২০২৪ সালে কানাডায় স্টাডি পারমিটের অনুমোদন হ্রাস পেয়েছে রেকর্ড পরিমানে
২০২৫ সালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে চায় দেশটি
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : ২০২৪ সালে কানাডায় অনুমোদিত স্টাডি পারমিটের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে রেকর্ড পরিমানে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় ২০২৩ সালে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৬৮১,৩৯০টি অনুমোদনের পর, ২০২৪ সালে অনুমোদন কমে ৫১৮,১২৫টিতে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমন নিয়ন্ত্রণের জন্য কানাডিয়ান সরকারের প্রচেষ্টার ফলে এই হ্রাস ঘটেছে। আবাসন সংকট, সরকারী সম্পদের উপর অতিরিক্ত চাপ এবং শিক্ষার্থীদের উপর আর্থিক চাপ সৃষ্টিকারী ক্রমবর্ধমান টিউশন ফি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই হ্রাস এসেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কানাডায় প্রবেশের ক্ষেত্রে আবারও লাগাম টানতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়, কানাডা ২০২৫ সালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে চায়। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা সহ অন্যান্য সমস্যার কারণে দেশটির সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে ৪ লাখ ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীকে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে যা ২০২৪ সালের সংখ্যার চেয়ে ১০ শতাংশ কম। গত ২৪ জানুয়ারি দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এতথ্য জানিয়েছে।

উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু মানুষ পাড়ি জমিয়েছেন। এর ফলে দেশটিতে ব্যাপক আকারে আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। আর এ কারণে আবাসন সংকট দূর করতে অভিবাসীদের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি ২০২৪ সালে বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্টাডি পারমিটের সংখ্যাও হ্রাস কর হয়।
এর আগে, ২০২৩ সালে সাড়ে ৬ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে কানাডায় পড়াশোনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শিক্ষার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে শীর্ষ পছন্দের দেশ কানাডা।
কানাডার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটিতে সক্রিয় ভিসাধারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে পৌঁছেছিল। ১০ বছর আগে, ২০১২ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার।
উল্লেখ্য যে, কানাডায় ২০০১ সাল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর এই শিক্ষার্থীদের অনেকে লেখাপড়া শেষে এদেশে থেকে গেছে এবং তাদের অস্থায়ী চাকরি এবং স্থায়ী আবাসন অব্যাহত রেখেছে। এই ছাত্ররা কানাডার অর্থনীতির সুযোগ নেয়া এবং উন্নত জীবনযাত্রা ভোগ করার বিনিময়ে এদেশের শ্রম বাজারকে জোরদার করতে সহায়তা করেছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় উৎস হলো চীন। প্রতি ১০ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩ জনই চীনের। এর পরেই রয়েছে ভারতের অবস্থান, প্রতি চারজনে একজন। তবে কিছু সমালোচক উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ভর্তিচ্ছুদের কোণঠাসা কর ফেলছে। তবে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রিপোর্টে জানা যায়, আসলে বিপরীতটাই সত্য।
পাবলিক ইকোনোমিক্স জার্নালে কেভিন শিহ লিখেন, “সার্বিকভাবে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের কারণে স্থানীয়দের ভর্তির সুযোগ বেড়েছে।” রিপোর্টে দেখা যায়, বিদেশি শিক্ষার্থীরা যে উচ্চ হারে টিউশন ফি দেয় সেটা ভর্তুকি হিসাবে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বাড়ায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কানাডায় আবাসন সংকট এবং চিকিৎসা সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় লোক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয় ফেডারেল সরকার। আর সে কারণেই কানাডায় অভিবাসীদের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই সাথে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও।
গত বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছিলেন যে তিনি কানাডায় অনুমোদন দেয়া অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমাতে চান। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল,অভিবাসীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক সেবা ঠিকমত পাওয়া যাচ্ছে না, জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গিয়েছে এবং আবাসন বা থাকার জায়গার খরচ আকাশ ছুঁয়েছে।
উল্লেখ্য যে, উপরে বর্ণিত এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে দায়ি হলো পরিকল্পনাহীনভাবে অভিবাসী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু তা সত্বেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি আগে। বছর খানেক আগেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী গ্রহণে সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টি তখনকার ইমিগ্রেশন মন্ত্রীর বিবেচনায় ছিল না। তিনি তখন বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের গ্রহণের বিষয়ে সংখ্যার সীমা আরোপ করা হলে সেটা হবে হাতুড়ি দিয়ে অপারেশন করার মত। গ্লোবাল নিউজকে এ কথা বলেছিলেন তিনি।
ইতিপূর্বে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার এক রিপোর্টে বলা হয়, কানাডায় আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি, আবাসন ও আনুসঙ্গিক ব্যয়সহ প্রতি বছর খরচ করছে ২২.৩ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন সংখ্যা ও একই সার্থে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে আবাসন সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। বছর খানেক আগে জর্জ ব্রাউনের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হারশাল ভাসগৌরি সিবিসি নিউজ বলেছিলেন, এখানে পড়ালেখার সময় টরন্টোতে থাকার জায়গা খুঁজে পাবার জন্য তিনি কয়েক মাসের ভাড়া আগেভাগেই ভারতে তার পরিবারের সঞ্চয় থেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু তার পরও গত চার মাস ধরে থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে তিনি কেবলই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন অথবা কোনও জবাবই পাননি। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, থাকার জায়গাই যদি না থাকে তাহলে কেন তাকে কানাডায় আসার আমন্ত্রণ জানানো হলো।
২৪ বছর বয়সী ভাসগৌরি বলেন, “গৃহহীন হয়ে যাবো এমন চিন্তার চাপ থেকে আমি প্রতি মুহূর্তে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থার কাছাকাছি থাকি।”
কানাডিয়ান অ্যালায়েন্স অব স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন্স (CASA) এর অ্যাডভোকেসি বিষয়ক পরিচালক মাতেউস সালমাসি বলেন, তার সংগঠন ভাসগৌরির মত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শুনেছে, যারা বলছেন, একটি আবাসনের জন্য তারা কয়েক মাসের এমনকি সারা বছরের ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করেছেন।
তিনি বলেন, কিছু শিক্ষার্থী একইরকম ঘটনা তুলে ধরেছেন যে, তাদেরকে সঙ্কীর্ণ ও অনিরাপদ জরাজীর্ণ আবাসনে গাদাগাদি করে বাস করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অনেকে বলেন, কোথাও জায়গা না পেয়ে তারা তাদের গাড়িতেই বসবাস করছেন।
এদিকে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত গ্লোবাল নিউজের এক খবর থেকে জানা যায়, তার আগের আট মাসে প্রায় ১৩ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কানাডায় রিফিউজি ক্লেইম করেছেন। ইমিগ্রেশন, রিফিউজি এ্যান্ড সিটিজেনশীপ কানাডার সূত্রে এই তথ্য জানা যায়।
গ্লোবাল নিউজের খবরে আরো বলা হয় ২০১৮ সালে কানাডায় ১ হাজার ৫ শ ১৫ জন শিক্ষার্থী রিফুউজি ক্লেইম করেছিলেন। তার সাথে তুলনা করলে বর্তমানে রিফুউজি ক্লেইমের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৬০০ শতাংশ।
উল্লেখ্য যে, কানাডার ইমিগ্রেশন মন্ত্রী মার্ক মিলার ইতিপূর্বে গ্লোবাল নিউজের সাংবাদিক মার্সিডিস স্টিফেনসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ক্রমবর্ধমান সংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডায় প্রবেশের পর এ দেশে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য আশ্রয় দাবি করছে। এই প্রবণতাকে মন্ত্রী ‘উৎকণ্ঠাজনক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মন্ত্রী আরো বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ স্টুডেন্ট ভিসার প্রোগ্রামটিকে ‘কানাডায় ব্যাকডোর এন্ট্রি’ হিসাবে ব্যবহার করছেন। প্রায়শই এটি করা হচ্ছে তাদের টিউশন ফি কমানোর জন্য। এই পরিস্থিতিতে কানাডার বিশ^বিদ্যালয় ও কালেজগুলোকে অবশ্যই তাদের স্ক্রিনিং এবং মনিটরিং প্র্যাকটিসকে উন্নত করতে হবে যাতে কেউ এই সিস্টেমের অপব্যবহার না করতে পারে।
এদিকে কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমানোর ফলে এখানকার কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়গুলো পড়েছে বিপদে। তাদের আয় হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য শিক্ষক কমানোর পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের কয়েকটি বিভাগও বন্ধ করে দিয়েছে বা বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে।
