‘ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ডেঞ্জারাস ম্যান’ ডোনাল্ড ট্রাম্প!

খুরশিদ আলম

মিথ্যাবাদী, নিষ্ঠুর এবং নীতিহীন এই তিন অভিধায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একবার অভিহিত করেছিলেন তারই বড় বোন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ম্যারিঅ্যান ট্রাম্প ব্যারি।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের ভাতিজি ম্যারি ট্রাম্প তার প্রকাশিত ‘টু মাচ অ্যান্ড নেভার এনাফ: হাউ মাই ফ্যামিলি ক্রিয়েটেড দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ডেঞ্জারাস ম্যান’ শিরোনামের এক বইতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন নিচের চাচাকে। ম্যারি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

ট্রাম্পের বড় বোন এই ভাতিজির সঙ্গে এক আলাপচারিতায় এই তথ্যও প্রকাশ করেছিলেন যে, কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে তার ভাই জালিয়াতির আশ্রয়ও নিয়েছিলেন। ম্যারিঅ্যান এর তথ্যমতে তার ভাই ট্রাম্পের হয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন অন্য একজন। এইসব তথ্য ইতিপূর্বে প্রকাশ করে সিএনএন।

জালিয়াতি বা প্রতারণার পাশাপাশি তিনি একজন সেরাদের সেরা মিথ্যাবাদীও। ওয়াশিংটন পোস্ট এর হিসাব মতে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে তিনি মোট ৩০,৫৭৩টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কথা বলেছিলেন। মূলত প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিদিনই তিনি একটির পর একটি টুইট করে মিথ্যার ঝড় তুলে যাচ্ছিলেন।

বিবাহিত জীবনে এক পর্নো তারকার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ছিল এমন অভিযোগও রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এই সম্পর্কের কথা গোপন রাখার জন্য তিনি সেই পর্নো তারকাকে বড় অঙ্কের ঘুষও দিয়েছিলেন। কারণ সামনেই ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (২০১৬ সালের)। আর সেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই মুহূর্তে পর্নো তারকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা ফাঁস হয়ে গেলে সমস্যা হতে পারে সেই আশঙ্কায় তিনি তার আইনজীবীকে বলেছিলেন সেই পর্নো তারকাকে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার ঘুষ দেওয়ার জন্য। আর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবসায়িক নথিপত্রে বিষয়টি গোপনও রাখেন ট্রাম্প।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দিবাস্বপ্ন দেখছেন কানাডাকে অঙ্গরাজ্য হিসাবে পাবার। ছবি : ট্রুথ স্যোসিয়াল

তবে পরবর্তীতে যৌন সম্পর্কের বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখতে পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ঘুষ দেওয়ার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরপরও গত ১০ জানুয়ারি আদালত নিঃশর্ত মুক্তি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত (দ্বিতীয়বার) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। ইউএসটুডের বরাত দিয়ে এই খবর জানায় কালবেলা।

খবরে আরো বলা হয়, মামলায় ট্রাম্পকে কোনো ধরনের শাস্তি বা দণ্ড দেওয়া হয়নি, যা তার রাজনৈতিক জীবন এবং ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রায়ে বলা হয়, ট্রাম্প যদিও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, কিন্তু আদালত থেকে ট্রাম্পকে শাস্তি হিসেবে কোনো দণ্ড, যেমন- কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড দেওয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে বিচারক হুয়ান মারচেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রেসিডেন্টদের ফৌজদারি অপরাধ থেকে রক্ষা করার কথা বলা আছে, তাই ট্রাম্পকে কোনো শাস্তি প্রদান করা সম্ভব নয়।

