টরন্টোতে আসছে ঐতিহাসিক যাত্রা পালা ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’
মার্চ ১১, ২০১৭

রেজাউল হাসান ॥ ধীরে ধীরে সব কিছুই উঠে আসছে বাংলাদেশের হৃদয় হতে। প্রথমে আসতে শুরু করে লাউ,কুমরো,লতা পাতা, মাছ-এমন কী পান সুপুরি – আতলান্তিকের এপারে বাঙ্গালীদের বাস হলেও আক্ষেপ করার আর কিছুই থাকলো না। স্যাটালাইট টিভিতে যেমন দেশের প্রতি মুহূর্তের খবর এসে পৌঁছুচ্ছে তেমনি দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা এসে প্রায়শই আসর জমাচ্ছে এই টরন্টোতে। ঢাকার মঞ্চের অনেক খ্যাতিমান শিল্পী বাসা বেঁধেছেন এই সিটিতে – তারা থিয়েটারের দল গড়ে মাতাচ্ছেন মঞ্চ। শুধু বাকী ছিল যাত্রা।
এই শীত প্রধান দেশে যাত্রার সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা কি সম্ভব! বাংলাদেশের শীত মানে এখানে ‘ঠান্ডা গ্রীষ্ম’। সূতির চাদরেও যা মানানো যায়। আর এখানে খোলা প্রান্তরে জাম্বু জাম্বু জ্যাকেটেও হিমের মাঝে উষ্ণতার কথা ভাবাই যায়না।-সেই অসম্ভব, অবাস্তব বিষয়টিকে-সম্ভব ও বাস্তব করে তুলছেন-প্রথিতযশা মঞ্চ অভিনেতা-ঢাকা পদাতিকের মানিক চন্দ। জন্ম তার সিলেটের হবিগঞ্জে। শৈশব থেকে বেড়ে ওঠেছেন যাত্রা পালা দেখতে দেখতে। বাবা-মনোরঞ্জন চন্দ ছিলেন খ্যাতিমান যাত্রা নট। বাবার প্রবহমান রক্তের ধারা থেকেই মঞ্চে অভিনয় করলেও যাত্রার নেশাটা রয়েই গেছে।
টরন্টোতে কি করে যাত্রা পালা নামানো যায়! তার এই পরিকল্পনার পরীটা আকাশে উড়ে যায়-থাকে শুধু কল্পনা। এ সময় তার সাথে দেখা হয়ে যায় অমিততেজী যুবা রিজওয়ান রহমানের সাথে। মঞ্চে মানিকের অভিনয় দেখে তাকে সে ‘নটরাজ’বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। হঠাৎই একদিন তার মনের এই আকাঙ্খার কথা জানান রিজওয়ানকে। রিজওয়ান তাতে সায় জানান। তারা টরন্টো থিয়েটার প্লাস নামে একটি নাট্য সংগঠন গড়ে তোলেন। যার সভাপতি মানিক চন্দ আর সাধারণ সম্পাদক রিজওয়ান। এবং মার্চের ১৮ ও ১৯ তারিখে বার্চমাউন্টের গ্র্যান্ড প্যালেসে ঐতিহাসিক যাত্রা পালা নবাব সিরাজদ্দৌলা মঞ্চায়নের ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে স্পন্সর থেকে শুরু করে টরন্টের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন মানিক চন্দ। আরও আছেন অরুন্থিয়া ঊর্মী, শেখর গোমেজ, লিটলী রায়, সুব্রত পুরু, মোস্তফা দুলারী, জাহানারা চিনু, মেহরাব রহমান, ম্যাক আজাদ, দিলীপ দাস, চিত্ত ভৌমিক ও অনুপ সেনগুপ্ত।

মানিক বলেন, আমরা পালাটাকে বিন্যাস করেছি। সব চরিত্র ছেটে রেখেছি মাত্র দশটি চরিত্র। এবং সময়ও দু’ঘন্টার বেশী হবেনা। মানিক বলেন, পালা হিসেবে নবাব সিরাজউদ্দৌলা নির্বাচনের পেছনে সবচে’বড় কারণ হচ্ছে-এ পালার আবেদন চিরায়ত। সিরাজ বলছেন, বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-এই যে সব ধর্মালম্বীদের একত্রে বাস করার যে অসাম্প্রদায়িক বাংলার কথা বলার চেষ্টা করছেন-এটা এই সময়ের জন্যে খুবই প্রযোজ্য-নয় কি! বাংলা তো এক সময় অসাম্প্রদায়িক বাংলাই ছিল-প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সেটা পছন্দের নয়। তারা একের পর এক চক্রান্তের বীজ বুনেই চলেছে। এছাড়া নবাবের দেশ প্রেমও আমাদেরকে উজ্জীবিত করে বইকি!
নবাব সিরাজউদ্দৌলার পালাটিতে নির্দেশনা দিয়েছেন মানিক চন্দ ও টরন্টোর নাট্যজগতের আরেক দিকপাল সুব্রত পুরু।
সম্প্রতি প্রবাসী কন্ঠের সম্পাদক খুরশিদ আলম ও আমি এই পালার মহলা দেখতে গিয়েছিলাম। বার্চমাউন্টের হিন্দু ধর্মাশ্রমে। নবাব, মীরজাফর, আলেয়া-মোহনলাল অংশ নিচ্ছিলেন মহলায়। তবে সকলেরই পরণে ছিল অত্যাধুনিক জিনস আর টপ্স। পালার কোন আবহ না থাকলেও সংলাপে তা ছিল। সুব্রত পুরুর নির্দেশনায় বেশ মুন্সিয়ানা ছিল। বারবার শিল্পীদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন-কেমন করে উচ্চলয়ে সংলাপ ক্ষেপন করতে হবে। মনে হচ্ছিল, টরন্টোর দর্শকরা আসল যাত্রারই স্বাদ নিতে পারবেন।
মানিক চন্দ বললেন, ঢাকার থেকে পোশাক সব এসে গেছে। এখন শুধু বাকী হ্যাজাক বাতি জ্বালানোর!
দেশের সাংস্কৃতিক ধারাটাকে প্রবাসেও অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করছি : রিজওয়ান

রেজাউল হাসান ॥ টরন্টোর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে রিজওয়ান রহমানকে সবাই জানে একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে। টেইলর ক্রিক পার্কে একুশের স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের একজন পুরোধা কর্মী হিসেবে সবাই তাকে চেনে ও জানে। এছাড়া ড্যানফোর্থে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সেন্টারে-‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’অনুষ্ঠান করে বেশ সাড়া জাগিয়েছিলেন। রিজওয়ান বলেন, আমাদের পরের প্রজন্ম দেশ সম্পর্কে তেমন একটা জানেনা। এখানে তাদেরকে দেশের সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চেষ্টা করেছি। এছাড়া এখানে বয়োজ্যেষ্ঠরা কমপিউটার সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। এই যেমন ‘ফেস বুক’বর্তমানে সকলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের একটা বড় মাধ্যম। আমরা তাদেরকে ফেস বুকের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা দেই। এটা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। যতো দূর জানি, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেন্টারে কমপিউটারের উপরে এ রকম সফল ট্রেনিং কোর্স আর হয়নি।
রিজওয়ান ওয়াই ই আই (ইয়ুথ এন্গেজমেন্ট ইনিশিয়েটিভ) প্রতিষ্ঠাতা। রিজওয়ান জানাান, আমাদের তরুণ প্রজন্ম যাতে এখানে ভাল কাজের সুযোগ পায়-এটা তারই একটা উদ্যোগ। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্সের কর্মকর্তাদের সাথে প্রথমে তাদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। তারপরে অনুষ্ঠিত জব ফেয়ারে পূর্ব পরিচিত সেইসব কর্মকর্তাদের দেখে তারা যেমন স্বচ্ছন্দ বোধ করে তেমনি তাদের চাকরির ইন্টারভিউটাও সহজ হয়। আমাদের এই প্রজেক্টটা বেশ সাফল্য অর্জন করেছে।
নব গঠিত থিয়েটার প্লাসের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে রিজওয়ান বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক ধারাটাকে প্রবাসে অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করবো। মাণিক চন্দ যখন যাত্রা পালার ব্যাপারে আমাকে প্রস্তাব দেন-আমি সানন্দে তাতে সায় জানাই। যাত্রা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। অপ-সংস্কৃতি আমাদের এই ঐতিয্যকে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। কিন্তু তারপরেও এই যাত্রা মানেই একটা নস্টালজিয়া। মঞ্চের চার পাশে বসে আছে বাদ্য যন্ত্রীরা। নৃত্য গীতের ফাঁকে ফাঁকে চলছে পালা। আমরা চেষ্টা করবো এই আবহটা রাখতে। এ দায়িত্বে আছেন রাজীব ও মামুন কায়সার। মাঝে মাঝে অরুণা হায়দারের পরিচালনায় এক ঝাঁক নৃত্য শিল্পী এসেও মঞ্চ মাতাবেন। এখন পালাটা বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে উন্মুক্ত আকাশের নীচে হ্যাজাক বাতির প্যান্ডেলে এই পালা করার সাধ আছে।