওকে শোন প্লিজ, তারপর তোমার পছন্দ না হলে তাড়িয়ে দাও- আমি কিচ্ছু বলবো না।

: ওকে, ওকে- তাহলে আজ স্টেজে মাইলস-এর জায়গাতে এই-ই গাইবে। এই ছোকড়া, যদি সকলে তোমাকে পছন্দ করে তবেই…

ফাবিয়ান তখন মনে মনে ‘ইয়েস’ বলে একটা চিৎকার দিল। ওহ্ গড, এই দিনটির জন্য আজ সে বহু দিন অপেক্ষায় আছে। এতদিনে তবে ঈশ্বর মুখ তুলে চেয়েছে। আহ্, নাওমী এই মেয়েটি তার জীবনে এ্যাঞ্জেল এর রূপ নিয়ে এসেছে!

তারপর। হ্যাঁ, তারপর আর কখনো ফাবিয়ানকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু এ্যান্থনি বারজেসই নয়, মোটামুটি এখানকার সমস্ত ক্লাইন্টরাই তাকে পছন্দ করেছে। যদিও আজও সে তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। তবু মোটামুটি তার সুখ্যাতি ভালো ছড়িয়েছে। এই ক্লাবের গান করবার ফলশ্র“তিতে এখানকার মিউজিক্যাল স্কুলেও সে চান্স পেয়েছে। সপ্তাহে ২ দিন ২টা ক্লাস নেয়। এছাড়া ৪/৫টা ছাত্রকে প্রাইভেটেও মিউজিক শেখায়। (চলবে)

রীনা গুলশান

লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।