এরপর ট্রাম্প গত ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে ইতিহাসে লেখা থাকবে যে যুক্তরাষ্ট্রে তিনিই প্রথম ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং আইনগত ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ট্রাম্প অবশ্য নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, স্টর্মির সঙ্গে তাঁর কোনো যৌন সম্পর্ক হয়নি। তবে স্টর্মির দাবি, ‘হ্যাঁ, শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল।’ তিনি আরো দাবি করেন, ট্রাম্প যৌনতায় একদমই সক্ষম নন। স্টর্মি আরও জানিয়েছিলেন, যৌন সম্পর্কের পরে ট্রাম্প নাকি তাকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে অনেকটা আমার মেয়ের (ইভাঙ্কা ট্রাম্প) মতো লাগে।’

এরকম একজন উন্মাদ ব্যক্তি যিনি আবার চরমভাবে বর্ণবাদী, কথাবার্তায় অমার্জিত, চরম মিথ্যাবাদী, প্রতারক, নিষ্ঠুর এবং নীতিহীন তাকেই কিনা মার্কিন জনগণ দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত করেছেন! তিনি আবার প্রতিশোধপরায়ণ এবং ভয়ানকভাবে অহংকারীও।

উপরে উল্লিখিত এই খেতাবগুলো তাঁর কপালে জুটেছে অনেক আগেই যখন তিনি প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় দফায় দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যেন আরো বেশী মাত্রায় আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন আচার আচরণে এবং কথাবার্তায়। তার একটি নজীর হলো কানাডার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসাবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এটি যে একটি দেশের সার্বভৌমত্বের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এটুকু অনুধাবন করার মতো শিক্ষা তাঁর আছে বলে মনে হয় না। বস্তুতপক্ষে নেই-ও। থাকলে এরকম উন্মাদের মত কেউ আচরণ করে না। কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসাবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু করেছেন কানাডা সম্পর্কে একের পর এক মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযান। নির্লজ্জের মত তিনি এই মিথ্যা তথ্যগুলো প্রচার করে আসছেন গত কয়েক মাস ধরেই। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি প্রথমবার প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরবর্তী চার বছরে ৩০,৫৭৩টি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছিলেন সোশ্যাল মিডিয়া আর বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে। এবার দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব নেওয়ার পরও আগের মতই নির্লজ্জভাবে শুরু করেছেন মিথ্যা তথ্য ছড়ানো।

মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর, গত ২০ জানুয়ারি সোমবার দু’টি বক্তৃতা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ঐ দুই বক্তৃতা মিলিয়ে প্রথম দিনেই তিনি মোট ২০টি মিথ্যা বলেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে তিনি কি আবারও সেই মিথ্যা বলার চর্চাই শুরু করেছেন?

প্রথম দিনের বক্তৃতায়ই ট্রাম্প ফের নির্লজ্জের মত দাবি করেন যে, ২০২০ সালে মার্কিন নির্বাচনে ‘কারচুপি’ করা হয়েছিল। অথচ ট্রাম্পের নিজস্ব অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে শুরু করে সকল কর্তৃপক্ষই সে সময় জানিয়েছিল ভোট প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরেকটি অদ্ভুত ও মিথ্যা দাবি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিপজ্জনক অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে। তার ভাষায় এই অপরাধীদের অনেকেই নাকি অন্যান্য দেশের কারাগার এবং মানসিক রোগের হাসপাতালে ছিলেন এবং সেখান থেকে অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করেছেন। এই দাবি তিনি আগেও করেছেন। কিন্তু বারবার এই দাবি করলেও, কখনও কোনও প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই মিথ্যার যে ঝলক তিনি দেখানো শুরু করেছেন, হয়ত সামনের চার বছরেও তিনি আগের মতই সেই অসত্য এবং অর্ধসত্যের ঝড় বইয়ে দিতে পারেন।

কানাডা সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সরাসরি মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত অথবা বিভ্রান্তিকর তথ্যগুলো ছড়াচ্ছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো : –

কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসাবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি এই কারণে যে এটা নাকি এ দেশের জনগণও পছন্দ করেন। আর এটি কার্যকর হলে কানাডা হবে একটি দুর্দান্ত অঙ্গ রাজ্য। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই জাস্টিন ট্রুডোকে গভর্নর হিসাবে আখ্যায়িত করা শুরু করেছেন।

মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন বলেছে, ‘কানাডার জনগণ এটি পছন্দ করে’ ট্রাম্পের এই দাবি মিথ্যা। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার ধারণাকে খুবই অল্প সংখ্যক কানাডিয়ান পছন্দ করছেন কিন্তু সামগ্রিকভাবে কানাডিয়ান জনগণের কাছে এই ধারণাটি অত্যন্ত অজনপ্রিয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘লেগার’ এর এক জরিপে দেখা গেছে ৮২% কানাডিয়ান এই অঙ্গরাজ্য হওয়ার ধারণাটি একেবারেই পছন্দ করছেন না। আর যারা এই ধারণা পছন্দ করছেন তাদের সংখ্যা মাত্র ১৩%।  

ট্রাম্প বলেছেন কানাডার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

সিএনএন জানায়, ট্রাম্পের এই দাবিও ডাহা মিথ্যা। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ব্যুরোর তথ্য মতে ২০২৩ সালে কানাডার সাথে মার্কিন পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০.৬ বিলিয়ন ডলার। এটি ২০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পর্যায়েও নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে সস্তা মূল্যে ক্রুড অয়েল ক্রয় করছে যার কারণে তারা তাদের স্থানীয় বাজারে তেলের দাম কম রাখতে সক্ষম হচ্ছে। অর্থাৎ কানাডার ক্রুড অয়েল আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্রই লাভবান হচ্ছে।

ট্রাম্পের আরো অভিযোগ, কানাডা ন্যাটোর (North Atlantic Treaty Organization) নির্দেশিকা মেনে চলছে না। এ জন্য তিনি কানাডাকে তিরস্কার করেন। ন্যাটোর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিটি সদস্য দেশকে তাদের মোট জিডিপি বা দেশজ উৎপাদনের ২% প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। ট্রাম্প দাবি করেন কানাডা ব্যয় করছে ১% এরও কম। কানাডা ন্যাটোতে সবচেয়ে কম অর্থ প্রদানকারী সদস্য দেশ।

এ ক্ষেত্রেও ট্রাম্প মিথ্যা বলেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন। কানাডা প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপি’র ১% এরও কম ব্যয় করে এ কথা সত্য নয়। ন্যাটোর সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, কানাডা ২০২৪ সালে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপি’র আনুমানিক ১.৩৭% ব্যয় করেছে যা ২০২৩ সালে আনুমানিক ১.৩১% ছিল।

আর কানাডা ন্যাটোতে সবচেয়ে কম অর্থ প্রদানকারী দেশ এই কথাও সত্য নয়। গত বছর অর্থপ্রদানকারী ৩১টি সদস্য দেশের মধ্যে (আইসল্যান্ড ছাড়া) কানাডার অবস্থান ছিল পঞ্চম। কানাডার প্রতিরক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞ স্টিফেন সাইদম্যান সিএনএন এ পাঠানো এক ইমেইলে জানিয়েছেন যে, নিখুঁতভাবে ন্যাটোর প্রতিটি সদস্যের অর্থনীতির আকার বিবেচনা না করে বলা যায় – কানাডা আসলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা খাতে বৃহত্তম ব্যয়কারী দেশগুলোর একটি। আইসল্যান্ড বাদে ৩১ সদস্যের মধ্যে কানাডার অবস্থান ছিল অষ্টম। এই হিসাব ২০২৪ সালের।

সিএনএন জানায় ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার সেনাবাহিনী নিয়েও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। তিনি সম্প্রতি বলেন, কানাডার আসলে কোন সেনাবাহিনী নেই। আবার বলেন, তাদের খুব ছোট সেনাবাহিনী আছে। পরবর্তীতে তিনি আবারও বলেন, কানাডার কার্যত কোনো সেনাবাহিনী নেই।

কিন্তু বাস্তবতা হলো কানাডায় সেনাবাহিনী আছে। এই সেনাবাহিনীতে ৬৩ হাজারেরও বেশী নিয়মিত সদস্য রয়েছেন এবং রিজার্ভ সদস্য সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। অবশ্য এই সংখ্যা খুব বেশি সেটা বলা যাবে না। কারণ কানাডিয়ান প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এবং কানাডিয়ান সরকার নিজেই দেশটির সেনাবাহিনীর আকার নিয়ে ইতিপূর্বে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন, কানাডার সেনাবাহিনীর আকার যতটা বড় হওয়া উচিত ছিল তার চেয়ে ছোট আকারের। কিন্তু খুব ছোট তা বলা যাবে না। একেবারেই না। 

ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কতটা মিথ্যাবাদী বা অজ্ঞ তার আরেকটি নমুনা হলো, তিনি দাবি করে আসছেন কানাডা থেকে বিপুল পরিমাণের ফেন্টানাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হচ্ছে। আর এই ফেন্টানাইল ব্যবহার করে এ পর্যন্ত ৩০০,০০০ জন আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এর জন্য তিনি কানাডাকেই দায়ী করছেন।

ফেন্টানাইল হলো একটি শক্তিশালী সিন্থেটিক ওপিওয়েড (Opioids) যা ১৯৬৮ সাল থেকে ক্লিনিক্যাল সেটিংস এ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি প্রায়শই অস্ত্রোপচারের সময় এবং ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ফেন্টানাইলকে প্রায়শই মরফিনের চেয়ে ৮০-১০০ গুণ বেশী শক্তিশালী বা হেরোইনের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশী শক্তিশালী হিসাবে বর্ণনা করা হয়। তবে এটির অতিরিক্ত ব্যবহার বা অপব্যবহার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা এই ফেন্টানাইলকে মাদক হিসাবে গ্রহণ করে থাকেন।

‘ওয়েস্টার্নস্ট্যান্ডার্ড.নিউজ’ এর রিপোর্টে বলা হয়, অনুসন্ধানে দেখা গেছে ২০২৪ সালে কানাডা থেকে মাত্র ৪৩ পাউন্ড ফেন্টানাইল অবৈধভাবে পাচার হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে মেক্সিকো থেকে পাচার হয়েছে ২১,১৪৮ পাউন্ড। সেই হিসাবে কানাডা থেকে পাচার হয়েছে মাত্র ০.২% এবং মেক্সিকো থেকে পাচার হয়েছে ৯৬.৬%। 

২০২২ সালের একটি কংগ্রেশনাল রিপোর্টও নিশ্চিত করেছে যে কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইলের প্রাথমিক বা প্রধান উৎস নয়। অর্থাৎ ট্রাম্পের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর এবং চরম মিথ্যাতো বটেই।

ট্রাম্পের এই মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের সমুচিত জবাব হিসাবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা যায় এখানে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি কানাডার সিবিসি নিউজে প্রকাশিত ঐ রিপোর্টে বলা হয়, কানাডিয়ান পুলিশ দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে এই বলে যে, সীমান্ত পথে আসা অবৈধ মার্কিন আগ্নেয়াস্ত্র এই দেশে বন্দুক-সম্পর্কিত অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি করছে। রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২০২২ সালে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি সীমান্তে ৫৮১টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা। আর গত বছর সীমান্তে জব্দ করা হয় ৮৩৯টি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে মাত্র ৯৩টি অন্যান্য দেশ থেকে আসা।

গত বছর শুধু টরন্টোতেই পুলিশ ৭১৭ টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে যার ৮৮ শতাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পথ পারি দিয়ে কানাডায় এসেছে। বিশেষজ্ঞ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকদ্রব্য কানাডায় অপরাধ, মৃত্যু এবং মাদকাশক্তিকে উসকে দিচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে ২০২২ সালে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ৩.৮ মিলিয়ন গ্রাম মাদক আটক করেছে। গত বছর এই সংখ্যা বেড়ে ৮.৩ মিলিয়ন গ্রামে পৌঁছেছে। এটি দুই বছরের মধ্যে ১৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি। 

