শুক্রবারের জুম্মা ও একটি উপন্যাসের প্লট
জসিম মল্লিক
এক শুক্রবারের কথা। আমি মহাখালী থেকে গেলাম নিকুঞ্জ-দুই এ। ওখান থেকে যাব উত্তরা ওয়ালির বাসায়। সারাদিন ওখানেই থাকব, জুম্মা পড়ব এবং সন্ধ্যায় যাব ওয়ালির হাউজবোটে। এমনই প¬্যান। নিকুঞ্জ থেকে জাস্ট বের হইছি এমন সময় ফোন,
তুমি কই!
বললাম নিকুঞ্জ আসছি।
ওখানে কি কাজ!
জেসমিনের ফ্ল্যাট দেখতে আসছিলাম।
এখনই চইলা আসো। পারবা না!
পারব।
আধাঘণ্টার মধ্যে পারবা!
আমি বললাম পারব আশা করছি।
শুক্রবার এই সময়টায় তেমন ট্র্যাফিক থাকে না। এয়ারপোর্টের কাছ থেকে ইউটার্ন নিয়ে চললাম ঢাকার দিকে। ড্রাইভারকে বললাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নিতে। ড্রাইভার একটানে ফার্মগেট নেমে মগবাজার হয়ে চলে আসল মন্ত্রী পাড়ায়। মিন্টু রোড খুঁজে পাই কিন্তু ফুলার রোড খুঁজে পাইনা। গুগল ম্যাপ কি সব যেনো বলে। ডিউটিরত পুলিশকে জিজ্ঞেস করি কেউ চেনেনা। আমি মহা বিরক্ত পুলিশের উপর। প্রায় সবাই বলল, আমি নতুন স্যার, চিনি না। মহা জ্বালা। আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না এ এলাকায় ফুলার রোড নাই কেনো! পরে একজন মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে বলল, ফুলার রোডতো ইউনিভার্সিটি এলাকায়। আরে তাইত! কতগুলো বছর মহসিন হলে ছিলাম আর ফুলার রোড ভুলে গেলাম! ছি!
চললাম ফুলার রোড। শহিদ মিনার এলাকা দিয়ে ঘুরছি। ঠিকানা খুঁজছি। দেখি প্রচণ্ড ভিড় এই এলাকায়। ব্রিটিশ কাউন্সিলে কিছু একটা পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা শেষ হতে সবাই হুর হুর করে রাস্তায় নেমে এসেছে। গাড়ি এগোতে পারছে না। আধা ঘণ্টা ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে। আমি বার বার ঘড়ি দেখছি। তখন বাজে সাড়ে বারোটা। জুম্মার নামাজ একটু পরেই। আজকে বুঝি আর দেখা হচ্ছে না। অবশেষে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছলাম। কিন্তু গেটের দারোয়ান বলল, স্যারতো এখানে থাকেন না। আমি বললাম কই থাকেন! বলল, ওই পাড়ায়। আমি বললাম, ওই পাড়া মানে কি! সে বলে ওই বিল্ডিং। এদেশের লোকজন কিচ্ছু খবর রাখে না! মনে মনে ভাবলাম কোনো ভুল হচ্ছে নাতো! এখানেতো তার থাকার কথা না! তাড়াহুড়োর সময় মাথা কাজ করে না। তাও আমি ফোন দিলাম। ফোন ধরে না। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। অবশেষে সেই ফোন দিল।
কই তুমি!
বললাম ফুলার রোড আসছি, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিনাতো।
সে বলল, ফুলার গেছো কেনো। আমি ফুলার রোড থাকি! আমি থাকি হেয়ার রোড।
তুমি যে বললা ফুলার রোড!
হায় হায় ভুল হইছে দোস্ত। চইলা আসো তাড়াতাড়ি।
কিন্তু যেতে কি আর পারি। গাড়ি একচুল নড়ে না। এদিকে নামাজের সময়ও হয়ে এসেছে। অবশেষে পৌঁছালাম হেয়ার রোড।
সরি দোস্ত তোমারে ঘুরাইলাম।
মহা জ্যাম ওদিকে। মনে হয় কোনো পরীক্ষা চলতেছে।
কফি খেতে খেতেই নামাজের সময় হয়ে গেলো।
চলো নামাজ পইরা আসি।
কাকরাইল মসজিদে নামাজ শেষে আবার আমরা অফিস রূমে বসলাম। ঠিক তখনই আমার পুরোনো একটা ঘটনা মনে পড়ল। সেটা ২০০৯ সালের কথা। আমি টরন্টো থেকে বাংলাদেশ যাব। ইউরোপে কয়েকদিনের যাত্রা বিরতি নিয়েছি। উদ্দেশ্য লন্ডন ও প্যারিস ঘোরা। একদিন লন্ডন থেকে ইউরোস্টারে প্যারিস যাই। প্যারিস থেকে আবার লন্ডন ফিরি। দুবারই আমাকে ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানো এবং রিসিভ করেছিল আসিফ নজরুল। লন্ডনে উঠেছিলামও তার কাছে। আসিফ আগেই বলে রেখেছিল, তুমি একটু স্টেশনে ওয়েট করবা, আমি জুম্মা পইড়া তোমাকে নিতে আসব। আজকে শুক্রবার, সেদিনও ছিল শুক্রবার। খুবই কাকতালীয় ঘটনা।
বলল দুপুরে খাইয়া যাও।

আমি এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম। বললাম, বাসায় গ্যাস নাই, দুই দিন থেকে রান্না বন্ধ।
আসিফ চিরাচরিত হাহাহা হাসি দিয়ে শিলাকে বলল, খাওয়া রেডি করো। জইস্যার বাসায় রান্না বন্ধ।
আমরা ভাত, মাছ, সীম, ডাল আর শুঁটকি দিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম তিনজনে।
হেয়ার রোডের বাড়িটা কয়েক একর জায়গা নিয়ে। যা হয় সাধারণতঃ মন্ত্রী পাড়ার বাড়িগুলো এমনই বিশাল। কিছু বাড়ি হেরিটেজ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত। এর মূল ডিজাইন কখনো চেঞ্জ হয় না। বরিশালে দেখেছি, ডিসি, এডিসি, এসপি, ডিএসপি, জজ সাহেবদের বাড়িগুলোও এমন বিশাল বিশাল। খাওয়া দাওয়ার পর আমরা দুজনে হাঁটছিলাম বাড়ির চৌহদ্দির ভিতরে সরু ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে। কথা হচ্ছিল লেখালেখি নিয়ে। বলল, লেখাটা মন দিয়ে লেখো। তোমার গদ্য খুবই ভাল। এটাকে সিরিয়াসলি নাও। নিজের লেখালেখির কথাও বলল। আমি আবু বকর, ক্যাম্পাসের যুবক ইত্যাদি উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, সংবিধান বিতর্ক ১৯৭২ বা মানবিধকার ইত্যাদি বই লেখার পিছনে কত শ্রম দিতে হয়েছে সেসব কথা উঠল।
শেষে বলল, তুমি একটা উপন্যাস লিখ। এই যে বিদেশে গিয়ে এত স্ট্রাগল তোমাদের, সন্তানদের বড় করা, তুমি জেসমিন যে এতো ত্যাগ স্বীকার করেছো, অড জব করেছো সেসব নিয়ে অকপটে লিখ। নিজেকে লুকানোর তো কিছু নাই। ভীতু হলে চলবে না। কে কি বলল, কিছু যায় আসে না। তোমার সব লেখাই দেখিতো আমি। দেখবা তোমার অভিজ্ঞতাই একটা চমৎকার উপন্যাস হবে।
বাড়ি বা ডিভাইসের চেয়ে সন্তান বড়
