পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সহায়তা দেয়া আমাদের সবার জন্যই ভালো

প্যাটি হাজদু / লুই ব্রাডলি

(লেখক পরিচিতি: প্যাটি হাজদু বর্তমানে ইনডিজিনাস সার্ভিসেস মিনিস্টার। এর আগে তিনি ছিলেন কানাডার হেলথ মিনিস্টার। লুই ব্রাডলি কানাডার মেন্টাল হেলথ কমিশনের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় আইপলিটিকস.সিএ-তে। )

পুরুষের আত্মহত্যা করে মৃত্যুর সম্ভাবনা নারীর চেয়ে তিনগুণ বেশি।

সমাজের মানুষ হিসাবে আমাদের কিছু আদব-কেতা আছে যেগুলির ওপর আমরা সবাই সুস্পষ্ট ও সমন্বিতভাবে একমত। এই আদব-কেতা থেকেই আভাস পাওয়া যায় ‘প্রকৃত পুরুষ’ বলতে কী বোঝায়। এখনই সময় ওইসব পুরনো ধ্যান-ধারণা ছুড়ে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন করে শুরু করার, কিন্তু  আমরা অব্যাহতভাবে সেইসব ক্ষতিকর চক্র চিরস্থায়ী করার জন্যই কাজ করে চলেছি যা কেবল পুরুষ ও বালকদেরই নয় বরং যারা তাদের ভালোবাসে সেই নারীদের জন্যও ক্ষতির কারণ।

পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলা মূলত একটি নারীবাদী অবস্থান। পুরুষের আত্মহত্যা করে মৃত্যুর সম্ভাবনা নারীর চেয়ে তিনগুণ বেশি। আর এধরণের মৃত্যুর পরিণামে সৃষ্ট দুঃখ ও ক্ষতি ভোগ করতে হয় বেঁচে থাকা মানুষ Ñ অর্থাৎ তাদের স্ত্রী, কন্যা, মা ও বোনদেরকে – যা তাদেরকে নিজেদের জীবনহানির মারাত্মক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।

পুরুষদের মাদকাসক্তিজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা নারীদের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। বিচ্ছিন্নতার মধ্যে তাদের এই অপব্যবহার বন্ধ থাকে। এই মুহূর্তে যখন আমরা ঘরে আশ্রয় নিয়ে আছি, আমরা জানি, তখন ঘরোয়া সহিংসতার হার কমে আসছে। সহিংসতার শিকার নারীদেরকে তাদের নিপীড়কদের সঙ্গেই আবদ্ধ পথে চলতে হচ্ছে। এর ফলে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ হুমকির মুখে পড়ছে।  

ছবি :  হেলথ কাউন্সিল অব কানাডা

আমরা আমাদের পুরো জনগণের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারবো না যদি না আমরা আমাদের অর্ধেক সংখ্যক মানুষকে আবেগগত বিস্ফোরক বোমার মত একটি বিষয় চেপে রাখা, একান্তে লুকিয়ে রাখা বা উপেক্ষা করতে শেখানোর যে প্লেবুক ব্যবহার করে চলেছি তা ছিঁড়ে ফেলতে না পারি।

বহু প্রজন্ম ধরে এক ধরণের অসচেতন পক্ষপাত ছেলেদেরকে পুরুষালী আচরণের দিকে চালিত করেছে যা তাদের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রগুলো রুদ্ধ করে দেয়। এই ধারণাগুলো অবয়ব পেতে শুরু করে যখন আমাদের ছেলেরা একদম ছোট থাকে তখন থেকে। আমাদেরকে বলা হয় তাদেরকে কঠোর প্রকৃতির করে গড়ে তুলতে। তাদেরকে ননীর পুতুল করে তোলার ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়। আমরা ছোট ছেলেকেও না কাঁদার শিক্ষা দিই, আর এটা দিই এর ফলাফল কি হবে সে বিষয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা ছাড়াই একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত বোধ থেকে। 

সহপাঠীদের পক্ষ থেকে ছেলেদের ওপর চাপ আসা শুরু হতে পারে একেবারে কিন্ডারগার্টেনে পড়ার মত সময় থেকেই। সে সময় গোলাপি রঙ পছন্দ করা, পুতুল নিয়ে খেলা করা, এমনকি মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্যও তাদের খেলার সাথীরা ছেলেদের লজ্জা দিতে পারে। ছেলেদের অনেককেই সুষ্ঠুভাবে, গঠনমূলক উপায়ে নিজেকে প্রকাশ করতে উৎসাহিত করা হয় না। আর খুব কম ছেলেরই অনুসরণ করার মত একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব থাকে। ছেলেরা প্রায়ই এই শিক্ষা পায় যে, বড় ধরণের আবেগ প্রকাশের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো ক্রুদ্ধ হয়ে আঘাত করা। 

