মানসিক বিকারগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
খুরশিদ আলম
গত ১৪ এপ্রিল হোয়াইট হাউজের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ’ রয়েছেন। প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ক্যাপ্টেন শন বারবাবেলার বরাত দিয়ে বিবিসি এই তথ্য প্রকাশ করে। ঐ চিকিৎসক আরো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, স্নায়ুতন্ত্র ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা খুবই ভালো। তাঁর সক্রিয় জীবনযাপন এই সুস্থতায় বড় অবদান রাখছে।’
চিকিৎসকরা একথাও বলেন যে, প্রেসিডেন্ট মানসিক সক্ষমতা পরীক্ষায়ও পূর্ণ নম্বর পেয়েছেন।
বিবিসি’র তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি’র কাছাকাছি ওয়াল্টার রিড সামরিক হাসপাতালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদের প্রথম বাৎসরিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা সম্পন্ন হয়। সেখানে তাঁর হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, স্নায়ু এবং অন্যান্য শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা স্বাভাবিক পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ডা. শন বারবাবেলা। তিনি যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ জরুরি বিভাগীয় চিকিৎসক।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ার একটি নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ঐ সময় আততায়ীর গুলি তাঁর ডান কান ছুঁয়ে যায়। তবে চিকিৎসক জানিয়েছেন সেই গুলির আঘাতের চিহ্ন এখনও রয়েছে তাঁর কানে। কিন্তু এটি তাঁর স্বাস্থ্য বা শারীরিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলেনি।
ট্রাম্প নিজেও সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমি সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েছি। আমার মনে হয় আমি বেশ ভালো অবস্থায় আছি-একটা ভালো হৃদয় আছে আমার, আছে ভালো একটি আত্মা।”
“ভালো হৃদয় আর ভালো আত্মা”!!!
ট্রাম্প যেহেতু ‘ভালো হৃদয়’ এবং একই সাথে ‘ভাল আত্মা’র কথা বলেছেন তখন আমরা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতে পারি তিনি তাঁর ‘হৃদয়’ বলতে হৃদ্যন্ত্র নয়, দিল বা অন্তরকেই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি একজন অতিশয় ‘হৃদয়বান’ লোক এবং তাঁর আত্মা বা মন কিংবা চিত্ত যেটাই হোক অতিশয় ‘মানবিক’! এরকম ‘মানবদরদী’ মানুষ হয়ত পৃথিবীতে দ্বিতীয়জন নেই। এই দুর্যোগ, দুর্বিপাক আর যুদ্ধ বিগ্রহের হাত থেকে মানবজাতিকে ‘রক্ষা’ করার জন্য ঈশ্বর তাকে মর্ত্যে প্রেরণ করেছেন! তিনি এখন মানবজাতির ‘ত্রাণকর্তা’, ‘রক্ষাকর্তা’! ট্রাম্প নিজেই এরকম একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করেছেন যেখানে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘God made him to be America’s ‘caretaker’. একবার নয়, ট্রাম্প দু’বার এই ভিডিওটি শেয়ার করেছেন যেখানে তাঁকে পৃথিবীতে ঈশ্বরের উপহার হিসাবে দেখানো হয়েছে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে এই বলে যে, আজকের যুগে মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক কোন মানুষ কি এরকম দাবি করতে পারেন? অথবা মানসিকভাবে কতটা বিকারগ্রস্ত হলে এরকম উদ্ভট এক দাবী করতে পারেন?
স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে এক সম্মেলনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই বলে মন্তব্য করেছিলেন যে ‘ট্রাম্প ভয়ংকর মানসিক রোগে আক্রান্ত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত নন।’
সম্মেলনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছিলেন, ট্রাম্প ‘মস্তিষ্ক বিকৃতি ও বিভ্রমে’ আক্রান্ত। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল স্কুলের পরামর্শক ও সাইকোথেরাপিস্ট ড. জন গার্টনার ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘ট্রাম্পের ভয়ংকর মানসিক রোগের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
অনুষ্ঠানের সভাপতি ইয়েলের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ড. ব্যান্ডি লি বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি জনগণও ট্রাম্পের এই মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছে। এ নিয়ে এখন তাঁরা ব্যাপকভাবে আলোচনাও করছে।’
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, “কেউ কেউ বলেছেন, মি. ট্রাম্পের মধ্যে হয়ত নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার বা এনপিডির লক্ষণ থাকতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে আছে: বড় বড় কথা বলা এবং অন্যদের অনুভূতি বোঝার অক্ষমতা। এরা মনে করেন অন্যদের প্রশংসা-বন্দনা পাওয়া এদের জন্য খুবই প্রয়োজন। এরা আরো মনে করেন যে অন্যদের চেয়ে এরা শ্রেষ্ঠ এবং এ জন্য এদের প্রতি বিশেষ সম্মান দেখাতে হবে। অতিরিক্ত প্রশংসা বা বন্দনাও চান এরা এবং সমালোচনা বা পরাজয় মেনে নিতে পারেন না।”
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেও তাঁর মানসিক বিকারগ্রস্ততা নিয়ে আলোচনা বেগবান হয়ে উঠেছিল। হোয়াইট হাউজের চিকিৎসকরা যদিও এখন দাবী করছেন ট্রাম্প ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ’ রয়েছেন কিন্তু সবাই এ কথা মানতে রাজী নন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, গত বছর ৫ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সপ্তাহ দুই আগে ট্রাম্প-বিরোধী একটি রাজনৈতিক দল ২০০ জনেরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের স্বাক্ষরিত একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছিল, যেখানে সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে ‘গুরুতর, অচিকিৎসাযোগ্য নার্সিসিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে যে সকল লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে তার মিল রয়েছে। আর এ কারণে তিনি একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি, যার ফলে তিনি ‘নেতৃত্বের জন্য চরমভাবে অযোগ্য’। দি গার্ডিয়ান পত্রিকা এই খবর প্রকাশ করেছিল।
এই নার্সিজম হলো এক ধরনের পার্সোনাল ডিজঅর্ডার। এর লক্ষণসমূহের মধ্যে আছে :
“- আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ/সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আত্মকেন্দ্রিকতা।
-টেকসই সাবলীল সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা, মনস্তাত্বিক সচেতনতার অভাব।
– অন্যের অনুভূতির বিষয়ে যৌক্তিক ধারণার অভাব।
– নিজেকে অন্যের তুলনায় সর্বদা উচ্চতর অবস্থানে দেখা।
– যেকোনো অবমাননা বা কল্পিত অবমাননার প্রতি অতি সংবেদনশীলতা।
– অসৌজন্যমূলক এবং অবন্ধুসুলভ দেহভঙ্গি।
– নিজের প্রশংসাকারীদেরকে তোষামোদ করা, নিজের সমালোচকদেরকে ঘৃণা করা।
– পূর্বাপর না ভেবে অন্যদেরকে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেয়া।
– আসলে যতটা না, তারচেয়ে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবা।
-আত্মম্ভরিতা করা (সূক্ষ্মভাবে কিন্তু প্রতিনিয়ত) এবং নিজের অর্জনকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা।
– নিজেকে বহু বিষয়ের পণ্ডিত মনে করা।
– অন্যের দৃষ্টিকোণে বাস্তব পৃথিবী কেমন, তা অনুধাবনে অসামর্থ্য।
– অনুতাপ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অস্বীকৃতি/অনীহা।”
(তথ্যসূত্র : Jarin Sanramoni / linkedin. Child and Adult Workforce Healthcare Assistant in NHS at Operose Health)
খোলা চিঠিতে আরো বলা হয়েছিল, “এমনকি একজন অ-চিকিৎসকও দেখতে পাবেন যে ‘সামাজিক রীতিনীতি এবং আইন মেনে চলতে ব্যর্থতা’, ‘বারবার মিথ্যা বলা,’ ‘অন্যদের নিরাপত্তার প্রতি বেপরোয়া অবহেলা’, ‘আবেগপ্রবণতা’, ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ এবং ‘অনুতাপের অভাব’ রয়েছে ট্রাম্পের আচার আচরণে।”
চিঠিতে ট্রাম্পের জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের লক্ষণের কথাও বলা হয়েছে এবং পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এই বলে যে, তাঁর “সম্পূর্ণ স্নায়বিক পরীক্ষা” করানো উচিত। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা ছিলেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক থেকে শুরু করে একজন মেরিল্যান্ড সাইকোথেরাপিস্ট, একজন মানসিক স্বাস্থ্য নার্স অনুশীলনকারী, একজন যৌন থেরাপিস্ট এবং একজন সমাজকর্মীর মতো পেশাদার ব্যক্তিগণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যে একজন ভয়াবহরকমের মিথ্যাবাদী তার অনেক নজির রয়েছে। মানসিক বিকারগ্রস্ত না হলে এরকম মিথ্যাবাদী কেউ হন না। মিথ্যাবাদী, নিষ্ঠুর এবং নীতিহীন এই তিন অভিধায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একবার অভিহিত করেছিলেন তারই বড় বোন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ম্যারিঅ্যান ট্রাম্প ব্যারি।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের ভাতিজি ম্যারি ট্রাম্প তাঁর প্রকাশিত ‘টু মাচ অ্যান্ড নেভার এনাফ: হাউ মাই ফ্যামিলি ক্রিয়েটেড দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ডেঞ্জারাস ম্যান’ শিরোনামের এক বইতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন নিচের চাচাকে। ম্যারি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
জালিয়াতি বা প্রতারণার পাশাপাশি তিনি যে একজন সেরাদের সেরা মিথ্যাবাদীও সে তথ্য প্রকাশ করেছিল ওয়াশিংটন পোস্ট। এই পত্রিকার হিসাব মতে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে তিনি মোট ৩০,৫৭৩টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কথা বলেছিলেন। মূলত প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিদিনই তিনি একটির পর একটি টুইট করে মিথ্যার ঝড় তুলে যাচ্ছিলেন।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানায়, দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর, গত ২০ জানুয়ারি সোমবার দু’টি বক্তৃতা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ঐ দুই বক্তৃতা মিলিয়ে প্রথম দিনেই তিনি মোট ২০টি মিথ্যা বলেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন।
প্রথম দিনের বক্তৃতায়ই ট্রাম্প ফের নির্লজ্জের মত দাবি করেন যে, ২০২০ সালে মার্কিন নির্বাচনে ‘কারচুপি’ করা হয়েছিল। অথচ ট্রাম্পের নিজস্ব অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে শুরু করে সকল কর্তৃপক্ষই সে সময় জানিয়েছিল ভোট প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ছিল। আর শুধু কারচুপির কথা বলেই ট্রাম্প ক্ষান্ত হননি। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারিতে ক্যাপিটল হিলে হামলা চালানোর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া প্রায় ১৬০০ মানুষকে ক্ষমাও করেছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই তাদের মুক্ত করার জন্য এক নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে হামলা চালিয়েছিলেন ট্রাম্পের সমর্থক একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। কংগ্রেস ভবনে ডোনাল্ড ট্রাম্পপন্থি বিক্ষোভকারীদের ওই হামলার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরেকটি অদ্ভুত ও মিথ্যা দাবি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিপজ্জনক অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে। তাঁর ভাষায় এই অপরাধীদের অনেকেই নাকি অন্যান্য দেশের কারাগার এবং মানসিক রোগের হাসপাতালে ছিলেন এবং সেখান থেকে অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করেছেন। এই দাবি তিনি আগেও করেছেন। কিন্তু বারবার এই দাবি করলেও, কখনও কোনও প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই মিথ্যার যে ঝলক তিনি দেখানো শুরু করেছেন, হয়ত সামনের চার বছরেও তিনি আগের মতই সেই অসত্য এবং অর্ধসত্যের ঝড় বইয়ে দিতে পারেন।
‘অন্যদের নিরাপত্তার প্রতি বেপরোয়া অবহেলা’ও তিনি দেখিয়ে যাচ্ছেন। সহিংস কথাবার্তা বলার রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। একবার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মেয়ে লজ চেনিকে তাক করে এক নয়, কয়েক ব্যারেল গুলি চালিয়ে পরীক্ষা করা উচিত বলে সহিংস মন্তব্য করেছিলেন। আরেকবার তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, কেউ যদি মিথ্যা খবর দেয় তাহলে তাদের গুলি করলে, তিনি কিছু মনে করবেন না। পেনসিলভানিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমাদের এখানেই অনেক ফেইক নিউজের কর্মীরা রয়েছে। কেউ যদি এই ফেইক নিউজওয়ালাদের গুলি করতে পারে তাহলে সে আমার মন পাবে। আর আমি তাতে কিছুই মনে করবো না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরকম হত্যার হুমকি দিয়েও তিনি পার পেয়ে গেছেন। বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। এবং আমেরিকার জনগণ তাকে দ্বিতীয়বারের মত প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন!
ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে শৈশব থেকেই ছিলেন অবাধ্য এবং উদ্ধত প্রকৃতির। রোয়ার মিডিয়ার এক রিপোর্টে বলা হয়, ট্রাম্প যখন ১৩ বছরের বালক তখন তাঁকে তাঁর কিউ-ফরেস্ট স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। কিউ-ফরেস্ট একটি প্রাইভেট স্কুল ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন সেখানকার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। কিন্তু তারপরও ট্রাম্পকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এ থেকেই অনুধাবন করা যায় বালক বয়স থেকেই তিনি কতটা উদ্ধত স্বভাবের ছিলেন। পরে তাঁর বাবা-মা তাঁকে নিউ ইয়র্ক মিলিটারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে বাধ্য হন। তাঁরা মনে করেছিলেন যে, ট্রাম্পের আরো বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করা উচিত।
উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবের ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পর্যন্ত বিয়ে করেছেন তিনবার। তাঁর প্রথম স্ত্রী ইভানা ট্রাম্প, দ্বিতীয় স্ত্রী মার্লা মাপলেস এবং বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। ইভানা ট্রাম্প এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিভোর্স হয়ে যায় ১৯৯০ সালের দিকে। ট্রাম্পের সাবেক এই স্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও এনেছিলেন। এছাড়াও তিনি তাঁর সাবেক স্ত্রীকে মারধরও করেছিলেন। রাগের মাথায় স্ত্রীর মাথার চুলও ছিঁড়ে নিয়েছিলেন ট্রাম্প।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে লেখিকা থেকে শুরু করে পর্ন তারকা তাঁর বিরুদ্ধে তুলেছেন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ।
উল্লেখ্য যে গত ৫ এপ্রিল শনিবার ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, ফ্লোরিডা, হিউস্টন, কলোরাডোসহ অনেক শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। সংবাদ সংস্থা এএফপি জানায়, বিক্ষোভে নারীদের সরব উপস্থিতিও দেখা গেছে। এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বার্লিন শহরের ৭০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এক মহিলা সুজান ফেস্ট ট্রাম্পকে ‘বদ্ধ উন্মাদ’ উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি আমেরিকায় সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করেছেন।’
নিউইয়র্ক শহরে ট্রাম্প বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়ে চিত্রশিল্পী শেইনা কেসনার (৪৩) বলেন, ‘আমার খুব রাগ হয়, আমি কিছুতেই মানতে পারি না- ধর্ষণে অভিযুক্ত মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী শ্বেতাঙ্গ পুরুষ এই দেশ চালাচ্ছে। এটা মোটেও ঠিক নয়।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প যে একজন বিকারগ্রস্ত বা উন্মাদ ব্যক্তি সে কথা তাঁর ভাতিজা ফ্রেড ট্রাম্পও বলেছেন। গত বছর আগস্ট মাসে এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফ্রেড বলেছিলেন, ‘আমার চাচা ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন বদ্ধ উন্মাদ। তিনি আমার সঙ্গে ভয়ানক কাজ করেছেন। এ কারণে কিছু মানুষ বলেন, “এত কিছুর পরও আপনি কীভাবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান?” আমার উত্তর হলো, তিনি তো আমার চাচা। এর অর্থ অনেক বড়। কিন্তু তারপরও আমি বলবো, তিনি মানুষকে ব্যবহার করেন। সেটা ওই ব্যক্তি কালো হোন কিংবা সাদা এবং ভোটের জন্য তিনি এটা করেন।
সাক্ষাৎকারে ফ্রেড ট্রাম্প তাঁর চাচা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট না দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তিনি বরং কমলা হ্যারিসকে ভোট দিতে চান।
উল্লেখ্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গত নির্বাচনের দিন কয়েক আগে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছিলেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাইকোপ্যাথি বা মনোরোগের হার অনেক বেশি – এমনকি সর্বাধিক নিরাপত্তার জেলখানায় বন্দী এবং গুরুতর অপরাধীদের চেয়েও বেশি। এক্সপ্রেস.কম.ইউকে’র এক খবরে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। ওতে আরো বলা হয়, প্রায় ৪০ জন শীর্ষস্থানীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক ক্ষমতা এবং নির্বাচনে জয়ী হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে কি না তা নিয়ে আলোচনা করতে মিলিত হয়েছিলেন।
ডাঃ ব্যান্ডি লি এবং অন্যান্য বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, যারা ২০১৭ সাল থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপজ্জনকতা এবং অযোগ্য মানসিক অবস্থার প্রমাণ সম্পর্কে দেশকে সতর্ক করে আসছেন, তাঁরা সম্প্রতি ‘দ্য মোর ডেঞ্জারাস কেস অফ ডোনাল্ড ট্রাম্প’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। এতে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে ট্রাম্প এমনসব লক্ষণ দেখিয়েছেন যা তাকে হোয়াইট হাউসের জন্য অনুপযুক্ত এবং বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মানসিক রোগী বা মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করছেন তাদেরকে পাল্টা মানসিক রোগী বলে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। ট্রাম্প সমর্থকরা অনেক আগে থেকেই মনে করেন, ট্রাম্পবিরোধীরা ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিনড্রোম’ বা সংক্ষেপে টিডিএস-এ ভুগছেন। গত ১৭ মার্চ মিনেসোটার পাঁচ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এই বিলটি উত্থাপন করেন। এই তথ্য জানায় দ্যা ইকোনমিক টাইমস।
তবে এই বিল মিনেসোটা সিনেটে পাস হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, কারণ সেখানে ডেমোক্রেটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ডেমোক্রেটরা এবং গভর্নর ওয়ালজ এই বিল পাস করতে দেবেন না। এ কথা স্বীকার করেছেন সেখানকার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। তবে কে জানে, হয়ত ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই উদ্যোগ নিয়ে এই বিল জাতীয়ভাবে পাশ করিয়ে নিতে পারেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের উভয় কক্ষে তাঁর দলের রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
অবশ্য ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টাদের অনেকেই ইতিপূর্বে তাকে মিথ্যাবাদী, ফ্যাসিস্ট এবং অনুপযুক্ত বলে অভিহিত করেছিলেন। এ খবর জানায় বিবিসি নিউজ। সেই উপদেষ্টারা গত নির্বাচনের আগে বলেছিলেন – ট্রাম্প যদি এবার দ্বিতীয় দফায় তাঁর অনুগতদের পাশে রেখে শাসনকাজ পরিচালনা করেন তাহলে খুব শীঘ্রই তিনি তাঁর চরমপন্থি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবেন।
তার আলমত আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। তিনি বিশ^বাসীর ঘুম হারাম করে দিয়েছেন ক্ষমতা হাতে নিয়েই। তিনি কানাডাকে অঙ্গরাজ্য করার স্বপ্ন দেখছেন, গ্রীনল্যান্ডকে দখল করার হুমকি দিচ্ছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের গাজা দখল করে সেখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলছেন। তিনি ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের অর্ধেকের মালিকানা দাবি করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের সঙ্গে চরম অবমাননাকর ব্যবহার করছেন। হিংস্র পশুদের যেভাবে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয় বা ভয়ানক অসামীদেরকে স্থানান্তরের সময় যেভাবে তাদের হাতে পায়ে শিকল বেধে রাখা হয় সেভাবেই নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদেরকে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। দীর্ঘ যাত্রা পথে তাঁদেরকে খাবার দেওয়া হচ্ছে না। টয়লেটও ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। কী রকম অমানবিক হতে পারেন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট!
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এখন যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অতিধনী কয়েকজন। এদের মধ্যে আছেন পিটার থিয়েল ও ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেররা। ট্রাম্প নিজেও একজন ধনকুবের। বিশে^ পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। এই ধনকুবেররা মিলে গোটা পৃথিবীকে গোগ্রাসে গিলে খাবে এমনটাই এখন আশঙ্কা বিশ^বাসীর।
পাশাপাশি এখন অপেক্ষার পালা এটিও দেখার জন্য যে, আগামী চার বছরে মানসিক বিকারগ্রস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প আর কতটা অমানবিক হবেন এবং আর কতটা বর্ণবাদী হয়ে উঠবেন। কথাবার্তায় আর কতটা অমার্জিত হবেন এবং আর কতটা নীতিহীনতা প্রদর্শন করবেন। প্রতারণা আর প্রতিশোধপরায়ণতায় কতটা মেতে উঠবেন এবং একের পর এক মিথ্যা কথা বলায় বা অপতথ্য ছড়ানোর ব্যাপারে তিনি আরো কতটা পারদর্শী হয়ে উঠবেন অবাক বিস্ময় নিয়ে সেটিও এখন চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে বিশ^বাসীকে।
বিশে^ মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজ চরম হুমকির মুখে মানসিক বিকারগ্রস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে।
খুরশিদ আলম
সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রবাসী কণ্ঠ