বিদেশে যারা থাকেন বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় তাদের প্রায় সবারই ধ্যানজ্ঞান একটা বাড়ির মালিক হওয়া। মনে হয় তারা বিদেশে আসেন একটা বাড়ি কেনার জন্য। ভাবখানা এমন যেনো তারা কোনোদিন বাড়িতে থাকেননি। যেনো অন্যরা রাস্তায় থাকেন। তাদের স্বপ্নে, কল্পনায়, ধ্যানে, জ্ঞানে, বর্তমানে, ভবিষ্যতে বাড়ি ছাড়া আর কিছু নাই। রাস্তায় হাঁটতে বাড়ি, গাড়ি ড্রাইভ করতে বাড়ি, বাসে ট্রেনে বাড়ি, শপিং মলে বাড়ি, কফি শপে বাড়ি, ওয়াশরুমে বাড়ি, আড্ডায় বাড়ি, দাওয়াতে বাড়ি। দেখেছি কোথাও দাওয়াতে গেলে যাদের বাড়ি আছে তারা আলাদা বসে এবং বাড়ি নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনায় লিপ্ত হয়। যার যত সমস্যা আছে বাড়িতে সেই সব নিয়ে কথা চলতে থাকে। তারা খেতে বসেও একই আলোচনা করে। আলোচনার অন্যতম দিক হচ্ছে বেজমেন্ট ভাড়া নিয়ে, ভাড়াটিয়ারা কেমন, রিয়েলটার কেমন সেসব নিয়ে। অনেকে আছে বাড়ি কিনে বিরাট দায় দেনায় পড়ে যায়। মর্টগেজ শোধ করতে গিয়ে জীবন দিয়ে দেয়। তখন না পারে কোথাও যেতে না পারে জীবনকে উপভোগ করতে। একবার টরন্টোতে এক বাসায় গিয়েছিলাম পাত্র দেখতে, পাত্রের বাবা মায়ের সাথে আলোচনা করতে। ওমা সেই বাড়িতে যতক্ষণ ছিলাম শুধু বাড়ির গল্পই করলেন। এমনকি জোর করে প্রতিটা বাথরুম পর্যন্ত দেখতে বাধ্য করলেন। শেষ পর্যন্ত পাত্র নিয়ে আর কোনো কথাই হলো না। এমন অনেক গল্প আছে। পরে কখনো বলা যাবে।
বাড়ি যে কেনা যাবে না তা না। অবশ্যই যাবে। একশবার যাবে, হাজারবার যাবে। একটা না দশটা বাড়ি কিনলেও কোনো সমস্যা নাই। বাড়ি নিয়ে গল্প হোক, আড্ডা হোক, শয়নে স্বপনে বাড়ি থাক তাতেও সমস্যা নাই। বাড়ির স্বপ্ন কে না দেখে। সবাই দেখে। আমিও দেখি। নিজস্ব একটা আশ্রয় থাকা কত দরকার। বাড়ি একটি ভাল ইনভেস্টমেন্টও বটে। নিরাপদ ইনভেস্টেমেন্ট। ভবিষ্যতের আশ্রয়। এজন্যইতো বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দেশের টাকা পাচারকারীরা বাড়ি কেনে। কালো টাকা সাদা করার অন্যতম উপায়। এটা দেশেও আছে। বিশ, পঁচিশ কোটি টাকা দামের ফ্লাটও আছে। এগুলো নগদে কেনা। কারো কারো পনোরো বিশটা ফ্লাটও আছে ঢাকায়। বিদেশে টাকা পাচারকারীরা ব্যাংকের দ্বারস্থ হয় না। সোজা ক্যাশ টাকা দিয়ে কিনে ফেলে। পাঁচ, দশ, পনেরো, বিশ, পঁচিশ মিলিয়ন ডলার দামের বাড়ি ডাল ভাত ওদের কাছে। মধ্যবিত্ত যেখানে একটা বাড়ির জন্য এক/দেড় মিলিয়ন জোগাড় করতেই হিমসিম খায় সেখানে তাদের কাছে বাড়ি একটা ছেলে খেলা মাত্র। এজন্যই ট্রুডোর এই পরিণতি। ইমিগ্রেশন আর আবাসন নিয়ে যে সংকট তৈরী হয়েছে সেটার জন্য একজন নায়কের পতন। নারীদের ক্রাশের পতন!
বাড়ি কিনুন, গাড়ি কিনুন, সম্পত্তি বাড়ান, গল্প আড্ডা করেন, বেড়ান যত পারেন, অনুষ্ঠান করেন, গান করেন, কবিতা পড়েন, গল্প উপন্যাস লেখেন, সমিতি করেন, সেমিনার করেন, রাজনীতি করেন, দলাদলি করেন, গ্রুপিং করেন, পকিনিক করেন, পিঠা পার্টি করেন, ফ্যাশন শো করেন, ব্যবসা বাণিজ্য করেন, সেলফি করেন, যতখুশী ছবি পোস্ট করেন, লাইভ করেন, রীলস করেন, ইউটিউব করেন। কোথাও কোনো সমস্যা নাই। শুধু একটাই অনুরোধ সন্তানদের সময় দিন। তাদের পাশে থাকেন, তাদের মন বোঝার চেষ্টা করেন, তাদের বন্ধু হন। সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। কেমন বন্ধুর সাথে মেশে জানার চেষ্টা করেন। জোর করে কিছু চাপিয়ে দিয়েন না। একটা ঘটনা বলে শেষ করছি। বেশ অনেক বছর আগে আমি যে এলাকায় থাকি সেখানে একজন বাঙালি ফ্যামিলির ছোট্ট মেয়েটিকে একদিন পুলিশ নিয়ে যায়। মেয়েটি সম্ভবত কোনো অভিযোগ করেছিল বাবা মায়ের বিরুদ্ধে। বহুবছর সে তাদের জিম্মায় ছিল। আঠারো বছর হলে মেয়েটি মুক্ত হয়। কিন্তু বাবা মায়ের কাছে আর ফেরেনি। একদিন শুনলাম মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। এই প্রবনতা বাড়ছে। যার যায় সেই জানে কি হারিয়েছে! অতএব সাধু সাবধান! মনে রাইখেন ডিভাইস আর বাড়ির চেয়েও আপনার সন্তান বড়!
আমাদের সন্তানেরা যে বিপদগামী হচ্ছে, ড্রাগ আসক্ত হচ্ছে, আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে এর কারণ আমরা নিজেরাই। আমাদের নিজেদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে এই সমস্যাগুলো তৈরী হয়েছে। আমরা এতো বেশি নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, এতো বেশি নিজেদের জাহির করতে চাচ্ছি যে সন্তানদের সময় দেওয়ার মতো সময় খুব কম। আমাদের এই প্রজন্ম এক একটা সোনার টুকরা কিন্তু আমরা হচ্ছি তামা। সোনার মূল্য বুঝতে পারছি না। বাবা মায়ের চেয়ে বড় কাউন্সিলর আর নাই। আমি অন্তত তা মনে করি না।
মনে রবে কিনা রবে আমারে
মুরালিদার অফিসটা বরিশালের বাজার রোডে টেম্পু স্টান্ডের কাছে। যখনই বরিশাল যাই মুরালিদার দফতরে একবার না একবার যাওয়া হবেই। গেলেই রঙ চা খেতে দেন। মিষ্টি হেসে বলেন দাদা একটা চিকন হবে! চিকন মানে ইজি সিগারেট। মুরালিদা ভুলে যান যে আমি তেমন স্মোকার না। কামাল ভাইর মাধ্যমেই মুরালিদার সাথে পরিচয়। এবারও দেখলাম মুরালিদা আগের মতোই নির্দিষ্ট চেয়ারটায় বসে আছেন। পোলট্রির বিজনেস তাদের ফ্যামিলির। চালু বিজনেস। আমাকে দেখেই হাসলেন। ৫ আগষ্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুরালিদা কেমন আছেন জানার খুব আগ্রহ ছিল। বাংলাদেশের হিন্দুদের একটা আওয়ামী ট্যাগ লাগানো হয়। এই ধারণা একদমই ঠিক না। সবারই যে আওয়ামী প্রীতি আছে ব্যাপারটা এমন না। বিএনপি বা অন্যদলের প্রতি সমর্থন আছে এমন হিন্দুর সংখ্যা প্রচুর। আমি মজা করে মুরালিদাকে বললাম, দাদা আপনার সাথে দেখা হবে ভাবিনি। মুরালিদা বললেন কেনো! আমি বললাম, বিদেশে আমার কিছু হিন্দু বন্ধু আছে তারা মনে করে বাংলাদেশে আর কোনো হিন্দু নাই। সব কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। দাদা হাহাহা করে হাসলেন।
গতকাল আমরা গিয়েছিলাম পিরোজপুর মুরালিদার ভাই সমীর দাসের মেয়ে শৈলী দাসের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানে। পিরোজপুরের বনেদি ফ্যামিলী গৌরাঙ্গ দাসের ছেলে সৌরভ দাসের সাথে পাকা কথা অনুষ্ঠান। আমরা প্রায় একশর উপরে গিয়েছিলাম গাড়ি বহর নিয়ে। এর আগে আমি পিরোজপুর যাইনি। পথে ছোট ছোট অনেকগুলো জেলা উপজেলা পড়ে। বরিশালটা সত্যি খুব সুন্দর। শুধু বরিশাল না আমাদের দেশের প্রতিটি জনপদই সুন্দর। মন কেড়ে নেয়। পিরোজপুর থেকে কামাল ভাই আর দোলন সহ ঢাকা ফিরেছি। ঢাকা আসতে হয় গোপালগঞ্জ, ভাঙ্গা হয়ে। দারুণ মজা করেছি আমরা বিয়েতে। হিন্দুদের বিয়েতে খাওয়া দাওয়া একটা বিরাট ঘটনা। প্রথমে ফলাহার তারপর চার পদের মিষ্টি দিল। স্পেশাল মিষ্টি। সব নিজেদের বানানো মিষ্টি। গৌরাঙ্গ দাসের বাবা দুলাল দাস এই ব্যবসার জনক। এই অঞ্চলে সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি। তারপর শুরু হলো মূল খাওয়া দাওয়া। রোষ্ট, পোলাউ, খাসীর কারি ছাড়াও ছিল চার পদের মাছ, রূপচান্দা, গলদা চিংড়ি, আইড় আর কাতল মাছ। সব স্পেশাল অর্ডার দিয়ে আনানো। আর ছিল সবজি। শেষে দই না থাকলে চলে!
একসময় বরিশালে আমি প্রচুর হিন্দু বাড়িতে বিয়ে খেয়েছি। মনে আছে আমানতগঞ্জে শুক্লার বিয়েতে কত ফুর্তি করেছিলাম আমরা। শুক্লা ছিল পৃথিবীর সেরা সুন্দরী। আমাকে অনেক পছন্দ করত। কলেজে গুন গুন করে গান শুনাত।.. মনে রবে কি না রবে আমারে সে আমার মনে নাই। ক্ষণে ক্ষণে আসি তব দুয়ারে, অকারণে গান গাই..। একদিন হঠাৎ বলল, জসিম আমার বিয়ে। আমিতো অবাক। এখনই! শুক্লা বিষন্ন হয়ে বলল হুম, আমি দেখতে সুন্দরতো তাই বিয়ে। বরিশাল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং আমার শৈশবের অনেক বন্ধুরা আজও আছে। এবার বরিশাল খুব ঘুরছি। এমন হতে পারে বরিশালে আবার ফিরে আসব। এমন কি হতে পারে না! পারে। তাই পুরোনো সম্পর্কগুলো ঝালাই করে নিচ্ছি। সেদিন গেলাম উদিচির কার্যালয়ে। এক সময় খুব যেতাম। সেখানে পুরোনো অনেকের সাথে দেখা হলো। আমাদের এলাকায় একসময় যাদের সাথে খেলেছি তাদের অনেককেই দেখি বুড়িয়ে গেছে। ইয়া লম্বা দাড়ি, দাঁত পড়ে গেছে, গাল বসে চিমসে হয়ে গেছে, ডায়াবেটিস, প্রেসার, হার্টের ব্লক। মনে মনে হাসি। নিজেকে বলি, তোমার বয়সও বাড়ছে সমানতালে।
বহুদূরের এক নিস্তব্দতার কণ্ঠস্বর শোনা যায়
গত দেড় মাসে বেশ কয়েকবার বরিশাল গিয়েছি। বিদেশে থাকলেও প্রতি বছরই বরিশাল যাই। কখনো দুবারও। এবারই একটু বেশিবার আসা যাওয়া করছি। নতুন করে আরো কিছু পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়েছি। কিন্তু এগুলো কে দেখবে! কে ভোগ করবে! আমার অবর্তমানে সন্তানেরা কি এই দ্বায়িত্ব নেবে! বরিশাল গেলে ক্লাবের গেস্ট হাউজের নির্জণ কক্ষে রাত কাটে আমার। বাড়িতে গেলে মায়ের শূন্য ঘরটা বড় বেশি কষ্ট দেয়। তাই ২০১০ সালে মা মারা যাওয়ার পর আর বাড়িতে থাকতে পারি না। থাকার সে রকম কোনো আয়োজন কেউ করে রাখেনি। আমি আমার মতো করে থাকি। আমার মতো করে বাঁচি। এখন আমি নিজের জন্য বাঁচতে শুরু করেছি। আমার কারো কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নাই, কারো কাছে কোনো প্রত্যাশা নাই আর। নিজেকে নিজেই একাকী মানুষ হিসাবে ঘোষণা করেছি। একাকী থাকায় আমি অভ্যস্ত। আমার খারাপ লাগে না। বরিশাল আমার প্রিয় শহর। শুধু প্রিয় শহর বললে কম বলা হয়, অতি প্রিয় শহর। এই শহরেই আমার জন্ম, আমার বেড়ে ওঠা। এই জনপদের প্রতিটি ধূলিকণা, গাছ পালা, পশুপাখি, রাস্তাঘাট, অলি গলি, বাড়ির আনাচ কানাচ আমার অতি প্রিয়, অতি পরিচিত। একদিন বরিশাল ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম ঢাকা। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় পড়াশুনা করব, প্রিয় লেখকদের কাছ থেকে দেখতে পাব। ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে পড়তে মনে গোপন স্বপ্ন জেগেছিল আমি লেখক হবো।
আমার অনেক না বলা কথা আছে। আমার কথাগুলো বলার কেউ নাই, শোনারও কেউ নাই। তাই আমি লিখব। লিখলে আমার ভাল লাগবে। আমার যে অনেক গোপন কষ্ট আছে, আমি যে একজন দুঃখী মানুষ তা কেউ বুঝতে পারে না। সেসব আমি লিখব। আমি একটু আজব প্রকৃতির, কারো সাথে আমার কোনো মিল খায় না। আমাকে কেউ কখনো বোঝেনি, মন বোঝেনি, ভাষা বোঝেনি। আমিও নিজেকে বোঝাতে পারিনি। এমনকি আমার স্ত্রী সন্তানরাও আমাকে স্পষ্ট করে বোঝেনি। স্বামী- স্ত্রী শুধু জীবন যাপন করে। একটা অভ্যাসের মতো। একজন আর একজনকে ব্যবহার করে। সেখানে কোনো প্রেম থাকে না। পরস্পরকে বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তারপর প্রতিদিন একা হয়ে যেতে থাকে। আমি তাদের যত ভালবাসা দিয়েছি যত ত্যাগ স্বীকার করেছি তা তারা বোঝেনি। অন্য সবার জন্য যত করেছি কেউ তার মূল্য বোঝেনি। আমি কারো কাছে কখনো কিছু চেয়ে নিইনি, অভিযোগ করিনি। কষ্টগুলো কারো সাথে শেয়ার করিনি। আপনজনদের চেয়ে দূরের মানুষরা আমাকে বেশি ভালবেসেছে। তারাই আমার আপনজন হয়েছে। এভাবেই আমি বেঁচে আছি।
ঢাকা শহরও আমাকে বেঁধে রাখতে পারল না। আমি আসলে অস্থির প্রকৃতির মানুষ। কোনো কিছুতে আমি সুস্থির হতে পারি না। আমাকে যারা কাছ থেকে চেনে তারা আমার এই অস্থিরতা টের পায়। একদিন আমি ঢাকা শহর ছেড়ে সুদূর কানাডার অটোয়া শহরে পারি জমালাম। ঢাকা ছেড়ে দেওয়া বা দেশ ছেড়ে দেওয়ার মতো কোনো কারণ ঘটেনি আমার। নিভৃত জীবন ছিল আমার। ধীরে ধীরে আমার সন্তানরা বেড়ে উঠছিল। এক অনন্ত লড়াই সংগ্রামের জীবন আমার। কিন্তু আমার সন্তানরা তার কিছুই টের পেলোনা। আমি তাদেরকে সবকিছু থেকে আড়াল করে রাখলাম। অটোয়া থেকে টরন্টো থিতু হলাম একদিন। কিন্তু মন পরে থাকল বরিশাল। কোনো শহরই বরিশালের চেয়ে আপন হয়ে উঠতে পারল না। কেবল অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাকে। মনে মনে ভাবি জীবনতো একটাই, একবারই এই পৃথিবীতে এসেছি। নতুন করে আর জীবন পাব না।
এখনও যখন বরিশালের নির্জন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটি তখন নিবিড় ঝিম ঝিম, অনুত্তেজক নৈশব্দ ঘিরে ধরে আমাকে। এখানকার প্রতিটি বৃক্ষ, কীটপতঙ্গ, তৃণভূমি, নদী, পশুপাখি সব আমার বন্ধু। সবসময় ভাবি একদিন আমি টরন্টো শহরের বাস ঘুচিয়ে চলে যাব বরিশালে। একটা বাড়ি করব, সেখানে থাকবে একটা লাইব্রেরি। শেষ জীবনে শুধু বই পড়ব। কত কি তো পড়া হয়নি। ছোটবেলার দেখা সেই গরুর গাড়ি, ডোবার গর্ত, পানিতে ভরভরন্ত, খানাখন্দ ভেঙে, কাদা ঘেঁটে হাঁটব, মাটি মাখব, ভাব করব পৃথিবীর সঙ্গে। আল পথ দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলে যাবো। ক্ষেতগুলো ডুবে থাকবে পানিতে, চিনে জোক রক্ত চুষে নেবে, ক্রমে নিবিড় থেকে নিবিড়তর গাঁয়ের মধ্যে চলে যেতে যেতে দু’খানা চোখ রুপমুগ্ধ সম্মোহিত হয়ে মাকে খুঁজে বেড়াবে। আমরা প্রত্যেকটা মানুষ এই পৃথিবীর কাছে নানাভাবে ঋণী। যে যেমনই হোক, যত বড় বা ছোট, তার উচিত সেই ঋণ একটু করে শোধ করা। রোজ শোধ করা।