এ বছরের গোড়ার দিকে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার আমেরিকান এক পডকাস্টারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, কানাডা থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিবাসী সীমান্ত পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে না। আর মাদক, বন্দুক, অপরাধ- এই জিনিসগুলির বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় প্রবাহিত হয়। কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নয়।    

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও দাবি কানাডায় মার্কিন কোনো ব্যাংকের ব্যবসা করার অনুমতি নেই। ‘ওয়েস্টার্নস্ট্যান্ডার্ড.নিউজ’ জানায় এটিও সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। কানাডায় বেশ কয়েকটি মার্কিন ব্যাংক কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে সিটিব্যাংক, জে.পি. মরগান অ্যান্ড কোং, ব্যাংক অব আমেরিকা, পিএনসি ব্যাংক, ইউ.এস. ব্যাংক এবং কমারিকা (Comerica) ব্যাংক। কানাডিয়ানরা রয়েল ব্যাংক অব কানাডার মাধ্যমে মার্কিন ব্যাংক একাউন্টও খুলতে পারেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী বৈধ কাগজ-পত্রহীন অভিবাসীদের সংখ্যা নিয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্তর অপতথ্য বা মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন। দোষ চাপাচ্ছেন কানাডার ওপর।

factcheck.org জানায় ‘মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন’ অথরিটি কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০২৪ অর্থবছরে (যা ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে) অবৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি লোককে আটকের ঘটনা ঘটেছে। এরা মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। এই সংখ্যা ২০২৩ অর্থবছরে ছিল প্রায় ২ মিলিয়ন এবং ২০২২ অর্থবছরে ২.২ মিলিয়নেরও বেশি।

অন্যদিকে ২০২৪ অর্থ বছরে কানাডা থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কালে গ্রেফতার করা হয়েছে ২৩,৭২১ জনকে। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের মোট সংখ্যার মাত্র ১.৫%। সাম্প্রতিক কালের অন্যান্য তথ্য থেকে দেখা যায় ২০২৩ সালে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল ১০,০২১ জন এবং ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ২,২৩৮ জন। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে বেড়াচ্ছেন কানাডা থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন লোক অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম আসলে শৈশব থেকেই ছিলেন অবাধ্য এবং উদ্ধত প্রকৃতির। রোয়ার মিডিয়ার এক রিপোর্টে বলা হয়, ট্রাম্প যখন ১৩ বছরের বালক তখন তাকে তার কিউ-ফরেস্ট স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। কিউ-ফরেস্ট একটি প্রাইভেট স্কুল ছিল। তার বাবা ছিলেন সেখানকার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। কিন্তু তারপরও ট্রাম্পকে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এ থেকেই অনুধাবন করা যায় বালক বয়স থেকেই তিনি কতটা উদ্ধত স্বভাবের ছিলেন। পরে তার বাবা-মা তাকে মাত্র ঐ বয়সেই নিউ ইয়র্ক মিলিটারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে বাধ্য হন। তারা মনে করেছিলেন যে, ট্রাম্পের আরো বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করা উচিত।

উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবের ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পর্যন্ত বিয়ে করেছেন তিনবার। তার প্রথম স্ত্রী ইভানা ট্রাম্প, দ্বিতীয় স্ত্রী মার্লা মাপলেস এবং বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। ইভানা ট্রাম্প এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিভোর্স হয়ে যায় ১৯৯০ সালের দিকে। ট্রাম্পের সাবেক এই স্ত্রী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও এনেছিলেন। এছাড়াও তিনি তার সাবেক স্ত্রীকে মারধরও করেছিলেন। রাগের মাথায় স্ত্রীর মাথার চুলও ছিঁড়ে নিয়েছিলেন ট্রাম্প।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে লেখিকা থেকে শুরু করে পর্ন তারকা তার বিরুদ্ধে তুলেছেন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ।

সহিংস কথাবার্তা বলার রেকর্ডও রয়েছে তার। একবার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মেয়ে লজ চেনিকে তাক করে এক নয়, কয়েক ব্যারেল গুলি চালিয়ে পরীক্ষা করা উচিত বলে সহিংস মন্তব্য করেছিলেন। আরেকবার তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, কেউ যদি মিথ্যা খবর দেয় তাহলে তাদের গুলি করলে, তিনি কিছু মনে করবেন না। পেনসিলভানিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমাদের এখানেই অনেক ফেইক নিউজের কর্মীরা রয়েছে। কেউ যদি এই ফেইক নিউজওয়ালাদের গুলি করতে পারে তাহলে সে আমার মন পাবে। আর আমি তাতে কিছুই মনে করবো না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরকম হত্যার হুমকি দিয়েও তিনি পার পেয়ে গেছেন। বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। এবং আমেরিকার জনগণ তাকে দ্বিতীয়বারের মত প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন।

কানাডায় আমরা এরকম হুমকির কথা চিন্তাও করতে পারি না। এখানকার কোন রাজনৈতিক নেতা যদি এরকম সহিংস মন্তব্য করেন জনসমক্ষে তাহলে সেইদিনই তাকে রাজনীতি থেকে চির বিদায় নিতে হবে। তারপরে বিচারের সুযোগ তো রয়েছেই তার বিরুদ্ধে।

বিবিসির এক খবরেও বলা হয়, ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টাদের অনেকেই তাকে মিথ্যাবাদী, ফ্যাসিস্ট এবং অনুপযুক্ত বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই উপদেষ্টাদের মতে- ট্রাম্প যদি এবার দ্বিতীয় দফায় তার অনুগতদের পাশে রেখে শাসনকাজ পরিচালনা করেন তাহলে খুব শীঘ্রই তিনি তার চরমপন্থি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবেন।

তার আলমত আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। তিনি বিশ^বাসীর ঘুম হারাম করে দিয়েছেন ক্ষমতা হাতে নিয়েই। তিনি কানাডাকে অঙ্গরাজ্য করার স্বপ্ন দেখছেন, গ্রীনল্যান্ডকে দখল করার হুমকি দিচ্ছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের গাজা দখল করে সেখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলছেন। তিনি ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের অর্ধেকের মালিকানা দাবি করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের সঙ্গে চরম অবমাননাকর ব্যবহার করছেন। হিংস্র পশুদের যেভাবে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয় বা ভয়ানক অসামীদেরকে স্থানান্তরের সময় যেভাবে তাদের হাতে পায়ে শিকল বেধে রাখা হয় সেভাবেই নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদেরকে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। দীর্ঘ যাত্রা পথে তাদেরকে খাবার দেওয়া হচ্ছে না। টয়লেটও ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে না। কী রকম অমানবিক হতে পারেন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট!

এখন অপেক্ষার পালা এটি দেখার জন্য যে, আগামী চার বছরে তিনি আর কতটা অমানবিক হবেন এবং আর কতটা বর্ণবাদী হয়ে উঠবেন। কথাবার্তায় আর কতটা অমার্জিত হবেন এবং আর কতটা নীতিহীনতা প্রদর্শন করবেন। প্রতারণা আর প্রতিশোধপরায়ণতায় কতটা মেতে উঠবেন এবং একের পর এক মিথ্যা কথা বলায় বা অপতথ্য ছড়ানোর ব্যাপারে তিনি কতটা পারঙ্গম হয়ে উঠবেন অবাক বিস্ময় নিয়ে সেটিও চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে এখন বিশ^বাসীকে। মানব সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজ চরম হুমকির মুখে আমেরিকার জনগণের প্রতিনিধি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। আমেরিকার সিংহভাগ জনগণই তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছেন!