আমরা যখন একটি বৈশ্বিক মহামারির মোকাবিলা করছি, যখন ক্রমবর্ধমান হারে মানুষেরা চাপ ও উদ্বেগে ভুগছে, সেই মুহূর্তে পুরুষের জন্য সত্যিকারের জটিলতা দেখা দিচ্ছে, কারণ তাদেরকে কখনই শেখানো হয়নি কীভাবে রুমাল উড়াতে এবং সাহায্য চেয়ে ইঙ্গিত করতে হবে Ñ কারণ এই বিষয়টিকে তারা সাহসিকতা নয় বরং আত্মসমর্পণ হিসাবে দেখতেই অভ্যস্ত হয়েছে।

অভাবিত হলেও সত্য, আমাদের পুরুষ সহকর্মী, বৈবাহিক সঙ্গী ও বন্ধুদের আমরা বলতে শুনি, কীভাবে তারা মুখোমুখি আলোচনা থেকে দূরে থাকার চ্যালেঞ্জ নেন, অথচ খোলামেলা আলোচনা হয়তো আরও সহজে অনানুষ্ঠানিক সহায়তায় রূপ পেতে পারে। কেউ কেউ বলেন, যৌথভাবে কোনও কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তা কঠিন আলোচনাও মোলায়েম করতে পারে, কিন্তু মিলেমিশে প্রয়াস চালানোর সুযোগ না থাকায় এসব আলোচনা নিষ্ফল হয়ে যায়।

গায়ের রঙ, যৌন অভ্যাস, শারীরিক সক্ষমতা বা সামাজিক মর্যাদার কারণে বৈষম্যের শিকার হন যেসব পুরুষ তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার স্তর আরও গভীর Ñ যেহেতু পৌরুষের পূর্বধারণাসঞ্জাত সংজ্ঞার মধ্যে নিজেদেরকে দেখতে পারা তাদের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠে। এটাও আর একটি কারণ যেজন্যে ২১ শতাব্দীর বিশ্ববীক্ষণে উল্লেখিত এক গুচ্ছ নতুন মূল্যবোধ ও গুণাবলীর বিপণনকে স্বাগত জানাতে হয়।

যে মুহূর্তে আমরা একটি ধীর প্রক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি, যখন ঘরে বসে থাকা বাবারা তাদের চাঙ্গা মনোভাবের জন্য সুখ্যাত আর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রবক্তারা তাদের নাজুক অবস্থার জন্য প্রশংসিত হচ্ছেন, সেই মুহূর্তে আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

আমাদের পুরো মহাদেশজুড়ে যখন পরিবর্তনের ঢেউ জোরালোভাবে আঘাত হানছে তখন আমরা একটি রাস্তার চৌমাথায় দাঁড়িয়ে আছি। পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করা এককভাবে পুরুষদেরই কাজ এমন বক্তব্য আসলে সেই ঐতিহাসিক শিকড়কে অস্বীকার করা যাএকটি সেকেলে আচরণগত প্রত্যাশার ধারণায় আমাদের সবাইকে আবদ্ধ করে রেখেছে।

সমস্যাটি চিহ্ণিত করা সহজ। কিন্তু সমাধানে পৌঁছা খুব কঠিন।

চলতি মাসে আমরা যখন বাবা দিবস পালন করছি, যখন আমাদের অনেকেই প্রিয়জন থেকে দূরে এবং সুপরিচিত ঐতিহ্য থেকে অপসৃত সেই সময়ে আমাদের সামনে একটি সুযোগ এবং একটি দায়িত্ব এসে পড়েছে, সেটি হলো আমাদের জীবনে যেসব পুরুষ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ তাদের খোঁজখবর নেয়া।

আমাদের দাদা-নানা, যারা হয়তো অবরুদ্ধ দশায় আটকে আছেন, থেকে শুরু করে যাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে সঙ্কটকাল চলছে আমাদের সেইসব বন্ধু ও প্রতিবেশী এবং আমাদের নিজেদের স্বামী বা সঙ্গী পর্যন্ত যারা নিজেদের মর্মযাতনা ও উৎকণ্ঠা ঢেকে রাখার জন্যই বাইরে সাহসী চেহারা প্রকাশ করছেন তাদের সবার জন্যই নারী হিসাবে আমাদের আর সেইসব অবৈধ সামাজিক নিয়ম বা কাজের সহযোগী হওয়া উচিৎ হবে না যা আমাদের সবাইকে ধ্বংস করবে।

আপনার পুরুষটিকে নিজের চাহিদা জানানোর স্বাধীনতা দিন। তাদেরকে দেখিয়ে দিন যে তাদের জন্য সহায়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার উপকরণগুলো কোথায় পাওয়া যাবে। এবারের বাবা দিবসে শুধু আমাদের বাবার জন্য নয় বরং আমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদের জন্যও এটি হতে পারে একটি বড় উপহার।

সর্বোপরি, আমরা তো একসঙ্গেই আছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *