কানাডায় শরণার্থীদের বরণ করে নেয়া হচ্ছে ব্যাপকহারে

২০১৮ সালে ১৪ হাজার শরণার্থীকে বরণ করে নেয়া হয় : ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজারে

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় রিফিউজি বা শরণার্থীদের বরণ করে নেওয়া হচ্ছে ব্যাপক হারে। ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয় এই প্রবণতা। ঐ বছর মোট ১৪ হাজার শরণার্থীকে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজারে। সম্প্রতি সিবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরী করা হয় কানাডার ইমিগ্রেশন এ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের ডাটা বিশ্লেষণ করে।

সিবিসির অনুসন্ধানে আরো দেখা যায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে ইরান ও তুরস্ক থেকে কানাডায় আসা শরণার্থীদের আবেদন পত্র অনুমোদনের হার অনেক বেশী। এ ছাড়াও তালিকায় আরো আছে ভারত, হাইতি এবং মেক্সিকো। এই দেশগুলো থেকে আসা শরণার্থীদের আবেদন পত্র অনুমোদনের হার প্রায় ৫০%। আর ইরান ও তুরস্ক থেকে আসা শরণার্থীদের আবেদনপত্র গ্রহণের হার ৯৫% এরও বেশী।

উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য কানাডার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে আমাদেরকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে এই সিষ্টেমের কোন অপব্যবহার যাতে না হয়।

 ছবিতে দেখা যাচ্ছে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রম করে কানাডায় প্রবেশ করছেন কয়েকজন শরণার্থী। ছবি : ক্রিস্টিন মুসি/রয়টার্স

জাস্টিন ট্রুডো আরো বলেছিলেন, আমাদেরকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে কাদের সবচেয়ে বেশী সাহায্যের প্রয়োজন, কে একজন সত্যিকারের রিফিউজি বা শরণার্থী। সিস্টেম এবিউজ করে কেউ শর্টকাটে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সী বা সিটিজেনশীপ পাওয়ার জন্য রিফিউজি ক্লেইম করলে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়।

ইমিগ্রেশন, রিফিউজি এ্যান্ড সিটিজেনশীপ কানাডা’র একজন মুখপাত্র ইতিপূর্বে গ্লোবাল নিউজকে বলেন, কানাডার আইন অনুসারে কেউ এখানে রিফিউজি ক্লেইম করলে তার কেইস হিয়ারিং এর সুযোগ রয়েছে। এটি তার অধিকার। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কেউ ক্লেইম করলেই কানাডায় থাকার গ্যারান্টি পেয়ে যাবেন।

উল্লেখ্য যে, কানাডায় কেউ রিফিউজি ক্লেইম করলে সেটি শুনানি বা হিয়ারিং ছাড়া খারিজ করে দেওয়া যায় না। ভেঙ্কুভার নিবাসী শরণার্থী ও অভিবাসন আইনজীবী মোজদেহ শাহরিয়ারি সিবিসিকে বলেন, শুনানী ছাড়া রিফিউজি ক্লেমেন্ট বা শরণার্থীদের মামলা অনুমোদন করা একসময় বিরল ঘটনা ছিল। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লক্ষ মামলা শুনানির অপেক্ষায় থাকায় সরকার সেগুলো দ্রুত প্রসেসিং এর জন্য চেষ্টা করছে পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই।

শাহরিয়ারি আরো বলেন, এভাবে শরণার্থীদের মামলা নিষ্পত্তি করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আর এটা এখন বুঝতে পারাটা কঠিন নয় যে কানাডায় শরণার্থী সুরক্ষার যে ব্যবস্থাটা বিদ্যমান রয়েছে তার অপব্যবহার করা হচ্ছে এবং দিন দিন এই অপব্যবহার বাড়ছে। 

তবে শাহরিয়ারি বলেন, ইরান থেকে যারা কানাডায় এসে রিফিউজি ক্লেইম করছেন জীবনের নিরাত্তা নেই দাবী করে, তাদের সিংহভাগের কাহিনীই সত্য। কারণ ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থায় জীবন সেখানে ‘ভায়াবহ’। দেশটিতে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা অথবা যারা ইসলাম ব্যতিত অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, তারা কঠোর নির্যাতনের সম্মুখীন হন।

ইমিগ্রেশন এ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড সাধারণত যে প্রমাণগুলো যথেষ্ট বলে মনে করে তা হলো আবেদনকারী গির্জায় যাচ্ছেন তার ছবি, অথবা খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন তার প্রমাণপত্র ইত্যাদি। কিন্তু যেহেতু এই ধরনের প্রমাণ জাল করা যেতে পারে তাই সিস্টেম এবিউজ এর সুযোগ থেকেই যায়।

সিবিসি নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান থেকে আসা বেশিরভাগ রিফিউজি ক্লেমেন্ট দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এমন দাবী করেন। এদের বেশিরভাগই ধর্মত্যাগী বা ইসলাম ত্যাগকারী।

শাহরিয়ারি বলেন, তবে ইরান থেকে আসা অনেক রিফিউজি ক্লেমেন্ট এর কাহিনী সত্য নয় বা তাদের দাবী বৈধ নয়। তিনি এরকম সন্দেহভাজন শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে রাজি হওয়ার আগে তাদের কাগজ-পত্র ভাল করে যাচাই-বাছাই করে দেখেন। এরা হতে পারে ভিজিটর ভিসায় বা স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডা এসেছেন এমন ব্যক্তি এবং উন্নত জীবনের আশায় এখানে থেকে যেতে চাচ্ছেন। তিনি বলেন, এটি বন্ধ করার জন্য বিদেশে কানাডিয়ান ভিসা সেন্টারগুলোতে স্ক্রিনিং বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ইমিগ্রেশন এ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের উচিত শুনানির সংখ্যা বৃদ্ধি করা।

ইমিগ্রেশন এ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এক বিবৃতিতে বলেছে তারা শুনানি ছাড়া শরণার্থীদের মামলাগুলো প্রসেস করবে না। মামলা প্রসেস করার আগে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স লাগবে এবং একই সাথে তাদের আইডেন্টিটি বা পরিচয়ের বিশ^াসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ নিয়ে কোনও উদ্বেগ থাকলে চলবে না।    

সিবিসি নিউজ তাদের অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে যে, গত পাঁচ বছরে কানাডায় শরণার্থীদের বরণ করে নেওয়ার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এদের মধ্যে ইরান ও তুরস্কের মানুষদের গ্রহণযোগ্যতার হার সর্বোচ্চ, ৯৫ শতাংশেরও বেশি। অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন উচ্চ গ্রহণযোগ্যতার কারণ হলো লোকেরা তাদের সরকারের নিপীড়নের হাত থেকে পালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্বিস্তরযুক্ত রিফিউজি ক্লেইম সিস্টেম। অর্থাৎ এই সব দেশ থেকে আসা রিফিউজিদের ক্লেইমের বিষয়ে ততটা যাচাই-বাছাই করা হয় না।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য

অন্যদিকে, কিছু আশ্রয়প্রার্থী রিফিউজি চরম তদন্তের সম্মুখীন হন। টরন্টো নিবাসী অভিবাসী আইনজীবী ভাক্কাস বিলসিন সিবিসিকে বলেন, নাইজেরিয়া বা এরকম কিছু দেশ থেকে আসা

আশ্রয়প্রার্থীদের সবসময় শুনানিতে পাঠানো হয়। এই আশ্রয়প্রার্থীদেরকে ইমিগ্রেশন এ্যান্ড রিফিউজি বোর্ড এর সদস্যের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে তার দেশের পুলিশ তাকে রক্ষা করতে পারবে না। আর সে যদি সে দেশের অন্যকোন অঞ্চলেও চলে যায় তবু সে নিরাপদ নয়।

সিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে নাইজেরিয়া থেকে (২০১৮ – ২০২৪ সালের মধ্যে) কানাডায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের একসেপ্টেন্সীর হার ছিল ৪৬%।) 

উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় আশ্রয়প্রাথী শরণার্থীর সংখ্যাও বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তে বা বিমান বন্দরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৃদ্ধি করার পরও কমানো যাচ্ছে না শরণার্থীদের ভীড়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবেশ করা আশ্রয়প্রার্থীদের স্রোত ঠেকাতে ২০২৩ সালের শেষের দিকে কানাডা স্থল সীমান্ত পথে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নয়। এতে করে প্রথম কিছুদিনের জন্য সীমান্তের অননুমোদিত পথে ধরা পড়া লোকের সংখ্যা কমে এসেছিল।

কিন্তু পাঁচ মাস পর দেখা গিয়েছিল, কানাডায় উদ্বাস্তু হওয়ার আবেদন জানানো লোকের সার্বিক সংখ্যা কমার পরিবর্তে বেড়েছে। অনেকে বিমানে আসছেন, অনেকে ফেরত পাঠানোর ভয় না করে সীমান্তপথ গলে ঢুকে পড়ছেন এবং আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন না করতে পারা পর্যন্ত লুকিয়ে থাকছেন। অভিবাসীদের সঙ্গে কাজ করেন এমন লোকেরা রয়টার্সকে এসব তথ্য দিয়েছেন।

হিসাবে দেখা গেছে ২০২২ সালে অননুমোদিত সীমান্তপথে ৩৯ হাজারের বেশি আশ্রয়প্রার্থী কানাডায় ঢুকেছে। এদের বেশিরভাগ নিউ ইয়র্কের রক্সহ্যাম রোডের একটি ধুলি ধূসর রাস্তা দিয়ে কানাডার কুইবেক প্রদেশে আসেন, যার ফলে প্রদেশটি দ্রুতই স্বীকার করে নেয় যে তারা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ সামলাতে পারছে না।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সার্বিকভাবে কানাডায় প্রবেশ করা আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে জুলাই মাসে কানাডায় শরণার্থীর মর্যাদা পাবার আবেদনের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২,০১০ টি- যা একক মাসের হিসাবে অন্ততপক্ষে ২০১৭ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ এবং ২০২৩ সালের মার্চের ১০,১২০টিকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি কানাডার অভিবাসন, উদ্বাস্তু ও নাগরিকত্ব বিষয়ক দপ্তরের হিসাব।

রয়টার্স কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টোতে ২০২৩ সালে আসা ১০ ব্যক্তির সাথে কথা বলেছে যারা শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তারা এসেছেন সুদান, উগান্ডা, মেক্সিকো এবং অন্যান্য দেশ থেকে। সবাই এসেছেন বিমানযোগে বৈধ ভিসা নিয়ে। কেউ কেউ এখানে আসার কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে উদ্বাস্তু হবার আবেদন জানিয়েছেন।

তারা সবাই পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে নানা কারণে দেশ ছাড়লেও তাদের আকর্ষণ করেছে একটি অভিন্ন বিষয়। সেটি হলো, মানবাধিকার রক্ষা ও আশ্রয়দানের বিষয়ে কানাডার সুনাম।

অন্যদিকে কানাডায় পড়তে আসা অনেক শিক্ষার্থীও সম্প্রতি রিফিউজি ক্লেইম করেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে ইমিগ্রেশন, রিফিউজি এ্যান্ড সিটিজেনশীপ কানাডার সূত্র উল্লেখ করে গ্লোবাল নিউজের এক খবরে বলা হয় ঐ বছর পহেলা জানুয়ারী থেকে শুরু করে ৩১ আগস্টের মধ্যে কানাডায় মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৩৫ জন ব্যক্তি রিফুউজি ক্লেইম করেছেন। এর মধ্যে ১২ হাজার ৯ শ ১৫ জন ক্লেমেন্ট ছিলেন স্টাডি পারমিটে এবং ১ হাজার ৩ শ ১০ জন স্টাডি পারমিট এক্সটেনশনে।

গ্লোবাল নিউজের খবরে বলা হয় ২০১৮ সালে কানাডায় ১ হাজার ৫ শ ১৫ জন শিক্ষার্থী রিফুউজি ক্লেইম করেছিলেন।

ঐ সময় কানাডার ইমিগ্রেশন মন্ত্রী মার্ক মিলার গ্লোবাল নিউজের সাংবাদিক মার্সিডিস স্টিফেনসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্রমবর্ধমান সংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডায় প্রবেশের পর এ দেশে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য আশ্রয় দাবি করছে। এই প্রবণতাকে মন্ত্রী ‘উৎকণ্ঠাজন’ বলে অভিহিত করেছেন। মন্ত্রী আরো বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ স্টুডেন্ট ভিসার প্রোগ্রামটিকে ‘কানাডায় ব্যাকডোর এন্ট্রি’ হিসাবে ব্যবহার করছেন। প্রায়শই এটি করা হচ্ছে তাদের টিউশন ফি কমানোর জন্য। এই পরিস্থিতিতে কানাডার বিশ^বিদ্যালয় ও কালেজগুলোকে অবশ্যই তাদের স্ক্রিনিং এবং মনিটরিং প্র্যাকটিসকে উন্নত করতে হবে যাতে কেউ এই সিস্টেমের অপব্যবহার না করতে পারে। এদিকে নতুন এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪৪ শতাংশ কানাডীয় মনে করেন, দেশে খুব বেশি অভিবাসন হচ্ছে। এনভায়রনিক্স এই সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় বলা হয়, “প্রতি ১০ জনের মধ্যে চার জনেরও বেশি কানাডীয় এখন এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন যে, ‘কানাডায় খুব বেশি অভিবাসন হচ্ছে।” এই বক্তব্যে জোরালো সমর্থন জানান ২৩% এবং অনেকটাই সমর্থন জানান ২১% কানাডীয়। এই সংখ্যাটা এক বছর আগের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি এবং তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এক বছরের মধ্যে জনমতের বৃহত্তম পরিবর্তন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *