কানাডায় কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা সহিংসতা চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে!
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ২০ জুলাই ২০২৫: কানাডায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতবাদে বিশ্বাসীদের মধ্যে কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি সহিংসতা সৃষ্টির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে! এরা মূলত অভিবাসী-বিরোধী এবং ইহুদি-বিরোধী। বিভিন্ন পাবলিক পার্ক, প্রাইভেট জিম এবং মার্শাল আর্ট ক্লাবগুলিতে – যেখানে শিশুরাও ক্লাস নেয় – সেখানে তারা সহিংসতা চালানোর জন্য রীতিমত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। পুরুষ-কেন্দ্রিক এই গোষ্ঠীর সদস্যরা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ প্রচার করে। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে রাজপথে প্রতিবাদ থেকে শুরু করে ভাঙচুর, প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের মতবাদ পোস্ট করা। তারা পরিকল্পনা করছে বা স্বপ্ন দেখছে- বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং একটি নতুন শ্বেতাঙ্গ-কেন্দ্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। খবর সিবিসি নিউজের।
কুখ্যাত এই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী কমিউনিটিতে এদের সাংগঠনিক কার্যক্রম অ্যাক্টিভ ক্লাব কানাডা’ এর ব্যানারে পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই ক্লাবগুলোর কার্যক্রম চলছে সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে। তারা অনলাইন প্রচারণার অংশ হিসাবে তাদের প্রশিক্ষণ সেশনের ভিডিও পোস্ট করে এবং সেখানে তাদের মুখ লুকানো থাকে এক ধরণের বিশেষ মাস্কের আড়ালে এবং তারা তাদের অবস্থান গোপন রাখার জন্য সতর্ক থাকে।

কিন্তু ‘দ্য ফিফথ এস্টেট’ এর সহযোগিতায় মাসব্যাপী সিবিসি’র ভিজ্যুয়াল তদন্তে দেখা গেছে এই গোষ্ঠীগুলির কিছু অংশ ঠিক কোন কোন জায়গায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
এই অ্যাক্টিভ ক্লাব কানাডা’ একটি বিকেন্দ্রীভূত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী এবং নব্য-নাৎসি নেটওয়ার্কের অংশ যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা ক্রমবর্ধমানভাবে অনলাইন ফোরাম থেকে বাস্তব জগতে প্রবেশ করছে। মার্শাল আর্ট বা ক্যারাটের প্রশিক্ষণ নিয়ে অভিবাসন বিরোধী বিক্ষোভ বা তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে এই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গ্রুপের সদস্যরা।
“দৃশ্যত বা বাহ্যিকভাবে, তারা এমন লোকদের দলে টানছে যারা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে, ওজন নিয়ন্ত্রণ রেখে সুঠাম দেহের অধিকারী হতে এবং মার্শাল আর্ট এর প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী।” সিবিসি নিউজকে এ কথা বলেছেন ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের ম্যাক ল্যামোরেক্স, যা যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক। এরা কর্তৃত্ববাদ, বর্ণবাদ, ঘৃণা এবং চরমপন্থা সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা করে থাকে। এই থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এর মতে “এরা হলো হিংস্র শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী। এরা এমন লোক যারা অনেক ক্ষেত্রেই আসন্ন জাতিগত যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।”
অন্যদিকে গ্লোবাল প্রজেক্ট এগেইনস্ট হেট অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ২৭টি দেশে ১৮৭টি অ্যাক্টিভ ক্লাব’ রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি রয়েছে কানাডায় । সবচেয়ে জনপ্রিয় হল হ্যামিল্টন-ভিত্তিক ‘ন্যাশনালিস্ট-১৩’ (NS13)। সম্প্রতি, ‘সেকেন্ড সন্স’ নামে একটি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গ্রুপ-ও কানাডা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সিবিসি নিউজের খবরে বলা হয়, গত কয়েক মাসে, ‘ন্যাশনালিস্ট-১৩’ আগের চেয়ে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং প্রকাশ্যেই প্রচারণা চালাচ্ছে। সম্পূর্ণ কালো ইউনিফর্ম এবং মুখোশ পরে তারা টরন্টো, লন্ডন এবং হ্যামিল্টনে অভিবাসন বিরোধী বিক্ষোভে অন্যান্য সক্রিয় ক্লাবের সদস্যদের সাথে যোগ দিয়েছিল। অভিবাসীদেরকে “গণ হরে নির্বাসনের” আহ্বান জানিয়ে ব্যানার উচিয়ে ধরেছিল তারা।
ম্যাক ল্যামোরেক্স বলেন কানাডিয়ান অ্যাক্টিভ ক্লাব’ গুলির “অন্যান্য অতি-ডানপন্থী এবং চরমপন্থী সংগঠনগুলির সাথে অনেক গভীর সংযোগ রয়েছে।”
এর মধ্যে রয়েছে কানাডিয়ান প্রাউড বয়েজ এবং কুখ্যাত অ্যাটমওয়াফেন ডিভিশনের মতো গোষ্ঠী, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পাঁচটি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ২০২১ সালে পাবলিক সেফটি কানাডা এই উভয় গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং কানাডায় তাদের সংগঠনকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তবে, তারা এখনও আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের কিছু সদস্য অ্যাক্টিভ ক্লাব’ এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। সিবিসি নিউজের খবরে এ কথা বলা হয়।
২০২৩ সালের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এক তদন্তে নেমে আরসিএমপি এমন দুই ব্যক্তিকে আটক করেছিল যারা অ্যাটমওয়াফেনের জন্য নিয়োগের ভিডিও তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী তদন্তে নেমে তখন আরসিএমপি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে “অনেক প্রাক্তন অ্যাটমওয়াফেন এর সদস্য কানাডার ‘অ্যাক্টিভ ক্লাব’ এ যোগ দিয়েছে।”
সিবিসি নিউজের এক তদন্তে আরো দেখা গেছে যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা হ্যামিল্টন-এলাকার জিম এবং পার্কগুলিতে “বর্ণ যুদ্ধের” প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই খবর প্রকাশের পর হ্যামিল্টনের মেয়র এন্ড্রিয়া হারওয়াথ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, আপনার আশেপাশে ঘৃণার পরিবেশ খুঁজে পেলে, রিপোর্ট করুন। মেয়র হারওয়াথ আরো বলেন, “হ্যামিল্টনে ঘৃণার কোনও স্থান নেই,” এটি এমন একটি শহর যা সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তি, ডাইভার্সিটি এবং নিরাপত্তাকে মূল্য দেয়।”
অন্যদিকে হ্যামিল্টন সিটির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নরিন্দার ন্যান সিবিসি নিউজকে বলেন, “আমি মনে করি এটি জননিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগ।”
ন্যান আরো বলেন, হ্যামিল্টনে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সংগঠন সম্পর্কে “অনেক” বাসিন্দার উদ্বেগ তিনি শুনেছেন এবং সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন যেখানে স্থানীয় দোকানগুলিতে বর্ণবাদী গ্রাফিতি লেখা হয়েছিল এবং ভাঙচুর করা হয়েছিল।
ওয়ার্ড ৩ কাউন্সিলর ন্যান এমন একটি এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন যেখানে কিছু ক্লাব সদস্যকে প্রশিক্ষণ নিতে দেখা গেছে।
ন্যান বলেন, “চরমপন্থী সংগঠনের উত্থান জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় নয়।” তিনি আশা করেন যে, যারাই জানতে পারবেন এই গোষ্ঠীগুলি তাদের এলাকায় কাজ করছে তারা সেটি পুলিশকে অবহিত করবেন।