বাড়িতে সবই আছে, আগের সেই ঘর আছে, পুকুর আছে, উঠোন আছে, মানুষজন আছে শুধু মা নাই। স্মৃতিগুলো আছে শুধু। কত স্মৃতি ভিড় করে আসে মনে। পেয়ারা তলার ছোট্ট খুপরি রান্নাঘরটায়
মা নিশ্চল বসে থাকতেন। একটু কুঁজো হয়ে কেমন ছেলেমানুষের মতো বসবার ভঙ্গি ছিল মা’র। যেন কোনও কিশোরী বেলার চিন্তায় বিভোর। সারাদিন কাঠকুড়নির মতো কুঁজো হয়ে হয়ে মা সারা ঘর ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে খুঁজে ময়লা বের করে ঘর থেকে, বার বার সামান্য জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখে, বিছানার চাদর টান করে অকারণে, তারই ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় মার চোখ, শিশুর মতো বোকা হয়ে যায় তোবড়ানো মুখ। যেন চার দিকের এই ঘড়বাড়ি. ছোটখাটো জিনিসপত্র, এই ছোট্ট সংসার- এর কোনও কিছুর অর্থই মা বুঝতে পারেন না। হাঁটু মুড়ে ছোটখাটো হয়ে মা সবসময় ঘুমোতেন, নিঃসাড় সেই ঘুম, আর মাঝে মাঝে সেই মুখে একটু একটু হাসি ফুটে উঠে মিলিয়ে যেতো। তখন মনে হয় মা স্বপ্ন দেখছেন- সেই কিশোরী বেলার স্বপ্ন। এক দূর গঞ্জ কিংবা গাঁয়ের স্বপ্ন, যার সঙ্গে এই চারপাশের জীবনের লক্ষ লক্ষ মাইলের তফাত।
অপরাহ্ণে এক-একদিন উঠোনে একটা অদ্ভুত আলো এসে পড়ত। শালিকের পায়ের মতো হলুদ তার রং। পাঁচালির ছায়া ঘর ছাড়িয়ে অর্ধেক উঠোন পর্যন্ত চলে যায়। পেয়ারা গাছে ফিরে আসে পাখির ঝাঁক। সেই অলৌকিক হলুদ আলো-আঁধারিতে মা কুঁজো হয়ে সড়সড় করে উঠোন ঝাঁট দেয়, বিড়বিড় করে কী যেনো কথা বলে নিজের সঙ্গে। ঝাঁট দেওয়া শেষ হলে মা ঘটি থেকে পানি ছিটিয়ে দেয় সারা উঠোন। ঠিক সেই সময় দূরে কোথাও বাচ্চা ছেলেদের খেলা ভাঙে- তাদের হাসি চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। কোথা থেকে উঠোনে এসে পড়ে বিষণ্ন সব ছায়া আর ছায়া। ভেজা মাটির গন্ধ মন্থর বাতাসে ভারী হয়ে ওঠে। তখন মা ডেকে বলে যা, ঘরে যা, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তখন অপরাহ্ণের নিঃশেষ আলোয়, দীর্ঘ গাঢ় ছায়ার দিকে চেয়ে থেকে বহুদূরের এক নিস্তব্দতার কণ্ঠস্বর শোনা যায়। তখন ছোট্ট উঠোনটায় শব্দহীন ভাবে শেষ হয়ে যায় এক একটা দিন।
বরিশালে গেস্ট হাউজের রুমে আমি ঠায় বসে থাকি প্রায় প্রায়। তেমন কোথাও যাওয়ার নেই। কোনও স্টেশনেই নামবার নেই। ভাঙাচোরা মনে সম্পর্কহীন একা। বড় আনমনা লাগে। বাইরের দিকে চেয়ে পৃথিবীর সঙ্গে আমার ও মানুষের সম্পর্কের বুননটা আবিষ্কারের চেষ্টা করি। পারি না। আমার চারদিকে একটা গুটিপোকার খোলস আছে। প্রকৃত আমি বাস করি সেই খোলের মধ্যে। সেখানে শক্ত হয়ে থাকি। বাইরের কারও সঙ্গেই আমার সম্পর্ক রচিত হতে চায় না সহজে। কাউকেই আমি ভাল চিনি না। এর কারণ অন্য কিছু নয়, বাক্য। অভাব ভাব প্রকাশের। আমার অতি আপনজনরাও যখন আমাকে বাক্যবানে জর্জরিত করে বা ছিঁড়ে খুরে ফেলে আমি কিছু করতে পারি না। কিন্তু মা আমাকে কিছুটা হলেও বুঝত।
আমি নিজেকে এক জায়গায় জড়ো করতে পারিনি। এখানে ওখানে টুকরো-টাকরা পড়ে আছে। অনেকটাই পড়ে আছে বরিশালের বাড়িতে। যেখানে আমি মায়ের সাথে থেকেছি। টিনের ঘর, দারিদ্রের ক্লিষ্ট ছাপ, প্রতি পদক্ষেপে এক পয়সা দু’পয়সার হিসাব। তবু সেখানে আমার অনেকটা পড়ে আছে। আজকে এই চকচকে শহর, উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার দেশে থেকেও মনে হয় ঢাপরকাঠির সেই অজপাড়াগাঁ আমার সঙ্গেই আছে। কাঁদা মাখা পা, উড়ো খুরো চুল, চোখে স্বপ্ন, বিস্ময়ের পর বিস্ময়। আর আছে বরিশালের সেই সোনালি দিনগুলো।
আমি প্রতি বছর মাকে দেখতে যেতাম। যখনই গিয়েছি তখন দেখেছি কোনো সুদূর ছেলেবেলায় দেখা পুরোনো ছবিটাকে মা টেনে এনে দূর ভবিষ্যতের গায়ে টাঙিয়ে রাখছেন। দীর্ঘ সব ঘুমহীন রাত জেগে ভাবতে ভাবতে মায়ের মনে সব অতীত ভবিষ্যৎ গুলিয়ে উঠত, জট পাকাত। বুদ্ধুদের মতোই তখন মার মুখে কথা ভেসে উঠত। কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে হালকা হয়ে যেতো মায়ের মন, আর তখন এসব একা একা দীর্ঘ দিনরাত্রিগুলোকে আর একটু সহনীয় মনে হতো মার। পুরোনো সেই দৃশ্যের জন্ম হয়না আর। স্টিমার রকেটটি ভোঁ দিয়ে যখন বরিশাল ঘাটে থামত তখনও রয়ে যেতো অন্ধকার। পনেরো মিনিটের মাত্র পথ। মনে হয় পথ আর ফুরোয় না। আকাশভরা তারা, তার পূবদিকে আকাশের রং ময়ূরের গলার মতো রঙিন। সামান্য ঠান্ডা অনুভূতি হয় ভোরের সকালে। সেই হিম ধুয়ে দেয় বাতাসকে। বাতাস তখন বড় শীতল, বড় উদার। একটু পরেই এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হবে। এই একটি মুহূর্তের জন্যে অপেক্ষা থাকে মায়ের। ঘরের সামনে যখন রিকশাটা থামে, দেখা যায় মাথায় ঘোমটা টানা ছোট্ট বুড়িয়ে যাওয়া মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। নিদ্রাহীন চোখে ক্লান্তির ছাপ। আমাকে জড়িয়ে ধরেন। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে পাগলের মতো আদর করেন। তারপর বাচ্চাদের মতো লুকিয়ে কাঁদেন।
বরিশাল ২৩ জানুয়ারি ২০২৫
জসিম মল্লিক
লেখক ও সাংবাদিক
টরন্টো
jasim.mallik@gmail.com