তবে নতুন এক জরিপে দেখা গেছে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক মাসের মধ্যেই মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প্রের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোস পরিচালিত ঐ জরিপে বলা হয়, ৫৭ শতাংশ মার্কিন এখন মনে করছেন, দায়িত্বগ্রহণের পর ক্ষমতার

সীমা ছাড়িয়ে গেছেন ট্রাম্প। এই সময়ের মাঝে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রমকে সমর্থন করছেন ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক আর বিরোধিতা করেছেন ৪৮ শতাংশ নাগরিক। এর মধ্যে তীব্র বিরোধিতা করছেন ৩৭ শতাংশ, তীব্র সমর্থন দিচ্ছেন ২৭ শতাংশ। তবে জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ রিপাবলিকান ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন আর বিরোধিতা করছেন ৯০ শতাংশ ডেমোক্রেট।

আর বিশ্বে মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চরমভাবে অবনমিত করার পিছনে শুধু ট্রাম্পই কি দায়ী? তার আগের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মানব সমাজের মানবিকতা রক্ষায় কি করে গেছেন? গাজায় শিশুসহ ৪৮ হাজার নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার পিছনে ইজরাইলকে নেপথ্যে থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা করে গেছেনতো তিনিই। তারও অনেক আগে ২০০৩ সালে সেই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যুক্তরাজ্যকে সাথে নিয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে এক কাল্পনিক অভিযোগ তুলে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সেই যুদ্ধে পৌনে ৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তাদের কাল্পনিক অভিযোগ ছিল প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলেছেন। কিন্তু পৌনে ৩ লাখ মানুষ হত্যা করার পর প্রমাণিত হয়েছিল যে, ইরাকে কোন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত ছিল না। তারা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকেও হত্যা করে।  

সেই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য জর্জ বুশ কানাডার উপরও প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী Jean Chrétien যুক্তরাষ্ট্রের সেই চাপের মুখেও যুদ্ধে অংশ নেননি। সেদিন তিনি বলেছিলেন ইরাকের হাতে যে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে তার অকাট্য প্রমাণ দিতে হবে আগে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। কারণ, কল্প কাহিনীর কোনো প্রমাণ থাকে না।

মার্কিনিরা ২০১১ সাল পর্যন্ত ইরাকে অবস্থান করে। তার কয়েক বছর পর ২০১৮ সালে ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশন’ প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয় গত ৭৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ২ থেকে ৩ কোটি মানুষ হত্যা করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আধিপত্য লড়াইয়ের এ মিশনে ১৯৪৫ সাল থেকে পরবর্তী ৭৩ বছরে অর্থাৎ ২০১৮ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির দেশটির হাতে নিহত হয়েছে এই সংখ্যক নিরীহ মানুষ। এটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের প্রায় দ্বিগুণ। ঐ যুদ্ধে নিহত হন প্রায় দেড় কোটি মানুষ।

কয়েক বছর ধরে গবেষণা করে রিপোর্টটি প্রস্তুত করেছেন মার্কিন ইতিহাসবিদ জেমস এ লুকাস। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, যুদ্ধে প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির বিপরীতে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। সেই হিসাবে মার্কিন বাহিনীর হাতে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ থেকে ৩০ কোটি মানুষ।

যুগান্তর জানায়, জেমস লুকাসের গবেষণার বরাত দিয়ে ‘অ্যাটাক দ্য সিস্টেম ডটকম’র প্রধান সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেইথ প্রেস্টন ঐ সময় প্রেটিভিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মার্কিন সরকার বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য, অপরাধ, বর্ণবাদ ও সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কখনই শীর্ষ পর্যায়ে ছিল না, বরং দেশ ও বিদেশে ব্যাপক হারে অপরাধ ও কুকর্ম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র একটা আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী, যা আগে ছিল ব্রিটেন।

আর এই আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী দেশটির ‘আধুনিক’ প্রেসিডেন্ট হলেন ‘ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ডেঞ্জারাস ম্যান’ ডোনাল্ড ট্রাম্প!         

খুরশিদ আলম

সম্পাদক ও প্রকাশক

প্রবাসী কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *